পারুল আপার পৃথিবী

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

আলতাফ শাহনেওয়াজ
পারুল আপার পৃথিবীটা এখন কেমন, খুব জানতে মন চাই। বর্তমানে যে জগতে তাঁর বাস, সেখানে কি কাগজ-কলম আছে, আছে কি বইয়ের পরিচিত গন্ধ? নিশ্চিত জানি, আমাদের পারুল আপা, মানে বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুলের ভুবনে অন্তর্জালের ঘনঘটা বা ফেসবুক-টুইটারের ঝকমারি ছিল না, তাঁর পৃথিবীতে কাগজ-কলমই সই, মহাকবি ফেদৌসী কিংবা রবীন্দ্রনাথই সেখানে অবলম্বন। কিন্তু তিনি-পারুল আপা তো কবি-সাহিত্যিক-লেখক নন, তাই অকিঞ্চিৎকর এ লেখার সূচনায় তাঁর পৃথিবীর সূত্রে কাগজ আর কলমের প্রসঙ্গ আসছে কেন!
নিজে লেখক না হলেও অন্তত একজনকে দ্বৈত-অদ্বৈতের সম্মেলনে ‘লেখক’ হয়ে উঠতে দেখেছেন তিনি, আর সেই দেখাটি অবশ্যই ওই লেখকের পরিমণ্ডলের খুব নিকটে থেকে। চারাগাছ দিনে দিনে যেভাবে মহিরুহ হয়ে ওঠে, ফেনীর সেনেরখিলের একজন মঈনউদ্দিন আহমেদকে তিনি সেভাবেই বাংলা নাটকের নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন হয়ে উঠতে দেখেছেন। এই বাক্যে থেকে আশকারা নিয়ে আরেক পা বাড়িয়ে যদি বিনীত ও নম্রভাষ্যে বলি, সেলিম আল দীনের হয়ে ওঠার নেপথ্যের গোপন পরিচর্যাকারীর নাম মেহেরুন্নেসা পারুল, কেউ কি গোস্বা নেবেন? একদিন যে পৃথিবীর কাগজ-কলমে ‘কিত্তনখোলা’র বনশ্রীবালা কি ‘হাত হদাইয়ে’র চুক্কনীকে এঁকেছেন সেলিম আল দীন, সেই পৃথিবী, সেই কাগজ-কলম যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছেন কে? পারুল আপা, সেলিম আল দীনের সহধর্মিনী মেহেরুন্নেসা পারুল। না, এখানে একটু ভুল হলো, আমৃত্যু সেলিম আল দীন এবং তাঁর গড়ে তোলা ভুবনকে গুছিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন মেহেরুন্নেসা পারুল। যতই ভাবি, পেছনের স্মৃতি মনে রাখব না, ভুলে যাব তাঁকে, ততই যেন পারুল আপা ক্রমে ক্রমে আসেন। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয়-ঘনিষ্ঠতা খুব বেশি কালের নয়, তবুও স্মৃতি-সঞ্চয় যতটা, মনের কোঠায় তা মণিকাঞ্চন হয়ে আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে পড়ার সূত্রে সেলিম আল দীনকে পেয়েছিলাম শিক্ষক হিসেবে। বলা ভালো, সেলিম আল দীনই এই বিভাগে ভর্তি করেছিলেন আমাকে। এমনকি নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে আমার পা পড়ার আগেই আমি দেখে ফেলেছিলাম ক্যাম্পাসের সি-৪৭-এ সেলিম স্যারের আবাসস্থল। প্রথম দিন সেলিম স্যারের ফ্লাটে প্রবেশ করেই দেখলাম পারল আপাকে। ড্রইংরমে এন্তার কাগজপত্র গোছগাছে ব্যস্ত। পরে বুঝেছি, ওই কাগজপত্র সবই সেলিম স্যারের লেখাজোখা। সেই যে তাঁকে আবিষ্কার করেছিলাম, কাগজ-কলমের পৃথিবীতে, আমৃত্যু ডুবে থেকেছেন সেখানেই।

সেলিম আল দীনের সঙ্গে একসময় আমার সম্পর্ক কেবল আর ছাত্র-শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দিনে দিনে আমি হয়ে উঠেছিলাম তাঁর ছায়াসঙ্গী; ততদিনে আমাদের সম্পর্কটাও রূপান্তরিত হয়েছে গুরু-শিষ্যে। সংগত কারণেই সময়ে-অসময়ে সি-৪৭-এ যাতায়াত ছিল আমার। যখনই গিয়েছি, পারল আপাকে দেখেছি তিনি কাগজ-কলমের পৃথিবীতে বিভোর, সেলিম আল দীনের পৃথিবীতে ডুবে আছেন। অন্তরালে থেকেছেন আজীবন, তবে চাইলেই নিজের আত্ম পরিচয় নির্মাণ করতে পারতেন। সেই যোগ্যতা-ক্ষমতা-সবই ছিল তাঁর। কিন্তু কেন সেসব পথে হাঁটলেন না?-সেলিম স্যারের মৃত্যুর পর প্রশ্নটি করেছিলাম তাঁকে। উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি চেয়েছি তোমার স্যার অনেক বড় লেখক হোক, রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড়।’
তাই তো সেলিম আল দীনকে বড় করতেই সবসময় বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে। ফুল যেমন অকাতরে গন্ধ বিলিয়ে যায়, পারল আপাও তেমনি বিলিয়ে গেছেন, নিঃশেষে বিলিয়ে গেছেন নিজেকে। তাঁর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে একের পর খুলে যাচ্ছে স্মৃতির আর্গল- ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮…২০১৭। কত কথা! বিশেষত সেলিম স্যারের প্রয়াণের পর অনেক কয়েকটি রাত ভোরের দিকে যাত্রা করেছে, পারল আপার সঙ্গে আমাদের গল্প তবু শেষ হয়নি। আর সেই গল্পে না-থেকেও আরেকজন ছিলেন প্রবলভাবে অস্তিমান-সেলিম আল দীন। সেই সব গল্প আর স্মৃতিকণা অন্য কোনো রাতের জন্য তোলা থাক, না হয় থাকুকই তা অব্যক্ত। চলিষ্ণু পৃথিবীর তাতে খুব ক্ষতি নেই কোনো। এখনো চক্ষু মুদলেই দেখতে পাই পারল আপাকে-এক মনে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আওড়ে চলেছেন, আর সেই কবিতার চরণ ধরে কীভাবে যেন সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে সেলিম আল দীনের চরিত্ররা-আমার কাছে এ-ও এক মনোহর অভিজ্ঞতা বটে। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল, ফেরদৌসীর শাহানামা থেকে মুর্হুমুহু উদহারণ দিতে পারতেন, আড্ডায় ছিলেন বন্ধুর মতো, তবু শেষ অবধি সেলিম আল দীনের প্রতি একধরনের অভিমান কি তাঁর ছিল না? যে চারাগাছকে চোখের সামনে মহিরুহ হয়ে উঠতে দেখলেন, সেই মহিরুহকে একসময় তিনি আর ছুঁতে পারেনি-অভিযোগ ছিল তাঁর, পারল আপার। এজন্যই অভিমান ছিল কী? তবে সবকিছুর পর পারল আপা শেষমেশ সেলিম আল দীনের মহাভুবনের পুঁজারি হিসেবেই বেঁচে থকতে চেয়েছেন-এ নিয়তি একান্ত তাঁর নিজের নির্বাচন। তাই হয়তো সেলিম আল দীনের জীবনচরিতেই আমরা বারংবার খুঁজে ফিরব তাঁকে, সেখানেই তো এই মহিয়সীর নিজের পৃথিবী।

শেষে এ সত্য স্বীকার করে নেওয়া ভালো, পারল আপার পৃথিবীর খোঁজ এখন আর নিতে চাই না আমি। কারণ, এই সন্ধান বা খোঁজ নেওয়ার ভেতরে অনেক দায় থাকে। আজকাল সুপারম্যান হয়ে ওঠার মহাবিশ্বে সেধে কে-ই-বা আর নিতে চাই দায়। তবুও এখনো কোনো কোনো রাতে মন খারাপ হলে, যখন সেই রাতে আর ঘুমই আসে না, এবং মুঠোফোনে গেম না খেলে নিজের ফেলে আসা জীবন মুছতে শুরু করার খেলা শুরু করি যখন, তখন সেই অনবদ্য ক্রীড়া জাহাঙ্গীরনগর অব্দি পৌঁছুলে অবধারিতভাবে সেথায় হাজির হন আচার্য সেলিম আল দীন আর বেগমজাদী মেহেরন্নেসা-আমার পারল আপা। তাঁদের দেখার পর আমি কি এই জীবন থেকে নিকেশ করতে পারি ওই অধ্যায়? কেননা, সবকিছু মুছে ফেলতে পারলেও পারল আপার মুখে, পারল আপার পৃথিবীতে আমার জন্য মায়ের মমতা আছে, এ যে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই আজও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *