আলোর দিশারি হয়ে থাকবেন লোহানী ভাই

১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ভারতের সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল শিব প্রসাদ চক্রবর্তীর প্রয়াণে লিখেছিলাম ‘Heroes never die’। আর শনিবার চলে গেলেন বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আরো একজন মহান যোদ্ধা কামাল লোহানী। কামাল লোহানীদের মতো মানুষের মৃত্যু নেই। তাঁরা বেঁচে থাকেন অনাগত জীবনের প্রতিটি বাঁকে। ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ইতিহাস সৃষ্টি করেন যাঁরা তাঁরা তো জাতীয় বীর। জাতীয় বীরদের মৃত্যু নেই। তাঁদের অন্তর্ধান ঘটে। মাত্র কদিন আগে আমরা হারিয়েছি আমাদের পথপ্রদর্শক, সংগ্রামে-সৃষ্টিতে যাঁর অনিবার্য উপস্থিতি ছিল সেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে। যিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরে জাতির শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।

কামাল লোহানীর দেহ অবসান হয়েছে। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী চেতনার আলো প্রজ্বলিত হাজারো মানুষের হৃদয়ে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরশাসন, সেনাশাসন ও প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। পাবনায় ভাষা আন্দোলন কর্মী হিসেবে যে কামাল লোহানীকে আমরা দেখি, সেই কামাল লোহানী প্রথমে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক দর্শনে দীক্ষিত হয়ে জীবনকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যার প্রয়াস নেন। সেই পঞ্চাশ দশক থেকে আমৃত্যু তিনি সাম্যবাদের জয়গান গেয়েছেন। একদিকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। সরাসরি রাজনৈতিক দল করেননি। কিন্তু সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগঠিত করে তিনি জনগণকে সচেতন করতে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর জীবন একই আদর্শের পথিক। তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল মুক্তির সংগ্রামের নির্ভীক উচ্চারণ।

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনে পাকিস্তান সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করলে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পী-সাহিত্যকরা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন। গঠিত হয় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি। তরুণ কামাল লোহানী সেই আন্দোলনের একজন নিরলস কর্মী হিসেবে দিন-রাত পরিশ্রম করেছিলেন।

কামাল লোহানী ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছিলেন। গত শতকের ষাটের দশক বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন কার্যত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যার দ্বারা প্রভাবিত ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে তোলে স্বাধিকার আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন। সেই সময় কামাল লোহানী মিছিলে জনসভায় দৃপ্তকণ্ঠে স্লোগানে স্লোগানে উদ্বেলিত করত জনমানুষকে। পরবর্তী সময়ে কামাল লোহানী ছায়ানট ছেড়ে ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী তৈরি করেন।

লোহানী ভাই মওলানা ভাসানীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় সম্পর্ক ছিল। তিনি মুজিব ভাই বলে সম্বোধন করতেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্বাসে ভাসানীর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তৃতীয় কিস্তিতে যখন ১৯৭১ সালের মে মাসে কলকাতা থেকে শুরু হয়, তখন কামাল লোহানী বেতার কেন্দ্রের প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে মুক্তিযুদ্ধকালে সংবাদ ও কথিকায় তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অধিকৃত বাংলাদেশে বন্দি ছয় কোটি মানুষের মানসিক উজ্জীবন ঘটানোর জন্য সংবাদ পরিবেশনের ধরনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে যুদ্ধ রিপোর্টিং বিষয়ে কারো কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু আমাদের বেতারকর্মী, সংবাদকর্মী ও শিল্পীদের দেশপ্রেম সব অনভিজ্ঞতা ও বাধা অতিক্রম করে তাঁরা যুদ্ধবেতার পরিচালনার যে নজির স্থাপন করেছিলেন তা বিশ্ব ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কামাল লোহানী সে ভূমিকার একজন দক্ষ কারিগর।

যুদ্ধোত্তরকালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কালে যখন সংস্কৃতিকর্মীরা মঞ্চে ও রাজপথে সংগঠিত হয়েছিল, তখনো তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকার-আল-বদরদের বিচারের দাবিতে তিনি যে রকম সোচ্চার ছিলেন, একইভাবে সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

গত শতকের আশির দশকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। গণ-আদালত থেকে গণজাগরণ মঞ্চ—সর্বস্থানে তাঁর সরব উপস্থিতি আমাদের উজ্জীবিত করেছে।

জীবনের শেষে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে উদীচীর মতো আদর্শিক সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

কামাল লোহানী বাঙালি জাতিসত্তার স্বাধীন ও বিপ্লবী বিকাশ এবং সামাজিক অসাম্য দূর করার অভিপ্রায়ে সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা চিরদিন ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। এবং এই ন্যায়ের ঝাণ্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে রেখেই তিনি বিদায় নিয়েছেন আমাদের মাঝ থেকে।

তাঁর অনমনীয় সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য আলোর দিশারি হয়ে থাকবে।

আবারও বলছি, বীরের মৃত্যু নেই। তাই কামাল লোহানীর মতো মানুষের মৃত্যু নেই।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, নাট্য নির্দেশক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *