এ এক বিপর্যয়ের শোক

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

কামরুল ইসলাম
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সহধর্মিনী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা, ডাক নাম পারুল; তিনি ইহলোক থেকে অনন্তলোকে (১০ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার) পাড়ি দিলেন। তাঁর এই অন্তর্ধান জানিনে, কোথায় যেন ছেদ পতন ঘটলো। যখন সংবাদটি দৃষ্টিগোচর হলো, তখন তাঁর শেষকৃত্য চলছে প্রিয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। চলে যেতে হবে এই সীমাহীন পথে, ভেবে নিতে পারি এই জানুয়ারিতেই নাট্যাচার্য চিরন্তন পথে মহাকালকে আলিঙ্গন করেন। সেই একই পথে তাঁর সহচর, তবু কী ভীষণ বেদনা নিয়ে তিনি হয়তো ওপারে। কালই নিরীক্ষণ করুক মহাকালের ব্যাপ্তি নিয়ে।

স্মরণে কত কথা কতোভাবে উঁকি দিয়ে গেল, ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচিত্র অনুষঙ্গে আপা পারুল এখন এক স্মৃতি, তীব্র বেদনার। মনে পড়ে, স্বৈরাচার ও সাম্পদায়িকতো বিরোধী আন্দোলনের কোন এক প্রেক্ষাপটে নাট্যাচার্য নিয়ে গেলেন তাঁর প্রান্তিক গেটের সন্নিকটের বাসায়। সরল সহজ, অথচ কী নির্মল ব্যক্তিত্ব পারুল আপার। বাসায় ঢুকেই বললেন, পারুল, তোমার ভাইকে নিয়ে এসেছি।’ কিছুটা বিস্মিত, কতকটা সংকোচে সালাম দিয়ে বসলাম ড্রইংরুমে। পরে জানলাম, আমার নামেই পারুল আপার একটি ভাই আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচুকিয়ে ঢাকায় তিনি থাকেন। আমি সেই অবধি নাট্যাচার্যের সহধর্মিনীকে আপা জ্ঞানে শ্রদ্ধা করেছি, মেনেছি। আমাকে মাঝে মাঝে পাগল ভাই, নেতা ভাই ইত্যাদি বলে ডাকতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২টি বাসা সবসময় আমারই ভেবেছি। প্রথমতঃ নাট্যাচার্যের বাসা, তারপর আমার প্রিয় শিক্ষক ড. আফসার আহমেদের বাসা। মনে পড়ে গাঁ গ্রাম থেকে উঠে আসা, শহুরে ডানপিটে না হলেও, আমি স্বভাবগত ভাবেই জেদী ও অভিমানী। এই জেদের মাত্রায় পড়ার সংযোগ, পাশ্চাত্য সাহিত্য বুঝতে শেখা, বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় অনুধাবন, কতকটা গুরু আশ্রমের মতো নাট্যাচার্যের নিকট থেকে, কতক সময় প্রিয়শিক্ষক আফসার আহমেদের সান্নিধ্যে অবহিত হয়েছি। এসময় আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে, হাতের অবস্থা কোন সময় ভালো থাকতো না। তবে উপাদেয় খাবারের স্বাদ থেকে পারুল আপা কখনো বঞ্চিত করেননি। বরং ভালো কিছু হলেই, বা না হলেই যা আছে তাই নিয়ে কী আনন্দের সাথেই দুপুর ও রাতের আহারে সামিল হয়েছি। আপা হাসতে হাসতে বলতেন, আমার নেতা ভাই এসেছে। বই পড়ার জন্যে যতটুকু সময় পেতাম, তার সদ্ব্যবহার করতে চেষ্টা করতাম। সেক্ষেত্রে নাট্যাচার্যের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীটা আমার বৃহৎ উপকারে এসেছে। কোনকিছু বুঝতে অসুবিধে হলে অকপটে জিগ্যেস করতাম, স্যার তো হেসেই বলতেন, কী যে পড়িস? অর্ধেক সিগারেটে টান দিয়ে যা বলতেন, তাই আমার সাহিত্যে পরম শিক্ষা বলে এখনো জানি।

নাট্যাচার্যের সাথে পাঠকক্ষে তেমন কোন সংশ্রব ছিল না, কারণ তিনি ছিলেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপক (তিনিই এই বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন)। যতটুকু সাহচর্য, তা ছিল ক্লাসরুমের বাইরে। সম্মান ও এম.এ পর্বে সর্বোচ্চ শ্রেণী প্রাপ্ত হলেই, উভয় দিনই আপার বাসায়। খাবার দাবার মিষ্টি সহযোগে যে আপ্যায়ন, তা আজ যখন ভাবি, বুঝতে পারি এই মহীয়সীর আদর কতটা স্নেহের, কতটা আবেগের ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকায় নাগরিক জীবনে, কতকটা অনাহূত বেদনাবোধের অভিমান ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠতো। কোনো হিসেব মিলাতে পারিনি এই জীবনে, সবই বোধহয় নিজের সাথে নিজের লুকোচুরি করেছি। সেইসব সময় পেরিয়ে গেল, বহু সময়ের অ-বলা, অলেখা স্মৃতি আরো কিছুকাল পরে হয়তো লিখবো। তবে এটুকু বুঝি, যে-কথা নাট্যাচার্য আমার অভিমানে বলেছিলেন, তোকে ফিরে আসতেই হবে। সেই ফিরে এসে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। সেই সৃষ্টিশীলতায় সাহস সঞ্চার করালেন পারুল আপা। বাসায় গিয়ে দেখি, কী কষ্টটাই তিনি করছেন! নাট্যাচার্যের পাণ্ডুলিপি প্রকাশ, অপ্রকাশিত লেখা আলাদা করা, বিভিন্ন সময়ের সাক্ষাৎকার, পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা সংরক্ষণ ইত্যাদি যেন ব্রত সাধনার মতো নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন। সুন্দরম-র জন্য অপ্রকাশিত লেখা দিলেন, রাষ্ট্র সম্পর্কিত। সেখানে নাট্যাচার্যের রাষ্ট্র বিষয়ক ভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে। সেই লেখা প্রকাশ করতে গিয়ে পাঠ-উদ্ধারে তাঁর সহযোগিতা এখনো ভুলতে পারি না। বলে গেলেন, তাঁর জীবনের নানা কথা, দীর্ঘশ্বাস। উচ্চারণ করলেন, নাট্যাচার্যের অন্তর্ধানের সময়ে কিভাবে নাট্যাচার্যের কম্পিউটার থেকে নাট্যাচার্যের লেখা রহস্যজনক উধাও হয়ে গেল। তার কোন দালিলিক প্রমাণ হয়তোবা দিতে পারেন নি, তবে এই রহস্য উন্মোচনের জন্য আমাকে বার বার বললেন। এ নিয়ে কোন একজন একটি লেখা লিখেছেন জানালেন। তবে সবকিছু তো রহস্য থাকে না, কোন একসময় সেটি বের হবে? এই আশা ছিল তাঁর। নাট্যাচার্যের সমাহিত স্থানকে সমাধিসৌধ করার বাসনার কথা বললেন, আরো বললেন নাট্যাচার্যের অপূর্ণ ইচ্ছা বাস্তবায়ন। জানি, মানুষের স্বল্পতম সময়ের জীবনে সব বাসনাই পূরণ হয় না। ভাবিকালের অপেক্ষায় থেকে বলবো, কোন এক গবেষক, বা স্ব-উদ্যোগী কেউ হয়তো নাট্যাচার্যের সেই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করবেন। আর সেই বাস্তবায়নের সাথে এই মহীয়সীর নামটি অতি উজ্জ্বলভাবে থাকবে বলে বিশ্বাস করি।

ক’দিন ধরে কতক লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে, টিভি সহ নানা সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। আজ (১০ জানুয়ারি ২০১৭) ইন্টারনেটে ঢুকতেই ‘সুহৃদ জাহাঙ্গীরনগর’ গ্রুপের আলাপন থেকে অগ্রজ কায়কোবাদ হোসেন যখন জানলেন, তখন থেকেই কেমন বিষন্ন বেদনা আঁখির পাশে এসে জমলো তার মতো করেই…।

ভেবেছি এমন দিনে তাঁর অন্তর্ধান, বিকেলের সেই রঙ কী তাঁকে ছুঁয়ে দেখবে, যে রঙ দেখে নতুন দিনের স্বপ্ন আঁকতেন, রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনে সময় পার করতেন, ভোরের শুভ সুন্দর শিশির ও রোদে উন্মুক্ত আকাশ দেখতেন। সেই অন্তর্জগতের মহাকালে তাঁর এখন অবস্থান, সেই অবস্থান মহিমান্বিত করুক ক্ষণকালের বিশ্বলোককে।
(পুনর্মুদ্রিত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *