ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই পারুলভাবিকে

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

রশীদ হারুন
মেহেরুন্নেসা সেলিম, পারুলভাবি। আমাদের শিল্পপিতার জীবনসঙ্গিনী। আমি শুধু ভাবি বলেই ডাকতাম। প্রয়োজনে বলতাম এবং বলি সেলিমভাবি। তাঁর সাথে আমার স্মৃতি অ¤øমধুর। তিনি ছিলেন আমার ছাত্রজীবনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে [১৯৮১-১৯৮৭] প্রথম এবং প্রধান আশ্রয়স্থল। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পূর্ব থেকে সেলিম স্যার এর প্রয়াণের পূর্ব পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও শীতল ছিল তার সাথে আমার সম্পর্ক। আমারই অসতর্ক মন্তব্য সংকুল প্রামাণ্য-পত্র কারণ হয়ে ছিল ঐ দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার সূত্র হিসেবে। কিন্তু শুধু গুরুপত্মী নন। একজন আপাদশীর্ষ শিল্পনিবিষ্ট খেয়ালী মানুষ-শিল্পীর ছায়াতরু হিসেবে আমার চেতনায় সদা সতেজ ও অহংবোধ সম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন সেলিমভাবি।

সেলিমভাবি তাঁর দেহ সৌষ্ঠবের ন্যায় ছিলেন একহারা, একরোখা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। নির্মোহ ও আপাত নির্লিপ্ত বাক্যালাপে আমরা ভীত থাকলেও কখনো মনে হয় নি তাঁকে অন্তরহীন। বরং বলা ভালো সেলিম আল দীনের মত সৃজন পাগল মানুষকে লালন-পালন করার দুঃসাধ্য কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন ঐ মমতাময়ী নারী। সকল সত্তা দিয়ে আমৃত্যু আগলে রেখেছেন এবং সংরক্ষণ করেছেন সেলিম আল দীন এবং তাঁর সকল সৃজনকর্মকে। প্রয়োজন কিংবা গুরুত্বের বাছবিচার না করেই যক্ষেরধনের মত আঁকড়ে রেখেছিলেন একজন লেখকের সকল কর্ম। এ যেন ব্রত, সাধনা! ¯্রষ্টার সৃষ্টিকে সযতনে কুড়িয়ে তারই চরণে যেন নৈবেদ্য দান!

আর নাট্যাচার্য প্রয়াণের পর! যেন নতুন এক অভিযাত্রায় নেমেছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারির পর থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চালিয়েছেন অবিরাম এক মিশন; যদিও থেকে গেছে তা অসমাপ্ত। নাট্যাচার্যের রচনা প্রকাশের খুঁটিনাটি তত্ত¡াবধান, তাঁর স্মৃতি-স্মারক যেখানে যা আছে তার অন্বেষণ, যত সেমিনার-স্মরণ সভা, জন্ম-মৃত্যু স্মরণ অনুষ্ঠান, আচার্যের নাটকের প্রদর্শনী, মেলা, নাট্য উৎসবÑ কোথায় না অংশগ্রহণ করেন নি! কখনও তো এমন মনে হয়েছে নিভৃতচারী অভিমানী নাট্যাচার্যের জীবনকালে যেমন থেকেছেন অজ্ঞাত; তাই যেন শতগুণে বেশি করে প্রকাশিত হয়ে সমন্বয় করতে চেয়েছেন তার জীবনাবসনের পর অথবা নাট্যাচার্যকে আরো বেশি করে প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ! সেলিম আল দীন স্মৃতি জাদুঘর বা সেলিম আল দীন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তো রীতিমত সংগ্রাম করেছেন আত্মীয় পরিজনদের সাথে। পারেন নি আরাধ্য কর্মটি সমাপ্ত করে যেতে। কত কিছুই যে চেয়েছেন করতে! আমাদের তো বিশ্বাস নাট্যাচার্যের স্মৃতিরক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র সৃজনে এতটাই নিমগ্ন বা নিবিষ্ট থেকেছেন যে আপন শরীরকে করেছেন অবহেলা-অবজ্ঞা। হায় নারী! একদা হেলা অবহেলায় বঞ্চিত হয়েছেন সৃজনশিল্পী স্বামীর কাছে; আবার তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁরই কার্যে অনিঃশেষ নিবেদিত হয়ে নিজেকে করেছেন শূন্য! যথার্থই বাঙালি নারী ভারতীয় নারী! শকুন্তলা, মহুয়া, মদিনা, মলুয়া, ডালিমন, বনশ্রী বালা, ছক্কুনি, কালিন্দী, পরী, যমুনাদের উত্তরসূরি যেন।

আমরা যারা নাট্যাচার্যের পশ্চাৎযাত্রী, অনেক বারই ভেবেছি তিনি যোগ্য মর্যাদা দেন নি ভাবিকে (প্রকাশ্যে তো বটেই)। কিন্তু থিয়েটার কিংবা শিল্পাঙ্গনের ব্যক্তি, গ্রাম থিয়েটারের কর্মী অথবা শিক্ষার্থী (যে কোন বিষয় বা প্রতিষ্ঠানের হোক না কেন) ভাবির কাছে সমাদর বা আপ্যায়ন বঞ্চিত হয়েছে এমনটা শুনি নি কখনো। কতবার কত রটনা, ঘটনা, শংকা, আশংকাÑ কত ঝড় এসেছে নাট্যাচার্য আর ভাবির জীবনে! কতবার সম্পর্কের কিনারা ঠেকেছে সুঁচবিন্দুতে! অথচ থেকে গেছেন আমৃত্যু অবিচ্ছিন্ন, অবিভায্য। আমাদের বিবেচনায় শেষাবধি সকল কৃতিত্ব আমাদের ভাবির! নাট্যাচার্যের অতৃপ্ত রচনার ছিন্ন বা দুমড়ানো মোচড়ানো পৃষ্ঠার মতই কুড়িয়ে নিয়ে সমতলে তুলে রেখেছেন, রক্ষণ করেছেন রচয়িতাকেও। আমরা যে নাট্যাচার্যকে লাভ করেছি, তাকে পুষ্টিদান করে লালন পালন করে ফলবান করে তোলাÑ পুরাটাই করেছেন পারুলভাবি। তিনি যথার্থই বলতেন, ‘আমি বলে তোমাদের স্যারের সাথে টিকে থাকলাম।’ হ্যাঁ ভাবি, আপনি বলেই টিকে থাকতে পেরেছিলেন আমাদের স্যারের সাথেÑ আমৃত্যু! ….ঐ অজানা ভুবনেও কি আছেন আমাদের স্যারের সাথে! ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাকে পারুলভাবি !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *