প্রত্ননারী

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

ইফফাত আরেফীন তন্বী
সময়টা ঊনিশো নিরানব্বই সালের শীতকাল। শুরু বা শেষের দিকে, শুক্লপক্ষের দ্বাদশী হবে! কুয়াশা ভেদ করা রহস্যময় জ্যোৎস্না। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে পানি খেতে উঠি। মেহেরুন্নেসা সেলিম পারুল- আমার রক্তসম্পর্কহীন খালামনি আর রক্তসম্পর্কহীন মামা সেলিম আল দীন। একজন আমার মায়ের প্রিয়সখী অন্যজন রাখিভাই। প্রান্তিকের ডি টাইপের বাসায় থাকেন। খালামনি মাঝের ঘরের বিছানায় বসে তাকিয়ে আছেন জানালার বাইরে। শব্দ পেয়ে বললেন- তন্বী? আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম, দুজনে বেশ অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। একসময় খালামনি বললেন ঘুমাবি না? বসে থাকতে ইচ্ছে করছিলো, তাই বললাম- না ঘুম আসছে না। আমি আর খালামনি রাতের পর রাত বসে গল্প করেছি। খালামনির শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রেম-অপ্রেম, ভালোলাগা, মন্দলাগা, দাম্পত্য সবকিছু আমার কাছে মেলে ধরতেন কী চমৎকার করে! সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সবুজশাড়ি গায়ে জঙ্গলে দৌড়ে পালানো অথবা সেই সময়ে ডোমের গল্প। এখন মনে হয় সেসব কি কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম! সে এক ইলিয়াড অথবা ওডিসি। যেন মধ্যরাতে স্বর্গ থেকে নেমে আসা ত্রিকালদর্শী টিরেসিয়াসের মত প্রত্ননারী বর্ণনা করে গেছে সময়ের। সেই সব সুবিনিদ্র রাতগুলো আমি আর খালামনি- পৃথিবীর দুই নারী। একজন যৌবনের শেষ প্রান্তে আর আমি তখন সদ্য তরুণী। আমি শুনি খালামনির জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া এবং না পাওয়া, মৃত সন্তানের গল্প, একজন নাট্যকারের প্রতিটি লেখার স্মৃতিগুলো। আর খালামনি শুনতো আমার স্বপ্ন, আমার ভালোলাগা আমার ছোট্ট পৃথিবীর কথা, তারপর আমার পৃথিবীর মানুষগুলোও আস্তে আস্তে জুড়ে গেলো খালামনির সাথে।

খালামনির লেখার হাত ছিলো অসাধারণ, ঝরঝরে গদ্য লিখতেন তিনি, দারুণ সুখপাঠ্য। লিখতেন আর রাতে আমাকে সেইসব লেখা পড়ে শোনাতেন। খালামনির নিজের অনেক কিছু হবার যোগ্যতা ছিলো। উনি স্কুলের না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারতেন, কিংবা একজন ঔপন্যাসিক হতে পারতেন। কিন্তু তিনি পৃথিবীর একজন অসামান্য নাট্যকারকে গড়ে উঠবার জন্য হাত ধরে পাশে থেকেছেন, নিজেকে সমর্পণ করেছেন।

মেহেরুন্নেসা সেলিমের পড়াশোনার পরিধি ছিলো বিশাল, সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা, ইতিহাস। আমি খালামনিকে সমকালীন কবিতা শোনাতাম, সেলিম আল দীনের সব লেখার প্রথম পাঠক ছিলেন তাঁর স্ত্রী পারুল, মেহেরুন্নেসা সেলিম। এবং সেলিম আল দীন তাঁর পারুলের প্রতিটা মতামত খুব গুরুত্বের সাথে নিতেন এবং সেই মতই পরিমার্জন পরিবর্ধন করতেন তাঁর লেখা। সেলিম আল দীন তার পারুল সম্পর্কে বলতেন- ‘ভীষণ রুচিবান এই মহিলা কখনো মিথ্যা বলে না। আমার পছন্দ না হলে তর্ক ঠিকই করি কিন্তু আমি জানি সে সত্যিটাই বলে।’ আমি আমার এই জীবনে খালামনির মত নির্লোভ নারী দেখিনি। চাওয়া এত কম ছিলো যা সত্যি ওনাকে কাছ থেকে কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। অনেকবার খালামনির জন্য অনেককিছু নিয়ে গেছি। মা হয়তো শাড়ি পাঠিয়েছে বা অন্যকিছু। আমি একবার খালামনির জন্য একটা ক্যাকটাস এনেছিলাম। তাঁর চোখেমুখে খুশির ঝিলিক! এত আনন্দিত কিছু পেয়ে হতে দেখিনি এর আগে আমি। কোনো মানুষ যে ভোগবিবাগী হতে পারে আমি খালামনিকে কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, খালামনির জন্ম হয়ত সীতার মত ভূমি থেকে তাই এত নির্লোভ, প্রকৃতিবাদী। উল্কাঝড়ের রাতে আমি দেখেছি একজন অর্ধশত বয়সী নারী কী করে শিশু হয়ে যায়! মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি দেখে, এসএম সুলতানের বাড়ি দেখে কেমন আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। আমি যখন কোনো সুন্দর জায়গাতে যাই- আমার মনে একটা আফসোস থাকে, আহা খালামনি যদি আমার পাশে থাকতো!

খালামনিকে নিয়ে লিখবো বলে প্রায়ই বসি আমি, লিখতে পারি না, আর যা লেখা হয় পাঠক হয়তো ভাবতে পারে সেটা বাড়াবাড়ি। আসলে খালামনির জন্য কিছু লেখা মানে সেইসব তুলে আনা যেখানে থাকবে, তিনি কত বঞ্চিত হয়েছেন, কত কষ্ট পেয়েছেন, কীভাবে কষ্ট আড়াল করেছেন। কীভাবে একজন মেধাবী নাট্যকারের ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছেন, শাড়ির ছেঁড়া অংশ কুচির মধ্যে ফেলে স্কুলে ক্লাস করতে গেছেন। পরীক্ষার প্রশ্ন করার জন্য বেশি কাগজ চেয়ে এনেছেন স্কুল থেকে, কারণ সেলিম আল দীন লিখবেন সে কাগজে। অনেক পরে যখন নাট্যকার সেলিম আল দীনের লেখার কাগজ হিসাববিহীন, সেসব সময়েও খালামনিকে দেখেছি স্কুলের পুরানো প্রশ্ন বা ব্যবহৃত কাগজের খালি অংশে নিজের লেখাগুলো লিখেছেন। কারণ তিনি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন মিতব্যয়িতায়। আমি জানি না পাঠকদের বোঝাতে পারছি কি না?

খালামনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, মামা তখন খালামনিকে ভালোবাসেন, রোকেয়া হলে যান কল দিতে, এক টুকরো কাগজে কল দিতেন, পারুল নামে কখোনো বা আমার মায়ের নাম তরী নাম লিখে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খালামনি সেলিম আল দীনের হাতে লেখা সেই ছোট নাম লেখা কাগজের টুকরোগুলো বুকে আগলে রেখেছেন। আমৃত্যু স্বপ্ন দেখেছেন সেলিম আল দীন এর নামে যাদুঘর হবে। একদিন নিশ্চয় হবে। একজন শুদ্ধ মানুষের অন্তিম চাওয়া নিশ্চয় বিফলে যাবে না। খালামনির আরেকটা দুর্বলতার নাম অন্বিতা। সেবুন্তী স্বরূপা অন্বিতা। খালামনি সবচেয়ে ভালোবাসার তিনজন মানুষ- পুত্র, স্বামী ও অন্বিতা এই তিনজনের মৃত্যুর শোকের ভিতর দিয়ে গেছেন ।

খালামনির মত জীবনবাদী মানুষ আমি কম দেখেছি! সব কিছুর মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে পেতেন। এত মায়াবতী ছিলেন! আর সহ্য করতে পারতেন না মিথ্যা। সেলিম আল দীন ছিলেন একজন বৃহৎ শিশু। এই শিশুকে আগলাতে যথেষ্ঠ বেগ পেতে হতো তাঁর। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাবতো পছন্দ করেন না এই শিশুকে। আদতে সত্যি কথা হলো পাগলের মত ভালোবাসতেন। সেটা বোঝা যেতো সেলিম আল দীনের শরীরটা কখোনো খারাপ করলে। ছটফট করতেন। আসলে খুব কাছের কাউকে হৃদয়ের নিকটের কাউকে নিয়ে লেখা সত্যিই কঠিন। খালামনিবিহীন আমি সত্যি একা। একবার ইউনিভার্সিটিতে আমার শরীর খুব খারাপ। খালামনির বাসায় যেতে পারছি না। নিচে গিয়ে ফোন দিলাম। মামা ফোন ধরলো। আমি হ্যালো বলতেই মামা বললেন মা তোর কী হয়েছে? কী ব্যাকুলভাবে বললেন, আমার অসম্ভব আনন্দের মধ্যেও সেই কণ্ঠস্বর মনে হলে আজও আমি অশ্রু থামাতে পারি না। অথবা একদিন সকালে বাসায় গেলে মশারির মধ্যে থেকে খালমনি বলেছিলো- তন্বী আসলি মা। সেবার অনেকদিন বাড়ি যাইনি পরীক্ষার কারণে। খালামনির ওই মায়াকাড়া ডাক- মশারির মধ্যে গিয়ে নিঃশব্দে কেঁদেছিলাম। আমার ছোটোখাটো গোপন শখ, দুঃখ, আনন্দের সাথী আমার খালামনি। আমাকে যদি কেউ বলে পৃথিবীতে একজন ভালোমানুষের কথা বলো- আমি বলবো আমার পারুল খালামনি। কোনো আবেগের জায়গা থেকে নয়। আবেগের জায়গা থেকে বললে মানুষ নিজের মায়ের কথা বলে। আমি আমার মায়ের কথা না, এমন কী মায়ের আপন বোনের কথাও না, তার বান্ধবীর কথা বলছি। আমার সোলমেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *