দুখিনি রাজকন্যার কথা

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

নার্গিস
পারুল, আমার বড় আদরের বড়আপা। আমার আপাকে নিয়ে ছেলেবেলার স্মৃতি খুব একটা মনে পড়ে না। আমরা ছয় ভাইবোন বড় হয়েছি বাবার চাকরির সুবাদে ছোট্ট মফস্বল শহর টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ ক্যাম্পাসে। ছোটবেলায় বড়আপার গান শেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তা শেখা হয়নি। তাই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে চাইতেন নিজের ভাইবোনদের মাঝখানে। যখন ২য় বা ৩য় শ্রেণিতে পড়ি তখন শীতের সকালে লেপের ভেতর আপা নিজের কোলের ভেতর বসিয়ে রেওয়াজ করাতেন আমায়। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে রেডিওতে রাত জেগে আকাশবাণীর আধুনিক ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন আপা। তারপর একটু বড় হলে ১৯৭১ এর যুদ্ধের সময় একদিন আর্মিরা করটিয়া আক্রমণ করলে আমরা বীরপুশিয়ার দিকে পালিয়ে যেতে থাকি। আপা বড় তাই আপার হাত ধরেই আমরা ৬ ভাইবোন ছুটতে থাকি। একটা সময় বুঝতে পারলাম যে আমাদের মা আর বাবাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মর্টারের গোলার শব্দ, করটিয়া বাজার পোড়ার গন্ধ, ছাই-ধোঁয়া, মেশিনগানের গুলির শব্দ পেছনে ফেলে আমরা আপার হাত ধরেই ছুটছি তো ছুটছি। সন্ধ্যার সময় পৌঁছালাম পাথরাইল গ্রামে। সেখানে এক বাড়িতে আপার কোলে শুয়েই রাত্রিযাপন করলাম। পরদিন সকালে খুঁজে পেলাম বাবা আর মাকে। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এলেন আমাদের টাঙ্গাইলে। আমাদের বাসার খাটভর্তি ফুল। সব ফুল দিয়ে মালা বানানোর দায়িত্ব পারুলের।

১৯৭৫ সালে আপার বিয়ে হল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আল বেরুনী হলের এক্সটেনশনে দুইরুমের বাসা। চাল নেই, চুলা নেই তবুও অসীম শান্তি সেখানে। তারপর ডি টাইপের বাসায় থাকা অবস্থায় আমি ভর্তি হলাম জাহাঙ্গীরনগরে ভূগোল বিভাগে। প্রথমে কিছুদিন আপার বাসায় থাকার পর উঠলাম হলে। তখন মা-বাবাকে ছেড়ে আপাই আমার সব। ওই সময়গুলো ছিল আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। প্রায় বিকেলে দুলাভাই, আপা আর আমি হাঁটতে বের হতাম। জঙ্গলের ভেতর হাঁটার সময় আপা ‘ক্যাল্লা’ নামক পোকা খুব ভয় পেত। রাস্তায় ‘ক্যাল্লা’ দেখলেই আপা ভয়ে দুলাভাইয়ের ঘাড়ে ঝুলতে থাকত। ওই সময় আপা একটা খরগোশ পালতো। একদিন দুলাভাই খরগোশকে প্রচুর কাঁঠাল খাওয়ালো। তারপর সেই রাতেই পেট ফুলে খরগোশটা মারা গেল। সারারাত দুইজনের সে কী কান্না!

তালুকনগর গেলে দুলাভাই জাল নিয়ে মাছ ধরতে বের হত আর আপা তাঁর পাশে খলুই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। রাতে দুলাভাই খেজুর রসের হাড়ি নামাতে যেত তখন সাথে আপা জগ-গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। আমার বাবা দুইজনকে ডাকতেন পাগলা-পাগলি বলে।

দুলাভাই হঠাৎ করেই মারা গেলেন। একটা নক্ষত্রের পতন ঘটল। তাঁর মৃত্যুর ৪৭ দিন পর অন্বিতা মারা গেল। আমাদের পরিবারে ভাঙ্গনের শব্দ। এই দুইজনের মৃত্যুশোক আপা কাটিয়ে উঠবে কেমন করে? তারপর থেকে আর আপার ঢাকা আসার সময় নেই। দুলাভাই এর যত লেখা, ফেলনা কাগজ, জামা, জুতা সব জমিয়ে রাখতো। সিগারেটের প্যাকেটে যদি কোন একটা লাইন লিখে রাখে তাও জমিয়ে রাখত আপা। অসম্ভব সৎ চরিত্রের আমার আপা অন্যায়কে প্রশয় দিত না একেবারেই। আপা অতিরিক্ত স্পষ্টভাষী এটাই ছিলা আপার সবচেয়ে বড় দোষ! আপার কাছে কারও নামে কোন অভিযোগ দিতে গেলেই বলত আগে নিজে ভালো হও। মায়ের কাছে শুনতাম ছোটবেলা থেকেই গাছ, ফুল এগুলোর প্রতি আপার অসম্ভব ভালবাসা ছিল। তাইতো সব সময় গাছপালা নিয়েই থাকতে ভালোবাসতো। নিরাভরণ আমার আপাকে বিয়ের দিন ছাড়া সাজতে দেখিনি কোনোদিনও। দুলাভাই এর যেকোন অনুষ্ঠানে আপা তৈরি হত মাত্র ১০ মিনিটে তাও আপাই থাকতো মধ্যমণি। আপার অপারেশনের আগের দিন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমাকে বলেছিল ‘এইবার তোর দুলাভাইয়ের ১৪ই জানুয়ারির অনুষ্ঠানে আমি হয়তো থাকতে পারবো না। তোরা থাকিস।’ আপা চলে গেল বাঁচাতে পারিনি। আপা দুলাভাইকে নিয়ে বিশাল স্বপ্ন দেখতেন। জানিনা আপার সেই স্বপ্ন আমরা পূরণ করতে পারবো কি না? যেখানেই থাকো ভালো থেকো আপা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *