আমার পারুলভাবি

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

এস এম ফারুক হোসাইন
আমার মা ফিরোজা বেগম। গৃহিনী তিনি। বাবা স্কুল শিক্ষক। আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সারথি ছিলেন বাবা। কী এক অজ্ঞাত কারণে আমার ব্যক্তি জীবনে বাবা অপেক্ষা মায়ের প্রভাব অধিক। মা ছুঁয়ে যান আমার অন্তর-আত্মাকে বাবা বিনির্মাণ করেন আমার বৈশ্বয়িক ভাবনাগুলোকে। মা আমার একান্তই ব্যক্তি জীবনের আশ্রয়স্থল। হৃদয়ের অতল গহ্বরে স্বযন্তে লুকিয়ে রাখা জীয়নকাঠি। আমার সকল বেদনায়, বঞ্চনায়, হতাশায় উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি তাঁর। আর আমার জাগতিক সকল সংকটে কাণ্ডারি হয়ে আবির্ভূত হন বাবা। পিতা-পুত্রের যুগল সমন্বয়ে সে সংকট থেকে স্থিত হই আমি। এই আমি এবং তাঁরা কী আশ্চর্য এক মেলবন্ধন!

আমার বাবা-মার এই যুগল মিথষ্ক্রিয়ার অনুরূপ সংস্করণে আমার স্থানান্তর ঘটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলিম আল দীন-বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা দম্পতির স্নেহছায়ায়। পরিচয়ের প্রথম পর্যায়ে বেগমজাদী মেহেরুন্নেসাকে ম্যাডাম বলে সম্বোধন করতাম। বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল কিশোর আমি তখন। ভয়-সংকোচ-জড়তা তখন আমার পায়ে পায়ে ভর করে চলে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশ ও তার মাঝে বসবাসরত মানুষগুলোর প্রতি বুকভরা অপার অদম্য কৌতূহল। আমার এই মানসিক অবস্থার দুই বিপরীতমুখী দ্বন্দ্ব এবং কিছু বন্ধুর তথাকথিত প্রগতিশীলতার বায়বীয় স্বপ্নে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার এমনই মানসিক অবস্থায় সৃষ্টিকর্তার করুণা হিসেবে পেলাম বেগমজাদী মেহেরুন্নেসাকে। আমার আনন্দ-বেদনা আর দুঃখ-কষ্টের সহমর্মী হয়ে উঠলেন তিনি। ম্যাডাম বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা সেলিম থেকে তিনি হলেন আমার পারুলভাবি। এটি ছিলো আমার ১৯৯৪ সালের চিত্রপট। আমি তখন নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের সাধারণ এক শিক্ষার্থী। চলনে বলনে এবং গেট-আপে ছিলো না আধুনিকতার মোহনীয় জৌলুস, ছিলো না বুদ্ধিদীপ্ততার চোখ ধাঁধানো বর্ণিলচ্ছটা। আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই আমি। তবুও কেন পারুলভাবির স্নেহছায়া আমাকে আবৃত করেছিলো? এ প্রশ্নটি আমার জীবনের সুখস্মৃতি, অহংকারও বটে।

নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে পারুলভাবির সান্নিধ্য সর্বাধিক জুটেছিলো আমার ভাগ্যে। কারণ নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে দীর্ঘতম শিক্ষার্থী জীবন হয়তো আমার। সেই ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। অর্থাৎ অনার্স, মাস্টার্স, এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি সমাপ্ত করে ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে আমি যোগদান করি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে। এই দীর্ঘ শিক্ষার্থী জীবনের সুদীর্ঘ পথচলা মোটেই মসৃন ছিলো না। যাঁদের আঁকড়ে ধরে আমার পথপরিক্রমা তাঁদের মধ্যে অন্যতম পারুলভাবি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কোনো কোনো বাঁকে এমন সংকটে পতিত হয়েছি যে সেখানেই আমার শিক্ষাজীবনের ইতি টানার কথা। পারুলভাবির উৎসাহ, অনুপ্রেরণা, মমতাময়ী স্পর্শ রূপ নিয়েছে আলোকবর্তিকায়, পেয়েছি নতুন উদ্যম, অসীম সাহস। বললে অত্যুক্তি হয় না, এই আজকের আমি তার অনেকটাই পারুলভাবির মমতা আর আঁচলে পাতা। আমি তাঁর প্রতি আজন্ম ঋণী। পারুলভাবির প্রতি এই ঋণ শিক্ষার্থী, গবেষক, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী অনেকেই হয়তো স্বীকার করবেন। কারণ তাঁর স্নেহশীতল স্পর্শে অনেকে ধন্য হয়েছিলেন। তবে আমার প্রাপ্তিটা যে প্রত্যাশার অধিক ছিলো তা টের পাই স্মৃতির খেরোখাতা উন্মোচনে কিংবা প্রাত্যহিক জীবনের অনেক আয়োজনেই।

সেলিম আল দীন স্যার প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ একজন মানুষ ছিলেন। ছিলেন ঘরোয়া আড্ডাবাজ এক স্বপ্নচারী। প্রতিদিন স্যারের বাসায় জমতো রাত্রীকালীন ঘরোয়া আড্ডা। রাতের খাবার শেষে সিগারেট হাতে সেলিমস্যার ডিভানে হেলান দিয়ে বসতেন ডয়িং রুমের কার্পেটে। আমরা বসতাম স্যারকে তিন দিক ঘিরে। আমরা কী করছি, কী ভাবছি, স্যারের নতুন নাটকের পাঠ, দেশ পেরিয়ে বিশ্ব, সাাহিত্যের সমান্তরালে সমকালীন রাজনীতি, চিত্রকলা কতো বিষয়ই না উঠে আসতো সে আড্ডায়। সেলিম স্যারের Sense of Humor ঈর্ষণীয় ছিলো। তিনি যে কতো বড়ো Humorist ছিলেন তাঁর একান্ত সান্নিধ্য না পেলে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। তাঁর Witticism ভীষণভাবে উচ্ছ্বসিত করে তুলতো আড্ডাকে। একথা ওকথা নানা তত্ত্বকথা, হাস্য-রসিকতায় পার হতো রাতের দু’প্রহর তিন প্রহর, কখনো কখনো শেষ প্রহর। এটা একদিন-দু’দিন নয়, নিত্য আবর্তিত ঘটনা। আমাদের এই আড্ডায় পারুলভাবিকে সরাসরি যোগ দিতে কখনো দেখিনি। তবে বাসার ভিতর গভীর রাত পর্যন্ত এমন হৈচৈ এ তিনি যে বিরক্ত হয়েছেন তার ছিটেফোঁটা প্রমাণও কোনো দিন পাইনি। পারুলভাবি অন্তর্মুখী মানুষ ছিলেন। তাঁর যাপিতজীবন নিজের জগতে নিজের বসবাস। আমরা অনেকে বুঝতে পারতাম চলমান এ আড্ডা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। তবুও হাসিমুখে তিনি প্রশ্রয় দিয়েছেন আমাদের। এটা যে সেলিমস্যারের ভালো লাগার প্রতি পারুলভাবির শ্রদ্ধা প্রদর্শন তা অনুভবে আমাদের অসুবিধা হতো না। নিজের ভালোলাগাকে অবদমিত করে অন্যের ভালোলাগার প্রতি সম্মান দেখানোর দৃষ্টান্ত আমাদের সংসারে খুব অল্পই দৃষ্ট হয়। বিষয়টি সম্ভবত কারো প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশেরই নামান্তর।

অতিথি আপ্যায়নে পারুলভাবি ছিলেন অদ্বিতীয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক ব্যক্তির আগমন ঘটেছে সেলিমস্যারের বাসায়। এমনকী বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার-এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসেছেন অনেক নাট্যকর্মী। সবাইকে সদাহাস্যমুখে আন্তরিকতা নিয়েই স্বাগতম জানিয়েছেন পারুলভাবি। তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন হৃদ্যতার সাথে, আপ্যায়ন করেছেন আপন হাতে। সর্বস্তরের মানুষকে ভালোবাসার এক বিশাল হৃদয় উত্তরাধিকারসূত্রেই পেয়েছিলেন তিনি। যার প্রমাণ পেয়েছি তাঁর মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ঘনিষ্টতার মাধ্যমে।

সেলিম আল দীন স্যার ভীষণ ভোজনরসিক ছিলেন। আমার দেখা মতে মাছ ছিলো তাঁর প্রিয় খাবার। নানান প্রজাতির মাছে নানা উপাদেয় রান্না হতো ভাবির হাতে। কতোবার খাওয়া শেষে স্যারকে বলতে শুনেছি- ‘আহা-হা ঝোল তো নয়, যেন অমৃত।’ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করলেও বলতে পারি ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতো পারুলভাবির। তবুও তিনি ছিলেন সদাহাস্যোজ্জ্বল মানুষ। সন্তানহীন জীবন, আত্মজতুল্য ভগ্নীকন্যা অন্বিতার দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসার অতঃপর মৃত্যু, স্বামীর অকাল মহাপ্রয়াণ তাঁর পরমপ্রাপ্তির অন্তরায় ছিলো। তবে শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বিবাবিত জীবনের প্রথম দিকটায় তিনি সৃষ্টিকর্তার সুনজরে ছিলেন অনুমান করতে পারি। কারণ সম্ভ্রান্ত এক শিক্ষক পরিবারের প্রথম সন্তান তিনি। সংসার পেতেছিলেন ভালোবাসার প্রিয়ব্যক্তিকে নিয়ে। স্বামী সেলিম আল দীন তখন উদীয়মান নাট্যকার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তরুণ শিক্ষক। তিনিও বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে। সেলিমভাবির বাবাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাঁর মা এবং ভাই-বোনরা প্রচণ্ড ভালোবাসতেন পারুলভাবিকে। অগ্রজের প্রতি তাঁদের এই ভক্তি তাঁদের শিষ্টাচারের বহিঃপ্রকাশ সন্দেহ নেই। তবে পারুলভাবিকে এই হৃদয় উচ্ছ্বসিত মমতা অর্জন করতে হয়েছে সেটাও তো অস্বীকার্য। কারণ পাত্রের গুণাগুণের ভিত্তিতেই তো দানের ধরন, রকম ও পরিমান নির্দিষ্ট হয়। এমন অবস্থায় যার যাপিতজীবন- তাঁকে ভাগ্যবান মানুষ হিসেবে কল্পনা করা অমূলক নয়।

পারুলভাবির ছন্দময় জীবনে ছন্দপতনের সূচনা ঘটে সাতমাসের গর্ভজাত পুত্রের অনন্তযাত্রায়। শুনেছি অপূর্ব সুন্দর, কান্তিময় পুত্রটির মৃত্যুর পর পারুলভাবির জন্য আরো একটি ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিলো। চিকিৎসাবিজ্ঞান সার্টিফাই করলো, তিনি আর মা হতে পারবেন না। একজন নারীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা দু’টো কতো মর্মান্তিক, যন্ত্রণাদায়ক, বেদনাবিধুর তা ভুক্তভোগী ব্যতীত কারো পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। পারুলভাবির পরবর্তী জীবন শুধু বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকা। কী আশ্চর্যজনক ক্লান্তিকর এ বেঁচে থাকা। আমাদের এই কর্মময় জীবন, তার ব্যস্ততা, আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা, আরো কতো কতো আয়োজন সবই তো আত্মজের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অভিপ্রায়ে। যে আত্মজহীন তার প্রয়াস? সেলিমস্যার আপনাকে নিমগ্ন করেছিলেন লেখালেখিতে। কীর্তিমান, খ্যাতিমান উভয় বিশেষণে ঈর্ষণীয়ভাবে তিনি ভূষিত। ব্যক্তিজীবনের শূন্যতা ও অপূর্ণতার মাঝেও তিনি খানিকটা স্বস্তির সন্ধান পেয়েছেন স্বীয় সৃজনশীলতায়। কিন্তু পারুলভাবি? বিবর্ণ প্রজাপতির জীবন নিয়েও তিনি সদাহাস্যোজ্জ্বল, সদালাপী, অতিথিবৎসল, মমতাময়ী এক নারী। ঠিক যেন প্রদীপের জ্বলন্ত সলতে। নিজে জ্বলে অন্যকে আলোদান, কিংবা মেহেদিপাতা, ভিতরটা থকথকে লাল বাহিরটা সবুজ।

অনেকটা অগোছালো জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন সেলিমস্যার। পারুলভাবি ঠিক তার বিপরীত মেরুর মানুষ ছিলেন। সব কিছু টিপটপ, ছিমছাম সযত্নে গোছানো। সেলিমস্যার কয়েকদিনের জন্য বাইরে গেলে পারুলভাবি ব্যাগ ঘুছিয়ে দিতেন। কাপড়, ঔষধ এবং ব্যবহার্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটি কাগজে লিষ্ট করে ব্যাগ সাজিয়ে দিতেন। কারণ অগোছালো-উদাসীন স্বামী তাঁর এখানে-ওখানে অনেক কিছুই ছেড়ে আসতেন। ভ্রমণে অথবা বাইরে অবস্থানরত সময়ে তাঁর প্রিয় নাট্যকারের কলম যেন থেমে না থাকে তার জন্য কাগজ গুঁজে ক্লিপফাইল ধরিয়ে দিতেন হাতে। সেলিমস্যারের দিনলিপি পারুলভাবির অনুপ্রেরণাতেই লিখা। স্পষ্ট মনে আছে, পারুলভাবি নিজের পছন্দমতো বড় রেজিস্ট্রার খাতা কিনে বাসায় ফিরতেন। সেলিমস্যারের সামনে রেখে অনুরোধ করতেন লিখতে। প্রথম প্রথম সেলিমস্যার খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেননি। ভাবির পীড়াপিড়িতে দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তা। শুধু দিনলিপি কেন? সেলিমস্যারের প্রতিটি লেখায় ছিলো পারুলভাবির অনুপ্রেরণা। সেলিমস্যারের যে কোনো লেখা প্রকাশ হলে সর্বাপেক্ষা আনন্দিত হতেন ভাবি। সে কী তাঁর উচ্ছ্বাস! শিশুর মতো সারাল্যে ভরা সে বহিঃপ্রকাশ।

তাঁদের সংসার জীবনের শুরুতে অর্থনৈতিক সংকট ছিলো বেশ। ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ, সামাজিকতা, সংসারের ব্যয়, স্যারের একার উপার্জনে স্বাচ্ছন্দ্যে চলছিল না তাঁদের জীবন। সেলিমস্যার তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক। ভাবি তখনো কলেজে যোগদান করেননি। তাঁরা বসবাস করতেন বর্তমান ফজিলাতুন্নেসা হলের একরুমের একটি কক্ষে। হলটি ছিলো তখন আলবেরুনী হলের বর্ধিত ভবন। স্যার ছিলেন উক্ত হলের আবাসিক শিক্ষক। ভাবির বক্তব্যে জেনেছি, স্যারের লেখার জন্য তিনি কীভাবে কাগজ সংগ্রহ করতেন। পরীক্ষণ নিমিত্তে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার যে খাতাগুলো স্যার বাসায় আনতেন, সে খাতাগুলোর শেষ পাতাটি অনেক ক্ষেত্রে ফাঁকা থাকতো। পারুলভাবি সেখাতাগুলো বেছে বেছে সাদাপাতাটি সংগ্রহ করতেন। সংগৃহীত কাগজগুলো স্ট্যাপলার করে স্যারকে দিতেন লিখতে। কতোখানি মমতা নিয়ে পারুলভাবি সংসার শুরু করেছিলেন তা বুঝবার জন্য হয়তো এই একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট।

আমরা বলতাম পারুলভাবি নাট্যকার সেলিম আল দীনের তথ্যভাণ্ডার। সেলিমস্যার মঞ্চের মানুষ হলেও বিভিন্ন মাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকী, গবেষণাপত্রিকাসহ অন্যান্য প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হতো সেলিমস্যারের লেখা। আবার এ সকল প্রকাশনা থেকে অনেকে প্রকাশ করেছেন তাঁর শিল্পদর্শন, নাটক এবং নাটকের মঞ্চরূপ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রবন্ধ। স্যারের এবং স্যার সম্পর্কিত সকল প্রকাশনাগুলো পারুলভাবি সংগ্রহ করেছিলেন পরম মমতায়। সেলিমস্যার সম্পর্কিত কোনো তথ্যের প্রয়োজনে আমাদের দ্বারস্থ হতে হতো পারুলভাবির। পারুলভাবি স্বীয় সন্তানের মতো আগলে রাখতেন তাঁর নাট্যকারের এবং নাট্যকার সম্পর্কিত যাবতীয় লিখা ও প্রকাশনাগুলো। মনে আছে, দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত স্যারের প্রথম দিককার কয়েকটি লিখা হারিয়ে গিয়েছিল। পারুলভাবি লেখাগুলো সংগ্রহের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। অবশেষে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সিডনির বাবার সহযোগিতায় বাংলা একাডেমির পুরাতন পত্রিকা ঘেঁটে লেখাগুলো উদ্ধার করেছিলেন তিনি। বছরে দু’বার ভাবি সংগৃহীত লিখাগুলো রোদে শুকাতে দিতেন। প্রত্যেকটি প্যাকেটের উপরে লিখাগুলোর শিরোনাম সম্বলিত একটি তালিকা থাকতো। যা দেখে বুঝে নিতেন ভাবি প্যাকেটটিতে কী কী বিষয়ভিত্তিক লিখা বিদ্যমান। পারুলভাবির খুব ইচ্ছা ছিলো তিনি সেলিম আল দীন ফাউন্ডেশন করবেন। স্থান হিসেবে তিনি নির্বাচন করেছিলেন স্যারের খরিদকৃত অরুণাপল্লীর জমি। পারুলভাবির সংগৃহীত সকল তথ্য-উপাত্ত ও গ্রন্থের সমন্বয়ে তৈরি হবে একটি গ্রন্থাগার। গবেষকগণ সেখান থেকে সম্পন্ন করবেন সেলিম আল দীন সম্পর্কে বৃহৎ বৃহৎ গবেষণা। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ফাউনডেশন প্রবর্তন করবে বৃত্তির। ফাউন্ডেশন বিল্ডিং এর একটি তলায় নির্দিষ্ট হবে গবেষকদের আবাসিক ব্যবস্থা। আরো কতো স্বপ্ন! এই তো মৃত্যুর কিছুদিন আগেও যখন ভাবির কাছে গিয়েছিলাম তিনি শোনালেন কতো স্বপ্নের কথা, কতো পরিকল্পনার কথা। সহযোগিতা চাইলেন, দোয়া চাইলেন। সব চাওয়াগুলো তাঁর চাওয়াই রয়ে গেলো, স্বপ্নগুলো অনন্তযাত্রার ছায়াসঙ্গী হয়ে রইলো। চলে গেলেন তিনি।

ঐ যে শুরু করেছিলাম আমার বাবা-মার প্রসঙ্গ তুলে। আমার আজকের সামাজিক জীবন ও নিজস্ব ভুবনে সেলিমস্যার ও পারুলভাবির ভূমিকা ঠিক আমার বাবা-মার অনুরূপ। সেলিমস্যার বিনির্মাণ করেছেন আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর পারুলভাবি তৈরি করেছেন আমার ব্যক্তিজীবনের নিজস্ব আঙিনা। সকল কর্মব্যস্ততা সমাপনে আমি যখন উপনীত হই একান্তই আমাতে তখন আমার মায়ের সমান্তরালে অনুভব করি পারুলভাবিকে। তিনি যে আমার একান্ত আপনজন, ছিলেন অনেক ভরসার আশ্রয়স্থল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *