এই আক্ষেপ কোনোদিনই ঘুচবে না

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

সেঁজুতি খান
আমি জন্মেছি ঢাকা থিয়েটার পরিবারে, সেই সূত্রে সেটি আমার জীবনের অপরিহার্য অংশ খুব ছোটবেলা থেকেই। আর সে কারণেই জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত মানুষের সাথেই আমার চলা-ফেরা-কথা। সেভাবেই চিনি সেলিম আল দীন আংকেলকে। লেখক হিসেবে জেনেছি পরে। আগে চিনতাম ব্যক্তি সেলিম আল দীনকে এবং তাঁর পরিবার বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা, পারুলআন্টি। আমার বাবা-মা দু’জনেরই ভীষণ কাছের মানুষ তিনি। শুনেছি আমার মা ইউনিভার্সিটি জীবন থেকেই তাঁর ন্যাওটা ছিলেন। ছোটবেলায় খুব বেশি তাঁকে দেখেছি বলে স্মৃতিতে আসে না আমার। তবে ২০০৮ সাল থেকে প্রতিবছর দুইবার দেখা হত তাঁর সাথে আমার। কখনও এর বেশিও হয়েছে। তো, সবসময়ের মতই, স্নিগ্ধ এক মুখ, সুন্দর হাসি, কেমন মায়াভরা। প্রতিবার আমাকে দেখেই প্রথম কথাটা ছিল- ‘তুই কি আর মোটা হবি না?’ অর্থাৎ বছরে দুইবার এই একটি কথা আমাকে শুনতেই হতো। আর তারপরই জড়িয়ে ধরে আদর করতেন এবং কী করছি না করছি হালচাল জানতে চাইতেন। আমরা নাটকের মানুষদের পরিবার। নিঃসন্দেহে নাট্যাচার্যকে নিয়ে আমাদের বাসায় আলোচনা থামেনি কখনো, সাথে তাঁর স্ত্রীও হয়েছেন কথোপকথনের বিষয়বস্তু। কিন্তু আমার মূল আকর্ষণের জায়গায় তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল একটি বিশেষ ঘটনায়। লেখকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক ধরনের ফ্যান্টাসি, ইতিবাচকতা, নেতিবাচকতা থাকে। সেখান থেকে তাঁর সঙ্গীরাও নিস্তার পায় না। তো কোনো একদিন আমাদের বাসায় এক তরুণ লেখকের সাথে আমার মা এর আলোচনা হচ্ছিল যে, পারুলভাবি অনেক কষ্ট করেছেন। একজন লেখকের সাথে সংসার করা খুব কঠিন এবং যন্ত্রণাময়। এবং সকল যন্ত্রণাই তিনি ভোগ করেছেন। পরদিন সেই তরুণ লেখক আমাকে প্রশ্ন করেছিল, শুনলে তো? থাকতে পারবে লেখকের সাথে? ব্যস! মাথায় ঢুকে গেলো পারুলআন্টি, যে তাঁকে জানতে হবে, তাঁকে আরও বুঝতে হবে। পরবর্তীতে আমি একজন লেখককেই জীবনসঙ্গী করি। এবং আমরা দুইজনে তাঁর আশীর্বাদ নিতে যাই তাঁর বাসায়। তো, এক মুহূর্তে তাঁর ভীষণ স্নেহের পুত্রসম আমার সঙ্গীকে তিনি মেয়েজামাই বানিয়ে দিলেন। অর্থাৎ আমার বাবা-মার সাথে তাঁর সম্পর্ক যেহেতু আগে থেকে, তাই কিনা আমি তাঁর কন্যা। খুব আড্ডা হল, সময় কাটালাম দীর্ঘক্ষণ। তাঁর সংসারজীবনের স্মৃতিচারণা করলেন অনেক। গল্প যেন ফুরায় না। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছি, শিক্ষা নিচ্ছি, গ্রহণ করছি। আর ভাবছিলাম মানুষ এত সাহসী হয়! আড্ডার শেষে তিনি আমাকে বললেন- ‘শোনো মেয়ে, লেখককে জীবনে জড়িয়েছ, তোমার জীবন কিন্তু আর ১০জনের মত সাধারণ হবে না। তোমার অনেক কষ্ট। তোমাকে অনেক ধৈর্য্য, অনেক সাহস রাখতে হবে। কিন্তু তোমাকে অনুভবও করতে হবে। কষ্ট পেয়ে যদি সরে যাও, যেতেই পারো। কিন্তু অনুভবটা যদি করতে পারো, তুমি সুখী হবে। আমার আশীর্বাদ রইলো।’ এইটুকু নিয়ে আমি ফিরলাম। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম তাঁর সাথে আমাকে আরও অনেক সময় কাটাতে হবে। কিন্তু সুযোগটা হয় নাই আর। ২০১৭ তে আমি যখন জানতে পারলাম তিনি হাসপাতালে, ছুটে গেলাম অফিস শেষেই, কারণ আমার মন বলছিল আর দেখা হবে না। তাই হয়েছে। আর দেখা হবে না! কতকিছুই তো জানা হল না! কতকিছুই তো শোনা হল না! এই আক্ষেপ যে আমার কোনোদিনই ঘুচবেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *