প্রিয় পারুলভাবিও স্মৃতি হয়ে গেলেন

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

আসাদুল্লাহ ফারাজী
পারুলভাবির সাথে রক্তের বন্ধন নেই, আত্মীয়সূত্রের পরিচয় ছিলো না, পাড়া- প্রতিবেশীও নয়, তবুও পারুলভাবি প্রিয়জন, আপন মানুষ, আমার শ্রদ্ধার একজন। প্রিয় নাট্যগুরু- নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন যিনি মাটির সাথে মিশে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া বাংলা নাটককে মাটির গভীর তলদেশ থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে ছিন্ন-বিছিন্ন হাড়গোড় তুলে এনে জোড়া লাগিয়ে দেখিয়ে দিলেনÑ এই তোমার হাজারবছরের নাট্যরীতি, আর এই তোমার বাংলা নাটক। পাশ্চাত্য নয়, প্রাচ্যের সমৃদ্ধ বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিই তোমার শিকড়, এই তোমার উত্তরপুরুষের সংস্কৃতির পথনির্দেশ। খেয়ালি, উড়নচÐী শিল্প¯্রষ্টা নাট্যকার সেলিম আল দীনের সহধর্মিনী মহিয়সী নারী পারুলভাবিকে নিয়ে অনেক স্মৃতির কিছুটা আলোকপাতের চেষ্টা। তিনি ইতোমধ্যেই আমাদের নাগালের বাইরে।

১৯৮৩ সালে সেলিম আল দীনের বাসায় প্রথম গিয়েছি গ্রাম থিয়েটারে যুক্ত হবো বলে। স্যার কেরামতমঙ্গল নাটক লেখায় ব্যস্ত। খাবার টেবিলে বসে লিখছেন। আমরা সামনে বসলাম। স্যারের ব্যস্ততার কথা জানালেন। গ্রাম থিয়েটারে যুক্ত হতে হলে কী কী করতে হবে, কী আদর্শ, সাংগঠনিক ধারা কেমন হবে, তা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন। একসময় হাঁক ছাড়লেনÑ ‘পারুল, চা দাও।’ একটু পরে ভাবি চা-নাস্তা নিয়ে এলেন। স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেনÑ ‘তোমাদের ভাবি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক, ডাবল এমএ।’ ভাবি স্মিত হাসলেন। ছিপছিপে গড়ন, গায়ের রং ফর্সা, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, নিরাভরণ ভাবিকে দেখে অত্যন্ত ব্যক্তিত্ববান মনে হলো।

আমরা যারা গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলাম তাদের জন্য সেলিম আল দীনের বাসা নাটক শেখার আশ্রমে পরিণত হয়। বিশেষ করে নাটক লেখার ইচ্ছে যাদের ছিল, তাদের সেলিম আল দীন বাসায় এসে থাকার আমন্ত্রণ জানাতেন এবং আমরা তিন, পাঁচ, সাতদিন পর্যন্ত তাঁর বাসায় থেকে নাটক লেখার সবক নিয়েছি। আর এই যে, প্রায়ই গিয়ে থাকা হতো, খানা-দানা, চা নাস্তা, বাসায় বাড়তি মানুষের বিড়ম্বনা ভাবিকে সইতে হতো। সইতে হতো বললে কিছুটা অবিচার করা হয়, তিনি আনন্দে আমাদের উপস্থিতি গ্রহণ করতেন। শিক্ষকতা পেশায় খাটুনি খেটেও সঙ্গ দিতেন, গল্প করতেন, নানা ব্যঞ্জন তৈরি করে পরম আদরে সাথে নিয়ে খেতেন। ভাবির হাতের রান্না ছিল অসাধারণ। একদিন দুপুরে খাবার সময় আরিচা থেকে আগেরদিন কিনে আনা পাঙাশ মাছের এত্তবড় একটা টুকরো পাতে উঠিয়ে দিলেন স্যার। অর্ধেক না খেতেই ভাবি আর একটি টুকরো হঠাৎ উঠিয়ে দিলেন। মাছ অত্যন্ত প্রিয় খাবার আমার, কিন্তু বেশি খেতে পারি না। বললাম খেতে পারবো না ভাবি। স্যার বললেনÑ ‘দাম জানিস? আঠারোশত টাকা, আরিচা গিয়ে যমুনার তাজা মাছ এনেছি।’ ভাবি বললেন- ‘পাবে কোথায় এই মাছ। আর আমরা ছাড়া কে খাওয়াবে আদর করে? (তখনো চাষের পাঙাশ বাজারে আসেনি) তোমার স্যার তোমার বউয়ের খুব গল্প করে। তোমার বউ নাকি অনেক পদ করে খাইয়েছে, রান্নাও চমৎকার।’ আমি বললামÑ ‘আপনার রান্নার মত নয়।’ স্যার বললেনÑ ‘তোর ভাবির রান্না অবশ্যই ভালো। কিন্তু তোর বউয়ের রান্নাও, বাহ্!’

প্রথম সাক্ষাতের সময় সেলিম আল দীনকে জানিয়েছিলাম যে, আমার দু-তিনটি নাটক আছে। স্যার বললেনÑ ‘তাই? স্ক্রিপ্ট এনেছ?’ মাথা নেড়ে না করলাম। বললেনÑ ‘ঠিক আছে, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে স্ক্রিপ্ট নিয়ে চলে আসো।’ এমন আহŸানে আশ্চর্য হয়ে কয়েকদিন পর স্ক্রিপ্ট পাঠিয়ে দিলাম ডাক যোগে। তারও সপ্তাহ পরে স্যারের চিঠিÑ ‘নাটক পড়ে ভাল লেগেছে। তুমি আমার বাসায় চলে আসো। লেখা নিয়ে আলোচনা করব।’ পত্র পেয়ে দ্রæতই চলে গেলাম। বাঙলা ডিপার্টমেন্টে গিয়ে সাক্ষাৎ করলাম। কাজ শেষ করে বললেনÑ ‘চলো, বাসায় চলো। আজ যাবে না, থাকবে আমার বাসায়।’ থাকবো বলে যাইনি জাহাঙ্গীরনগর। তবুও না করার সাহস হলো না। হেঁটে হেঁটে প্রান্তিকের কাছে বাসায় চলে গেলাম। বাসায় ঢোকার পরেই ভাবি একটি বড় বগি থালা স্যারের সামনে ধরে বললেনÑ ‘তোমার জন্য এনেছি। খেতে গিয়ে ভাত ফেলে কাড়ি করো। এখন আর পড়বে না।’ ভাবি আনন্দ করার জন্য বললেন, কিন্তু নতুন মানুষের সামনে এমন গোপন প্রকাশ করার জন্য কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে স্যার বললেনÑ ‘১২ বছর মাস্টারি করলে মানুষ যে বোকা হয়ে যায় তার প্রমাণ তুমি।’ ভাবির উচ্ছ¡াস থেমে গেল। উনিও আমার সামনে এভাবে বলায় লজ্জা পেয়ে মন খারাপ করে অন্য কামরায় চলে গেলেন। সন্ধ্যার আগে ভাবিকে হাঁক ছাড়লেন স্যারÑ ‘পারুল, চা দাও।’ কিছুক্ষণ পর ভাবি চা দিয়ে চলে গেলেন। ঘণ্টা খানেক পর তখন রাত নেমেছে, ভাবির রাগও কমেছে খানিকটা। চা এনে কাছে বসে আমাকে কী যেন জানতে চেয়ে ‘আপনি’ সম্মোধন করায় স্যার বললেনÑ ‘ওকে আপনি বলছ কেন? তোমার ছোট হবে। তোর কত হলোরে?’ স্যার তুমি থেকে ‘তুই’তে নেমে এলেন। মানুষকে সহজেই আপন করার কী দুর্দান্ত শক্তি। আমার বয়স জানালে স্যার বললেন তোমার চার বছরের ছোট। সেদিন থেকে ভাবি তুমি বলেই সম্মোধন করতেন। রাতে স্যার প্রান্তিকের দিকে গেলেন। ফাঁকা পেয়েই ভাবি আপন মানুষের মত কাছে এসে অভিযোগ করলেনÑ ‘কী এমন বলেছিলাম যে, তোমার সামনে লজ্জা দিতে হবে?’ ভাবিকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। ভাবির অভিমান কমে না। বললেনÑ ‘শোন, তোমার স্যারের জন্য জীবনে অনেক ছাড় দিয়েছি। তাঁর মত পাগলের সাথে আমি ছাড়া অন্য মহিলা তিনদিনও সংসার করতে পারবে না। রাত জেগে লেখে, আমিও রাত জেগে চা বানিয়ে দেই, নাস্তা দেই।’ একদিনেই ভাবি আমার আপজন হয়ে গেলেন। আমি যেন কতদিনের চেনা কেউ। পরবর্তীতে যতবার গিয়েছি ভাবি তখন বড় বোনে পরিণত হয়েছেন। সেলিম আল দীন বাসায় না থাকলে সঙ্গ দিয়েছেন, আলাপ করেছেন। কথা প্রসঙ্গে স্যারের দোষ-গুণ সবই ব্যক্ত করেছেন। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষকে আপন করে নেয়ার যোগ্যতা স্যারের তো ছিলই, ভাবিও ছিলেন অকৃত্রিম।

গ্রাম থিয়েটারে যুক্ত হয়ে সেলিম আল দীনের সাহচর্য পেয়েছিলাম, বিশেষ করে আমার কথাই যদি বলি, তাহলে বলতে হবে, একজন অর্ধশিক্ষিত ক্ষুদ্র নাট্যকারকে ঘষে-মেজে নাটক লেখায়, পরিচালনায় এবং অভিনয়ে সামান্য হলেও শৈল্পিকধারায় চলতে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন সেলিম আল দীন। পাশাপাশি, বাসায় ভাবির আতিথেয়তায়, আন্তরিকতায় আপন করে নেয়ার মনোভাবের জন্যই একজন আসাদুল্লাহ ফারাজী হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। সেলিম আল দীন ছিলেন একটি সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান। সে প্রতিষ্ঠানের সচেতন কেয়ারটেকার ছিলেন পারুলভাবি।

স্যার হঠাৎই ‘নাই’ হয়ে গেলেন। অপূরণীয় ক্ষতি হলো আমার, আমাদের, গ্রাম থিয়েটারের তথা বাংলা নাটকের। স্যারের জীবদ্দশায় ভাবি সব অনুষ্ঠানে যেতেন এমন নয়, কিন্তু স্যারের প্রয়াণের পর গ্রাম থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার কিংবা স্যারকে নিয়ে কোন অনুষ্ঠান বা স্যারের নাটকের শো’তে ভাবি উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। ভাবিকে দেখলে যেন স্যারের উপস্থিতি টের পেতাম। খুব ভালো লাগতো। কথা বিনিময় হতো। স্মৃতিচারণ হতো। স্যারের অনুপস্থিতি ভাবির অবয়বেও সুস্পষ্ট ছাপ ফেলেছিল।

একদিনের স্মৃতি আমাকে বড় পীড়া দেয়, ভুলতে পারি না দিনটিকে। গ্রাম থিয়েটার ৭ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা শিল্পকলার মাঠে প্যান্ডেল করে। দক্ষিণ দিকে দেয়াল ঘেষে খাবার প্যান্ডেল। আমরা কয়েক জন দুপুরের খাবার বিকেল চারটে নাগাদ খেয়ে প্যান্ডেলের বাইরে চেয়ার পেতে বসে আয়েশ করে সিগারেট টানছি। এমন সময় কোথা থেকে পারুলভাবি এসে আমার পাশের চেয়ারে খুব কাছাকাছি বসে পড়লেন। ধূমপান করছি বলে উঠতে যাবো, এমন সময় ভাবি দ্রæত বললেন ‘বসো’। আমি সিগারেট টানছি ভাবি। ভাবি বললেনÑ ‘তোমাকে সিগারেট টানতে দেখেই এগিয়ে এলাম। তুমি আর সেলিম একসাথে সিগারেট টেনেছ অনেক। দূর থেকে কিছু স্মৃতি মুহূর্তেই ভেসে উঠলো চোখে। তোমার সিগারেটের ঘ্রাণ নিতে এলাম।’ আমি থমকে গেলাম। সহসা কথা বলতেও পারছি না, সিগারেটে টানও দিতে পারছি না। ভাবিই পরিবেশ হালকা করে নিলেনÑ ‘আরে টানো তুমি। বিখ্যাত ধূমপায়ীর সংসার করেছি আমি।’ ভাবি আমার অবস্থা বুঝতে পেরে অন্য প্রসঙ্গে আলাপ ঘুরিয়ে দিলেন। কিন্তু যতই হোক, ভাবি কাছে আসলে ঘুরেফিরে সেলিম স্যারকে নিয়েই কথা হতো।

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ৬ষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে দিনরাতব্যাপী অনুষ্ঠানে আমার বক্তৃতা গড়ালো গিয়ে গভীর রাতে। তখনো প্যান্ডেলে শ’পাঁচেক গ্রাম থিয়েটারকর্মী ও সুধী মহল উপস্থিত। সেলিম আল দীন বিহীন প্রথম সম্মেলন এটি। সম্মেলনে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতেও কোথায় যেনো অলঙ্কারবিহীন অনুষ্ঠান মনে হচ্ছিল। বক্তৃতায় স্যারের প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে অঝোরে কাঁদলাম। মঞ্চ থেকে নেমে এলে ভাবি ডেকে তাঁর পাশের চেয়ারে বসিয়ে বললেনÑ ‘তুমি কেঁদেছো আমাকেও কাঁদিয়েছো।’ সব স্মৃতি মনে নেই, থাকলেও লেখার বিস্তৃতি বেড়ে যায়। ভাবির এমন কিছু বয়স হয়েছিল না, চলাফেরা করতেন অনায়াসেই। তিনি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে লাভবান হতো গ্রাম থিয়েটার, লাভবান হতাম আমরা।

ভাবি যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক, অ¤øান থাকুক আমাদের স্মৃতিতে, এই কামনা ক্ষুদ্র নাট্যকর্মীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *