মান্নান ভাই নেই!

১০ জুলাই, ২০২০
সকাল থেকে মহা অম্বরে চলছিল দিবামণি’র লুকোচুরি খেলা। এই মেঘ ফাটা রোদ, আবার এই কালো আঁধারে ঢেকে যাওয়া, মেঘের গর্তে আদিত্য দেবতার লুকিয়ে যাওয়া। এই বাতাস ধীরলয়ে, আবার এই ক্ষেপে এক ঝাপটা বয়ে যাওয়া। প্রকৃতির পাগলাটে কান্ড। করোনার কারণে ঘরবন্দী হয়ে নতুন নাটক “মুঘল কন্যা জাহানারা ” লিখছি। মুঘল সাম্রাজ্যের সেই অসাধারণ রমনীর উপাখ্যান। ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা এক অনন্যা রাজকন্যার কথকথা। ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্য, সিংহাসন, হত্যা, রাজনীতি এ সবের মধ্যে বেড়ে ওঠা জাহানারা। সম্রাট শাহাজানের দ্বিতীয় কণ্যা ছিলেন বুদ্ধিমতী ও সাহসী। সিংহাসনে বসেননি কোনদিন তবুও সম্রাজ্ঞীর মহিমায় ইতিহাসে চির অমর। ইতিহাস খুঁড়েখুঁড়ে লিখছি জাহানারা নাটক। আগামিতে বগুড়া থিয়েটারের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ করার ইচ্ছা আছে।

মান্নান ভাই নেই, এ কেমন কথা : খাওয়া দাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকাল ৪টার দিকে আবার লেখায় মনোযোগ দিলাম। এমন সময় মোবাইল খুব বিরক্ত হলাম। সাধারণত লেখার সময় মোবাইল বন্ধ রাখি, হয়তো ভুলবসত……. অপর প্রান্ত থেকে শিশু একাডেমির পরিচালক ইসহাক ভাই। বল্লেন, খবর শুনেছেন কি?
মান্নান ভাই আর নেই। মান্নান ভাই! কোন মান্নান? ইসহাক ভাই বল্লেন, ভাইরে আমাদের মান্নান ভাই, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক, সবুজ নার্সারির সত্ত্বাধিকারী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান।
বিনা মেঘে বজ্রপাত! লেখা বন্ধ করে বসে পরলাম পড়ার ঘরের মেঝেতে। বুকের মধ্যে কষ্টে, বেদনায় মোচড় দিয়ে ওঠলো। শোকাহত হয়ে বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। বাহিরে তাকিয়ে দেখি পাগলের মতো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালায় এসে দাঁড়ালাম, বৃষ্টির দাপটে কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে প্রকৃতি। হাওয়ার শব্দে কেমন যেন বেদনার সুর।
অকষ্মাৎ আমার শ্রবনে পরিচিত ধ্বনি, “ক্যারে বারে ময়না, কেংকা আছো? লতুন নাটক লিখিচ্ছু? আরে তুমি তো হামাক ভুল্যাই গ্যাছ, নাটকত আর ডাকো না। আমাকে দেখলেই বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় কথামালা গাঁথতো ভালোবাসায়।

আব্দুল মান্নান, আমাদের মান্নান ভাই। পরিচয় ৮২ সালের দিকে। আমি তখন ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত। মান্নান ভাই জাসদের সাথে, আমি ছাত্রলীগের সাথে। আমার সাথে ছিল, আলম ভাই, বন্ধু শংকর, বিজু, আরো অনেকে। খান মার্কেটের বিশাল অংশ তখন ফাঁকা, মাঝে ছোট আঁধা পাকা ঘর। সেই ঘরেই চলতো পার্টির কার্যক্রম। আমরা প্রায়ই যেতাম পার্টি অফিসে, কখনো মিটিং কখনো আড্ডা দিতে। ঐ অফিসে কেউ না থাকলে প্রতিদিন মান্নান ভাইকে পাওয়া যেতই। সারদিন কখনো রাজনীতি নিয়ে আলোচনা, কখনো হৈ হুল্লড়। খুব রসিক মানুষ ছিলেন মান্নান ভাই। সাথে যুক্ত হতেন আলম ভাই। আমাদের বসিয়ে গল্প করতেন, আমরা শুনতাম আর হাসিতে লুটিয়ে পরতাম। আড্ডায় তিনি প্রায়ই একটা শব্দ ব্যবহার করতেন “দ্রবাদি “। কেন বলতেন তা এখন আর মনে করতে পারছি না। বন্ধু শংকর হয়ত বলতে পারবে। আর একারনে আমার সাথে যখনই দেখা হতো, বলতাম, দ্রবাদি । তিনিও তাঁর স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলতেন, “দ্রবাদি”।

স্মৃতির রঙিন পর্দায় একে একে দৃশ্যত হতে থাকলো নানা ছবি। প্রানের মাধুরী মাখা আনন্দিত মধুর দিনগুলি। কুজনে গুঞ্জনে কেঁপে ওঠে অতীতের সেই প্রীতিঘন ধ্বনি। বুকের ভিতর পুনর্বার ক্ষত হয়ে তপ্ত রক্ত ঝরে। ভেসে ওঠে সেই হাস্বজ্জ্বল সুন্দর মানুষ……আব্দুল মান্নান, আমাদের মান্নান ভাই।
মেঘগুলো গলেগলে বিষাদবৃষ্টি হয়ে গেলো। হায়! আর কোনদিন আমাদের শিল্প উঠানে পড়বে না সৃষ্টির বৃষ্টিপাত, শিল্পের বীজতলা খুঁড়ে আর পাবো না আমাদের মান্নান ভাইকে। যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন।
(তৌফিক হাসান ময়না এর ফেসবুক থেকে পুণঃপ্রকাশিত।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *