গ্রাম থিয়েটার : পঁয়ত্রিশ বছরের বৃত্তান্ত

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

[পাঁচ মার্চ ২০১৭, কথা বলেছিলাম মেলান্দহের ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নাটককার, সংগঠক, স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিককর্মী আসাদুল্লাহ ফারাজীর সাথে। নাট্যদলটি ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’-এর একটি সহযোগী সংগঠন। আসাদুল্লাহ ফারাজীর সাথে গ্রাম থিয়েটারের নানা প্রসঙ্গে আলোচনা করে তাঁর এলাকার গ্রাম থিয়েটারের অতীত ও বর্তমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যতে কি করার কথা তাঁরা ভাবছেন, এ সম্পর্কে জানার উদ্যোগ থেকেই বক্ষ্যমাণ কথোপকথনের জন্ম। আমার ধারণা এরকম যে, একটি অঞ্চলের গত পঁয়ত্রিশ বছরের গ্রাম থিয়েটারচর্চার বৃত্তান্ত জানতে পারলে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে চর্চিত এর ইতিহাস সম্পর্কেও একটি ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে। তবে বলাই বাহুল্য যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য অবশ্যই থাকবে। যাই হোক, ইতিহাসের খাতিরে এটুকু বলা প্রয়োজন যে, গ্রাম থিয়েটারের ওপর প্রথমদিকের কিছু তাত্ত্বিক রচনা আমি লিখেছিলাম। আমার সেই উৎসাহের খাসলত এখনো বিদ্যমান। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম থিয়েটারচর্চার বয়স পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রম করতে চলেছে। ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ সেই ১৯৮৩ সাল থেকেই এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে এখনো কাজ করে চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ৩-৫ মার্চ ২০১৭ সালে দলটি মেলান্দহে তাদের সংগঠনের পঁয়ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সেলিম আল দীন স্মরণ নাট্য উৎসব’-এর আয়োজন করে যেখানে বেশকিছু গ্রাম থিয়েটার ও অন্যান্য দল অংশগ্রহণ করে। গ্রাম থিয়েটারের কর্মী নাট্যপ্রাণ হুমায়ুন কবীর হিমু আমাকে এই উৎসবের খবর জানালে আমি সেখানে গিয়ে নাটক দেখে এই আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করি। হিমু আমাকে সব ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু ওখানে তিনদিন থেকে আমার মনে হলো এবিষয়ে নিজে কিছু না-লিখে যাঁরা এতো বছর ধরে এর চর্চা করছেন তাঁদের কারো সাথে কথা বললে বিষয়টির গভীরে যাওয়া যাবে। এই ভাবনা থেকেই আমার উৎসাহের পরিধির মধ্যে থেকে কিছু প্রশ্ন দাঁড় করাই এবং তার ভিত্তিতেই আসাদুল্লাহ ফারাজীর সাথে কথা বলে মেলান্দহসহ সার্বিকভাবে গ্রাম থিয়েটারচর্চার বর্তমান অবস্থা জানার চেষ্টা করি। এইসূত্রে এ-ধাঁচের থিয়েটার সম্পর্কে আমার অদম্য উৎসাহের কিছুটা হলেও নিবৃতি ঘটে। বলা দরকর যে, পুরো কথোপকথনের শ্রুতিলিখনের মতো কষ্টকর কাজটি করেছেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চলচ্চিত্র ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ’-এর ছাত্র নাজিমুল ইসলাম। তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ভবিষতে সুযোগ পেলে ‘গ্রাম থিয়েটার’ বিষয়ে আরো কিছু কাজ করার ইচ্ছে রইলো। -সাজেদুল আউয়াল]

সাজেদুল আউয়াল : আপনার কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে আপনার অঞ্চলের ‘গ্রাম থিয়েটার’ চর্চার বর্তমান অবস্থা কী রকম?
আসাদুল্লাহ ফারাজী : শুরুতেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্য যে, ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’ চর্চার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য আপনি ঢাকা থেকে সুদূর এই মেলান্দহে এসেছেন বলে। আমি যদি আমার অঞ্চলের কথা বলি, এখানে কয়েকটি সংগঠন কাজ করে, সেটার মাদার অর্গানাইজেশন হচ্ছে ‘শহীদ সমর থিয়েটার’। এখান থেকে আমরা সৃষ্টি করেছিলাম ‘টুপকারচর থিয়েটার’, ‘নবারুণ থিয়েটার’, ‘প্রভাতী থিয়েটার’। তারপরে আপনার ‘চারণ থিয়েটার’, ‘ইসলামপুর থিয়েটার’, ‘চারাইলদার থিয়েটার’ এবং পরে জামালপুরের ‘অমৃত থিয়েটার’। সর্বশেষ আমাদের সহযোগী সংগঠন হিসেবে জামালপুর শহরের ‘নাট্যনীড়’ যুক্ত হয়েছে। জেলা শহর জামালপুরের ‘অমৃত থিয়েটার’ এবং ‘নাট্যনীড়’ মোটামুটি কাজ করছে, খারাপ বলা যাবে না। আপনি জানেন যে গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রমকে কয়েকটা অঞ্চলে ভাগ করে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলটা হল ‘মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ অঞ্চল’। এই অঞ্চলে তিরাশি সালে আমরা ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করি। তখন এর নাম ভিন্ন ছিল। পরে গ্রাম থিয়েটারের অন্তর্ভুক্ত হই।
সা আ : তার মানে গ্রাম থিয়েটারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে এটা অন্যধরনের সংগঠন ছিল?
আ ফা : হ্যাঁ।
সা আ : তখন এই সংগঠনের নাম কী ছিল?
আ ফা : ‘মানব কল্যাণ সমিতি’। মেলান্দহ রেল স্টেশনভিত্তিক একটা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল ওটা; তার একটা কার্যক্রম ছিল নাটক মঞ্চায়ন। সেখানে যাত্রা ধাঁচের নাটক করা হত। এখানে বেশ কয়েকজন লোক ছিলেন। মুজিবর ফারাজী, রাশেদুল হাসান মানিক, লতিফ খান, হায়দার ভাই- এরকম আরও অনেকে যারা যাত্রা ধাঁচের নাটক করেছে, এমন কী একটা পর্যায়ে দেখেছি ওনারা পাঁচদিনব্যাপী টিকিটের বিনিময়ে/দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করেছেন। এবং সেই যাত্রা ধাঁচের নাটকগুলি যাত্রা যেভাবে হয় সেভাবেই হয়েছে, মানে দুই/তিন দৃশ্যের পর পর নাচ। তো, আমরা যখন প্রথম ‘মানব কল্যাণ সমিতি’তে নাটক করতে যাই, তখন আমার লেখা একটা নাটক ‘মানুষ-অমানুষ’ দিয়ে ওখানে কাজ করা শুরু করি।
সা আ : এটা কোন সনে?
আ ফা : ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নাটকের মহড়া শুরু করি। মার্চের প্রথম সপ্তাহে আমরা প্রথম একটা শো করি।

সা আ : এটাকে আপনারা গ্রাম থিয়েটারে পরিণত করলেন কোন সনে?
আ ফা : ১৯৮৩ সালের আগস্টের ১৯ তারিখে। ১৯৮৩ সালে ‘মানব কল্যাণ সমিতি’তে যখন আমার নাটক ‘মানুষ-অমানুষ’ হল, তখন আমরা গ্রাম থিয়েটারের সাথে অন্তর্ভুক্ত হলাম। আমরা ওইদিনই একটা আহ্বায়ক কমিটি করি। আর গ্রাম থিয়েটারের সাথে যোগাযোগটা সম্ভব হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন ছাত্রের কল্যাণে। ছাত্রটি আমাদের এলাকার। ওর নাম আইয়ুব খান। উনি সেলিম আল দীনের প্রিয়ভাজন ছাত্র ছিলেন। আইয়ুব খান আমাদের প্রস্তাব দিলেন যে, আপনারা নাটক করেন, তো গ্রাম থিয়েটারের সাথে যুক্ত হন। পরে আমি এবং মোখলেস চৌধুরী নামে আমাদের তৎকালীন একজন সদস্য, সিলেটে বাড়ী কিন্তু বিবাহসূত্রে জামালপুরে মানে আমাদের মেলান্দহে বসবাস করতেন, তাকে নিয়ে সেলিম আল দীন স্যারের সাথে দেখা করতে যাই। সেদিন প্রচণ্ড দাবদাহ ছিল।
সা আ : ওটা নিশ্চয়ই ১৯৮৩ সালে হবে?
আ ফা : হ্যাঁ। এটা সম্ভবত মে মাসের প্রথম দিক কিংবা মাঝামাঝি হবে। আমি স্যারের বাসায় দেখা করি। তখন স্যার ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটক লিখছেন। তিনি বললেন, আমি তো ব্যস্ত, নাটক লিখছি, বাহাত্তরটা ক্যারেক্টার হবে নাটকে। তো, যাই হোক, ওটাই ওনার সাথে আমার প্রথম আলাপ। আলাপের পর উনি কিছু দিক-নিদের্শনা দিলেন যে, যদি গ্রাম থিয়েটারের সাথে যুক্ত হও তাহলে নামকরণ করবা কোনো নদীর নামে, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির নামে, এলাকার নামে অথবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে। আমরা সেলিম আল দীন স্যারের সাথে আলাপ করে খুব অনুপ্রাণিত হই। উনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমাদেরকে গ্রাম থিয়েটারের উদ্দেশ্য, আদর্শ অল্প সময়ে চমৎকারভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমরাও বিষয়টা কিছুটা ধারণ করেছি। আমরা গ্রামে এসে সভা ডেকে একটা আহ্বায়ক কমিটি করি। নাম দেই ‘শহীদ সমর থিয়েটার’। সেটার আহ্বায়ক হিসেবে আমি ছিলাম। যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন আবুল মনসুর খান দুলাল।
সা আ : তখন থেকে এই পর্যন্ত আপনারা যে গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রম পরিচালনা করলেন, এগুলো কি নিজস্ব অর্থায়নেই করেছেন?
আ ফা : আমরা নিজস্ব অর্থায়নে কখনোই করিনি। কিছু কিছু চাঁদা দিয়েছি তবে বেশকিছু সুহৃদ মানুষ মেলান্দহে ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে আমরা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছি। তবে ১৯৮৩ সালে আমাদের দেশে টাকা-পয়সার যথেষ্ট অভাব ছিল। টাকা-পয়সা সংগ্রহ করা খুব কঠিন ছিল। আমরা কুপনের বিনিময়ে টিকিট ছেড়ে নাটক করেছি।
সা আ : আপনারা দর্শনীর বিনিময়েই নাটক করেছেন?
আ ফা : আমরা অনেকবার দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করেছি। আবার খোলা মাঠেও করেছি। শিল্পকলার খোলা মাঠে চার দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বজলুর রহমান ভূঁইয়া। মানউন্নীত থানার প্রথম নির্বাহী অফিসার ছিলেন উনি। এটা একটা খাস জমি ছিল। উনি এটা দখলমুক্ত করে এখানে উপজেলা লাইব্রেরি এবং শিল্পকলা প্রতিষ্ঠান করেন। প্রথম শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম বাবু। ওনার পরে আমাকে শিল্পকলার দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে যে কদিন আমি দায়িত্ব পালন করেছি, সেকদিন সরকারি কোন সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
আসাদুল্লাহ ফারাজীর বাসায় সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
সা আ : কিন্তু নানা উৎস থেকে আপনারা অর্থ সাহায্য নিতেন?
আ ফা : আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়েছি। আর বজলুর রহমান ভূঁইয়া নাটকের প্রতি এত অনুরক্ত ছিলেন, এত বড় একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন যে, উনি কোন না কোন সোর্স থেকে আমাদের টাকা সংগ্রহ করে দিতেন। আর আমরা তখন নাটকপ্রতি একেবারে ন্যূনতম খরচ পাঁচশ’ টাকা বা এক হাজার টাকা খরচ করতাম। হ্যাজাক জ্বালিয়ে করতাম, কারণ তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ আসলে এই ২০০ ওয়াটের বাল্ব জ্বালিয়ে আমরা নাটক করেছি। আমার মনে আছে- আমরা সেলিম আল দীন স্যার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, তৌফিক হাসান ময়না, সালাম সাকলাইন- তাঁরা এসেছিলেন ১৯৮৫-এর প্রথমদিকে।
সা আ : কোন নাটকটা করেছিলেন?
আ ফা : তখন আমরা সালাম সাকলাইনের ‘জাহেন আলীরে ধর’ করেছিলাম। স্যরি, আমি ভুল বলছি। এর আগে আমরা সেলিম আল দীনের ‘বাসন’ নাটকটি করেছিলাম। একেবারে প্রথম আমরা গ্রাম থিয়েটারে যুক্ত হওয়ার পরে। আমরা ‘বাসন’ নাটকটি হাতে নিই এবং করি। এখানে একটা পাবলিক হল ছিল সেখানে সেলিম আল দীন স্যার, মাহমুদভাই, রেজাভাই ছিলেন। এ রকম আরও তিন-চারজন এসেছিলেন এখানে ১৯৮৪ সালের প্রথম দিকে। তখন আমরা ‘বাসন’ করি। এরপর আমরা ‘জাহেন আলীরে ধর’ করি। ‘জাহেন আলীরে ধর’ আমরা অনেকগুলো শো করেছি ওই সময়, অন্তত তিরিশটার কম নয়। এটা আমরা দর্শনীর বিনিময়ে করেছি। আমরা তিন টাকা টিকেটের দাম রেখেছিলাম।
সা আ : আর ‘বাসন’-এর শো কয়বার করেছিলেন?
আ ফা : ‘বাসন’-এর অন্তত চল্লিশটা শো করেছিলাম।
সা আ : এর পর থেকে আজ পর্যন্ত কতগুলো নাটক করেছেন?
আ ফা : অল্পকথায় যদি বলতে যাই তাহলে ‘মানুষ-অমানুষ’, ‘বীরাঙ্গনা বিমলারা’, ‘রাক্ষসের ক্ষিধা’, ‘সি-মোরগ’, ‘সোহাগী বাইদানীর ঘাট’ – এই নাটকগুলো করি।
সা আ : এগুলো আপনার লেখা?
আ ফা : হ্যাঁ, এই নাটকগুলো আমার লেখা। আর সেলিম আল দীন স্যারের করেছি ‘বাসন’, ‘সঙবাদ কার্টুন’, ‘মুনতাসির’, ‘কেরামতমঙ্গল’ এবং ‘পুত্র’।
সা আ : এগুলো সব মঞ্চে করেছেন? মানে প্রসেনিয়াম মঞ্চ যেটা, সেই স্টেজে?
আ ফা : হ্যাঁ। তারপর নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের পালা’, এসএম সোলায়মানের ‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল’, ‘খানদানী কিচ্ছা’ – এই নাটকগুলো আমরা করেছি।
সা আ : এগুলোর উপস্থাপনারীতি কি প্রসেনিয়াম থিয়েটারের মত, না খোলা আকাশে চারদিকে দর্শক আছে, এমন জায়গায়?
আ ফা : না, অন্তত তিনদিক খোলা এরকম জায়গায় আমরা করেছি। এবং দর্শনীর বিনিময়ে করেছি। আমার মনে আছে ‘বীরঙ্গনা বিমলারা’য় তিনটাকা দামের টিকেট বিক্রি করে আমরা চব্বিশশত টাকার মতো পেয়েছিলাম।

সা আ : কেন্দ্র থেকে কখনো কোনো ফান্ড পেয়েছেন?
আ ফা : না। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার কখনো কোনো ফান্ড দেয়নি।
সা আ : অর্থ না দিলেও ওয়ার্কশপ বা অন্যকিছু করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা পেয়েছেন নিশ্চয়?
আ ফা : আবুল মনসুর খান দুলাল ঢাকায় ওয়ার্কশপ করে এসেছে। এরপর এখানে স্থানীয়ভাবে ওর তত্ত্বাবধানে ওয়ার্কশপ করেছি। এরপরে জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র হারুন, হোসাইন, শাহীন রহমান এবং ইভান- এরা আমাদের এখানে এসেছিল। পনেরদিনব্যাপী প্রযোজনাভিত্তিক ওয়ার্কশপ করেছে। সেই ওয়ার্কশপে ‘একটি ফুলের গল্প’ ও ‘সঙবাদ কার্টুন’ নাটক দুটি তৈরি হয়েছে। ‘মুনতাসির’ও আমরা আরেকটা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তৈরি করেছিলাম। এরপরে দীর্ঘদিন আমাদের ওয়ার্কশপ হয়নি। আইয়ুব খান তো ঢাকা থিয়েটারের সদস্য ছিল, ঢাকা থিয়েটারে কাজ করেছে। আর জাহাঙ্গীরনগরে কাজ করেছে। আইয়ুব মেলান্দহে আসলে আমরা একদিন-দু’দিনের সংক্ষিপ্ত ওয়ার্কশপ করতাম। আমরা আরেকটা কাজ করতাম। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের যারা শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস, বাংলা সাহিত্যে যাদের দখল আছে, তাদের নিয়ে আমরা মাঝে মাঝে থিয়েটার সংক্রান্ত ক্লাস করতাম। এখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন যিনি একসময় বাংলার টিচার ছিলেন, করটিয়ায়। তিনি নাটকের প্রতি খুব অনুরক্ত ছিলেন। আমরা বেশ কয়েকদিন ওনার কাছ থেকে নাটক বিষয়ে কথা শুনেছি। তখন আমাদের ছেলেদের নাটক বিষয়ে জানার শেখার খুব আগ্রহ ছিল। আমরা জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে শিক্ষক এনে ক্লাস করেছি। আমরা নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব বিষয়ক শিক্ষক এনে ক্লাস করেছি। ইতিহাস থেকে শেখার চেষ্টা করেছি। আমাদের তখন বই-পুস্তকের সাপোর্ট খুব একটা ছিল না, এটা পঁচাশি-ছিয়াশি সালের কথা। আমরা এভাবে করার চেষ্টা করেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গিয়েছি অনেকবার। সেলিম আল দীন স্যারের বাসায় চার-পাঁচ দিন একটানা থেকেছি। উনি ইউনিভার্সিটি থেকে আসার পর বিকেলে ও রাতে বসেছি, নাটকের কথা বলেছি। রাস্তার হেঁটেছি, আমাকে নাটক শিখিয়েছেন, আমরা মাঠে বসে গল্প করেছি, ওখানেও নাটক শিখিয়েছেন। উনি কখনো আমাদের সাথে ফালতু আড্ডা দেননি। আড্ডায় আড্ডায় নাটক শিখেছি। এভাবে নাটক লিখতেও আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং নাটক লিখার ক্ষেত্রে আমার আগের যে হাত ছিল তার বদল হয়েছে। আমি আগে না-বুঝে লিখতাম, ঠিক যেমন নাপিতের ফোঁড়া কাটার মত। পরবর্তীতে আমি কিছুটা অন্তত সেলিম স্যারের সাথে কথা বলে শিখেছি, উনি আমাকে হাতে কলমে শিখিয়েছেন। আমি মনে করি আমি যতটুকু লিখতে পেরেছি, তা সেলিমস্যারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়-শিক্ষায়। আমি যদি আরও যেতে পারতাম, আরও যদি তাঁর সংস্পর্শ পেতাম, তাহলে আমার মনে হয় আমি একজন ভালো নাট্যকার হতে পারতাম।
সা আ : আচ্ছা, এটা একটা দিক গেল। আপনাদের সংগঠনের পঁয়ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবং সেলিম আল দীন স্মরণে এই যে একটা উৎসব তিনদিনব্যাপী করলেন, যেখানে আমিও একজন অংশগ্রহণকারী- অনেক নাটক দেখলাম, আলোচনা শুনলাম। এখানকার গ্রাম থিয়েটারচর্চা সম্পর্কে অনেককিছুু জানলাম। এবার আমার আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই ধরনের উৎসবের আয়োজন আর কয়বার করেছেন গত পঁয়ত্রিশ বছরে?
আ ফা : পঁয়ত্রিশ বছরে উৎসবের আয়োজন আমাদের তিনটা। বেশি করতে পারি নাই। তবে আমরা কিছু কাজ করেছি, উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে, বিশেষ বিশেষ জাতীয় দিবস যেমন ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর পালন করেছি। সাংস্কৃতিক উপ-কমিটি করে আমরা করেছি। এমন হয়েছে যে সাতদিনব্যাপী নাট্যউৎসব করেছি এখানে। সেটা হয়েছে আমাদের ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর নামে। আমরা সশরীরে সকলে অংশগ্রহণ করেছি। সাংস্কৃতিক উপ-কমিটির আহ্বায়ক প্রায় সময়ই আমি না হয় আব্দুল্লাহ মোল্লা থাকত কিংবা মুকুল থাকত। আমরাই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছি, দল সিলেকশন করেছি মানে কোন দল নাটক করবে। যে দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে, তাদেরই আমরা নাটক করার জন্য সিলেক্ট করেছি। আমরা অন্তত দশবার এধরনের উৎসব করেছি।
সা আ : উপজেলা পরিষদের সহায়তায়?
আ ফা : জ্বি। সেটা ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর ব্যানারে ও আমাদের সার্বিক সহযোগিতায়।
সা আ : আচ্ছা। ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর ব্যানারে যে তিনটা উৎসবের কথা বললেন এগুলো কোন সনে হয়েছিল?
আ ফা : একটা ১৯৮৭ সালে, পরেরটা ১৯৯৩ সালে এবং পঁয়ত্রিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে এখন যেটা করছি মানে এই ২০১৭ সালে।
সা আ : এখানে তিনদিন থেকে আমি যেটা দেখলাম যে, এখানকার রাজনৈতিক দল, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন সবার সহযোগিতায় আপনারা গ্রাম থিয়েটারের কার্যক্রম চালাচ্ছেন, এই উৎসবটাও করছেন। তো, এই ব্যাপারে আমি এই উৎসবে আসা সালাম সাকলাইন, আফসার আহমদের সাথেও কথা বলেছি। উনারা বললেন, গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনের প্রথম থেকেই আমাদের এভাবেই কাজ করতে হয়েছে গ্রামে-গ্রামে। কারণ নানা ধরনের পকেটগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ না করলে কাজটা হয় না। এই ব্যাপারে আপনার কী অভিমত? আপনার অভিজ্ঞতা গত পঁয়ত্রিশ বছরে কীরকম?
আ ফা : আমরা যারা থানা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করছি, এখানে পরিসরটা ছোট। এই ছোট পরিসরে সাংস্কৃতিককর্মী যে-কয়জন আছে তারা অবশ্যই সহযোগিতা করে। তারপরে আপনার রাজনৈতিক শেল্টারটা অবশ্যই প্রয়োজন হয়। এবং রাজনৈতিক শেল্টার যে সবাই দেয় তা না, এরমধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চেতনাকে ধারণ করে ও মানুষদের কাছে থাকে, তারা দেয়। এমনি এমনি দেয় না। যারা আমাদের অতীতের কাজগুলো দেখেছে, আমাদের আদর্শটা দেখেছে, তারা দেয়। আমাদের চলার পথে বিচ্যুতি কম, আমাদের ব্যক্তিগত চরিত্র তারা দেখেছে, নাট্যকর্মী হিসেবে, নাট্যদল হিসেবে আমাদের উদ্দেশ্যটা তারা বোঝার চেষ্টা করেছে। ওনারা যখন বুঝেছে যে হ্যাঁ- এই দলটি, এই ছেলেগুলি আমাদের সমাজের জন্য কোনো প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে না, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করারই প্রয়াস এরা চালাচ্ছে এবং বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করছে, নাটকের মাধ্যমে মানুষকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য যত অনুসঙ্গ আছে, এ বিষয়ে সচেতন করার প্রয়াস তারা চালিয়ে যাচ্ছে- এই বিষয়গুলো যখন তারা বুঝতে পেরেছে তখন দেখা যাচ্ছে তারাই আমাদের উৎসাহ দিয়ে সাংগঠনিক ও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছে। এবং তাঁদের সহযোগিতায় বিশেষ জাতীয় দিবসগুলি ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, ২১শে ফেব্রুয়ারি আমরা পালন করছি। গত ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৭, আমরা তিনদিনব্যাপী বইমেলা ও তিনদিনব্যাপী নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলাম, এটা কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুধীমহল যাঁরা আছেন, সংস্কৃতিসেবী যাঁরা আছেন, বুদ্ধিজীবী যাঁরা আছেন, যাঁরা আমাদের কাজকে সমর্থন করেন ও ভালোবাসেন, তাঁরাই কিন্তু প্রশাসনকে চাপ দিয়ে আমাদেরকে কাজগুলো করতে সহযোগিতা করেছেন। এতে দেখা যায় যে, আমি নাট্যদল হিসেবে আর্থিক কারণে যে উৎসবটা করতে পারি না, আমরা তাঁদের মাধ্যমে আমাদের কাজটা করে নিতে পারছি। এতে করে সামাজিক, রাজনৈতিক মেলবন্ধনটা কিন্তু তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের সাথে, সুধীমহলের সাথে, সাধারণ দর্শকের সাথে, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সাথে, স্থানীয় মানুষদের সাথে, প্রশাসন ও প্রশাসনের লোকদের সাথে একটা মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছে।
সা আ : আমি যেটা বুঝতে পারলাম আপনাদের কথা থেকে যে, গ্রাম থিয়েটার শুধু নাটকই করছে না। সাংস্কৃতিককর্মী হিসেবে একটা গ্রহণযোগ্যতাও স্থানীয়ভাবে আপনারা তৈরি করছেন। এইসূত্রে এটাওতো বলা যায় যে, গ্রাম থিয়েটার সমাজ পরিবর্তন বা সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং মৌলবাদ বিরোধিতা- এইসব প্রসঙ্গে এক ধরনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশে যে ধর্মীয় মৌলবাদী অপতৎপরতা চলছে অনেকদিন ধরে, সেটাকে মোকাবেলা করার জন্য গ্রাম থিয়েটারের ভূমিকা কীরকম হওয়া দরকার এখন?
আ ফা : গ্রাম থিয়েটারগুলো তাদের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে কিন্তু। আমরা সুস্থ একটা বিনোদন সাধারণ দর্শক-শ্রোতাকে দেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছি। আপনি লক্ষ করেছেন তিনদিনব্যাপী নাট্য উৎসবে প্রচুর দর্শক সমাগম হয়েছে। একটা সময় ভীতি ছিল। একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাব? কোনো জঙ্গিরা হয়ত আত্মঘাতী বোমা মেরে আমাদের অনুষ্ঠানকে পণ্ড করে দিতে পারে। হতাহত হতে পারে, নানা কিছু হতে পারে। কিন্তু তিনদিন থেকে আপনি মেলান্দহে দেখেছেন যে, প্রত্যেকটি প্রদর্শনীতে ব্যাপক দর্শক সমাগম হয়েছে, ভয়ভীতি কোথাও ছিল না। তারপরও পুলিশ প্রশাসন তাঁদের নিজস্ব তাগিদে, তাঁদের নিজস্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে আশেপাশেই ছিলেন; আমরা কিন্তু পুলিশ প্রশাসনের সাথে বসিও নাই, তাঁদেরকে বলিও নাই যে আমাদেরকে প্রটেকশন দেন। তাঁরা আমাদের অজান্তে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন; আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কোনো বিঘ্ন যাতে না ঘটে তার জন্য তাঁরা তাঁদের মত করে ব্যবস্থা নিয়েছে। মেলান্দহের দর্শকবৃন্দকে আমি ধন্যবাদ জানাই আপনার মাধ্যমে। পঁয়ত্রিশ বছরে এটা আমাদের সার্থকতা যে এই দর্শক সবসময় আমাদের সাথে থেকেছেন। একসময় এখানে যাত্রার দর্শক বেশি ছিল, আমাদের দর্শক কম ছিল। কারণ আমাদের নাটকে কোনো নর্তকী নাচে না। যাত্রা ধাঁচের নাটকের যে অন্য একটা সুর আছে সে সুরে আমরা নাটক করি না। আমরা সাধারণ মানুষের চলফেরা-কথামালার যে ধারা সে ধারায় আমরা নাটক উপস্থাপন করি। প্রথমদিকে কিন্তু দর্শক খুব একটা পছন্দ করত না, এখন করে। পঁয়ত্রিশ বছরে এটা আমাদের অর্জনের একটা দিক।
সা আ : মানে নিজস্ব কিছু দর্শক আপনাদের এখন আছে। গতকাল আমি দেখলাম যে একদম উপচেপড়া ভিড়।
আ ফা : জ্বি। কালকে আমাদের নাটক ছিল আটটায়। আমরা দেখলাম যে অনেক রাত হয়ে যাবে দুইটা নাটক করতে। আমরা তখন সময় পরিবর্তন করলাম। পরিবর্তন করে একটু মাইকিং করলাম যে আমাদের নাটক হবে সাড়ে ছয়টায়। আপনি দেখছেন যে, সাড়ে ছয়টার মধ্যেই আমাদের প্যান্ডেল পুরোটা ভরে গেছে। দুই হাজার-আড়াই হাজার দর্শক হবে।
সা আ : তারমানে আপনারা পঁয়ত্রিশ বছরে একটা দর্শকশ্রেণি তৈরি করতে পেরেছেন।
আ ফা : কোনো নর্তকী ছাড়া। অন্য কোন গান-বাজনা ছাড়া। মানে একটা গানের অনুষ্ঠান করে, অমুক তমুককে এনে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করিনি আমরা। এসব ব্যতিরেকেই ‘শহীদ সময় থিয়েটার’ তার পঁয়ত্রিশ বছরের পথচলায় অত্যন্ত ভভ্র, সৃজনশীল দর্শক সৃষ্টি করতে পেরেছে। এ দাবি আমি করতে পারি।
সা আ : আমি তিনদিন নাট্য প্রযোজনাগুলোতে উপস্থিত থেকে সেটা নিজেও অনুভব করেছি। গতকাল যে নাটকটা হয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ’-এর ‘কারবালার জারি’। অসাধারণ! মানুষতো যেতেই চায় না! বিদ্যুৎ চলে গেল তাও মানুষ যায়নি। এবং নাটক শেষ, প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে তাও যায় না। আচ্ছা, আরেকটা জিনিস লক্ষ করলাম যে, আপনার এখানে দর্শক হিসেবে শুধু স্থানীয় জনগণ নয়, উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা, উনি সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও তিনদিনই উপস্থিত ছিলেন। সবাই মিলে নাটক উপভোগ করার প্রবণতাটা এখানে আমি দেখেছি। এটাতো একটা অ্যাচিভমেন্ট!
আ ফা : এটা আমাদের অর্জন। পঁয়ত্রিশ বছরের অর্জন। দর্শক আমাদেরকে কষ্টি পাথরে যাচাই করে দেখেছে যে, না, এরা প্রকৃতপক্ষে শিল্প-সংস্কৃতির কথা বলে, বিনোদনের কথা বলে। এখানে কোনো অশ্লীলতা নাই। এখানে কোনো উস্কানিমূলক কথাবার্তা নাই। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক কিছু নাই। সব মিলিয়ে তারা দেখেছে যে, এই ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ কিংবা ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’- এই সংগঠনটি আমাদেরকে সুস্থ বিনোদন এবং এই বিনোদনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সহযোগিতা করছে। এজন্য বিশেষ করে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ যাঁরা তাঁরা এসেছেন।
সা আ : আরেকটা জিনিস দেখলাম এখানে যে, স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী যাঁরা কবিতা লিখেন, গান করেন তাঁরাও আপনাদের সাথে ছিলেন। কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠনও জড়িত ছিলো।
আ ফা : জ্বি। উত্তরণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এই তিনদিনের উৎসবে আমাদের সঙ্গে ছিল। আমাদের চেয়ে একটু বয়স কম ওনাদের। ত্রিশ-একত্রিশের কম হবে না। ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ, মুকুল কবির- উনি পর্বত আরোহী, ওনারা ছিলেন। উত্তরণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মহব্বত আলী ফকির একজন অসম্ভব শক্তিশালী সাংস্কৃতিককর্মী। তাঁর কাজ অত্যন্ত গোছানো, এবং তিনি শিল্প-সংস্কৃতি-মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি ভীষণ কমিটেড। কোনো অবস্থাতেই অশুভ কোনো কিছুর সাথে তিনি আপস করেন না। তার মতো নিরলস কর্মী আমি খুব কম দেখেছি।
সা আ : তাহলে আমরা একটা জিনিস বলতে পারি যে, এইখানে মানবিক গুণের চর্চা করেন এমন সব মানুষ, অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির চর্চা করেন এমন সব মানুষ, যাঁরা শুভতার পক্ষে, মঙ্গলের পক্ষে, বহুর ভালোর পক্ষে আছেন, এঁদের সবাইকে ‘শহীদ সমর থিয়েটার’, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে এক কাতারে আনতে পেরেছে। এটা সাফল্যের একটা দিক গেলো। এখন আমরা আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে যাই – সেটা একেবারে গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীক আলোচনা। এইখানে গ্রাম থিয়েটারেরকর্মী সংকটের কিছু কথা শুনলাম, দেখলামও। আপনি নিজেও বলছেন যে, কর্মী কিছু কমে গেছে। এর আগে বলি যে, আমি নিজেও তো সেই শুরু থেকেই ছাড়াছাড়াভাবে গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনের সাথে জড়িত। ১৯৮২ বা ১৯৮৩ সালে এর উপর কিছু তাত্ত্বিক লেখাও লিখেছিলাম। এখন আমার এখানে আসার কারণ হচ্ছে সরেজমিনে গ্রাম থিয়েটারের বর্তমান অবস্থাটা দেখা। আমার একটা অনুধাবন এরকম যে, একটা পর্যায়ে এই আন্দোলন অনেক উপরে উঠেছিল। এখন মনে হয় রেখাটা কিছুটা নিচের দিকে নেমে কম্পমান অবস্থায় আছে। আমি নিশ্চিত আপনারাই কাজ করে গ্রাম পর্যায়ে এটাকে আবার উপরের দিকে ওঠাবেন। কিন্তু ওঠাতে গেলে তো কর্মী লাগবে, তাই না? এই কর্মী সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?
আ ফা : আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট এখানে উত্থাপন করেছেন। কর্মী যদি না থাকে, প্রজন্ম যদি সৃষ্টি না হয়, তাহলে একটা নাট্যদল চলবে কী করে? আমি একথা প্রসঙ্গে একটু পিছনে যাই। আমরা যখন নাটক শুরু করি তখন আব্দুল লতিফ খান, জাহাঙ্গীর আলম, এসএম আবু হানিফ, রাশেদুল হাসান মানিক, শাহ আলম, জহুরুল ইসলাম ঘুতু। এঁরা আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী কর্মী ছিলেন। এবং প্রত্যেকেই বলিষ্ঠ অভিনেতা ছিলেন। আপনি আজও যদি লতিফ খানের কথা জিজ্ঞেস করেন, এসএম আবু হানিফের কথা জিজ্ঞেস করেন কাউকে যে তাকে চিনেন? বলবে, হ্যাঁ চিনি – ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর সদস্য। আহা! কী অভিনয় ছিল! একথা বলবে দর্শক। কী অভিনেতা ছিল তাঁরা! কী অভিনয় তাঁদের! এই লোকগুলি তখন ছিল। আমরা নাটক করতে পেরেছি। এই শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীরা ছিল, আমরা জমিয়ে নাটক করতে পেরেছি। যে ক’জনের নাম বললাম তাঁরা আজকে প্রয়াত। আমাদের সাথে নাই। এই ঘাটতিটা আমরা ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ একেবারে হাড়ে হাড়ে অনুভব করছি। পরবর্তীকালে ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ বিভিন্ন ওয়ার্কশপ করেছে কর্মী সংগ্রহের জন্য। কিছু পেয়েছে। দুই তিন মাস আগেও আমরা নতুন সদস্য সংগ্রহের একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমরা মাত্র দু-তিনজন নতুন সদস্য পেয়েছি। উৎসবের তৃতীয় দিন আমার লেখা নাটক ‘সোহাগী বাইদানীর ঘাট’ হল, সেখানে কিছু ইয়াং অভিনেতা দেখেছেন। এই ছেলেগুলো আমার গ্রাম ‘টুপকার চর থিয়েটার’ থেকে ধার করে আনা। খুব অকপটে আমি একথা স্বীকার করছি। ‘টুপকার চর থিয়েটার’-এর পাঁচ-সাতজন সদস্য সব সময়ই ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর নাটকে থাকে। এটা ধার বলা যাবে না। এবারের ছেলেগুলো একদম আনকোরা। এরা কোনোদিনই কোনো উৎসবে অংশগ্রহণ করেনি অথবা কোনো নাটকে। এদেরকে অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করে ‘সোহাগী বাইদানির ঘাট’ ও ‘কারবালার জারি’ মঞ্চস্থ করেছি।
সা আ : তারপরও অনেক ভালো করেছে ওঁরা।
আ ফা : ধন্যবাদ। তো, এই যে আমি যদি নব প্রজন্মটাকে সংগ্রহ না করতে পারতাম, তবে আজকের উৎসবে ‘শহীদ সমর থিয়েটার’-এর নাটক করতে অসুবিধা হতো।
সা আ : এই প্রসঙ্গে বলি যে, এই কর্মী সঙ্কটটা শুধু আপনার এখানে না। ময়নাভাই, গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক, উনি কালকেই আমাকে বলছিলেন যে, এই সঙ্কটটা নাকি এখন একেবারে সব জায়গায় আছে। নানা কারণে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে- নতুন প্রজন্মের তরুণরা মোবাইল কালচারের দিকে ঝুঁকে গেছে। এবং আপনাদের এইখানে মহব্বতভাই বলছিলেন যে, ছেলে-মেয়েদের বাবা-মা’রাও নাকি ওদের দিতে চায় না নাটকের দিকে আসতে। এগুলো তো সঙ্কটের অন্যতম কারণ। তো, এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায়টা কী?
আ ফা : উত্তরণের উপায়টা নানাকিছুর সাথে সম্পর্কিত।। এই যে ছেলে-মেয়েদের বাবা-মায়েরা তাদের দিতে চায় না, এ কথাটা খুব সত্য। আবার একথাও সত্য যে, ছেলেদের মধ্যে যদি বাবা-মা উৎসাহ তৈরি না করে তাহলে তো ওদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হবে না।
সা আ : একজন বলছিলেন যে, এখন কোচিং-এর সংখ্যা বেড়ে গেছে। ছেলে-মেয়েরা সময় পাচ্ছে না!
আ ফা : এটাও একটা বড় বাধা বটে। সবাই মনে করছে যে, তার ছেলেটা কোচিং-এ না গেলে বোধ হয় পিছিয়ে যাবে।
আসাদুল্লাহ ফারাজীর বাসায় আফসার আহমদ, সালাম সাকলাইন, গোলাম শফিক, সাজেদুল আউয়াল প্রমুখ
সা আ : আবার নারী সদস্যের সংখ্যাও কিন্তু ‘গ্রাম থিয়েটার’ বাড়াতে পারছে না।
আ ফা : একটু বলি আপনাকে, এই মেলান্দহের বাজারটার চারপাশে বাইশটা মাদ্রাসা। আরেকটা জিনিস লক্ষ করবেন আপনি, আমাদের প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়েকে যেমন টিউটরের কাছে পাঠাচ্ছি ইংরেজি, বাংলা, অংক শেখানোর জন্য, আবার মৌলভীস্যারের কাছে ধর্ম শিক্ষাটার জন্য। একটা সত্যি ঘটনা বলি- একটা মেয়ে ধর্ম শিক্ষার ক্লাসেও যায় আবার গানের ক্লাসেও যায়। তো বাচ্চাটার গানের ক্লাস থেকে ধর্মশিক্ষার ক্লাসে আসতে একদিন একটু দেরি হয়েছে। তখন ধর্ম ক্লাসের শিক্ষক মা-কে বললেন যে, দেখেন আপনি তো মুসলমান। আপনার মেয়েটাকে পাঠিয়েছেন গান শিখতে, তো কেয়ামতের দিন আপনার মেয়ের জিহ্বাটা বের করে পায়ের গোড়ালিতে নিয়ে পেরেক মেরে দিবে। গান বাজনা শিখালে তো এই ধরনের একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্যে অভিভাবকরা কিছুটা পড়েনই।
সা আ : মানে একটা বাধা এক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে।
আ ফা : ভেতরে ভেতরে। মানে কোন সন্তানই কেউ দিতে পারে না। অনেকে বাবা-মাকে গিয়ে বলেন যে, আপনার ছেলে তো ছাত্র ভালো- এসব এই জায়গায় দিলেন, ছেলেটার লেখাপড়া তো নষ্ট হয়ে যাবে। তখন মা-বাবা উদ্গ্রীব হয়ে যায় যে, না-না লেখাপড়া নষ্ট করতে দেয়া যাবে না। বিশ বছর আগেও প্রায় পরিবারে একটা প্রবণতা ছিল, বিশেষত শিক্ষিত পরিবারে যে, আমার ছেলে-মেয়েকে একটু গান শেখাব, নাচ শেখাব, একটু অভিনয় শেখাব। আমাকে কতজন ধরেছে, আমার ছেলেটাকে নেবেন আপনার দলে! এখন সেটা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এটার একটা প্রধান অন্তরায় হল কোচিং সেন্টার, অন্তত আমাদের অঞ্চলে।
সা আ : তার মানে একটা নীরব বাধা আসছে। একেবারে সরাসরি বাধা আসছে কি? কোনো প্রতিপক্ষ আপনাদের সামনে মানে গ্রাম থিয়েটারচর্চার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে কি?
আ ফা : একবার আমাদের টুপকার চরে সাতদিনের বৈশাখী মেলা করছি। ওখানে একটা মাদ্রাসা আছে, আমাদের গ্রামের হাফেজিয়া মাদ্রাসা। ইমাম সাহেব ছাত্রদের নিয়ে আসল বাধা দিতে, বললো আপনারা এই নাটক করতে পারবেন না। কেন? না এটা অনৈসলামিক। ইসলাম এটা সমর্থন করে না। আমরা টুপকার চর গ্রামে প্রভাবশালী ছিলাম। তারা আমাদের প্যান্ডেল জোড় খাটিয়ে ভেঙে দিবে এই সাহস তাদের ছিল না। তারা কেন এসেছিল জানেন? ধর্মে একটা কথা আছে, প্রতিবাদ কর, অন্যায়ের। যদি না পার, জানাও তাকে এটা খারাপ। তাও যদি না পার মনে মনে ঘৃণা কর। এ রকম একটা ধারণা থেকে তারা এসেছিল যে, আমরা পারব না তাদের সাথে, তাদের নাটক বন্ধ করতে কিন্তু আমরা আমাদের ফরজটা আদায় করে গেলাম। আমরা বলে গেলাম যে তোমরা একটা অনৈসলামিক কাজ করছো, ইসলাম এটা সমর্থন করে না, অনৈতিক কাজ। এটা তোমরা বন্ধ রাখ। এটা বলে তারা খালাস হয়ে গেল যে আখেরাতে তাদের আর জবাবদিহি করতে হবে না। এ ধরনের একটা ঘটনা একবার ঘটেছে। এখানে এই মেলান্দহে উৎসব-নাটক অনেক করেছি। দুইশ-আড়াইশর উপরে শো করেছি।
সা আ : একই নাটকের?
আ ফা : না, না। তেইশ-চব্বিশটা নাটক করেছি। গত পঁয়ত্রিশ বছরে এই যে এতগুলো শো করেছি, শোতে সরাসরি কেউ এসে বাধা দেয়নি। কিন্তু আমাদের নিয়ে আলোচনা আছে হুজুরদের মহলে যে, এনারা বুড়ো হয়ে গেছে, এখনো আল্লা-রসুলের কথা স্মরণ করছে না! এই লোকগুলি জাহান্নামি হবে, এই-সেই।
সা আ : তাহলে দেখা যাচ্ছে গ্রাম থিয়েটার-এর একটা প্রতিপক্ষ আছে। তার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েই গ্রাম থিয়েটার এগিয়ে যাচ্ছে।
আ ফা : কিছুটা, তবে এখনো প্রবলভাবে ওই পক্ষের মুখোমুখি হইনি।
সা আ : হয়তো এই এলাকায় হননি। তবে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’-এর অন্যান্য অঞ্চলের অনেক দলকে ওই পক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আ ফা : আমরা এখনো হইনি। তবে রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়েছি।
সা আ : কোন সময়ে?
আ ফা : ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এখানে আমরা ‘একাত্তরের পালা’ করেছি, তাতে ‘জয় বাংলা’ গান আছে। সরাসরি এসে বাধা দিচ্ছে, এই গান গাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া যাবে না। এ রকম বাধা আমরা পেয়েছি।
উৎসবে মঞ্চায়িত নাট্য প্রযোজনা প্রত্যক্ষ করছেন সাজেদুল আউয়াল, আফসার আহমদ, গেলাম শফিক
সা আ : আবার আমি সাংগঠনিক পর্যায়ের একটা প্রশ্ন রাখছি, সেটা হচ্ছে যে আপনার এখানে আমরা গতকাল নাটকের পরে ময়নাভাই, আপনি এবং আপনারা যাঁরা সংগঠনের সাথে জড়িত, বসলেন, বসে কথা বললেন। বুঝতে পারলাম যে, গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন একটু ঝিমিয়ে গেছে। যে কটা গ্রাম থিয়েটারের কথা আপনি কিছুক্ষণ আগে বললেন, ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ যাদের মাদার অর্গানাইজেশন। তারাও বলছে যে, তারাও অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এর কারণটা কী?
আ ফা : কারণটা ছেলে-মেয়ের অভাব। নেতৃত্বটা কে দেবে? নাটক সংক্রান্ত কোনো সংগঠন চালানো, সাংস্কৃতিক সংগঠন চালানো, আমি মনে করি সাংস্কৃতিক চিন্তা-বোধ সম্পন্ন একজন খুব আগ্রহী মানুষ ছাড়া সম্ভব না। এটা কোনো প্রসাশনিক কিংবা কাঠামোগত কাজ না। এটা এমন নয় যে আমি সরকারি নিয়মমত-ধারামত আমার দায়িত্বটা পালন করে যাচ্ছি। একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ ছাড়া থিয়েটার করা সম্ভব না।
সা আ : তাহলে এখন সৃষ্টিশীল ব্যক্তির অভাব আছে। এটা বলছেন আপনি?
আ ফা : ঠিক তাই। যেমন এসএম আবু হানিফ মারা যাওয়ার পর ‘টুপকারচর থিয়েটার’ বন্ধ হয়ে গেছে। ইসলামপুরে যে ‘ইসলামপুর থিয়েটার’ ছিল, সেখানে সদস্যরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ছেলেগুলো চলে গেল। ‘গ্রাম থিয়েটার’ তো আপনার মৌলবাদী চেতনায় কখনো বিশ্বাস করে না। যার জন্য দেখা গেল আপনার দুই গ্রুপে দ্বন্দ্ব হয়। দ্বন্দ্ব মানে ভেতরের দ্বন্দ্ব। এটা প্রকাশ্য না।
সা আ : মানে এটা নেতৃত্বের দ্ব›দ্ব হতে পারে অথবা অন্য কিছু।
আ ফা : নেতৃত্বের দ্বন্দ্বেই আস্তে আস্তে ‘গ্রাম থিয়েটার’ কার্যক্রমটা বন্ধ হয়ে গেল। কিংবা এই নাটক করা যাবে না, ওটা করতে হবে- এরকম কিছুটা বাধা আসে। আপনাকে বলতে পারি যে, যেমন মুক্তাগাছার এখন বর্তমান যে উপজেলা চেয়ারম্যান, উনি ‘মুক্তাগাছা থিয়েটার’, যেটা আমাদের ‘গ্রাম থিয়েটার’-এর অন্যতম সংগঠন ছিল, তার সদস্য ছিলেন। উনি একটা সময় আমাকে বলেছে যে, আমি তো বিএনপি করি, গ্রাম থিয়েটারের যে আদর্শ তা আমার দলের সাথে যায় না। পরে উনি নিজেকে গ্রাম থিয়েটার থেকে সরিয়ে নিলেন।
সা আ : এবার প্রসঙ্গ একটু পাল্টাই। ‘গ্রাম থিয়েটার’-এর স্ট্রাকচারটা সম্পর্কে বলুন।
আ ফা : এর কেন্দ্র আছে। তারপর বিভাগ আছে। বাংলাদেশের যে কয়টা বিভাগ আছে। বিভাগের পরে অনেকগুলো অঞ্চল আছে। প্রত্যেকটা বিভাগেই ‘গ্রাম থিয়েটার’ আছে। একটা বিভাগীয় কাঠমোও আছে গ্রাম থিয়েটারের। এই বিভাগগুলো কতকগুলো অঞ্চলে বিভক্ত। এই অঞ্চলের আওতায় আছে এই যে বিভিন্ন প্রান্তের ‘গ্রাম থিয়েটার’গুলো। জামালপুর জেলায় সাতটা উপজেলা আছে। সাতটা উপজেলা নিয়ে খালেদ মোশাররফের নামে ‘মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ অঞ্চল’ গঠিত।
সা আ : ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ এই অঞ্চলভুক্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন্দ্রীয়ভাবে এই গত পঁয়ত্রিশ বছরে আপনাদেরকে কী কী সাপোর্ট দিয়েছে?
আ ফা : কেন্দ্র আমাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়নি। কেন্দ্রকেই আমরা বছরে একশ টাকা করে চাঁদা দিয়েছি।
সা আ : কোনো উদ্যোগই কী কেন্দ্র থেকে নেওয়া হয় নাই? এছাড়া আর কী করেছে?
আ ফা : তারা কিছু ওয়ার্কশপ করেছে। লোকবল দিয়ে সহযোগিতা করেছে ওয়ার্কশপ পরিচালনায়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা কেন্দ্র কখনো করতে পারে নাই।
সা আ : অন্যান্য ক্ষেত্রে নিশ্চয় সহযোগিতা করেছে?
আ ফা : কেন্দ্র থেকে নেতৃবৃন্দ এসেছে। আমাদের সাথে কথা বলেছে। সাংগঠনিক সফর করেছে কিংবা আমাদের ওয়ার্কশপের প্রয়োজন হলে তারা ওয়ার্কশপ-বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে। সেলিমভাই, বাচ্চুভাই, পীযূষদা, হিমু- এনারা এসেছিলেন। একবার না। চারবার-পাঁচবার এসেছেন। ওয়ার্কশপে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, না হলে ঢাকা থিয়েটার থেকে কাউকে পাঠিয়েছে। আমরা থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
সা আ : সেলিম আল দীনের কোন স্মৃতি কি আপনার মনে আছে?
আ ফা : উনি প্রথম এসেছিলেন ১৯৮৪ সালে। তখন ‘একতা ট্রেন’ এখানে থামতো না। স্টেশন মাস্টারকে বলে এই একতা ট্রেনটাকে লাইন ক্লিয়ার না দিয়ে আমরা থামিয়েছিলাম। কিন্তু একেবারে থামাতে পারিনি। ট্রেন ধীরগতিতে চলতিই ছিল। ওই অবস্থাতেই সেলিমভাই ট্রেন থেকে নেমেছেন।
সা আ : কে কে ছিলেন ট্রেনে?
আ ফা : সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আফসার আহমদ, সালাম সাকলাইন। তখন আমার বাড়ি টুপকার চর এলাকায়। এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। তাই ওঁদের ডাক বাংলোয় রেখেছি, হোটেলের খাবার খাইয়েছি।
সা আ : সেলিম আল দীন কোন সনে এসেছেন আবার?
আ ফা : ১৯৯৯ সালে। তারপরে আর আসেননি।
সা আ : শেষবার আসলেন ১৯৯৯ সালে। প্রথমবার আসলেন ১৯৮৪ সালে। এর ভেতরে উনি চারবার এসেছেন। তো, গ্রাম থিয়েটারের উদ্দেশ্য-আদর্শ সম্পর্কে কী বলতেন বাচ্চুভাই, সেলিমভাই?
আ ফা : আমি যতটুকু বুঝেছি সেটা সেলিম আল দীন এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর কথা থেকেই। তাঁরা বলতেন যে, বাঙালির নিজস্ব একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে, বাঙালির নিজস্ব একটা নাট্যধারা আছে- তার থেকে বাঙালির নিজস্ব নাট্যআঙ্গিক নির্মাণ করতে হবে। সেলিম আল দীন স্যার এবিষয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, বাঙালির হাজার বছরের নাটকের যে নাট্যধারা, সেই ধারায় বর্ণনাত্মক যে রীতি আছে, সে রীতিটা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং পাশাপাশি বলতেন যে- মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে। এদেশটা সবার। এদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান – সবার। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখব। আমরা কোনো ধর্ম দিয়ে মানুষকে বিচার করবো না। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে বিচার করবো। এ বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বলতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী কোনো লোকের কাছ থেকে চাঁদা নেয়া যাবে না। তাকে সদস্য তো বানানোই যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’ তার সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত করবে। বলতেন, নাটক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা নেই, নাটকটি মুক্তিযুদ্ধেরই হতে হবে এমন কোন কথা নেই। তবে নাটকটিকে হতে হবে শিল্পরুচি সম্পন্ন।
সা আ : এসূত্রেই একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করি, সেটা হচ্ছে আপনারা এখানে গত পঁয়ত্রিশ বছরে যে ক’টা নাটক করলেন, তাতে কোন্ কোন্ নাটকে কোন কোন ধরনের মেসেজ ছিল?
আ ফা : আমাদের প্রত্যেকটা নাটকেই একটা-না-একটা মেসেজ ছিল। আমি অল্প বয়সে লিখেছিলাম ‘মানুষ-অমানুষ’। নাটক সম্বন্ধে তখন কিছুই জানতাম না। আমি গ্রামে থেকে দেখেছি যে সেখানে লেখাপড়ার হার কম। আমার গ্রামে দেখেছি যে বিত্তশালী মানুষ আছে কিন্তু সে একটা স্কুল দিতে চায় না। তার নিজেরও লেখাপড়া ছিল না। আমি ঐ নাটকে লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলাম।
সা আ : এটা আপনার নাটকের ম্যাসেজ ছিল?
আ ফা : হ্যাঁ, আমি এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছি।
সা আ : শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে ছিল আপনার নাটক?
আ ফা : হ্যাঁ। সামাজিক যে দুর্দশা, মানুষে-মানুষে সম্পকের্র ক্ষেত্রে যে ভেদটা, তা শিক্ষাহীনতার কারণে।
সা আ : বাকি নাটকগুলায় কী কী মেসেজ ছিল?
আ ফা : আর একটা নাটক ছিল, নাম ‘হীরা’।
সা আ : এটা কি ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকে করা?
আ ফা : না।
সা আ : প্রথম যেটার কথা বললেন, ওটা কি ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকে করা?
আ ফা : হ্যাঁ। ওটা ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকে অনেকবার করেছি। ১৯৮৩ সাল থেকে অনেকবার করেছি।
সা আ : ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকে করা এরকম নাটকে আর কী ধরনের মেসেজ ছিল?
আ ফা : ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকে করা এরকম নাটকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছি; মানুষের মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধের প্রসারের কথা বলেছি; সামাজিক অবক্ষয়ের বিরেুদ্ধে যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে, সে কথা বলেছি।।
সা আ : মেসেজগুলো কোন্ কোন্ নাটকে রেখেছিলেন?
আ ফা : অনেক নাটকে, তার মধ্যে সেলিম আল দীনের ‘কেরামতমঙ্গল’-এর কথা বলতে পারি। নাটকটা ছোট আকারে করেছিলাম। বারটা খণ্ড আমরা করতে পারিনি। সেলিম আল দীন যে জায়গায় ‘কেরামতমঙ্গল’কে নিয়ে গেছেন, সে জায়গা স্পর্শ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এজন্য আটটা খণ্ড আমরা করেছিলাম। সেটি নিয়ে ঢাকাও গিয়েছিলাম। তো, ‘কেরামতমঙ্গল’-এ মানবতার অসাধারণ এক মেসেজ দেখি আমরা। আমরা দারিদ্র দেখেছি, একটা ভবঘুরে মানুষের জীবন দেখেছি, ছিন্নমূল মানুষের জীবন দেখেছি। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন, যা আছে ওখানে, সব আমরা দেখেছি। মানবতার চূড়ান্ত উৎকর্ষ আমরা সেলিম আল দীনের ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকে দেখেছি। তাছাড়া, আমার লেখা ‘বীরাঙ্গনা বীমলারা’-য় মুক্তিযুদ্ধের একজন মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের কথা বলেছি।
সা আ : এটাও তো ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকেই করা?
আ ফা : হ্যাঁ। আমার লেখা ‘রাক্ষসের খিদা’ বলে যে নাটকটা ‘গ্রাম থিয়েটার’ থেকে করেছি তাতেও একটা প্রাগ্রসর মেসেজ ছিল।। সে নাটকটায় সমাজের একজন প্রভাবশালী মানুষ সাধারণ মানুষকে কীভাবে তার স্বার্থটা রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা খুব কৌশলে বিনষ্ট করার জন্য যে পায়তারা করে, অপচেষ্টা করে- এই বিষয়গুলো আমি তাতে উপস্থাপন করেছি। আমার ‘সি-মোরগ’-এ সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলেছি। সংখ্যালঘুদের সংখ্যা একসময় এ অঞ্চলে ছিল ১৭%। এখন কমতে কমতে ৭%-এ এসে ঠেকেছে। সারাদেশে এখন ৯%-এর বেশি হবে না।
সা আ : নানা কারণে এ সংখ্যা কমেছে, না?
আ ফা : অনেক পরিবার চলে যাচ্ছে। এঁরা এমনি এমনি যায় না। এই লোকগুলিকে খুব কৌশলে নির্যাতন করা হয়। ভয় দেখানো হয়।
সা আ : ‘সি-মোরগ’-এ প্রথম দিনেই তো তার কিছুটা দেখলাম।
আ ফা : হ্যাঁ, কৌশলে তাদেরকে ভয় দেখানো হয়। এই বিষয়টি আমি ‘সি-মোরগ’-এ এনেছি।
সা আ : গতকাল যে নাটকটা দেখলাম- ‘সোহাগী বাইদানীর ঘাট’- সেখানেও তো একটা বক্তব্য…।
আ ফা : ‘সোহাগী বাইদানীর ঘাট’ একটা ফোকভিত্তিক নাটক। আমাদের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতি, লোকনাট্যের ধারা বিদ্যমান। এই দেশের গ্রাম বাংলায় বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই লোকনাট্যগুলো, এই পালাগুলো- কালু গাজীর জারি, অন্যান্য পালা যেমন মহুয়া, চন্দ্রাবতী। এই পালাগুলোই তো আমাদেরকে, আমাদের সংস্কৃতিটাকে সমৃদ্ধ করেছে। এর থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি ‘সোহাগী বাইদানীর ঘাট’ লিখেছি। নিবারণ দাস কর, তাঁর একটা সংক্ষিপ্ত কাব্যকর্ম আমার হাতে আসে, তাতে প্রচুর অসঙ্গতি ছিল, প্রিন্টিং মিসটেক হতে পারে।
সা আ : কত পৃষ্ঠার কাব্যকর্ম?
আ ফা : দশ থেকে বার পেইজের। প্রিন্টেড ভার্সনে একটা কাহিনি ছিল।
সা আ : ওটাকে সম্বল করে লিখেছেন। ওটাকে নিশ্চয় কিছুটা এনলার্জ করেছেন? ইলাবোরেট করেছেন?
আ ফা : ইলাবোরেট করেছি এবং কিছুটা আমার মত করে চরিত্র সৃষ্টি করেছি। এতেও একটা বক্তব্য দিতে চেয়েছি। প্রাগৈতিহাসিক যুগে বেটা বড় হলে মা-বেটায় বোধহয় খুব একটা ভেদাভেদ থাকত না। বিবাহ প্রথা বোধহয় তখন তৈরি হয় নাই। তখন হয়তো বা ভাইয়ে-বোনে সম্পর্ক হত। বিয়ে হত। কিন্তু এই সভ্য সমাজে এসে ভাই-বোনে বিয়ে হয় না। এই মেসেজটুকু এখন আর আমাদের প্রয়োজন নাই। কিন্তু একটা জিনিস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটা সময় হয়তো বা এরকম ছিল। আমরা সেখান থেকে একটা জায়গায় এসেছি এখন। মূল মেসেজটা হল, আমাদের গ্রাম বাংলার যে সংস্কৃতি, সেটা এই রকম ছিল, এই পালাগুলো আমরা মনোমুগ্ধ হয়ে শুনতাম।
সা আ : নতুনভাবে তৈরি করলেন এবং একটা মেসেজও কিন্তু দিয়েছেন। এটাওতো একটা উদ্যোগ এবং সফল উদ্যোগ বলবো। কারণ এখানে আধুনিকতা এবং পুরাতন ভাবনা, দুয়ের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন। এবং আধুনিকতার যে জয়গান, আধুনিকতায় উত্তরণের যে ব্যাপারটা এটা কিন্তু এখানে এনেছেন, সে চিত্রটা আমরা দেখেছি।
আ ফা : আরেকটা কথা বলি এখানে সেটা হল সেলিমস্যারের বর্ণনাত্মকরীতি, ওটাও এ নাটকে ব্যবহার করার একটু চেষ্টা করেছি।
সা আ : এটা হবেই, কারণ ওনার সাথেই তো…। একারণেই হয়তো উপস্থাপনের দিক থেকে বর্ণনাত্মকরীতিকে আপনি বেছে নিয়েছিলেন।
আ ফা : বেছে নিয়েছিলাম সত্য, কিন্তু আমাদের বর্ণনাকারীরা অত সমৃদ্ধ না। এজন্য কিছু কিছু অংশ বাদ দিতে হয়েছে।
সা আ : তারপরেও যিনি ‘জমিদারপুত্র’ করলেন উনি কিন্তু নিজের চরিত্রের বর্ণনাও দিচ্ছেন এবং চরিত্রটার হয়ে তার নিজের সংলাপও দিচ্ছেন। এবং তিনি উৎরে গেছেন শুধু বলব না, তাঁকে ভালোভাবেই দর্শক কিন্তু গ্রহণ করেছে।
আ ফা : এই বর্ণনারীতি প্রয়োগ করে নাট্যকারদেরকেও একটা মেসেজ দিলাম যে, আমরা সেলিমস্যারের প্রণীত এই রীতিতে নাটক লিখতে পারি।
সা আ : এটাই স্বাভাবিক। কারণ গ্রাম থিয়েটারের উদ্দেশ্য-আদর্শ নির্ধারণ করেছেন সেলিম আল দীন, বাচ্চুভাই। এঁরা দৃষ্টান্ত বা নিদর্শনও স্থাপন করেছেন। এই থিংক ট্যাংক-এর প্রভাব আপনাদের ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক। আর উপস্থাপনারীতির দিক থেকেও সেলিম আল দীন যে বর্ণনাত্মকরীতিটা তৈরি করেছেন এটা কিন্তু আমরা এই যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ পরিবেশিত ‘কারবালার জারি’ দেখলাম, তার উপস্থাপনার ঢংয়েও সেই রীতি পেয়েছি। সুতরাং সেলিম আল দীন এইভাবে কিন্তু আমাদের মাঝে জীবিত আছেন। তাঁর আদর্শ এবং তাঁর রচনারীতি নিয়ে আমি আমার বক্তৃতাতেও এখানে বলেছি যে, উনি এখনো জীবিত। উনি কিন্তু আমাকে আমার পিএইচডি ডিগ্রি হওয়ার পর, তাঁর মৃত্যুর আগে বলেছিলেন যে, তোমার এখন দায়িত্ব হচ্ছে ‘গ্রাম থিয়েটার’ নিয়ে কাজ করা এবং আমি কিন্তু তাঁর কথা মান্য করেই আপনাদের এখানে এসেছি, আমি বক্তৃতাতে সেটা বলেওছি। উনি আমার পিএইচডি পর্যায়ের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি নেই, তবুও তাঁর কথা মান্য করার জন্যই আমি এখানে এসেছি। এখানে এই তিনদিন থেকে মাঠ পর্যায়ে গ্রাম থিয়েটারের বর্তমান অবস্থা জানার চেষ্টা করছি। যাই হোক, শুরুতে আমি যে বলেছিলাম গ্রাম থিয়েটারের অগ্রযাত্রার কাঁটাটা উপরের দিকে ওঠে আবার নিচের দিকে নেমে গেছে এবং এখন নিচে নেমে কম্পমান অবস্থায় আছে। এখন এখান থেকে উত্তরণের জন্য কী করা দরকার। আপনারা কাজ করে প্রমাণ দিয়েছেন যে, সেলিম আল দীনের দেখানো আদর্শ এবং রীতি দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, এটা একটা দিক- প্রশ্ন হচ্ছে আদর্শের ক্ষেত্রে নতুন আর কী কী যুক্ত করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আ ফা : কঠিন প্রশ্ন আমার জন্য।
সা আ : আপনার অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলুন।
আ ফা : আপনার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একটা সংগঠন নিয়ে পথ চলছি। পথটা একেবারেই আমার-আমাদের অনেকের জীবনের সাথে মিশে গেছে। আমার এই ছোট জীবনে নাটক নিয়ে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আছি, এটা কিন্তু একেবারে ছোট কোনো বিষয় না।
সা আ : কম কথা নয় এটা এবং জীবনের একটা বড় সময় একাজে ব্যয় হয়েছে। তাই না! আপনার যৌবন আপনি এখানে বিলিয়েছেন। নিজে কাজ করেছেন, দর্শক তৈরি করেছেন, কর্মী তৈরি করেছেন। কিন্তু কর্মী সঙ্কটের আরও কিছু কারণ আছে যেটা আমি এখানে অনেকের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, সেটা হল যে আসলে চার-পাঁচ বছরই একজন কর্মী একটা সংগঠনে থাকতে পারে। ধরুন এইখানে এই উপজেলায় যে কলেজটা আছে, এইখানে একজন ছাত্র পড়ছে, সে দুই অথবা বড়জোর তিন বছর সংগঠন করতে পারবে, মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই। তারপরে তাদের হয়ত এখান থেকে অন্য জায়গায় যেতে হবে, না-হলে মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাবে, ছেলেটাও হয়তোবা এখান থেকে ইউনিভার্সিটিতে চলে যাবে। ঘটনাটা এরকমই। কর্মী সংকট হবেই। কর্মী এভাবে আসবে এবং যাবে, এটা হল বাস্তবতা এবং এটা ঢাকায় বসে অনুধাবন করতে পারিনি। আমি অনুধাবন করেছি আপনাদের এখানে এসে সবার সাথে কথা বলে। আরেকটা কথা, ‘গ্রাম থিয়েটার’ সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টাতে হবে। আমরা গতকাল মানে চার তারিখে গান্ধী আশ্রমে গেলাম, যাওয়ার পথে ধানক্ষেত, খাল-বিল; আমাদের ধারণা গ্রাম বুঝি এইরকম কিন্তু আমি লক্ষ করলাম এটা খুব বেশি দূর না। এই যে মেলান্দহ যেখানে আপনারা থিয়েটার করেন এর খুব কাছেই এসব। এক দেড় মাইলের মধ্যেই গ্রাম। সুতরাং ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ গ্রাম থিয়েটারই। যাই হোক, প্রশ্নে ফিরে আসি- যে আদর্শের ভিত্তিতে পঁয়ত্রিশ বছর পথ চললেন, সেই আদর্শের ভবিষ্যৎটা নিয়ে কিছু বলুন।
আ ফা : ‘গ্রাম থিয়েটার’-এর ভবিষ্যত কর্মীদের হাতেই সৃষ্টি হবে। হতাশাবাদী নই আমি। তবে আমাদের যে সামাজিকধারা চলছে তাতে করে নারী নাট্যকর্মী একটু কমবে বলে মনে হয়।
সা আ : কেন?
আ ফা : কারণ শিল্প-সংস্কৃতির চেতনাবিরোধীদের সংখ্যাটা দিন দিন বাড়ছে। তার ব্যাপ্তিটা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। কিছু ধর্মভিত্তিক সংগঠন শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সা আ : এই অবস্থায় ‘গ্রাম থিয়েটার’চর্চার প্রসার ভীষণভাবে দরকার। সব জায়গায়।
আ ফা : ঠিক তাই। এখনকার সরকার তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। যার জন্য কেউ কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু আজকে যদি কোনো কারণে মৌলবাদের উত্থান ঘটে তাহলে সংস্কৃতিচর্চা থেমে যাবে। খুব দ্রুত মৌলবাদী হয়ে যাচ্ছে মানুষ। গ্রামে-গ্রামে এবং স্কুলে-স্কুলে, কলেজে-কলেজে বাৎসরিক নাটককে বাধ্যতামূলক করা দরকার। একটা ক্লাস রাখা যায় নাটক পাঠের জন্য- ঐ খেলাধুলাটা যেমন অনেকটা ফর্মালিটির মধ্যে স্কুল-কলেজে আছে। সেভাবেই রাখুক, তবু একটা নাটক তৈরি হলে যে ছেলেটা ওই নাটকে একবার কাজ করবে তার ভেতরে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি একটা নেশা তৈরি হবে। এই নেশাটা থেকে ওই ছেলেটা বা মেয়েটা আমাদের মতন সংগঠনে কাজ করতে চাইবে। যতই বাধা আসুক, কিছু আগ্রহী কর্মী সংস্কৃতিকর্মে যুক্ত হবে।
সা আ : তার মানে আপনি পাঠ্যসূচিতে নাটকপাঠ অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন বলে মনে করছেন?
আ ফা : অবশ্যই। এবং হাই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে বৎসরে অন্তত ওই প্রতিষ্ঠানে একটা নাটক হওয়া উচিৎ।
সা আ : হ্যাঁ, পড়ার বিষয় হিসেবে নাটক থাকলে ভালো হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কারো লেখা কোনো একটা নাটক যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন ছেলে বা মেয়ে পড়ে, সে তো অনুপ্রাণিত হতেই পারে। হয়তো সে আপনার ‘গ্রাম থিয়েটার’ বা অন্য থিয়েটারের কর্মী হবে না কিন্তু যারা নাটক লেখেন-করেন তাঁদের কথাতো সে জানবে। আমরা নৌকা দৌড়ের প্রতিযোগিতায় দেখি যে একটা নৌকার সামনে একজন থাকে যিনি নেতৃত্ব দেন। মানে উনি পরিচালনা করেন। এটা কিন্তু লাগেই এবং আপনি কালকেই বলছিলেন যে সংগঠন পরিচালনা করার মানুষ জন্ম নিবেই। সে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হোক বা সিজার করেই হোক এই নেতৃত্বের জন্য একজন কেউ আসবেই এবং এই গ্রাম থিয়েটার বলুন অন্য থিয়েটার বলুন সামনে যাবেই, তাকে আটকে রাখা যাবে না। আমরা একটা নিম্নরেখার কথা বলছিলাম যেটা একটা জায়গায় এসে এখন কম্পমান। আমার একটা অভিমত এরকম যে, গ্রাম থিয়েটার ইজ এ কনসেপ্ট। সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং অন্যান্যরা যার প্রণেতা। এই তত্ত্ব, এই কনসেপ্ট, এটা বিকশিত হয়েছে-হচ্ছে। প্রত্যেক কনসেপ্টেরই একটা টেম্পো থাকে। এটা নিয়ে কনসেপ্টটা একটা জায়গায় গেছে এবং এখন কিছুটা নেমে গেছে। আবার আমরা এটাও জানি প্রত্যেকটা কনসেপ্টের টেম্পো অব ডেভলপমেন্ট থাকে, তার একটা ইন্টারনাল ইভ্যুলিউশানও হয়। একটা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন হয়। আমি আপনার সাথে কথা বলে যেটা বুঝতে পারলাম যে, অভ্যন্তরীণ বিবর্তন- পরিবর্তন, এটা গ্রাম থিয়েটারের ভিতরে হচ্ছে। আমার শেষ প্রশ্ন আপনার কাছে এই যে, কনসেপ্টটার ভিতরকার পরিবর্তনটা কোন কোন প্রক্রিয়ায় হলে পরে আপনি মনে করেন যে, আবার যে রেখাটা নিচে নেমে গেছে, সেটা কার্যকরভাবে ঊর্ধ্বমুখী হবে?
আ ফা : এর জন্য সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। অঞ্চলে-অঞ্চলে আমাদের নেতৃবৃন্দদের আসতে হবে। আগে কমিউনিস্ট পার্টি ক্যাডারদের বলতো, শ্রমিকদের মাঝে যাও। নিজে শ্রমিক সাজো। ওই শ্রমিককে মার্কসবাদ, লেনিনবাদে উদ্বুদ্ধ কর। শ্রমিকের অধিকার নিয়ে তাকে সচেতন কর। এভাবেই তো শ্রমিকরা সচেতন হয়েছে।
সা আ : আর আমাদের ক্ষেত্রে হবে এখানে কর্মশালা করা।
আ ফা : হ্যাঁ। কেন্দ্র থেকে দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। পনেরদিনব্যাপী প্রযোজনাভিত্তিক একটা কর্মশালা করতে পারি। প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা ছাড়া কর্মশালার কোনো মূল্য নেই।
সা আ : কর্মশালায় একটা নাটক তৈরি করবে ‘গ্রাম থিয়েটার’-এর সদস্যরা এবং সেটার উপস্থাপনার ঢংটাও তারাই তৈরি করবে। প্রত্যেকটা অঞ্চলে প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা থেকে যদি এক ঘণ্টার একটা নাটক নামানো হয় তাহলে ভালো হয়। কাছাকাছি অঞ্চলের নাটক নিয়ে আমরা কিন্তু একটা উৎসব করতে পারি। নাটকগুলোকে মেসেজ অরিয়েন্টেড হতে হবে, একটা শিল্পমানও থাকতে হবে। আমার শেষ কথা হচ্ছে যে, আপনি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই গ্রাম থিয়েটারটা ধরে আছেন। এজন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এবং আমি আশা করি যে এর বিকাশ ঘটবে। গ্রাম থিয়েটার দীর্ঘজীবী হবে এবং আমরা সবাই মিলে কাজ করলেই কিন্তু এই থিয়েটার যেটা এখন একটু নিম্নমুখী সেটা ঊর্ধ্বমুখী হবে।
আ ফা : গ্রাম থিয়েটারের সাথে যুক্ত হতে পেরে আমরা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। আমার বয়স হয়ে গেছে। তবে যতদিন সুস্থ আছি, গ্রাম থিয়েটার আমার ভেতরে থাকবে। গ্রাম থিয়েটারকে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। এটা আমাকে অনেকদূর নিয়েও গেছে। আসাদুল্লাহ ফারাজী রূপে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
সা আ : এই যে নেতৃত্বটা আপনি দিলেন, তা তো আসলে সারাজীবন ধরে রাখা যায় না। এর বিকাশের জন্য আপনি আপনার উত্তরসূরিকে তৈরি করবেন। আমি নিশ্চিত যে, আপনার আশেপাশে তাঁরা আছেন। তাঁদের দেখভাল করবেন এবং গ্রাম থিয়েটারের দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির জন্য ‘গ্রাম থিয়েটার’ করে যাবেন। আপনাকে আবারো ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের কথোপকথন শেষ করছি।
আ ফা : গত তিনদিন ধরে আমাদের উৎসবে দর্শক হিসেবে, আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকলেন, এর জন্য ‘শহীদ সমর থিয়েটার’ ও আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে আপনাকেও অনেক-অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *