পারুল স্মরণ

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

নাসির উদ্দীন ইউসুফ
আমার সাথে পারুলের প্রথম পরিচয় ১৯৭২ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংলগ্ন রাস্তায়। সেলিম আল দীন প্রায় জোর করে শরীফ মিয়া ক্যান্টিন থেকে আমাকে নিয়ে এলো তার প্রেমিকার সাথে দেখা করাতে। হেমন্তের বিকেল। চারদিক গমগম করছে তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বল উষ্ণ উপস্থিতিতে। পারুল কিছুটা অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও আমার সাথে পরিচিত হলো। বেশ একটা লাজুক অভিব্যক্তি। আমি বন্ধুর প্রেমিকাকে বেশ ভালোভাবে নীরিক্ষণ করলাম। উজ্জ্বল গাত্র বর্ণ। বেশ ঝকঝকে চেহারা। সুন্দরী বলতে হয়। পারুল দ্রুত চলে যেতে চাইলে সেলিম স্বভাবসুলভ হ্যাংলামো করলো খানিকটা। আমি বেশ উপভোগ করলাম। আমার ও সেলিমের প্রথম মঞ্চ নাটকের মহড়া বিকাল ৫.৩০ মিনিটে মহসীন হলের মিলনায়তনে। আমি তাড়া দিলাম সেলিমকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতা হবে বাংলাদেশের ২য় বিজয় দিবসকে স্মরণ করে। সেলিম আল দীনের রচনায় ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটক আমার পরিচালনায় মহসীন হলকে প্রতিনিধিত্ব করবে। সব হলগুলোতে সাজসাজ রব। মেয়েদের হল রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হলসহ সব হলগুলো প্রস্তুুতি নিচ্ছে। শিক্ষকরাও জড়িত হয়ে পড়েছে। সেলিমের পীড়াপিড়িতে পারুল এক-আধদিন এসেছিলো। সলজ্জ উপস্থিতি। তো পরিচয় হলো কিন্তু ঘনিষ্টতা হলো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য প্রতিযোগিতায় ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ সকল বিভাগে প্রথম হলো। আমরা অবাক। একটা অ্যাবসার্ড নাটক কী করে সব প্রথম পুরস্কার জিতে নিলো! যাক প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে এই পুরস্কার জিতে নেয়ায় পারুলের মুখ উজ্জ্বল হাসিতে ভরে গেল। পারুল আমাদের ফুচকা-চটপটি খাওয়ালো। খাওয়া শেষে সেলিম আর পারুলকে একটু নিরিবিলি হওয়ার সুযোগ দিতে আমরা দূরে সরে গেলাম। ওরা হাঁটতে হাঁটতে শামসুন্নাহার হলের দিকে চলে গেল। আমি আর সেলিম রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। আঁভাগার্ড নাট্যকার ও নির্দেশক বলে পত্রিকায় লেখা হলো। আবার অনেকে নাটকটি নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করলো। দৈনিক আজাদীতে এক তরুণ সমালোচক লিখলো ‘বাংলা মঞ্চে উন্মাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে!’ সেলিম খুবই রেগে গেলো। সমালোচকে একটি শাস্তি দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সেলিম কিন্তু নিয়মিত ব্যায়াম করতো। শরীরে বেশ শক্তি। আমি অবশ্য সহজ ভাবে নিলাম। তো সেলিমকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিষয়টি সামলানো গেল। তবে সেলিম, আল মনসুর, আসাদ, হাবীবুল হাসান সবাই মিলে ঐ সমালোচককে বেশ শাসালো। পারুলকে দেখলাম বেশ আনন্দ পাচ্ছে পুরো এই মাস্তানি পর্বে। এইভাবে আমি-সেলিম-পারুল শিল্পের বন্ধুতা সম্পর্কের নির্যাসে জীবনের বন্ধু হয়ে গেলাম। সেলিম একের পর এক নাটক লিখছে। পারুল সে পাণ্ডুলিপি কপি করে সকলের পাঠযোগ্য করছে। আমি বা ম. হামিদ নির্দেশনা দিচ্ছি। সেলিমের আগমনের সাথে যেন বদলে যেতে থাকলো নাটক। কী বিষয়বস্তু। কী আঙ্গিক। কী কাঠামো। কী ভাষা ও রচনাশৈলী। এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনের মুখে দাঁড়ালো বাংলা নাটক। নামকরণেও বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হতে থাকে সেলিমের নাটকে। ‘এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা’, ‘করিম বাওয়ালীর শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা’ ইত্যাদি। এই নাটকগুলো তারই সাক্ষ্য বহন করে। পারুল একনিষ্ঠ অনুগামীর মত সেলিমের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতে থাকলো। সেলিম তখন মহসীন হলের আবাসিক ছাত্র। পারুল রোকেয়া হলের আবাসিক। দু’জন নিয়মিত বিকেল বেলা দেখা করতো। সেলিম, আমি, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসানসহ একদল তরুণ কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক সে সময় শরীফ মিয়ার রেস্তোরাঁয় আড্ডা দেই। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ এ ঢাকা থিয়েটার গঠিত হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের গঠিত নাট্যদল। মৌলিক নাট্যচর্চার মধ্যদিয়ে বাংলা নাটকের মুক্তি। ঔপনিবেশিক নাট্যরীতি প্রত্যাখ্যানপূর্বক নিজস্ব নাট্যরীতির ব্যবহারে আধুনিক নাটক রচনা ও প্রয়োগ এই দলের মূল লক্ষ্য। সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’ ও হাবীবুল হাসানের ‘স¤্রাট ও প্রতিদ্ব›দ্বীগণ’ দুটি ছোট নাটক দিয়ে ঢাকা থিয়েটারের যাত্রা শুরু। ঢাকা স্টেডিয়ামের দক্ষিণ-পূর্ব কোনে ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতি মিলনায়তনে। আশাতীত সাফল্য। রবিবাব সকাল-বিকাল প্রদর্শনী। সব শো পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। পারুল ও সেলিম প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনীতে আসতো। পারুল খুব যত্ন সহকারে আমাদের নাটকের টিকিট, স্যুভেনিওর সংরক্ষণ করতো। দীর্ঘকাল পরে ঢাকা থিয়েটারের ২৫ বছর পূর্তিতে প্রকাশনার কাজে পারুলই তার কাছে সংরক্ষিত মূল্যবান কাগজপত্র সরবরাহ করেছিল।

সেলিম সবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। অনতিবিলম্বে বিয়ের জন্য উতলা হলো। কিন্তু বিয়ে করে নববধূকে নিয়ে কোথায় উঠবে। মহসীন হলে তো থাকা যাবে না। আমি আমাদের বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত একটি সম্পত্তি যা যুদ্ধের পরে আমার ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল সেই একতলা ভবনে সেলিম ও পারুলের থাকার ব্যবস্থা করলাম। বিয়ের পর সেখানেই ওদের বাসর হয় এবং কিছুকাল নবদম্পতি সেখানে অবস্থান করে। পারুল সেই পরিত্যক্ত ভবনটিকে রাতারাতি বসবাসের যোগ্য করেছিল। পারুল তৃতীয় দিন থেকে নিজে রান্না শুরু করলো। আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখেছি পারুলের বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার ক্ষমতা। সেলিম খুব দ্রুত জাহাঙ্গীরনগরে এককক্ষের একটি আবাসনের ব্যবস্থা করে পারুলকে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেল। একটি শোবার ঘর আবার ওই ঘরেই কেরোসিনের চুলায় রান্নার ব্যবস্থা। সাথে ছোট্ট একটি বাথরুম। আমি কত রাত সেলিম-পারুলের সাথে এককক্ষের সেই ঘরে রাত কাটিয়েছি। সারারাত নাটক পাঠ এবং মঞ্চায়নের পরিকল্পনা। পারুল আমাদের লাগামহীন আলোচনা শুনতে শুনতে রান্না শেষ করেছে কত রাত। খাবার খেয়ে আমরা তিনজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্জন ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়িয়েছি।

আবার খুব সকালে হেঁটে ফিরে এসে দেখি পারুল চা-নাস্তা তৈরি করে প্রস্তুত। আমি ঢাকায় ফিরে আসতাম। সেলিম বিকালে ঢাকায় চলে আসতো নাটকের মহড়া দেখতে। ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’র মহড়া শেষে আমরা দু’জন জাহাঙ্গীরনগরে ফিরে সেলিমের বাসায় নাটকের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হতাম। পারুল সেলিমের খসড়ার নূতন সংযোজনসহ নিজ হাতে পরিষ্কার করে লিখতো যাতে সবাই পাঠ করতে পারে। এইভাবে বছরের পর বছর পারুল আমাদের অত্যাচার সহ্য করেছে। শুধু তাই নয়, একই সাথে সেলিমের নাটকের সকল খসড়া সংরক্ষণ করেছে। সেলিমের নাটক রচনাকালে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়ে সেলিমকে সাহায্য করতো। এমন কী প্রাথমিক পর্যায়ে পরিশ্রম করে নানা সূত্র সরবরাহ করতো। পারুল ছাত্রী হিসেবে খুবই ভালো হওয়াতে সে দক্ষতার সাথে এ কাজটি করতো।

‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ ও ‘শকুন্তলা’ রচনার অগণিত খসড়া পারুল সংরক্ষণ করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘চাকা’ রচনাকালে একনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে পারুল সেলিমের সাথে বিনিদ্র রজনি যাপন করেছে। ‘যৈবতীকন্যার মন’ রচনা কাল থেকে নূতন নাট্যের উদ্গাতা সেলিম ঋষির মত একাকী ধ্যানমগ্ন হলেন। একের পর এক নূতন সৃষ্টির মধ্যদিয়ে সেলিম পূর্ণতা পেতে থাকে আর নিঃসন্তান পারুল নিঃসঙ্গ হতে থাকে। তবে সেলিমের লেখা প্রতিটি পৃষ্ঠা পরম মমতায় নিজকক্ষে নির্ধারিত বাক্সে তুলে রাখতে ভোলেনি পারুল। শুধু সেলিমের নয় ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটার নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, সমালোচনা এবং নূতন প্রযোজনা বা নাট্যোৎসবের সকল প্রকাশনা সম্পূর্ণ একক উদ্যোগে সংরক্ষণ করতো। আমরা সেলিমের মৃত্যু পূর্বকাল অবধি সেই পূর্বের মত পারুলের হাতের সুস্বাদু রান্না খেয়ে রাতের পর রাত সেলিমের বাসায় অতিবাহিত করেছি। পারুল নীরবে আমাদের আলোচনা শুনতো। মাঝেমাঝে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিতো। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিটি প্রযোজনার শেষে পারুলের আগ্রহে পারুলের বাসায় দীর্ঘ আলোচনায় আমরা মেতে উঠতাম। নূতন নাটকের বিষয় ও রচনা নিয়ে সেলিমের ও আমার সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়তো। এইভাবে এক সেলিম আল দীনের জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিহাস সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের জন্মেও পারুলের ভূমিকা ব্যাপক ও বিশাল। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের জন্ম হয়েছিল পারুলের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের তালুকনগরের বাড়িতে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারির তীব্র শীতে ঢাকা থিয়েটার, আমি, আসাদ , কামাল, শতদল বড়ুয়াসহ প্রায় ৩০জনের দল পারুল ও সেলিমের নেতৃত্বে তালুকনগরে গমন করি। রাস্তা নাই। ধানক্ষেতের আইল ধরে হাঁটা পথ। আমার জন্য পারুল তার বাবাকে বলে একটি টাঙ্গাগাড়ির ব্যবস্থা করেছিল। আজহার বয়াতীর মেলায় শত শত গায়েন অংশগ্রহণ করে। ঢাকা থিয়েটার ‘সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে। এই নাটক মঞ্চায়নের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার আত্মপ্রকাশ করে। পারুলের মা, বাবার আতিথেয়তা এ জীবনে ভুলবার নয়। আর পারুলের ছোটভাই কামরুল ও পরিশ্রমী তরুণ মানিকের প্রশংসাতীত ভূমিকার কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হবে। মানিক এখনো তালুকনগর থিয়েটারের নিরলসকর্মী আর কামরুল বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে সক্রিয়। সারাদেশের গ্রাম থিয়েটারের নিবেদিত সিংহভাগকর্মী যাদের নিজের সন্তান বা ভাইয়ের মত স্নেহ ও মমতায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিজ অন্ন মুখে তুলে দিয়েছে। তার ছোট্ট গৃহে কর্মীদের রাত্রিযাপনের বা বিশ্রামের জন্য আয়োজন করেছে। সেবার পরমতৃপ্তিতে নিঃসঙ্গ এই নারী নিয়তই অশ্রুসজল হতো।

সেলিমের মৃত্যুর পর পারুলের নিসঃঙ্গতা যেন বেড়ে যায় শতগুন। সন্তানহীন এই নারী তার জীবনসঙ্গীর শিল্পসৃষ্টিকে সন্তানের মতো লালন করেছে চিরজীবন। আর সেই সঙ্গী ও শিল্পী যখন অসময়ে প্রয়াত হন তখন পূজারী নারীর আয়ু যেন সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। জীবনসঙ্গী ও শিল্পী নাই, শিল্পীর সৃষ্টি, সন্তান জ্ঞান করতো যাকে তাও ক্ষান্ত হলো এ জীবনে। তখন জীবনতো ফুরিয়েই যায়। সেলিমের মৃত্যুর স্বল্পকাল পরেই বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা পারুলও যাত্রা করলো অসীমের পানে। কিন্তু রেখে গেল বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেলিমসৃষ্ট আধুনিক বাংলা নাটকের যে বিস্ময়কর উত্থান তার পশ্চাতের নীরব ও অনিবার্য সহযোগী পারুল। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের দেশব্যাপী যে বিকাশ তার পেছনেও রয়েছে এই নারীর ক্লান্তিহীন পরিশ্রম। আজ ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের ইতিহাস রচনা বা গবেষণা করতে হলে তাঁর সংরক্ষিত দলিল ও প্রামাণ্য সংগ্রহই আমাদের একমাত্র সম্বল।

নির্লোভ এই মানুষটির প্রয়াণে আমরা এক নিঃস্বার্থ বন্ধু হারিয়েছি। আমাদের নির্ভরতার এক দীর্ঘ মানুষকে হারিয়েছি যার কোনো বিকল্প নাই।

আমাদের কোনো প্রশংসা বাক্য পারুলের অবদান-ভালোবাসার যোগ্য নিবেদন হবে না কোনদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *