পারুলভাবি: সকল কাঁটা ধন্য করে

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

হামীম কামরুল হক
কদিন আগে আমার অনুজ একজন তরুণ লেখক ‘রাহুল’ শব্দের অর্থ বললেন, কাঁটা। তিনি বলছিলেন, বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ গৌতম, সন্তানের নাম রেখেছিলেন রাহুল, ঠিক নমাটাই রেখেছিলেন, সন্তান আসলে হলো গলার কাঁটা, দিনরাত কেবলই খোঁচায়। ‘রাহুল’ শব্দের অর্থ পরে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, এর মানে হলো ‘বন্ধন’। রাহুল শব্দটি এসেছে রাহুলা থেকে। পালি ও সংস্কৃত ভাষা অনুসারে এর মানে হচ্ছে ‘বন্ধন’। তবে কেন জানি রাহুল মানে কাঁটা- এমনটা বার বার খোঁচাচ্ছিল। এতে থাকা ‘হুল’ অংশটি মনে হয় এর জন্য দায়ী। তবে বন্ধন শব্দটার ভেতরে বদ্ধ, বিদ্ধ, গেঁথে থাকার মতো ব্যাপারগুলি নিহিত।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সম্বন্ধ মাত্রই পরাধিনতা। সেই অর্থ আমরা যখন কারো সঙ্গে সম্পর্ক করি বা সম্পর্কিত থাকি, তার মানে এক ধরনের অধীনতার আবহ তলে তলে থাকে। আমরা ছিলাম বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুলের স্নেহের অধীন। আমরা মানে শামীম রেজা, আসাদ আহমেদ, রনজু রাইম, হারুন রশিদ এবং আমিসহ আরো অনেকে। তিনি আমাদের কতটা স্নেহ করতেন সেটি কেবলই আমরাই অনুভব করতে পারি।

সেলিম আল দীনের সঙ্গে একটু একটু করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সূত্রে তাঁর সঙ্গে আড্ডা, আলাপ, সান্ধ্যভ্রমণ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেড়াতে যাওয়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের শেষ দিকে নিত্যই ঘটত। তখনও মোবাইল নামের বস্তুটি কল্পনাতেও ছিল না। সমস্ত যোগাযোগ হতো প্রাণের টানে। আমরা এমন সময় স্যারের বাসায় উপস্থিত হতাম, ঠিক যেসময়টায় তিনি কারো না কারো উপস্থিতি আশা করছেন। আজ একটা কথা মাঝে মাঝে মনেও হয়, তা হলো: সেলিম স্যারের কাছে আমরা কেউ হয়ত বিশেষ কেউ ছিল না। বরং একজন অন্যজনের বিকল্প ছিলাম। কাউকে না কাউকে হলেই তাঁর চলত। তাঁর দরকার ছিল সঙ্গ, কথা বলবার লোক, পথ-হাঁটার লোক। একজনকে পেলেই চলত। কিন্তু এটা টের পাওয়ার অনেক আগেই আমরা স্যারের গুণমুগ্ধ হয়ে গিয়েছি, হয়েছি তাঁর অতুল বিপুল সৃষ্টিশীল প্রতিভার ভক্ত। বুঝে না বুঝে তাঁর লেখা পড়ছি। তিনিও প্রতিদিন আমাদের উৎসাহ দিয়ে গেছেন লেখালেখির কাজে। নানান সময় বলতেন, তারচেয়ে বড় লেখক হতে হবে। সেই রকমের লেখা লিখতে হবে। সেমতো নিজেকে তৈরি করতে হবে।- এই উৎসাহ খুব ছোট ব্যাপার ছিল না কিন্তু। এখন সেটাও টের পাই।

তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার সেলিম স্যারের সঙ্গে আলাপ শুরু ফেরদৌসীর শাহনামা পড়তে গিয়ে। তাঁর কাছ থেকে এর ছয় খÐ পালাক্রমে নিয়ে নিয়ে পড়েছি। প্রথম খÐটা অনেক অনুরোধ করার পর দিয়েছিলেন পড়তে। কিছুতেই দেবেন নাÑ এমন একটা ভাব ছিল। অনেক যতেœর এই বই। পারুলের কাছ থেকে টাকা ধার করে কিনেছিলেন এই ছয় খণ্ড। এটা দেওয়া যাবে না, আমি নিলে যত্ন করে রাখতে পারব না ইত্যাদি ইত্যাদি। স্যার ওই প্রবাদে বিশ্বাসটা ভালো মতোই করতেন হয়ত,‘কলম, বই আর বউ কাউকে দিতে নেই। কোনোটাই আর আগের মতো থাকে না। হারায়, নষ্ট হয়, নয় বদলে যায়।’ কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। তাই অবশেষে অনেক অনুরোধের পর আমাকে দিলেন শাহনামার প্রথম খণ্ড। এমন ভাবে দিলেন যেন পারুল জানতে না পারে। লুকিয়ে, গোপনে। আমিও যেন তেমন করেই ফেরত দিই। গোপনে, লুকিয়ে। পারুলভাবি যেন টেরটিও না পান। তাই করলাম প্রথম খণ্ড পড়া শেষ হলে। সুন্দর করে মলাট দিয়ে নিয়েছিলাম। বইটা যেমন ছিল তারচেয়ে সুন্দর করে ফেরত দিলাম। আমার বই পড়ার যত্ন দেখে তিনি দ্বিতীয় খণ্ডটা দিলেন। এবারও পারুল যেন জানতে না পারে- তেমন ভাব নিয়ে।

দ্বিতীয় খণ্ড পড়া শেষ হলে যখন ফেরত দিই, তিনি বললেন, তৃতীয় খণ্ডটা পরে নিবি। এখন একমাস আগের দুটো হজম কর। আমি তাকে বলেছিলাম পড়েছি, আর নোট নিয়েছি পড়তে পড়তে। বইদুটো ভেতরে স্যারেরও মার্জিনে মন্তব্য ছিল। ফেরদৌসীর নন্দনিক বিশ্বাস, শিল্পভাবনা কীরকম ছিল সেগুলি নিয়ে তাঁর মন্তব্য থেকে সমৃদ্ধ হয়েছি। প্রত্যেকটি খণ্ড পড়ার পর বইটি পড়ার নেশা আমাকে পেয়ে বসল। কিন্তু তিনি যখন তৃতীয় খণ্ড দিতে চাইলেন একমাস পর, তখন এত অসহায় বোধ করলাম। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই আর দিলেন না দ্বিতীয় খণ্ডটি পড়ে ফেরত দেওয়ার পর।

শাহনামা পড়ার বিশেষ কারণও আছে। আমরা তখন লাতিন আমেরিকার গল্প উপন্যাস নিয়ে মতোয়ারা। মার্কেস, ফুয়েন্তেস, রুলফো, কার্পেন্তিয়ের, হোরাসিও কিরোগা প্রমুখের লেখা আমাদের নতুন জগতের সন্ধান দিচ্ছে। আলম খোরশেদের সম্পাদনায় কি মানবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে পড়া হচ্ছিল সেসব। লেখক মামুন হুসাইন আমাদের এক ক্লাস ওপরে পড়া প্রশান্ত মৃধাকে পাঠিয়েছেন হোরাসিও কিরোগার বই ‘দ্যা ডিক্যাপিটেইটড চিকেন অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’। এসব নিয়ে বিপুল উৎসাহ।

সেলিম আল দীনকে আমাদের লাতিন-মুগ্ধতার কথা বলতে তিনি খুব বিরক্ত হন। তিনি বলেন পশ্চিমা সাহিত্যের বদলে প্রাচ্যের লেখকদের পড়ো। রামায়ণ-মহাভারত ভালো করে পড়ো। দাকিকির কথা জানো তোমরা? তোমরা কি শাহনামা পড়েছো? আমার লেখায় চিত্রকল্পগুলি কোথা থেকে আছে জানো? আমি যদি শাহনামা না পড়তাম জানতাম না দিন ও রাত্রি একটি শাদা ও কালো ঘোড়ার দৌড়। শাহনামা পড়ো, বুঝতে পারবে প্রাচ্যের লেখা তো ন্যূন নয়ই, বরং এর তুলনায় পাশ্চাত্যের লেখকরা রীতিমতো মাঝারি। সেলিম স্যারের কাছে সবার ওপরে রবীন্দ্রনাথ। আর প্রতীচ্যের গ্যেটে ও তলস্তয় ছাড়া সবাই মাঝারি মানের লেখক, হোক সে কাম্যু কিংবা সার্ত্র। কাম্যুকে যদিও অনেক বড় লেখক তিনি মনে করতেন, পরে নানান সময় কাম্যুর লেখার নানান প্রসঙ্গ নিয়ে বলেছেন কত না কথা। যাই হোক, শাহনামা পড়ার বায়না ধরলাম। দুটো খণ্ড পড়ে আটকে দিলেন। এদিকে আমি মরিয়া। তাই সুযোগমতো এবার পারুলভাবিকেই বললাম ব্যাপারটা। তিনি বলেন, তাই তো বলি এই বই দুটো এত সুন্দর করে মলাট করে দিলো কে? তিনি হাসিমুখে আমাকে তৃতীয় খণ্ড পড়তে দিলেন। আসলে বইয়ের আলামারির চাবটি ভাবির কাছেই থাকত- এটাও সত্য। সেলিম স্যার তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আগের দুটো বই দিয়েছিলন। পরের চার খণ্ডের জন্য আর সেলিম আল দীনের মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। পারুলভাবির কাছ থেকেই নিয়েছি, পড়েছি আর ফেরত দিয়েছি।

ভাবির সঙ্গে আগে আলাপটি ছিল অনুষ্ঠানিক, কিন্তু পরে তা এক নিবিড় আন্তরিকতায় রূপ নেয়। আর সেটি ওই বইপড়ার সূত্রে। তারপর আর এই মনের টান আর কমেনি। টের পাই, দিনের পর দিন দেখা না হলেও, যখনই দেখা হয়েছে বা তিনি ফোন করেছেন, এক গভীর মমত্ব টের পেয়েছি তাঁর কণ্ঠে। ফলে যেদিন হঠাৎ শুনি তিনি মারা গেছে, সেটা এমন এক ধাক্কা দিয়েছিল যে আবেগের সব বাাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। তরুণ নাট্যকার তানভীর আহমেদ সিডনীকে ভাবির মৃত্যুসংবাদ নিয়ে কথা বলছিলাম এবং কখন আমরা লাশের কাছে যাবো বা জাহাঙ্গীরনগর যাবো, তা নিয়ে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বিপুল কান্নার একটা দমক স্থানকালপাত্র ভুলিয়ে দিয়ে হু হু করে চোখ ফেটে বেরিয়ে এসেছিল। নিজের কাছে নিজে বিস্মিত হয়েছি, আরও তো অনেককে মারা গেছেন, আমার প্রিয়জন, কিন্তু কারো জন্য এমন কান্না তো আসেনি। কত স্মৃতি, কত বেদনার ভাগাভাগিই না তিনি আমার সঙ্গে করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে মাঝে মাঝেই স্যারের বাসায় গেলেই ভাবি বলতেন, ‘এই যে হামীম এসে গেছে, আমার গল্প করার মানুষ এসে গেছে, আজকে রাতে আর ঘুম হবে না।’ সত্যিই তাই, একটি ঘরে হয়ত স্যার লিখছেন, আর বসার ঘরে, আমি আর ভাবি কত না বিষয় নিয়ে আলাপ করে চলেছি। বলাবাহুল্য, ভাবির কাছে আমরা প্রায় সবাই এমন স্নেহ মমত্ব আর আন্তরিকতা পেয়েছি।

পারুলভাবি বলতেন, (কে যেন তাকে বলেছিল, হয়ত স্যার নিজেই) ‘এই বাড়িতে সবাই আসে সেলিম আল দীনের ভক্ত হয়ে, আর বের হয় পারুলের ভক্ত হয়ে।’ ভক্ত না হয়ে উপায় কী! এই যে আমার ক্ষেত্রে শাহনামা পড়ায় ভাবির সহযোগিতা, সেটা তো তিনি বলেই পাওয়া। অথচ সেলিম স্যার বলেছিলেন পারুলই বই দেয় না কাউকে। আর আসলেই ভাবি বলে কাউকে বই দিতেন না। কিন্তু বইয়ের প্রতি আমার যত্ন দেখেই তিনি আমাকে ওই ছয় খণ্ড পড়তে দিয়েছিলেন। এই তো গেল শুরুর ব্যাপার। কত কত দিন যে স্যারের বাসায় দুপুর বিকাল সন্ধ্যায় বা রাতে খেতে হয়েছে, খেতে বাধ্য হয়েছি, তার তো কোনো ইয়ত্তা নেই। ভাবির অপূর্ব সব রান্না আর এর সঙ্গে তাঁর আন্তরিকতাময় পরিবেশনা, এটা যারা পেয়েছে তারা জানে পারুলভাবির ভক্ত না হয়ে উপায় থাকে না।

ভাবির জীবনে গভীর বেদনা ছিল বলাবাহুল্য। তিনি মনটাকে শক্ত করে সেসব বেদনা সামাল দিয়ে গেছেন সারা জীবন। সন্তানহীনতার কষ্ট তো তাকে আজীবন ভুগিয়েছিলই, সেই সঙ্গে সেলিম স্যারের নানান অস্থিরতার ঘূর্ণিপাঁকে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু অসীম ধৈর্যে তিনি সেসব সামাল দিয়েছেন। স্যারকে ও তাঁর লেখাকেই নিজের সন্তানজ্ঞান করেছেন। আমরা প্রায় সবাই জানতাম এবং দেখতাম, সেলিম আল দীনের এইটুকু লেখা কি কোথাও তাঁর ছবিসহ কোনো প্রতিবেদন কি যাই হোক, সব তিনি পরমযত্নে সংরক্ষণ করেছেন। স্যারের পাণ্ডুলিপিগুলি সুন্দর করে সুবিন্যস্ত করে রেখে দিতেন আলমারিতে। চেয়েছিলেন টিভিতে হওয়া স্যাররের নাটকগুলিও ভিডিও বা সিডি জোগাড় করতে। সোজা কথায় পারুলভাবি ছিলেন সেলিম আল দীনের ভাণ্ডারি। আমি বলতে চাই, সেলিম আল দীনের কাণ্ডারি। কারণ তিনি না থাকলে সেলিম আল দীন নানান মোহ লোভের প্রবল বন্যায় তৃণের মতো ভেসে যেতেন। দুহাতে আগলে রক্ষ করেছেন তিনি তাঁর স্বামীকে। তবে তাঁকে নিয়ে শেষ দিকে হতাশও বেড়েছিল। কারণ সেলিম আল দীন সেই সময় লেখার চেয়ে বস্তুগত ঐশ্বর্যের দিকে ঝুঁকেছিলেন। গাড়ি, দামি আসবাবপত্র ইত্যাদি আর দুহাতে আরো আরো অর্থ, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থের দিকে তাঁর নজর গিয়েছিল। সেই হতাশায় ভাবি প্রায় বলতেন,‘হবে না আর তোমার স্যারকে দিয়ে। এই সেলিম আল দীনকে আমি ঠিক চিনতে পারি না। হবে না আর শরৎসম্ভোগ, ময়ূরযান লেখা। তোমার স্যার বদলে গেছেন। তাঁর সব কিছু মেনে নিয়েছি। কিন্তু লেখার দিকে নজর কমে গেছে- এটা কোনো মতেই মানতে পারছি না।’

কে বলতে পারে, সেলিম আল দীন আসলে ফুরিয়ে যাচ্ছিলেন কিনা? এবং সেটা নিজেই টের পেয়েছিলেন বলেই একরম স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন, নিজের শরীরের অযত্ন নিয়ে। তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র, আমার আরেক প্রিয় শিক্ষক কবি নাট্যকার ও অধ্যাপক লুৎফর রহমান স্যার তো বলতেনই, ‘আমি সেলিম স্যারের মৃত্যুকে এক ধরনের আত্মহত্যা মনে করি।’

সেলিম স্যারের মৃত্যুর পর যাদের পারুলভাবি আমাদের চেয়ে আপন করে পুত্রের মতো কি নিজের ভাইয়ের মতো গ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেকের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। ভুলবোঝাবুঝি বাড়ছিল। সম্পর্কগুলি নানান দিক থেকে একেকরকম ব্যাখ্যায় দেখা দিচ্ছিল। এছাড়াও জীবনের ওপর দিয়ে কী গেছে সেলিম স্যারের সঙ্গে সংসার করার পর, প্রথম ও একমাত্র সন্তানের জন্মগ্রহণ করেই মৃত্যুর পর থেকে, সেসব কথা আর নাইবা বলা হলো।

পারুলভাবি জীবনযন্ত্রণার বিপুল কাঁটাগুলির ভেতরে থেকে ভাবি তাও পুষ্পের হাসিই হেসে গেছেন। নিজের বেদনা কথা নিয়ে অবিরাম ঠাট্টা করেছেন। তাঁর কৌতুকবোধ রসবোধের কোনো তুলনা হয় না। বিপুল প্রবাদ-প্রবচন, উপকথা ও কেচ্ছকাহিনি ততটাই মজা করে বলতেন ভাবি। পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা করতেন বলে হয়ত তা আরো সাবলীল করে বলতে পারতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল ও কলেজে তাঁর গড়া শিক্ষার্থীরাও তাঁকে যথেষ্ট ভক্তিশ্রদ্ধা করত বলেই জানি।

মানবচরিত্র গভীরভাবে পাঠ করতে পারতেন তিনি। সেলিম আল দীনের মতো নাটক লেখা চেষ্টা করলে বা কোনো কিছু লেখা জন্য শ্রম দিলে মন্দ লিখতেন না। দুয়েকটা প্রবন্ধও ছাপা হয়েছিল। এর একটা প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে, যেখানে ভাবি লিখেছিলেন: মানুষ কোনো দিন কোথাও তার প্রকৃত মুখটি দেখতে পরে না। একেক ফটোতে একটু হলেও আলাদা হয়ে যায় সে মুখ। একেকটা আয়নায় একেকরকম দেখে মানুষ। মানুষ কোনো দিন নিজেকে দেখতে পারে না, কি মুখের চেহারা কি নিজের মনের স্বরূপ, কোনোদিন একই রকমভাবে দেখা হয় না। – তাঁর এই প্রবন্ধটি পড়ে শোনানোর সময় চমৎকৃত হয়েছি। এছাড়া লিখছিলেনও সেলিম আল দীনের সঙ্গে কাটানো জীবন নিয়ে নিজের স্মৃতিকথা। সেই পাতাগুলি এখন কী দশায় আছে, কে জানে। আমি গেলেই তিনি সেই লেখাটা আগে যতটুকু পড়ে শুনিয়েছিলেন, তারপর থেকে পড়ে শোনাতেন। জানি না, তাঁর সেই পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশ হবে কবে। হলে তাঁকে ও সেলিম আল দীনকে নতুন করে আমরা চিনতে পারতাম।

সত্যিকারের রুচি, সৌন্দর্য ও সততার প্রতি পারুলভাবি পক্ষপাত ছিল মারাত্মক। চালাকি, কূটচাল ও যেকোনো ধরনের অন্যায়ে তিনি প্রচণ্ডভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। তীব্র শ্লেষ ও কৌতুকও করতে পারতেন। সেদিক থেকে তিনি কোনো লেখকের চেয়ে কম ছিলেন না, যদিও তিনি নিজেকে বার বারই বলতেন, ‘আমি তো আর তোমাদের মতো লেখক না।’ আমাকে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতেন মায়াকোভস্কির সেই বইটির কথা ‘কী করে কবিতা লিখতে হয়?’। তাঁর বিস্ময় ছিল সৃষ্টিশীল প্রতিভাদের নিয়ে। সেলিম আল দীনের কারণেই হয়ত তাঁর এই বিস্ময় সব সময় ক্রিয়াশীল ছিল। সাহিত্যের প্রতি, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ছিল বলেই সেলিম আল দীনের প্রতি ভালোবাসা তিনি আসলে হারিয়ে ফেলেননি। যদিও সেলিম স্যারের নানান কাজে, যেকাজ তাঁর লেখার পথে আদতে বাধা হিসেবে এসেছে, কিন্তু তিনি তাতে অংশ নিচ্ছেন, তাতে বিরোধিতা না করলেও পারুলভাবি সহযোগিতা করতেন না। তাঁর সমস্ত সহযোগিতা ছিল সৃষ্টিশীরতার পক্ষে, বস্তুগত ও বৈষয়িকতার বিপরীতে। প্রয়োজনের বেশি যা কিছু সেসব অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করার একটা মন ছিল। তিনি সেই অর্থে মার্ক্সের কাছ থেকে পাওয়া সূত্রটিই যেন মানতেন, ‘দেবে সাধ্যমতো, নেবে প্রয়োজন মতো।’ আর তাঁর কাছে থেকে আমি অন্তত পেয়েছি, ‘তুমি যতটুকু দেবে, তার বেশি তুমি পাবে না, আশাও করবে না।’ আমরা প্রায় সবাই দেওয়ার চেয়ে পাওয়া আশা বেশি করি। তাই নিত্য দুঃখ ও হতাশায় ভেতরে পতিত হই।

ভাবির জীবনে বস্তুগত পাওয়া নিয়ে কোনো হতাশা ছিল না। তিনি চাইতেন এমন কিছু যা আমাদের স্পর্শের অতীত কিন্তু মূল্যবান। মানবিক সেই সব অনুভবের বিশুদ্ধতার প্রতিই তিনি দায়বদ্ধ ছিলেন। আর এই দায়ের বিপরীতে তিনি যা দেখতেন তার প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের মতো করে এক ধরনের জেদে তাঁকে পেয়ে বসত। তিনি প্রমাণ ছাড়া যা বিশ্বাস করতেন তা থেকে কোনোভাবেই সরে আসতেন না। যেকারণে কয়েকটি ব্যক্তির প্রতি তিনি যথেষ্ট ক্ষুব্ধও ছিলেন। সেখানে তিনি ছিলেন শিশুর মতো জেদি ও অনমনীয়। সেলিম আল দীনও কম জেদি ও অনমনীয় ছিলেন না। পারুলভাবি তাঁর মতো লেখক নাও হতে পারেন, কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ের দিকে নিজের প্রতি আস্থা তাঁর কম ছিল না। সেজন্যই তিনি স্মৃতিকথা লিখে সেলিম আল দীনের ‘ভাঙা প্রেম অশেষ বিশেষ’-এর জবাব দিতে চেয়েছিলেন। স্বামী বা এত খ্যাতিমান স্বামীকেও তিনি কোনোভাবে সেখানে ছাড় দিতে রাজি হননি। অদ্বৈত মল্লবমর্ণ সম্পর্কে বলা হয়, তাঁর ভেতরে খাদ ছিল না বলেই অদ্বৈত অল্প বয়সে ভেঙে গেলেন। খাঁটি সোনা দিয়ে গয়না ভালো হয় না। পারুলভাবিকে নিয়েও একই কথা বলতে পারি। নিজে খাঁটি মানুষ হওয়া ও বিশুদ্ধ হওয়ার দিকে তাঁর এককাট্টা নজর ছিল, ফলে সেলিম আল দীনের মতো তিনিও সময়ের অনেক আগেই চলে গেছেন। তাঁর চলে যাওয়া আমাদের জন্য নানান কারণেই অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ তিনি বেঁচে থাকলেই সেলিম আল দীনে সত্যিকারে জীবনী লেখার উদ্যোগটা নেওয়া যেত। পারুলভাবি ছিলেন বাংলাদেশের থিয়েটার জগতের ভাঙাগড়ার একজন নীরব সাক্ষী। তাঁর মৃত্যু তাই আমাদের জন্য অনেক কাজকে কঠিন করে দিয়ে গেছে। তবে তিনি যেমন সকল কাঁটা ধন্য করে আমাদের স্মৃতি চিরঅম্লান হয়ে ফুটে রইবেন, তাঁর শিক্ষা নিয়েই আমাদের কঠিন কাজটাকে সম্পন্ন করতে হবে। আর তা করে উঠতে পারলেই সেটিই হবে পারুলভাবিকে স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *