তিনতরঙ্গ- অথশৃগালকচ্ছপশশসংবাদ- মাদল হাসান

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

উৎসর্গ
শিল্পগুরু সেলিম আল দীন
এবং
বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার
যৌথচরণারবিন্দে

চরিত্রলিপি
শৃগাল ওরফে শিয়াল
কচ্ছপ ওরফে কাইটঠ্যা ওরফে কাছিম
খরগোশ ওরফে শশ

[একটি অতিকায় কচ্ছপ কইচ পাড়তাছে মঞ্চের মাঝখানে। পরিপার্শ্ব দেখে মনে হয় একটি জীর্ণ মেসবাড়িতে আছে সে। ক্রমশ পরিষ্কার হবে যে, এই মেসবাড়িতে সে একা নয়। আছে আরও দুইজন মেসমেট কিংবা রুমমেট। একজন শিয়াল পণ্ডিত এবং অন্যজন খরগোশ ওরফে শশ। মঞ্চের ভিতর দিকের ঠিক মাঝখানে কচ্ছপের কণ্টকারামশয্যা। মঞ্চে ভ্রাম্যমাণ শিয়াল এবং শশ। এই মঞ্চ-মেদিনীতে সৃষ্টির উদ্ভব হতে বিলয়াবধি পর্যটনশীল এই তিন তরিকার তিন মাখলুক। এক মাংশাষী, এক তৃণভোজী আর এক উভচর। তিনকূলে কেউ থেকেও যেন তাঁদের কেউ নেই। তাঁদের তাঁরা ছাড়া। তাঁদের মতানৈক্য অনেক। ঐক্যও কম নয়। রূপসী বাংলার রূপকথা যে-অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে মরতে-গিয়ে পেয়ে যায় মরণকাঠি ও জিয়নকাঠি, তারই স্পর্শে এই তিনজন মরতে মরতে বেঁচে ওঠে। বাঁচতে বাঁচতে মুখোমুখি হয় মৃত্যুর। এ-মৃত্যু মননের, মানবিকতার। এই জিয়ন জীবনের জঙ্গমতার। তাঁরা কথা বলে কথকের মতো কবির মারণমসী এবং জিয়নমসীর অদ্বৈত-অভেদ মরমী স্পর্শে। মর্মমেদুর মিরাকলে আমৃত্যু আবদ্ধ থাকে অদ্ভুতুরে মৈত্রী-বন্ধনে…। সন্ধ্যা হয় হয়। নাকি এ-এক সময়সন্ধি? যেন গোধূলিসন্ধির নৃত্য। না-উষা, না-গোধূলি। এই অসূর্যতামসপ্রাতে প্রকৃত অবস্থা ঠাহর করতে পারে না কচ্ছপ। ক্রমাগত কইচ পাড়ে কণ্টকারামশয্যায়। নাকি এই শয্যা ভীষ্মের শরশয্যার শিল্প-সমতুল? যেন বা ক্ষুধার্ত অবশ শরীরে ঘুম আরো গাঢ় হয়ে আসে। এদিকে ক্ষুৎকাতর-শ্রমক্লান্ত শৃগাল এবং শশ হাঁফাতে হাঁফাতে প্রবেশ করে মঞ্চে। পিঠে পৃথিবীর বোঝা। মঞ্চে গ্যাসের চুলার পাশে বইপত্র। আলনায় হাড়ি-পাতিল। ফ্লোরে কাপড়ের স্তূপ। ড্রেসিং টেবিলের উপর জুতা এবং হ্যাঙ্গারে ঝুলানো চাঁদ।]

শশ : কাইটঠ্যা আইলশ্যা হ’লে কী-হবে, দ্যাখ, ঘর কেমন গুছিয়ে রেখেছে!
শৃগাল : এই প্রত্যেকদিন আগে-আগে নিজের শইল আরেক জনেরে খাবার দিয়া তারপরে আছার দিয়া মাইরা বস্তাভরা আর কাহাতক সহ্য হয়?
শশ : অরা কি গর্তে লেজ ঢুকানের সঙ্গে সঙ্গে খাওন শুরু করে?
শৃগাল : করে মানে? কী কী কছ তুই? আমার এই লেজ কি এইটুক আছিলো ভাবছস? এর ডাবলের ডাবল আছিলো।
শশ : কও কী?
শৃগাল : দ্যাখ, আইজক্যাও ইঞ্চিখানেক খায়া ফালাইছে। উহ্। [শশ শৃগালের লেজের আগা আলতোভাবে সপর্শ করে। এ-আদর প্রহারাদর নয়। বাৎসল্যের আন্তরিকতায় পূর্ণ।] উহ্, ধরিস না, ধরিস না। ব্যাপক জ্বলতাছে।
শশ : দাঁড়াও, রাইতের জন্য রাখা ঘাস থেইকা তোমারে মেডিসিন বানায়া দেই। [শশ শশব্যস্তের মতো পিঠের বোঝা খুলে মধুকূপী ঘাস বের করে এবং চিবিয়ে লালাসহ ঘাসের ক্বাথ পরম যত্নে লাগিয়ে দেয় শৃগালের লেজে।]
শৃগাল : উহ্! আহ্! ভালাই তো আরাম লাগতাছে! [শশ বিজ্ঞের মতো মাথা ঝাঁকে।] তুই যে আমার জন্য এত ব্যস্ত হইলি এইটারে মানুষ কী কয় জানছ?
শশ : না! ব্যস্ত হইলো ব্যস্ত, বিজি। এরে আবার কী কওন লাগবো?
শৃগাল : আছে, আছে! ব্যাপার আছে! তরে নিয়া ব্যাপার আছে।
শশ : ব্যস্ত নিয়া আমার আবার কী ব্যাপার?
শৃগাল : তর চরিত্র নিয়া টানাটানি করছে মানুষ।
শশ : দ্যাখো, ইয়ার্কি মারবা না। শশমিয়ার চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র।
শৃগাল : আরে, আমি ইয়ার্কি করমু ক্যান? মাইনষে কয়।
শশ : মাইনষের কতায় কান দেওন লাগেনা।
শৃগাল : আরে, কতায় তুই কান না দিলি । কিন্তু কানের মইধ্যে কতা সান্ধাইলে তুই না শুইনা যাবি কই?
শশ : তা ঠিক। তুমি শিয়াল পণ্ডিতের মতোই কতা কইছো।
শিয়াল : এই-যে তুই কইলি শিয়ার-পণ্ডিত, এইডাও মাইনষের দেওয়া নাম। মাইনষের কতায় কান দ্যাস-না কই? ঠিকই তো দ্যাস।
শশ : হইছে পণ্ডিত, এহন কও আমার চরিত্র নিয়া কী কইছে মাইনষে?
শিয়াল : শোন, যে-যত ভাবেই ধরুক, নিজের কতা শুনতে সবারই ভালা ঠ্যাকে।
শশ : এই জন্যেই আমি মাইনষের কতায় কান দিবার চাই না। যেই কান দিবার চাইলাম, অমনি তুমি গিয়ার বাড়ায়া দিলা।
শিয়াল : আরে, গিয়ার-না, গিয়ার-না। মাইনষে কয়, তুই নাকি ইজি কাজে বিজি থাকছ?
শশ : কী? ইজি কাজে বিজি থাকি? তাইলে এত ঘাস খাইলাম কেমনে? আর এত ঘাস-মূলা-বাঁধাকপি-ফুলকপি আনলাম কেমনে?
শিয়াল : অইডাই কয় মাইনষে।
শশ : [রাগত স্বরে] কী কয়?
শিয়াল : কোন মানুষ খুব ব্যস্ত হইলে অন্য মানুষ তারে শশব্যস্ত কয়। মানে, তর ব্যস্ততা দিয়া মানুষ সবচে ব্যস্ত-মানুষের ব্যস্ততা মাপে। মানে, তুই হইলি মানুষের দৃষ্টিতে ব্যস্ততা মাপার মানদণ্ড।
শশ : [রাগ কমে, খুশি মনে…] তাই কও। এইজন্যেই মাঝে মাঝে আমি মাইনষের কতায় কান দেই। মানুষ তো ঠিকই কয়। টাইম ইজ মানি। ঠিকই তো। টাইম ইজ ফুলকপি। টাইম ইজ বাঁধাকপি। টাইম ইজ গাজর-মূলা। টাইম ইজ ঘাস।
শিয়াল : এহ্। অরে মাইনষে ব্যস্ত কইছে আর খুশির চুদিরভাই হয়া গেছে গা।
শশ : দ্যাখ, মুখ সামলাইয়া কতা ক। অন্যের প্রশংসা তর সহ্য হয় না, না ? কত সুন্দর কথা বলেছে মানুষ আমার নামে। শশব্যস্ত। শুনলেই মন কেমন শশব্যস্ত হয়ে ওঠে। আহারে। আমার মনের মানুষ এলো দ্বারে, মন আমার জাগলো নারে। [শশ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া শুরু করে।]
শিয়াল : তোমার মন-না-খালি তোমার গতরডাও ঘুম থেইকা চেতন পায় নাই। এই কথাও কইছে মানুষ।
শশ : কও কী? শশব্যস্ত আবার ঘুম থেইকা চেতন পায়-না কেমনে?
শিয়াল : তাইলেই বুঝো ঠ্যালা, মাসে কয়দিন?
শশ : দ্যাখো, এত নাটক করবা না। নাটক আমি একদম পছন্দ করি না। যা-কবা কইয়া ফালাও। কী কইছে মানুষ আমার সম্পর্কে?
শিয়াল : না, মানে…মানে…[আমতা-আমতা করে শৃগাল।]
শশ : এত মানে-মানে করতাছ ক্যান? এত মানে-মানে করার কী মানে? কী কইছে সাফ-সাফ কইয়া ফালাও। তোমারে তো হাজার হইলেও আমি জেল-ফাঁস দিতাছি না।
শিয়াল : শোন, শশ, মুখে সবাই বড় বড় কথা কয়। কিন্তু উচিত কথায় বন্ধু বেজার। সমালোচনা কেউ সহ্য করবার পায় না।
শশ : তা ঠিক। তুমি পণ্ডিতের মতোই কথা কইছো। সমালোচনা সহ্য করতে সাদা-মন লাগে। আমার মতো সাদা-শরীল হইলেও খালি হয় না। তুমি কও। দাঁড়াও, তার আগে দুই ভাইয়ে মিলা মন সাদা করার একটা গান গাই। তারপর মন সাদা হইলে মানুষের সমালোচনা শুনবো।
আমাকে পাল্টে দিতে এসে
তুমিও পাল্টেছ ভালোবেসে।।
যেদিক থেকে ঐ আসে আলো
সেদিকে গাছটা ডাল ছড়ালো
কী ডাকে ঢালুতে জল গড়ালো?
ভাটির দেশে।।
আমাকে পাল্টে দিতে এসে
তুমিও পাল্টেছ ভালোবেসে।।

পোকাটি এসেছিল পাপড়ি কেটে নিতে
পরাগমাখা পায়ে ছড়ালো বীজ…
আঁধার এসেছিল আলোটা ঢেকে দিতে
শরীরে সেঁটে গেল আলোর কামিজ।।

বন্যা ভেবেছিল ভাসিয়ে নেবে
কৃষক জানে, সে পলিও দেবে…
কাঁদাতে এসে যদি কেঁদে যাবে
হাসাতে এসে যেও হেসে।।

আমাকে পাল্টে দিতে এসে
তুমিও পাল্টেছ ভালোবেসে।।

শশ : বন্ধু, চলো, এবার মানুষের সমালোচনা শুনি। সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে করলে করুক বঞ্চনা।
শিয়াল : আরে, এত অস্থির হইতাছ ক্যান? সমালোচনা এককান দিয়া ঢুকাবা, আরেক-কান দিয়া বাইর কইরা দিবা।
শশ : না-না। কও কী? তোমার আর কাইটঠ্যার সঙ্গে এইখানেই আমার ফারাক। আসল আলাদাত্ব। কাইটঠ্যা সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। আমি সব-সমালোচনা থেকেই কিছু-না-কিছু শিখতে চাই। আর তুমি সমালোচনাকে পাত্তাই দেও না। তারপরেও আমরা একত্রে একান্নবর্তী পরিবারে, থুক্কু মেসে থাকি। কিংবা ধরো, একসঙ্গে আছি, সেটাই বড় বিস্ময়বোধক আশ্চর্যচিহ্ন।
শিয়াল : আরে ভাই, আমরা হইলাম সামান্য মাখলুক। আমরা তো আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ-না। আমগর কাজ-কামের কোন হিসাব দেওন লাগবো না। নগদ যা-পাও, হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শূন্য থাক, দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে? মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।
শশ : না-না। আল্লা আমারে এত সুন্দর কইরা বানাইছে কি দুর্নাম কামানোর জন্য? শিক্ষার শেষ নাই। সমালোচনা না-শুনলে শিখমু কেমনে? তুমি তাড়াতাড়ি আমার সম্পর্কে-শোনা সমালোচনা-প্রবন্ধটা পড়ো।
শিয়াল : সত্যি কইরা কও, মাইন্ড করবা-না তো?
শশ : না-না। সত্যি কইলাম। সত্যি-সত্যি-সত্যি। তিন সত্যি। মাইন্ড করমু না।
শিয়াল : মাইনষে কয়, তুমি নাকি কচ্ছপের সাথে দৌঁড়ায়া পারো নাই?
শশ : আমি? কচ্ছপের সঙ্গে? কাইটঠ্যার লগে?
শিয়াল : হ। মাইনষে কয়।
শশ : আমি? আমি শশব্যস্ত খরগোশ, আইলশ্যা কাছিমের লগে লৌড়-পাইড়া পাইনাইংক্যা? কৌন হুওড়ের পো কইছে? লৌড় পাড় আমার লগে। সাহস থাকে অক্ষণ লৌড় দিবি। [দর্শক এবং ঘুমন্ত কচ্ছপের দিকে দেখিয়ে এবং তাকিয়ে।]
শিয়াল : আরে, শুয়োর না। মাইনষে কয়।
শশ : এতবড় জালিয়াতি। শালা, মাইনষের বাচ্চা মানুষ, টিপসই জাল কইরা ফালাইলো? যে মাইষেরে এত ভক্তি দেই…। হায়রে, আমার বেঁড়ায় খেত খাইলো, বিচার দিমু কারে? এই কয়, আমি শশব্যস্ত, এই কয়, আমি কাছিমের তনে আইলশা! একমুখে দুই কথা?
শিয়াল : আরে, আগে ভালো মতো শোনো।
শশ : কিসের ভালোমতো শুনমু? কিসের অত শোনাশুনি? [চোখ মুছতে থাকে] আমার চালানে হাত দিয়া ফালাইছে। বাদ আর থাকলো কী? এমুন দুইমুখ্যা সাপ?
শিয়াল : আরে, সাপ-না, সাপ-না। মানুষ-মানুষ। বন্ধু, তোমার কি আজকাল মনুষ্যে সর্পভ্রম হচ্ছে? মানুষ যুক্তি দিয়া কয়। যৌক্তিকতার মইধ্যে ফালায়া কয়।
শশ : আরে, রাখো তোমার যুক্তি আর মুক্তি। মানুষ কি খেলোয়াড় হোসেন যুক্তিবাদী হইছে [?] যে, যুক্তি দিয়া আমার মুক্তি কাইড়া নিবার চায়?
শিয়াল : আরে, আগে শুনবা-তো নাকি? এইনা তুমি মন সাদা-করার গান গাইলা। আমার মতো হুক্কাহুয়া-গাওয়া শিয়ালরে দিয়াও এত সুন্দর সাদামনের গান গাওয়াইয়া নিলা!
শশ : [চোখ মুছতে মুছতে] আচ্ছা, বলো।
শিয়াল : মানুষ বলাবলি করে, গল্প করে যে, তুমি দৌঁড়-প্রতিযোগিতার সময় অলস-কচ্ছপকে অবহেলা করেছিলে। অনেকদূর এগিয়ে গিয়ে, প্রায় সীমানার কাছাকাছি গিয়েও দৃষ্টিসীমায় কচ্ছপকে না-দেখে ভেবেছিলে একটু জিরিয়ে নেই। কিন্তু কিঞ্চিতাধিক ক্লান্ত থাকায় তোমার ঘুম ভাঙ্গে কচ্ছপের লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর। এই জন্যে তুমি প্রতিযোগিতায় হেরেছিলে।
শশ : আমি? আমি শশব্যস্ত খরগোশ, দৌঁড় প্রতিযোগিতা করতে নাইমা ঘুমাইয়া গেছিলাম? আর এই ফাঁকে কাইটঠ্যা কচ্ছপ ফার্স্ট হয়া গেছেগা? খাইজানি প্যাঁচাল পাড়ো? আইচ্ছা তুমি আইজক্যা নদীর পারে কাঁকড়া ধরবার যায়া গাঞ্জার আসরে বইছিলা নাকি? কল্কিতে টান দিছিলা?
শিয়াল : না। ক্যান?
শশ : নাইলে গাঞ্জাখুরি গপ্পো করো ক্যান?
শিয়াল : আগেই কইছিলাম, উচিত কথায় বন্ধু বেজার। তুমি সমালোচনা এক-কান দিয়া ঢুকায়া অন্য-কান দিয়া বাইর কইরাও দিবা না, আবার আহাজারিও করবা?
শশ : হাজার হলেও মানুষ তো, থুক্কু শশ তো। তাই সমালচনায় একটু শশব্যস্ত হই।
শিয়াল : বাদ দেও। এখন বলো, এই সমালোচনায় কী শিখলা?
শশ : কী আর শিখমু? শিখলাম, প্রতিযোগিতায় নামলে ঘুমান তো দূরে থাক, থামারও কোনো টাইম নাই। তাই প্রতিযোগিতা ভালো নয়। মানুষ ঠিকই কয়। টাইম ইজ মানি। টাইম ইজ ফুলকপি। টাইম ইজ বাঁধাকপি। টাইম ইজ গাজর-মূলা। টাইম ইজ ঘাস।
শিয়াল : দ্যাখো কাণ্ড, আমি শিয়ালপণ্ডিত হইলেও এই সত্যের মতো বানোয়াট গপ্পোটা আগে জানার পরেও এর মধ্যে কী শিক্ষণীয় আছে তা তুই না-কইলে কস্মিমকালেও জানতাম না, বুঝতামও না।
শশ : সমালোচনার শিক্ষাটা ভালোই,কিন্তু আমিতো আমি, আমার চৌদ্দ গুষ্টি, থুক্কু চৌদ্দ হাজার আলোকবর্ষ গুষ্টিরও কেউ কাছিমের গুষ্টির কাছে দৌঁড়-প্রতিযোগিতায় হারে নাই।
শিয়াল : [স্বগত] সবাই ‘সালিশ মানি কিন্তু তালগাছটা আমার’ বলতে চায়।
শশ : কী? কিছু কইলি? মনে হয় কিছু শুনলাম।
শিয়াল : ঠিক আছে, যা হবার হয়া গেছে, মন খারাপ করিস না।
শশ : কী ঠিক আছে? [চোখ মুছতে মুছতে] এত বড় অপবাদ!
শিয়াল : দাঁড়া, এখনই তোর মন ভালো-করে দিচ্ছি।
শশ : না, আমি তোর মন-ভালো-করা নেব না।
শিয়াল : অভিমান করিস না। অভিমানী হওয়া ভালো নয়। আমি তোকে সেদ্ধ-ভাষায় বলছি, অভিমান করিস না। চোখ মোছ।
শশ : রাখ তোর সেদ্ধ-ভাষা। আমি তোর চেয়ে ডাবল-ডাবল শুদ্ধ ভাষা জানি। মানলে তালগাছ না মানলে বালগাছ। কী অসম্মানটা করেছে আমার!
শিয়াল : শোন শশ, লক্ষ্মী সোনা শশ, [শশ শিয়ালের সান্ত¦নার হাত সরিয়ে দেয়] শোন, এখন কাইটঠ্যার বোকামি নিয়ে মানুষের বলা যে-কিচ্ছাটা কমু তা শুনলে তুই অ্যাস্টোনিস্ট হয়া যাবি।
শশ : কাইটঠ্যার বোকামি?
শিয়াল : হ।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : হ।
শশ : আবার একমুখে দুইকথা?
শিয়াল : হ।
শশ : ঘুরায়া-ফিরায়া দুইজনেরই দুর্নাম?
শিয়াল : তা তুই যে-ব্যাখ্যাই করিস-না ক্যান? মাইনষে যা দিছে-না কাইটঠ্যারে।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : শুনবি?
শশ : না-রে। কারণ নিজের সমালোচনা শুনতেই যদি এত কষ্ট, তাইলে তো সবারই নিজের সমালোচনা শুনতে কষ্ট হয়। তার উপর যদি দাগা-দেয়া দুর্দান্ত-দুর্নাম হয় তাহলে তো কথাই নাই। গিবত করা এবং গিবত শোনা নাকি মরা ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমান। সহি হাদিস। নারে বাদ দে। তার উপর কাইটঠ্যা এখনও মরে নাই। রীতিমতো জিন্দালাশ। একেবারে কাঁচা খাওয়া তো আরও খারাপ। নারে…
শিয়াল : না-শুনলি। না-শুনলে আমার কিসের ঠ্যাকা? আমারে কি গিবতকারী পাইছস? তবে এই কিচ্ছা শুনলেই জানা যাবে কাইটঠ্যার পিঠের খোলাটা খাপড়ার মতো পার্ট-পার্ট ক্যান?
শশ : কছ কী? আমার কিন্তু কিঞ্চিৎ কৌতূহল মার্ক হইতাছে।
শিয়াল : তাইলে শুনবি?
শশ : ক’বি? ক’।
শিয়াল : কী আর কমু রে? শালার কাইটঠ্যার গাধামি, বাগেন্দ্রিয় না-সম্ভবে।
শশ : ঐ সব মারফতি কথা রাখ। কইলে তাড়াতাড়ি ক’।
শিয়াল : কী আর কমু? শালা, কোনোদিন আমাগর কাছে কোনো আবদার করে না, আমরা হইলাম ক্লোজফ্রেন্ড, জানেদোস্ত, আর শালা কোনকার-কোন মরা নদীর হাঁস; কতায় কয়না, নালিতা খ্যাতে বিয়াইছে গাই, সেই সুবাদে তালতো ভাই; সেই হাঁস ভাইরেও নাকি কইছিলো, অর খুব আসমানে উড়ার শখ।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কী আর কমু? ঐ হাঁসা আর হাঁসি অরে একটা কাঠির মাঝখানে কামুড় দিয়া ধরায়া দুইজনে দুই পাশে কামুড় দিয়া ধইরা দিছে অগমপারে উড়াল।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কী আর কমু? অরাও তো খারাপ না। শখের তোলা আশি টেকা। শালার রাশিই খারাপ। শালা, নাম্বার ওয়ান কুত্তারাশি।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কী আর কমু? মেঘের দেশে বেগে ছুটছে তাঁরা।
শশ : তারপরে?
শিয়াল : কী আর কমু? কপালের লিখন না যায় খÐন।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কী আর কমু? শালার পুংটা-পুলাপান তো তামশা দেইখা ফালাইছে।
শশ : তারপরে?
শিয়াল : পড়বি তো পড় মালির ঘাঁড়ে, দেখছে-তো-দেখছে কাইটঠ্যারে মাটিতে ফালানির ফন্দিও আঁইটা ফালাইছে।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : আমি কী আর কমু? কইলো তো পুংটা-পুলারা আর স্বয়ং কাইটঠ্যা।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কী আর কমু? যেই পুংটা-পুলারা জিগাইছে, ঐ কাইটঠ্যা তোর বাড়ি কই? অমনি কাইটঠ্যা কয়, পানির তলেও আছে থৈ।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : আর কওয়া-কওয়ি। শালা, কাইটঠ্যা একটা আস্ত রিয়াকশনিস্ট। শালা, নাম্বার ওয়ান প্রতিক্রিয়াশীল। কওয়াও শ্যাষ, পড়াও শ্যাষ। ধপাস।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : পড়বি তো পড়, এক্কেবারে শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে। সঙ্গে সঙ্গে অর বহু-সাধের পিঠের খোলা ভাইঙ্গা খান খান।
শশ : কছ কী? আহারে!
শিয়াল : জানে বেঁচেছে সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের পানিতে নামার কারণে। শালা, একটা উভচর।
শশ : কছ কী? তার মানে শালায় তলে তলে ক্রভচর হবার ধান্দায় আছিলো।
শিয়াল : কী আর কমু? মাইনষে কী সাধে কয়!
শশ : এইজন্যে মানুষ কাইটঠ্যার নামেই কাইটঠ্যামি কথাডা কয়?
শিয়াল : হ, রে, হ। শালায় একটা জীবন্ত কিংবদন্তি।
শশ : হ, রে। আমি একদিন অরে কইলাম, তর পুলাপান গুলার খবর কী?
শিয়াল : ও কী কয়?
শশ : কয়, অগো মায়ের [অভিনেত্রী হ’লে… অগো বাপের খবরই রাখি না…] খবরই রাখি না।
শিয়াল : কছ কী? আমরা তো তা-ও বিকাশ-টিকাশ করি?
শশ : নারে, ও একেবারে আলাদা ধাতুতে গড়া।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কয়, [অভিনেত্রী হ’লে…অগো বাপেই খোঁজ রাখে না আর তো মাছের মায়ের পুত্রশোক।] অগো মায়েই ডিম বালুতে ঢাইকা পলায়, আর আমি তো বাপ। কতায় কয়, মা মরলে বাপ তাওই। তাই, আমিও তাই। পৃথিবীতে কে কাহার?
শিয়াল : কছ কী?
শশ : আমি কইলাম, তগো ডিমতো সব শিকারী পাখিরা, গুঁইসাপেরা খায়, আর তরা পাহাড়া দেছ না ক্যান।
শিয়াল : ঠিকই কইছস রে।
শশ : কয় কি, জানস?
শিয়াল : কী কয়?
শশ : কয়, হায়াত-মউত-রিজিক-দৌলত-বিয়া সব আল্লার হাতে। খাইলে খাক, কয়টা খাবে? ভিন্নির পালের একপাল জন্ম দেই। খাইতে খাইতে যা থাকে, তাতেই সই।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কয়, একেবারে দায়িত্ব অবহেলা করি না আমরা। আমাগরে বউরা ডিম পাড়ার পরে ডিম বালু দিয়া ঢাইকা দেয়। আল্লার কি কাম, তার একটু পরেই জোয়ারের ঢেউ আসে, আর সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের সব বালু আগের মতো সমানে-সমান হয়া যায়। শালারা আর খুঁইজা পায় না। বাসাই চিনে না।
শিয়াল : কছ কী? রীতিমতো আল্লার সঙ্গে টাইমিং।
শশ : বাদ দে কাইঠ্যার কথা। তুই কী মনে করস তর খবর আমরা রাখি না?
শিয়াল : কছ কী?
শশ : হে, হে, হে। এটা তথ্য প্রযুক্তির যুগ। সবাই সবার হাঁড়ির খবর রাখে।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : তুই কী জানছ মানুষ তর সম্পর্কে কী কয়?
শিয়াল : কছ কী? মানুষরে আমি খুব ভয় পাই। শালারা মানুষ না। হয় ফেরেশতা, নয় না-খাস্তা। মিনাল জিন্নতে খান্নাস। এই ফেরেশতা এইনা-খাস্তা। সত্যি কইরা ক’,আসলেই কি কিছু কইছে? নাকি তুই বানিয়ে বানিয়ে বলবি এখন? তুই তো আবার গল্প বানাবার উস্তাদ। এই যে, ঐবার পাজি সিংহটাকে বানোয়াট-প্রতিদ্ব›দ্বী-কুয়োর-সিংহের গল্প ব’লে ওকে কুয়োর ভিতরে ফেলে মেরেছিলি। সে-রকম কিছু? ঐ অবদানের জন্য আমরা কিন্তু তোর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
শশ : কী ব্যাপার? ব্যাপার কী? রীতিমতো সোবার হয়া উঠলা! নিজের কাছায় টান-খাওয়ার সম্ভাবনাতেই এতটা সাবধানতা! ব্যাপার কী?
শিয়াল : বলিস কী? এটা কি তবে রীতিমতো কাছায় টান-খাবার মতো কোন লুকানো কুকর্ম নাকি? মনেও তো পড়ছে না।
শশ : মনে করো, মনে করো।
শিয়াল : নারে, একেবারেই মনে করতে পারছি না। কতজনের কত সর্বনাশই তো করেছি, কিন্তু মনে রেখেছি কয়টা?
শশ : হ্যাঁ,সবাই সুনামেরটুকুই মনে রাখে এবং অন্যকে মনে করাতে চায়।আর ভুলে যেতে চায় সব র্দুনামের দগদগে ঘা-গুলি এবং ভুলিয়েও দিতে চায় সাবাইকে। মনে করো, মনে করো।
শিয়াল : কী করেছি? কী করেছি?কী করেছি?না, বন্ধু বেমালুম ভুলে গেছি। বলো তো।
শশ : কুমিরের কথা কি তোমার কিছুই মনে নেই?
শিয়াল : ও, ঐ বোকা-ছদ্মবেশী কুমির?
শশ : কেন-তুমি ওকে ধানের গোঁড়া আর আখের আগা দিয়ে নিজে ধানের আগা আর আখের গোঁড়া নিয়ে এইভাবে ঠকালে? বন্ধুই যখন ভেবেছিল সে, তখন সমান-ভাগ করলেই পারতে।
শিয়াল : সে তো আমার রীতিমতো সান্ধ্যভোজে বাধা দিচ্ছিলো। কাঁকড়া খেতে গেলেই পাকড়াও করতে চাইতো আমাকে।
শশ : কিন্তু পরে তো বন্ধু ভেবেছিল আর তাই তো তোমার সঙ্গে কৃষিকাজ করতে চাইলো।
শিয়াল : কিন্তু সে বুদ্ধিহীন হবার পরেও প্রতি পদক্ষেপেই আমাকে খেয়ে ফেলতে আসতো। আর-খালি গায়ের জোর দেখাতো, চোয়ালের জোর দেখাতো। শালা, আসলে ছিল আস্ত একটা ইন্টেলেকচোয়াল। তাই, আমার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের ন্যায্যতা বোঝাতেই এই বিকল্প-ব্যবস্থা।
শশ : কিন্তু তুমি একবারও হারতে পারলে না কেন?
শিয়াল : কেননা, সে শুধু জিততেই চাচ্ছিলো। সমান-সমান নিতে এবং দিতে চাচ্ছিলো না। যেহেতু আমি সমান-সমান দেয়া নেয়ায় বিশ্বাসী ছিলাম, তাই পুরোটাই বুদ্ধিবলে পেয়ে গেলাম।
শশ : কিন্তু কী ক্ষতি করেছিল কুমিরের বাচ্চাগুলি? তাদের তো পড়তে পাঠানো হয়েছিল তোমার কাছে এবং তাঁরাও তো পড়তেই চেয়েছিল।
শিয়াল : শোনো, আসলে বাস্তবতা ভিন্ন। বাইরে থেকে গর্তের ভিতরে কিছু দেখা অসম্ভব। ঐ বাচ্চারা ঠিক কুমিরেরই স্বভাবের। তাঁরা প্রত্যেকে মূর্খ এবং আগ্রাসী। তাঁরা পড়া বুঝতে পারতো না, বুঝতে চাইতোও না এবং ধমক দিলে এবং উপদেশ দিলে মানতো না। বরং চোয়াল বের ক’রে কামড়াতে আসতো। তাই, কানা-কানা-ঘানা-ঘানা কেমন লাগে কুমির ছানা, বলতে বলতে সকলকে সাবাড় করে দিয়েছিলাম।
শশ : কিন্তু তুমি নিষ্ঠুরভাবে একটি কুমিরের বাচ্চাকে দশবার দেখিয়েছিলে কেন? কেননা, ওটিকে সাবাড় করার পর তো তোমাকে পালাতেই হয়েছিল?
শিয়াল : যে কিনা নিজের বাচ্চাকেও মনে রাখতে পারে না, তাঁর তো অন্তত এই শিক্ষাই আগে হওয়া উচিত যে, একজনের কোন্ সন্তান কেমন? কারণ, প্রতিটি ধাপেই তাঁকে আমি নতুন-কিছু শেখাচ্ছিলাম।
শশ : কিন্তু তুমি তো নদী পার-হবার সময় কুমিরের চোয়ালে আটকাই পড়েছিলে।
শিয়াল : সে কথা আর বোলো না। তাই তো বাধ্য হয়ে বলেছিলাম, লাঠি ছেড়ে ঠ্যাং ধরো। কামড়ের কষ্ট দাঁতে-দাঁত চাইপা সহ্য-কইরাই কইছিলাম রে দোস্ত। আর শালা তো আমারে দোস্ত না, গোস্ত ভাবছিলো রে, গোস্ত ভাবছিলো।
শশ : তাইলে যে কইলা মনে নাই?
শিয়াল : তুমি অর্ধেক কইলা আর আর্ধেকটা মনে করাইলা। আমরা হইলাম আধা-গস্পেলের গর্বকারী। একপাশ না-দেখেই অন্যপাশের অবস্থা-বুঝে-ব্যবস্থা নেই।
শশ : হ, বন্ধু, ঠিকই কইছো, কোনো কিছুর একপাশ দেইখা সিদ্ধান্ত নেওন ঠিক না। তা কয়েন হোক, লুডুর ছক্কা হোক কিংবা বুক কিংবা পিঠ। [হঠাৎ হুক্কা-হুয়া, হুক্কা-হুয়া রব ওঠে এবং শিয়াল সহসা-সচকিত হয়।]
শশ : তোমাদের এই এক তরিকা। কেউ হুক্কা-হুয়া বললে একে একে সবাই হুক্কা-হুয়া ব’লে সাড়া দেয়। কী ইউনিটি রে বাবা! [বলতে বলতেই শিয়াল তর্জনী ঠোঁটে চেপে শশ-কে চুপ করতে বলে এবং ঘাড় উঁচিয়ে…]।
শিয়াল : হুক্কা-হুয়া, হুক্কা-হুয়া, হুক্কা-হুয়া, হু হু হু …।
শশ : হইছে হইছে থাম। পিরিত এক্কেবারে উথলায়া উঠছে। এক্কেবারে থামতেই মন চায় না। যাওনা ক্যান? অগো মেসবাড়িতে গিয়া উঠলেই পারো।
শিয়াল : একটু দিলাম আর কি। পুরানো অভ্যাস তো তাই।
শশ : পুরানো অভ্যাস, না, পুরানা খাছিলত। কথায় কয় না, স্বভাব যায় না ধুইলে আর খাছলত যায় না মইলে।
শিয়াল : হ, ঠিকই কইছো, মনডায় কয়, এক্কেরে জানডা দিয়া দেই।
শশ : না,না,। অত কইও না। অত জান দেওয়া লোক তুমি না।
শিয়াল : কও কী। এতবড় অস্বীকৃতি? আমার স্বজাতিকে কি আমি পরস্পরের পিঠে উঠে কাঁঠাল পেড়ে খাওয়া শিখাই নাই?
শশ : তা হয়তো শিখাইছো, কিন্তু তোমার এই একতরফা শিক্ষণের জন্যই তো তোমাকে মানুষেরা বলে, লেজকাটা শিয়াল।
শিয়াল : তো কী করতে পারতাম আমি? ফাঁদে প’ড়ে লেজ কাটা যাওয়ার পর কেউ আমাকে আর চিনতেই চাইছিল না। তাই, নিজেকে শেয়াল দেবতা ‘আনুবিস’ হিসবে জাহির করা ছাড়া, আমার আর অন্য গত্যন্তর ছিলো না।
শশ : তাই ব’লে স্বজাতির সঙ্গে ধাপ্পাবাজি?
শিয়াল : না, ধাপ্পাবাজি নয়, বরং নিজেকে হারিয়ে ফেলে পুনরায় ফিওে পাবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।
শশ : কিন্তু মানুষেরা বরাবর তোমাকে বন্ধু-বেঈমান হিসেবেই দেখতে পায়, দেখায় এবং দেখাবে।
শিয়াল : কেন? কেন? আমি কি মাইনষের পাকা ধানে মই দিছি? নাকি ভিটায় ঘুঘু চড়িয়েছি?
শশ : তা তুমি করো নাই ঠিকই, কিন্তু বন্ধুত্বের অবমাননা করা তোমার মজ্জাগত ব্যাপার।
শিয়াল : কেন? কী করলাম আবার?
শশ : কেন আবার? তুমি কি ভাবো, আমরা তোমার তথ্য রাখি না? বকের সঙ্গে ঠগের মতো আচরণের কাহিনি কে না জানে?
শিয়াল : দ্যাখো বন্ধু, পুরানা কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নাই। আর আগেই কইছি, অর্ধসত্য জানো শুধু তোমরা। তোমাদের শুধু একপিঠের পাঠশালা। উই হ্যাভ টু রিড বোথ দ্য কয়েন সাইড। অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও মন্দ।
শশ : কেন? বাকি অর্ধেক আবার কী?
শিয়াল : এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে। বাকি অর্ধেক আবার কী? তোমরা জানো শুধু জাহিরি, বাতিনিটুকু জানোও না, জানতে চাও-ও না।
শশ : কেন? কী হয়েছিল?
শিয়াল : না, শোনার দরকার নাই। যারা একপাক্ষিক ভাবে পূর্বানুমানের ভিত্তিতে আগে থেকেই শুধু আমাকেই দোষী ধ’রে নিয়ে গল্প সাজায়, তাদের ব’লেই কী ফল? কী লাভ?
শশ : ক’ না দোস্ত, আসলে কী হইছিল? [শিয়াল ঝটকা মেরে খরগোশের হাত সরায়।]
শিয়াল : না, সর, বাদ-দে ঐ সব প্যাঁচাল।
শশ : আরে দোস্ত, রাগ করছ ক্যান? তুইই না কছ, অভিমানী হওয়া ভালো না। আবার তুইই…।
শিয়াল : আরে ভাই, ঐ শালা, বকাসুর, মিছামিছি দাওয়াত দিছিলো আমারে, ব্যাপক গিয়ার, বাঘের গলার হাড় বের করার পর থেকে ওর লেজে পাড়া দেওয়ার জো ছিলো না…।
শশ : ভাইঙ্গা ক-না, কী ব্যাপার?
শিয়াল : আরে ভাই, এইটা কোনো লাঞ্চ কিংবা ডিনারের ব্যাপার না। রীতিমতো ফিস্ট। তাও যেনতেন ফিস্ট না। রীতিমতো কাঁকড়াভোজের নিমন্ত্রণ। আর জানিসই তো, কাঁকড়াদের সঙ্গে আমার শক্রতা কত পুরানো।
শশ : আচ্ছা, বাই-দ্য-বাই, বলতো কাঁকড়াদের সঙ্গে তোর যেন কী হয়েছিল? তারপরে বকাসুরের ব্যাপারটা বলিস না হয়।
শিয়াল : কছ কী? এতবড় ওয়ার্ল্ড ফেমাস ব্যাপার তুই জানছ না?
শশ : বল না দোস্ত, বল।
শিয়াল : আরে আমি তো কস্মিনকালেও কাঁকড়া খাইতাম না। গেছি নদীর ধারে পানি খাইতে। মরা মুরগি খাইয়া গলা গেছিলো শুকায়া। তো সবেমাত্র জিবলাডা পানিতে ভিজাইছি কি ভিজাই নাই, মনে হয় শইলডা শক খাইলো। আর অটোমেটিক লেঞ্জাডা দিলাম মাটিতে বাড়ি। তারপরে তাকায়া দেখি, আধমরা কাঁকড়া। রাগে-দুঃখে শালারে খাইলাম। আরে ভাই কী কমু, কাঁকড়ার সুস্বাদ অচিন্ত্যনীয়!
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কী আর কমু? সেই যে কাঁকড়া-খাওয়া শিখলাম, আর তারপর আবিষ্কার করলাম, গর্তে লেজ ঢুকায়া নিজেরে খাইতে দিয়া খাওয়ার নিজস্ব কৌশল।
শশ : ও, এই ব্যাপার। বুঝেছি। এবার বকের ব্যাপারটা বলতো দোস্ত।
শিয়াল : ঐ শালা আমারে কাঁকড়া ফিস্টের দাওয়াত দিয়া, বোজজস তো দোস্ত? অন্য কিছু না, যেনতেন না, রীতিমতো কাঁকড়া ফিস্টের দাওয়াত দিয়া আমারে খাইতে দিলো কলসীর ভিতরে রাখা কাঁকড়া। নিজের তো চিকন গলা। মনের সুখে কাঁকড়া ধরে আর খায়। আর আমি খালি লালা ফেলি।
শশ : ও, এইজন্যে তুমি বকেরে চ্যাপ্টা থালায় কাঁকড়া খাইতে দিয়া ঘৃণাতিথ্য করছিলা? হোয়াট অ্যা হেইট হোস্টালিটি। হোয়াট অ্যা কাউন্টার হিস্ট্রি অ্যাকজেক্টলি।
শিয়াল : হ,রে দোস্ত। টিট ফর ট্যাট। ইট মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। তাই, সাবধান থাকতে হয়। কারণ, বাইচান্সের কোনো লাইসেন্স নাই। সাবধানের মাইর নাই।
শশ : থাক বন্ধু, ভুইলা যাও, গতস্য শোচনা নাস্তি, প্রতিহিংসা ভালো নয়।
শিয়াল : তুমি তো কবাই। ভুইলা যাও। কিন্তু আমি যে বারবার মরতে মরতে জিতে ফিরি, তা শুধু আল্লা মালুম। মাইনষে তো আমারে পাজি, ধূর্ত ব’লেই খালাশ। আর এদিকে আমার সাড়ে সর্বনাশ। শিয়ালপণ্ডিত, না ঘোড়ার ডিম। ঐ যে, ঐ বার রাজার মরা হাতির মাংস খেতে খেতে পেটের ভিতরে ঢুকে আটকা পড়লাম, সেইবার গায়েবি আওয়াজের নাটকটা না করলে পণ্ডিতের সবই পণ্ড হ’তো। তখন পাঠশালার পড়–য়ারা পণ্ডিতের ব্যাসবাক্য করতো, ‘সব কিছু পণ্ড হইছে যাঁর’ এবং সমাসের নাম লিখতো, ‘মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি’। সবকিছুরই প্রাক-ইতিহাস আছে বন্ধু, প্রাক-ইতিহাস। শাক-ইতিহাস দিয়ে সবাই শুধু ঢেকে দিতে চায় সব সত্য।
শশ : শাক-ইতিহাস কী দোস্ত?
শিয়াল : ঐ যে বলে না, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। ঐ আর কি?
শশ : তার মানে, মানুষ তোমার ইতিহাস শুধু খণ্ডিত করে?
শিয়াল : শুধু আমার কেন? তোমার-আমার-আমাদের সবার ইতিহাসই মানুষ খণ্ডিত করে। এমন কি মানুষ মানুষের ইতিহাসও খণ্ডিত করে। মানুষ কয়, ইতিহাস নাকি শুধু ক্ষমতাবানের পক্ষের রচনা। যে ক্ষমতায় থাকে, তাঁরই পক্ষে ইতিহাস লেখা হয়।
শশ : তাইলে কি আমরা সবাই ধুলারও যোগ্য না?
শিয়াল : শুধু আমরা কেন? মানুষ তাঁর প্রতিপক্ষ অন্যমানুষদেরও ধুলায় মিশিয়ে দেয়, তারপর প্রতিদিন সেই ধুলা ঝাঁট দিয়ে ফেলে দেয়।
শশ : বন্ধু, আমি ধুলারও ইতিহাস চাই। কেউ যেন বাদ না পড়ে। চলো, আমরা মনের ধুলা পরিষ্কারের গান গাই। [দু’জনে গান ধরে।]

ঝাঁট দিয়ে ফেলবে কোথায় ধরার ধূলি?
ফেললেই কোথায়-বা যাবে সেগুলি?

এখানে ক’মে গেলে ওখানে জমে
এখানে জমে গেলে ওখানে কমে
ঝাড়তে ঝাড়তে বিভ্রমে
দ্বিধায় দুলি।।

ফেললেই কোথায়-বা যাবে সেগুলি?

নিজের শরীর থেকে খসা চামড়া
তাই দিয়ে ধূলিঝড় তুলি আমরা।।

নিজেকে নিজেই ঘৃণা
শুধু শুধু করি কিনা?
সেটাই তো বুঝছি না
কেমন ঠুলি?

ফেললেই কোথায়-বা যাবে সেগুলি?

এসো জড়াজড়ি ক’রে বাঁচি
গলাগলি ধ’রে নাচি
বিভেদ ভুলি ।।
ফেললেই কোথায়-বা যাবে সেগুলি?

শিয়াল : গান গেয়ে আর সুরে নেয়ে আর তোমার সঙ্গে নেচে নেচে আমার মন ভালো হয়ে গেছে। দ্যাখো, চারপাশে কেমন থৈ থৈ জোছনা। তুমি কি জানো, চাঁদের আরেক নাম শশাঙ্ক?
শশ : না-তো। তোমার কাছেই প্রথম শুনলাম।
শিয়াল : শশাঙ্ক কেন, তা-কি জানো?
শশ : না-তো। বলো তো শুনি।
শিয়াল : ‘শশাঙ্ক’ শব্দের ব্যাসবাক্য হলো, শশের অঙ্ক অর্থ্যাৎ তুমি হলে পূর্র্ণিমার মতো অর্থ্যাৎ পূর্ণিমা হলো তোমার মতো।
শশ : কছ কী? তুই-তো দেখি আমারে বাঁশ দিয়া চান্দে পাঠায়া দিলি। শালা, বন্ধু-বেঈমান এতদিন কছনাই ক্যালা? আমার দিমাগে চেরাগ জ্বইলা উঠবো, এল্লাই কছ নাই?
শিয়াল : খুশিতে দেখি তুই খাস ঢাকাইয়া হয়া গেলি। তাইলে শোন, শশাঙ্ক ছাড়াও চাঁদের আরেক নাম ‘শশধর’।
শশ : হায়! হায়! এতো দেখি একেবারে ডাইরেক্ট এ্যাকশন। অ্যাকশন-অ্যাকশন জোছনার ফ্র্যাকশন।
শিয়াল : চল, একটু জোছনা-বিহার ক’রে আসি।
শশ : চল, কিছু মশলাপাতিও কিনে আনি, জোছনাও দেখে আসি।
শিয়াল : ঠিক কইছস, কাঁচা আর কাহাতক খাওয়া যায়। কাঁচা খাইতে খাইতে পেটে একদম চরা প’ড়ে গেল।
শশ : ঠিক কইছস, আমরা সিভিলাইজড হইতে চাই।
শিয়াল : দেখি, ততক্ষণে নবাবজাদার ঘুম ভাঙ্গে কিনা?
শশ : চল্। [শিয়াল এবং শশ আবার পায়চারি শুরু করে।]
শিয়াল : নে শালা, জন্মের ঘুম ঘুমাইয়া নে।
শশ : আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা \ [এদিকে কচ্ছপ ঘুমের ভিতর এপাশ-ওপাশ করে এবং বায়ু ত্যাগ করে এবং বালিশ উল্টে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।]
শিয়াল : দেখেছিস! শালা মনে হয় ঘুমের ভিতর স্বপ্নেও আবার আরেক ঘুমের আয়োজন করছে।
শশ : হ’রে। ঘুমের ভিতরে ঘুমকৌটা, তার ভিতরে ঘুম, তারও ভিতরে ঘুমকৌটা, কৌটার ভিতরে কৌটা, তারও ভিতরে ঘুমঘুম কৌটা…।
শিয়াল : বাড়িঅলা কিন্তু রাতে বের হওয়া পছন্দ করে না। কিন্তু কী করবো? আমি তো বরাবরই নিশাচর।
শশ : তোর সঙ্গে থাকতে থাকতে আমিও তো নৈশচারীই হয়ে উঠলাম। তার উপর তুই শশাঙ্ক, শশধরের যে কাহিনি কইলি, তাতে তো এমন জোছনায় ঘরে থাকা রীতিমতো বেআইনি।
শিয়াল : খালি বেআইনি? এমন জোছনায় ঘরে থাকা রীতিমতো হারাম।
শশ : কিন্তু সব বাড়িঅলারা ভাবছে, আমরা রাতে বের হয়ে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, তার প্রচার চালাচ্ছি। আলাভোলাদের রিক্রুট করছি।
শিয়াল : করিই তো। করমু না ক্যান? সামনের মাস থেকে মাথাপিছু পাঁচশো টাকা বেশি দিতে হবে। আমরা তাদের জন্য গ্যাস বিল বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন করলাম, গ্যাসবিল পানিরবিল সরকার বাড়ালো না, তারপরও তারা বাড়িভাড়া অযথা বাড়িয়ে দিলো। এরপরও কি চুপ থাকা যায়। মৌনং সম্মতিং লক্ষণাং।
শশ : কাইটঠ্যা তো এ-ব্যাপারে কিছুই করে না। কিছু বলেও না।
শিয়াল : শালার কতা বাদ দে। শালা কয়, ও নাকি আটলান্টিক পাড়ি দেয়া লোক। ছোটখাটো ব্যাপারে নাক গলানোর লোক না।
শশ : আমারেও কইছে। কয়, তুই আছিস, শিয়াল পণ্ডিত আছে, আমার আর আলাদাভাবে থাকার কী দরকার? তোদের থাকাতেই আমার থাকা। শালা, নাম্বার ওয়ান ফানাবাদী-বাকাবাদী।
শিয়াল : তুই কইতে পারলি না, তাইলে তোর খাওয়াগুলি আমরা খেয়ে দেই। আমাদের খাওয়াতেই তোর খাওয়া হবে।
শশ : না রে। টুথপেস্ট-সাবান কিনতে বলাতেই যা-বললো।
শিয়াল : কী কয় রে শালা?
শশ : কয়, খালি আমি-আমি, আমার-আমার করা ভালো না। সবই নাকি সবার। কয়, দেব সাধ্যমতো, নেব প্রয়োজন মতো।
শিয়াল : ও। শালা তাই সাধ্যমতো ঘুমায় আর খায়।
শশ : না রে। সবাই বলে, ওর নাকি অনেক অবদান। শালা নাকি পুরো পৃথিবীকে বাঁচতে শেখায়।
শিয়াল : ও। তারমানে শালা একটা অবদানব। কথায় বলে, নিজে বাঁচলে বাপের নাম। বাপ বাঁচলে কার নাম?
শশ : বাদ দে। চল। তাড়াতাড়ি চল। পা চালা। নিশ্চিত গেট বন্ধ হয়ে গেছে। আন্দোলনের আগে থেকেই মেইন গেটের চাবি দেয়া বন্ধ। উপর থেকে যদি বাড়িঅলার ভালো পরি মেয়েটা চাবি না ফেলে দেয় তবে আজ বাসার বাইরেই রাত কাটাতে হবে।
শিয়াল : মেইন গেইট খুললেই কী? ভিতরের গেট খোলার জন্য তো ঐ খোলখাপড়া কাইটঠ্যাকে তোয়াজ করতে হবে।
শশ : চল, চল। পা চালা। অজান্তেই জোছনাগ্রস্ত হয়ে অনেকদূর চলে এসেছি। ভাগ্যিস আগেই জিনিসগুলো কিনেছিলাম।
শিয়াল : তোর সঙ্গে সমান-তালে-চলা খুব কঠিন। এত দ্রুত হাঁটিস কীভাবে?
শশ : তুই তো মুরগি [অভিনেত্রী হ’লে…মোরগা নিয়ে] পালানোর সময় ব্যাপক পারছ।
শিয়াল : হে হে হে। হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া হু হু হু। [দু’জনে মেইন গেইটে নক করে।]
শশ : ওরা ভাবছে, আমরা লেট-নাইট ক’রে ফিরলাম।
শিয়াল : ভাগ্যিস এই শহরে লেট-নাইটের কনসেপ্ট আছে। [ঝুমঝুম ঝুপ-শব্দে চাবির গোছাপড়ে।]
শশ : আহা! যেন জান্নাত হ’তে ফ্যালে হুরী রাশরাশ ফুল [অভিনেত্রী হ’লে… জাননাত হ’তে ফ্যালে হুর রাশ রাশ ফুল…।]
শিয়াল : তাড়াতাড়ি ফুল কুড়া। আমার হাত বন্ধ। [খরগোশ শশব্যস্ত চাবি কুড়ায় এবং ততোধিক শশব্যস্ত তালা খোলে এবং চাবির গোছা দারোয়ানের রুমের জানালা দিয়ে ফেলে দেয়।]
শশ : আহারে! দারোয়ান পোলাটা পাশবালিশ জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে।
শিয়াল : বাদ দে। আমগর তো পাশবালিশও নাই। আমরা হলাম বিবাহিত-ব্যাচেলর। একরুমে থাকি তিনজন। বৌ [অভিনেত্রী হ’লে…হাজবেন্ড এলে…] এলে থাকবে কোথায়?
শশ : ভাই খোল-খাপড়া ওয়ার্ড, ভাই কাশিমপুর কারাগার, ভাই কাছিম, খোলো খোলো দ্বার, রাখিও না আর, বাহিরে আমাদের দাঁড়িয়ে…।
শিয়াল : শালা কাইটঠ্যা খোল্ তাড়াতাড়ি। ব্যথায় হাত-পা টনটন করছে। এত বোঝা হাতে-নিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়? [কচ্ছপ ঘুমের ঘোরে চাবি হাতে হাঁটতে হাঁটতে আসে। ঘুমের ঘোরে সঠিক-চাবি আর খুঁজে পায় না।]
শশ : একটু তাকিয়ে দ্যাখ। একটু চোখটা ম্যাল।
কচ্ছপ : এই নে চাবি। বাইরে থেকে খুলে ভিতরে আয়। [ব’লেই চাবিটা খরগোশের হাতে গছিয়ে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।]
শিয়াল : শালার ডুপ্লিকেট চাবিতে সহজে খুলছে নারে।
শশ : দাঁড়া, একটু তেল মারি। হায়! হায়! ভুলে তো তেলই আনা হয় নাই। এখন?
শিয়াল : সব দোষ তোর। ঐ অন্দোলনকারী নেতাদের অতিরিক্ত তেল মারতে গিয়ে তুই কাঁকড়াভাজা খাওয়ার তেলের কথাই ভুলে গেলি? [শিয়াল মৃদুস্বরে গান ধরে।]
শিয়াল : যাহা কিছু প্রিয় মম, সকলই নিও হে স্বামী… স্বা-আ- আমি…আমি?
শশ : তুই না তো কে? খুল যা সিম সিম… খুলেছে রে খুলেছে। তোর স্বামী, ডামি দিছে রে। চল আগে রেস্ট নেই। তারপরে অন্য আলাপ। [দু’জনে ঘরে ঢুকে গা এলিয়ে দেয়। কেনা জিনিসগুলো পাশেই প’ড়ে থাকে।]
শিয়াল : সারাটা রাত না খেয়ে থাকতে হবে রে।
শশ : খুব ক্ষুধা পেয়ে থাকলে ব্রাশ কর।
শিয়াল : আমি শিয়াল, পিয়াল বনে ঘুরি। আমি না খেয়ে ব্রাশ করবো?
শশ : শোন্। আমাদের ক্ষুধাকে সুধা দিয়ে জয় করতে হবে। আজ কোজাগরী রাত। তুই ব্রাশ ক’রে আয়। এই ফাঁকে আমি একটা মন পরিষ্কার করা ক্ষুধানাশী সুধার গান বাঁধি।
শিয়াল : র্ত যা-ইচ্ছা র্ক-গা আমি….আমি এখন কী করি? শালার থেরাপি ছাড়া তো মারা পড়বো। কী আর করা, না খেয়ে ব্রাশ-করা। [শশ এই ফাঁকে গান ধরে।]

শশ : ক্ষতি দিয়ে ধুলে ক্ষতি
ক্ষতির হীরামোতি জাগায় জ্যোতি
কোজাগরী রাত সোজা অতি ।
আহা! কোজাগরী রাত সোজা অতি ।।

আহা! পেয়েছি যা, তাইতো পেতে
জাগছে চরাচর রাত-বিরেতে
ডুবে গেছি আজ তট-তীরেতে
গানই গতি ।।
আহা! কোজাগরী রাত সোজা অতি ।।

লড়াই লেগেছে আলো-কালোর
ভুল পথে নেই, আমরা ভালোর।
আকাশটা আজ আলোর ঝালর
কে করবে কার কাছে নতি?
আহা! কোজাগরী রাত সোজা অতি ।।
গান দিয়ে আজ প্রাণকে ধুবো
নির্শয়নে আজকে শুবো
ঘুমুবো কি না-ঘুমুবো
জানবে কি আজ জ্যোৎন্সাবতী?
আহা! কোজাগরী রাত সোজা অতি ।।

শিয়াল : গান থামা। গান থামা তাড়াতাড়ি। মনে হয়, বাড়িঅলা তার মেয়ে জোছনাকে চাবি দেয়ার জন্য বেধড়ক গালাগালি করছে। রীতিমতো গর্বনাশপাতি হয়েছে আজ জোছনা।
শশ : আর কী কী বললো রে?
শিয়াল : বললো, কাইটঠ্যাকে বাড়িভাড়ার কথা বলতে এসে দেখেছে টয়লেট অপরিষ্কার।
শশ : ও হো, এ সপ্তাহে তো কাইটঠ্যার বাথরুম পরিষ্কার করার কথা ছিল। শালার তো নাই কাজ, নাই ছুটি অবস্থা।
শিয়াল : মনে হয় আজান দিচ্ছে। ঐ যে, আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম… শোনা যাচ্ছে।
শশ : শালার কাইটঠ্যারে দেখলে মনে হয়…।
শিয়াল : কীমনে হয়? শালার পাছায় খোঁচা দে।
শশ : না রে। এত স্বাদের ঘুম। এখন জাগালে আবার তেল আনতে বলার আগেই আবার নতুন ঘুমের বাজেট পেশ করবে।
শিয়াল : শালা খালি ঘুমের ঘাটতি বাজেট পেশ করে।
শশ : আসলেই শালা একটা ঘুমার্থমন্ত্রী।
শিয়াল : দ্যাখ, দ্যাখ, মনে হয় অহল্যার ঘুম ভাঙছে। ঘুমপাথর গ’লে যাচ্ছে ক্রমশ।
শশ : ওঠো, ওঠো রে, বিফলে প্রভাত যায়, ওঠো …। [কচ্ছপ খালি হাই তোলে। আর মোচড়ামুচড়ি করে। কিন্তু ওঠে না। বরং গ্যাস ছাড়ে।]
শিয়াল : দেখছস কাণ্ড!? শালা আমগরে মানুষ বইলাই মনে করে না। ঐ শালা, উঠবি? নাকি পানি ঢাইলা দিমু?
কচ্ছপ : সকালবেলাই কী শুরু করলি? জানছ না, আমি লেট-রাইজার?
শশ : শালা, তুই লেট-রাইজার? না, অলওয়েজ স্লিপার?
শিয়াল : গতকাল কই গেছিলি? রাস্তায়-রাস্তায় স্যান্ডেল ক্ষয় না করলে তো এত টায়ার্ড হওয়ার কথা না।
কচ্ছপ : স্যান্ডেল না-রে পা-ই ক্ষয় হওয়ার দশা।
শশ : কই গেছিলি রে?
কচ্ছপ : গতকাল বৃষ্টির পরে দেখলাম রাস্তাঘাটে পানি আর পানি। তাই সাঁতরাইতে মন চাইলো। তারপরে কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখলাম একটা গর্ত, অথৈ সুরঙ্গ। তাই ডুবসাঁতারও দিলাম। কালো-কালো-কাদা-মতো। কালো কিন্তু স্বাদ ভালো।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কছ কী? তারপরে?
শশ : দেখলাম, একটা জায়গায় কিছু মানুষ বালতি-দঁড়ি দিয়া কালো প্যাঁক-কাদাগুলা তুলতাছে।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কছ কী? তারপরে?
শিয়াল : তারপরে মাথা তুইলা দেখি, একটা ঘর থেইকা একজন সালা… সালা… কয়া গানে টান মারছে।
শশ : কছ কী?
শিয়াল : কছ কী? তারপরে?
শশ : গানের টানে, ঐ ঘরে গিয়া দেখি, সবাই আমার মতো উপুড় হয়, আবার উঠে-বসে-দাঁড়ায়। কিন্তু উপুড়ই হয় বেশি।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কছ কী? তারপরে?
কচ্ছপ : ওদের উপুড় হওয়া দেইখা ভাবলাম, ওরা আমার মতোই কাইটঠ্যা, হয়তো কাপড়-পরা অন্য-প্রজাতির কাইটঠ্যা।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কছ কী? তারপরে?
কচ্ছপ : আমিও অগো লগে উপুড় হইলাম। উঠলাম, বসলাম, দাঁড়াইলাম।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কছ কী? তারপরে?
কচ্ছপ : তারপরে আগের পথে, মাটির নিচের আটলান্টিক দিয়া সাঁতরাইয়া আইসা, আমগরে এই বাথরুমের কমোডের পরিষ্কার ঝকঝকা পানিতে ভাইসা উঠলাম। এইজন্যেই তো আমার গায়ে একফোঁটা ময়লাও নাই। দ্যাখ, কত পয়-পরিষ্কার আমি।
শিয়াল : কছ কী?
শশ : কছ কী? তাড়াতাড়ি গোসল র্ক।
কচ্ছপ : ক্যান? দুইবার গোসল করমু ক্যান? আমরা জাতিতে সদাস্নান। আমাদের আলাদা-গোসল লাগে না। গোসল করতে হয়, তোরা কর।
শিয়াল : আচ্ছা, মানলাম তোরা জাতিতে সদাস্নান, কিন্তু আমরাও সদাকর্মী। আমরা এখন নিশিক্লান্ত, কর্মক্লান্ত, জ্ঞানক্লান্ত। তাই দয়া ক’রে বাজার থেকে তেল নিয়ে আয়। কারণ, আমরা ক্ষুধাক্লান্ত আরো বেশি। আমরা তেল আনতে ভুলে গেছি।
শশ : আসলে তোরা ভুলু জাতি। আমরা কিন্তু জাতিস্মরও বটে।
শিয়াল : হ, তুই জাতিস্মর, সদাস্নান কাইটঠ্যা। এখন তেল এনে কাঁকড়া-ভাজির ব্যবস্থা করো।
শশ : তেল ছাড়া আমি গাজরের হালুয়াও খেতে পারছি না। লাইফ ইজ ফুলকপি, লাইফ ইজ বাঁধাকপি, লাইফ ইজ গাজরের হালুয়া টাইট…।
কচ্ছপ : আচ্ছা যাচ্ছি। [কচ্ছপ যাচ্ছি ব’লে তেলের বোতলটা নিয়ে কচ্ছপগতিতে আগায়। যেন এক-পা আগালে তিন-পা পিছায়। উল্টা পদক্ষেপ। শিয়াল এবং শশ দুইপাশ থেকে তাঁর দুই পাছায় লাথি দেয়।]
কচ্ছপ : এই ভাবে অপমান?
শিয়াল : না রে, প্রহারাদর করলাম।
শশ : হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্রহারাদর। [কচ্ছপ কোনমতে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে দরোজার বাইরে যায়। আড়াল হয়। কিন্তু কণ্ঠ শোনা যায়।]
কচ্ছপ : আমারে দিয়া খালি কাজ করায় । খালি খালি গাধার খাটনি খাটায়।
শিয়াল : গেলি তুই?
শশ : গেলি? নাকি আরো আদর দিবো?
কচ্ছপ : উচিত কথায় বন্ধু বেজার। উচিত কথার ভাত নাই এই পৃথিবীতে। আসলে সবাই কাইটঠ্যা। খালি খালি দুর্নাম হয় আমার।
শিয়াল : গেলি তুই?
শশ : গেলি? নাকি?
কচ্ছপ : সব মাছ গু খায়, ঘাইড়া মাছের নাম হয়।
শিয়াল : গেলি তুই?
শশ : গেলি? নাকি? মনে হয় গেছে।
শিয়াল : যাক, অবশেষে একটা কাজ হ’লেও করানো গেল।
শশ : ও এ-রকম কেন রে?
শিয়াল : গড নোউজ।
শশ : চল, ও আসতে আসতে আমরা দুইহাতে ম্যারেজ খেলি।
শিয়াল : চল, নাইকাজ তো খই ভাজ। [শশ শশব্যস্তে তাসের প্যাকেট বের করে। তাস বাটের আগে জোকার আলাদা ক’রে দর্শকদের দেখায়। তারপর কিরিচ মারে না। বরং তাস ভাগ ক’রে ম্যারেজ খেলার উপযোগী করে।]
শশ : দে, কেটে দে। [শিয়াল সশব্দে কেটে দেয়।]
শিয়াল : শালা যে কতক্ষণে আসবে কে জানে?
শশ : শালার তো আঠারো মাসে বছর [বলতে বলতে তাস দেয়। নিজের দিকে এবং শিয়ালের দিকে।]
শিয়াল : খিদায় পেট চোঁ চোঁ করতাছে।
শশ : তুই-তো-তাও রাতে ব্রাশ করছস। আমার পেট এখন জেটবিমান হবার দশা। পাকস্থলি এখন নিজেই নিজেকে পাক কইরা খাইতাছে।
শিয়াল : শালা, স্লো-গনজালেজ!
শশ : আমারে কছ স্প্রিডি-গনজালেজ আর কাইটঠ্যারে কছ স্লো-গনজালেজ। শালা, তুই ব্যাপক পারছ।
শিয়াল : শালার আইলশার সামনে তেমন কিছুই কইতে পারি না। শালা ব্যাপক রাশভারী!
শশ : শালা, কখন যে আসবে, আল্লাই জানে!
শিয়াল : ওকি কোথাও আবার ঘুমিয়ে পড়লো?
শশ : নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নাই।
শিয়াল : বিশ্বাসটা থাকে কীভাবে? কতক্ষণ কেটে গেল, তার হিসাব আছে?
কচ্ছপ : [স্বগত] শালারা, আমারে বিশ্বাসটাও করো না, না? তারপর দরজার ওপাশ-থেকে ঘরের ভিতর গলা বাড়িয়ে বিদ্রোহ-বিদ্রুপ-বিরোধিতার স্বরে বলে…] এত সমালোচনা করলে আমি কিন্তু বাজারে যাবো না।

[মধুরেণ সমাপয়েৎ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *