শেখ কামাল : তারুণ্যের প্রতীক

নাসির উদ্দীন ইউসুফ
বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামাল ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক। তারুণ্যের যে শক্তি, তারুণ্যের যে সাহস, তারুণ্যের যে দৃষ্টির অসীমতা, দিগন্ত পর্যন্ত দেখে ফেলার যে দৃষ্টি-ক্ষমতা এই সকল কিছু শেখ কামালের মধ্যে ছিল। শেখ কামালকে শুধুমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান হিসেবে চিহ্নিত করলে আমরা তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরতে ব্যর্থ হবো। তিনি একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, ক্রীড়া সংগঠক এবং একজন নিষ্ঠাবান সংস্কৃতিকর্মী। এত গুণ একসাথে সহজে দেখা যায় না। এটা তাঁর পিতারও ছিলো। বঙ্গবন্ধু কবিতা ভালোবাসতেন, গান ভালোবাসতেন। সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন কখনো নৌকায়, কখনো ট্রেনে, কখনো গাড়িতে, কখনো বাসে। একটু অবসর পেলে নৌকায় যাওয়ার পথে অথবা জাহাজে, কর্মীদের বলেছেন-‘গান করো। দেশের গান করো, পল্লীগীতি শোনাও, রবীন্দ্রসঙ্গীত-নজরুলগীতি গাও।’ আবার নিজেও গান করেছেন। এবং আমরা প্রায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি জনসভায় যখনই উপস্থিত হতে পেরেছি তখন তাঁর কণ্ঠে অসাধারণ সব কবিতার পঙক্তি শুনতে পেতাম। এর মধ্যে দিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতার যে সাংস্কৃতিক পরিচয় আমরা পাই এবং যে মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন একটি চরিত্র আমাদের সামনে দাঁড়ায়, সেটি বঙ্গবন্ধুর মত শেখ কামালের মধ্যেও ছিল।

আমরা ছাত্রজীবন থেকে সহযাত্রী। ছোট বেলার কথা বাদই দিলাম না হয়। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, জানতে শিখেছি। পাকিস্তানের শোষণ-শাসন নির্যাতনের বিষয়গুলি যখন থেকে আমলে নেওয়া শুরু করেছি, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দিনের পর দিন জেলে, তখন আমরা ছাত্রকর্মী হিসেবে আন্দোলনকর্মী হিসেবে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যে আন্দোলনগুলো করেছি সেখানে শেখ কামাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমি ১৯৬৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বলতে পারবো শেখ কামালের ভূমিকা। আমরা একসাথে মিছিল করেছি। ‘আইয়ুব শাহী নিপাত যাক, পিন্ডি না-ঢাকা! ঢাকা ঢাকা’। ‘জয় বাংলা’। এবং ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব-শেখ মুজিব’। নানা রকম স্লোগান। আরো কিছু স্লোগান ছিল, দুই পাকিস্তানের অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের যে বৈষম্য ছিল তা নিয়ে। সে বৈষম্য নিয়ে শেখ কামাল খুব সুন্দর করে প্যারোডি আকারে আমাদের মিছিলে পরিবেশন করতেন। সেটা খুব আকর্ষণ করতো জনগণকে। রিকশাওয়ালাকে, দোকানদারকে, মুটে-মজুরদেরকে, সাধারণ মানুষকে, অফিস ফেরত বা অফিসগামী মানুষকে। ‘ওই ষাট টাকা মণ চাল খেয়ে স্বর্গে যাবো গো, আইয়ুব খানের লেজ ধরে স্বর্গে যাবো গো। পিন্ডির ঘাড়ে চড়ে স্বর্গে যাবো গো।’ এরকম নানা রকম কথা তিনি ছন্দে ছন্দে বলতেন এবং তিনি ভালো স্টেপিং করতেন অর্থাৎ তাঁর পায়ের ছন্দ ছিল। ঢোল করতাল এসব নিয়ে তাঁর সাথে একটা দল থাকতো। তিনি তাদের তালে তালে এসব গাইতেন। পুরো মিছিলগুলো এবং জনসভাগুলোকে তিনি প্রাণবন্ত করে তুলতেন। আর তিনি সচরাচর বক্তৃতা দিতেন না। জনতার মাঝেই থাকতেন। এটি তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিলো।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় যে, মিছিলে যেতে যেতে অনেকে অসুস্থ হতো। প্রচণ্ড গরমে অনেকদূর হাঁটতে হতো। সেই কলাভবন থেকে শুরু করে আজিমপুর হয়ে, বকশিবাজার, চকবাজার, সদরঘাট, নবাবপুর হয়ে মিছিল পল্টন ময়দানে পৌঁছাতো। অনেকে রাস্তায় অসুস্থ হতো। অনেকের তৃষ্ণা পেতো। কামাল দৌড়ে গিয়ে চায়ের দোকান থেকে অথবা আশপাশের বাড়ি-ঘর থেকে পানি এনে সবাইকে খাওয়াতেন। আবার কাউকে হাসপাতলে নিয়ে যেতে হচ্ছে সেই ব্যবস্থা করে দিতেন। এই কাজগুলো শেখ কামালই করতেন। এগুলো আসলে আমাদের নেতাদের কাজ নয়, এটা শেখ কামালের মতো রাজনৈতিক কর্মীর কাজ। তাঁর থেকে আশা করা যায়ও। আশা করেছিলাম, আমরা পেয়েছিও।

১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থানে, অর্থাৎ যে অভ্যুত্থানের কারণে বাঙালি জাতির নেতা শেখ মুজিবর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মক্তি পান, সেই অভ্যুত্থানকালে দিনের পর দিন, শেখ কামাল অমানসিক পরিশ্রম করেছিলেন এবং সংগঠিত করেছিলেন পুরো ঢাকা শহরকে, দেশকে, ছাত্রসমাজকে। অবশ্য ছাত্রনেতারাও কাজ করেছিলেন সমান তালে। তোফায়েল আহমেদের আব্দুর রাজ্জাক, রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরীর মত ছাত্র ও যুব নেতারা সফলভাবে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন। শেখ কামাল ছাত্র যুবকদের সংগঠিত করার কাজে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুবকদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। শেখ মুজিবর রহমানকে যেদিন বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়, সেদিন রেসকোর্স ময়দানে তোফায়েল আহমেদের উচ্চারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়। তখনও আমরা দেখি শেখ কামাল কি চমৎকারভাবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সারা মাঠকে প্রকম্পিত করছেন। পুরো জনসমাবেশ উদ্বেলিত হয়ে ছিল তাঁর সেই কণ্ঠ শুনে। এগুলো আমাদের দেখা।

এইভাবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনেও তাঁর একটা বড় ভূমিকা আছে। প্রতিটি মহল্লায় পাড়ায় গিয়ে সবার দেখভাল করেছেন। বুঝতে চেয়েছেন কার কি সুবিধা। কোথায় কি অসুবিধা। কিভাবে শ্রমিকদের সাথে আমরা আমাদের আন্দোলন সম্পৃক্ত করছি। কিভাবে আমরা সাধারণ মানুষ, মুটে-মজুরদের সম্পৃক্ত করছি, দোকানদারকে সম্পৃক্ত করছি, গৃহিণীদের সম্পৃক্ত করছি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আবার একইসাথে তখন তিনি ছায়ানটে পাঠ নিচ্ছেন সেতার বাজানোর। তিনি সেতার বাজাতে পারতেন, তবলা বাজাতে পারতেন, গিটার বাজাতে পারতেন, হারমোনিয়ামও বাজাতে পারতেন। এগুলো কিন্তু সবার একসাথে থাকে না। এই মানুষটি সেই তাল ও ছন্দের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের মিছিলগুলোকে একটি কট্টর রাজনৈতিক অভিব্যক্তি থেকে, সুনির্দিষ্ট সুর-ছন্দ-তাল-লয়ের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অভিব্যক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। এটি তাঁর বড় অবদান।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি যোগদান করেন। বাংলদেশ সেনাবাহিনীর ‘১ম মূর্তি’র একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা সদস্য। আমার সাথে তাঁর একবার মুজিবনগর সচিবালয়, ৮ নম্বর থিয়েটার রোড, কলকাতায় দেখা হয়েছিল। সাথে শেখ কামালের সহপাঠী-বন্ধু কাজী সাহাবুদ্দিন শাহজাহান বেবী, ও অনুজ মুক্তিযোদ্ধা রাইসুল ইসলাম আসাদ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর কক্ষের পাশে একটি কক্ষে আমরা শেখ কামালকে বসে থাকতে দেখি। সেখানে ক্যাপ্টেন নূর (পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের খুনি, বঙ্গবন্ধু ও শেখ কামালের হত্যাকারী মেজর নূর)কে একই কক্ষে দেখতে পাই। আমাদের তিনজনকে দেখে শেখ কামাল চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠেন। কোথা থেকে এসেছি, কিভাবে এসেছি, কি করছি, কোথায় আছি, কোন সেক্টরে জয়েন করেছি, কি খেয়েছি, কেমন আছি ইত্যাদি প্রশ্নে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন। তারপর আমাদেরকে সাথে নিয়ে মুজিবনগর সরকারের সচিবালয় থেকে বের হয়ে সচিবালয়ের উল্টো দিকে ছোট্ট একটি দোকানে নিয়ে গেলেন খাওয়াতে। আমরা তিনজন আপত্তি করলে কামাল সহাস্যে বলেন, ‘আরে বন্ধু আমি তো অল্পকিছু বেতন পাচ্ছি এখানে চাকুরি করে। এখানে তো আমি ডিউটিতে আছি। তোমাদেরকে আমি খাওয়াবো।’ সে আমাদেরকে দুপুরের খাওয়ালো এবং দুই ঘন্টার একটি তুখোড় আড্ডা হলো। আমার মনে আছে সেখানে মোল্লা জালালকে দেখেছিলাম, নূরে আলম সিদ্দিকীকে দেখেছিলাম, এইচ টি ইমাম সাহেবকে দেখেছিলাম। তখন এইচ টি ইমাম সাহেবকে সেইভাবে চিনতাম না। শেখ কামালই সবাইকে চিনিয়ে দিচ্ছিল।

একসাথে সবাইকে বুকে টেনে নিয়ে পথ চলতে জানতেন শেখ কামাল। আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, বেবী ছাত্র ইউনিয়ন করতো, শেখ কামাল ছাত্রলীগ করতো। এটি ৭০ পর্যন্ত, নির্বাচন পর্যন্ত, যুদ্ধের আগ পর্যন্ত। কিন্তু যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন আর ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগ বিষয়টি ছিল না। আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। দলের বিভাজন শেখ কামাল বুঝতেন না। শেখ কামাল মনে করতেন বাংলাদেশের সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন, মুক্তিযুদ্ধে যারা শরিক হবে সবাই তাঁর কমরেড। সবাই তাঁর বন্ধু। সবাই তাঁর সহযোদ্ধা। সবাই তাঁর সহযাত্রী। তিনি সেভাবেই সবাইকে দেখতেন এবং বিশ্বাস করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ও শেখ কামালের হত্যাকারী মেজর নূর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর সামরিক সচিব ছিলো। শেখ কামাল পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আমাদের নূরের সাথে। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাবো সেই নূর শেখ কামালকে ৭৫-এর ১৫ই আগস্টের প্রত্যুষে হত্যা করবে সেটা কে জানতো! ভাবা যায় না এইরকম ঘটনা। কিন্তু ইতিহাসে এইরকম ঘটনার সাক্ষাৎ আমরা আগেও পেয়েছি। তবে এত নৃশংস হত্যাকাণ্ড আধুনিক ইতিহাসে বিরল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সারাদেশে সাংস্কৃতিক জোয়ার আসে। দেশ মুক্ত ও স্বাধীন। বাঙালির ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি, বাঙালির নৃত্য, বাঙালির কবিতা, বাঙালির গল্প, বাঙালির নাটক, বাঙালির উপন্যাস, বাঙালির চলচ্চিত্র সকল কিছুই মুক্ত। সুতরাং সৃষ্টি হোক। তরুণ প্রজন্ম ঝাঁপিয়ে পড়ল সৃষ্টির নেশায়। শেখ কামালের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটল না। তিনি যতটুকু না রাজনৈতিক নেতা থাকলেন তার থেকে বেশি সাংস্কৃতিক কর্মী হয়ে উঠলেন। রাজনৈতিক কর্মী থেকে সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়টা তাঁর প্রধান হয়ে উঠলো। ম. হামিদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক। সেটা ১৯৭২ সাল। ডাকসুর উদ্যোগে ‘নাট্যচক্র’ নাট্যদল গঠিত হলো। শেখ কামাল ও আমি নাট্যচক্রের সহ-সভাপতি। সভাপতি হলেন ম. হামিদ। এবং আমরা একসাথে নবনাট্য আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যচক্রের নেতৃত্বে শুরু করলাম। তার কিছুদিন আগে কবির আনোয়ারের পারাপার নাট্যগোষ্ঠী নাটক শুরু করেছে। বহুবচনও নাটক শুরু করেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যে তরুণদের নতুন নাটক এটি কিন্তু শুরু করেছে নাট্যচক্র। নতুন ভাষা, নতুন আঙ্গিক, নতুন স্বপ্ন, নতুন ভাবনা, নতুন লেখার রীতি, নতুন বিষয়বস্তু, নতুন চরিত্র, এই সকল কিছু নতুন যখন হয়ে উঠছে তখন নাট্যচক্র এসে দাঁড়ায় এবং তরুণদেরকে সংগঠিত করে। অত্যন্ত মঞ্চ সফল নাট্য প্রয়োজনা নাট্যচক্র করেছিল। শেখ কামাল নাটকে চমৎকার অভিনয় করতো। ‘রোলার ও নিহত এলএমজি’ নাটকে শেখ কামাল অভিনয় করলেন। ‘এক্সপ্লোসিভ ও মুল সমস্যা’ নাটকে আমি অভিনয় করলাম। দুজন দুইটা নাটকে অভিনয় করলাম। শেখ কামাল নাটকে চমৎকার অভিনয় করলো। আমার অভিনয় খারাপই হলো। আমি অবশ্য টেকনিক্যাল কাজগুলি ভালো করতাম। এর মধ্যে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ডাকসুর আয়জনে আন্তঃহল নাট্য উৎসব আয়োজন করার সিন্ধান্ত হয়। ৭টি হল ৭টি নাটক। সেলিম আল দীন, ম. হামিদ, আবদুল কাদের, পীযুষ বন্দোপধ্যায় ও আমি মহসীন হলের ছাত্র। শেখ কামাল, আল মনসুর, সালাউদ্দিন জাকী, শফিকুর রহমান এসএম হলের ছাত্র। সেলিম আল দীন লিখলেন ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, আমি নির্দেশক। মহসীন হলের প্রযোজনা। আল মনসুর রচিত ও নির্দেশিত ‘রেভ্যুলেশন ও খ্রিস্টাব্দ সন্ধান’, এসএম হল প্রযোজনা। এছাড়া রোকেয়া হল, সর্যসেন হল, ঢাকা হল, শহীদুল্লাহ হলসহ সকল ছাত্রবাসের নিজস্ব নাট্যকার ও নিজস্ব নির্দেশক কর্তৃক প্রযোজিত নাটক মঞ্চায়নের প্রস্তুতি পূর্ণোদ্যমে শুরু হলো। ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে নিদিষ্ট দিনে নাট্য প্রতিযোগিতা শুরু হলো।

অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের চৌধুরীর সমন্বয়ে একটি বিচারক প্যানেল গঠিত হলো। ৭টি ছাত্রবাসে ৭টি নতুন নাটক। স¤পূর্ণ নতুন নাটক, নতুন আঙ্গিক, নতুন ভাষা, নতুন অভিব্যক্তি, নতুন চরিত্র, নতুন সংলাপ, নতুন প্রেক্ষাপট দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও ঢাকা নগরবাসী যুগপৎ বিস্ময় ও অভিভূত হলেন। শেখ কামালসহ একদল তরুণ চমৎকার অভিনয় করলেন। মহসিন হলের প্রযোজনা ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ বিচারক কর্তৃক শ্রেষ্ঠ নাটক ও প্রযোজনার মর্যাদা পেল। পুরস্কার ঘোষণার পর শেখ কামাল দৌড়ে এসে আমাকে ও সেলিম আল দীনকে অভিনন্দিত করলেন। আমি একটু বিব্রত হলাম। শত হলেও জাতির পিতার সন্তান, বঙ্গবন্ধুর সন্তান, প্রধানমন্ত্রীর সন্তান তাঁর নাটকটা প্রথম হয়ে যেতেই পারে। আমি জানি না আজকাল হলে হয়তো সেরকমই হতো। কিন্তু শেখ কামাল ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। প্রতিযোগিতা মুখ্য নয়। সদ্য স্বাধীন দেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নবযাত্রাই মুখ্য। উৎসবের পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম নাট্যচক্রের নাটকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের দর্শনের জন্য মঞ্চায়ন করবো। কিন্তু বাঁধ সাধলো ডাকসুর বিধি। ডাকসু প্রযোজিত নাটকসমূহ বা কোন অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে দর্শনীর বিনিময়ে করা যাবে না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এই নবধারার নাট্য আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি নতুন দল গঠন করবো।

শেখ কামাল, ম. হামিদ, কাজী সাহাবুদ্দিন শাহজাহান বেবী, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাইসুল ইসলাম আসাদ, হাবিবুল হাসান, আল মনসুর, কামাল আতাউর, আব্দুল কাদের ও আমিসহ গোটা ৫০জন মিলে আমরা নতুন নাট্যদল গঠন করি। নাট্যদলের নাম হল ‘ঢাকা থিয়েটার’। নামটি দিয়েছিলেন ম. হামিদ। ১৯৭৩ সালে ঢাকা থিয়েটার পল্টন ময়দানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতি মিলনায়তনে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক শুরু করে। প্রতি রবিবার সকালে দুইটা নাটক মঞ্চায়ন হতো। নাটক দুটি হল সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’ ও হাবিবুল হাসানের ‘সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ড্রামা সার্কেল ও বহুবচন আমাদের পূর্বে ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু করে।

১৯৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা থিয়েটারের নাটক দুটি প্রথম মঞ্চায়নের দিন ধার্য করা হয়। কিন্তু আমাদের হাতে কোন অর্থ কড়ি নেই। প্রযোজনা খরচ ৬০০ টাকা। মিলনায়তনে কোন চেয়ার নেই, চেয়ার বাইরে থেকে ভাড়া করে আনতে হবে। বিজয় দিবসের কারণে কোনও চেয়ার পাওয়া যাচ্ছে না। পীযূষ ও আসাদকে শেখ কামালের কাছে পাঠালাম। তারা ৩২ নম্বরে গিয়ে শেখ কামালকে সবকিছু বললেন। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা নাগাদ ডিডিএস মিলনায়তনে শেখ কামাল আসলেন। আমার কাছ থেকে পুনরায় বিষয়গুলো অবহিত হলেন, বললেন কত চেয়ার লাগবে। আমি বললাম ৩০০ চেয়ার। শেখ কামাল বলল আমি দিয়ে দেবো। কাল রাতে চেয়ার আসবে। আমি তাঁকে বললাম, ‘কিছু টাকা কি দেওয়া যাবে?’ শেখ কামাল বললো আহারে, ‘আচ্ছা দাঁড়া দেখি।’ এই বলে কামাল চলে গেলেন, সাথে আসাদকে নিয়ে গেলেন। তারপর গাড়ির ড্যাশবোর্ড খুলে ২০০ টাকা আসাদের হাতে দিলো। তাঁর কাছে এই ২০০ টাকাই ছিল। এর আগে ম. হামিদ ডাকসু থেকে ২০০ টাকা দিয়েছিল। সর্বসাকুল্যে ৪০০ টাকা আমাদের ব্যয় নির্বাহের জন্য যোগাড় হলো। বাকি ২০০ টাকার জন্য আমাদেরকে টিকেট বিক্রির ওপর নির্ভর করতে হবে। দুই টাকা তিন টাকা টিকেটের দাম। সকল টিকেট বিক্রয় হলে ৭০০ টাকা বিক্রয় হবে। আমাদের কপাল ভালো সকল টিকেট বিক্রয় হলো। প্রযোজনা খরচ বাদ দিয়ে ৫০০ টাকা আমাদের উদ্বৃত্ত হলো। আমরা মহাখুশি। নাটক ব্যাপক জনপ্রিয় হলো।

১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের কারণে বাংলাদেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। আমাদের নাটক নিয়মিত চলছিলো। হঠাৎ করে ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে পুলিশ এসে নাটক বন্ধ করার কথা বলে। আমি পুলিশের কাছে জানতে চাই, এটা কার হুকুম। পুলিশ জানায় ঢাকা জেলা প্রশাসক নাটক বন্ধ করার হুকুম দিয়েছেন। কারণ জানতে চাইলে সাদা পোশাকের একজন ম্যাজিস্ট্রেট জানান যে আমাদের নাটকে দেশবিরোধী কথা রয়েছে। আমি জানতে চাই দেশ বিরোধিতা কেমন। তিনি বলেন আপনাদের নাটকে দেশে দুর্ভিক্ষ অবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি কথা বলা হয়েছে। যা সত্য নয়। আমি বলি যে তা মিথ্যাও নয়। তিনি বললেন যে আজ সন্ধ্যায় নাটক করতে পারবেন না। আমি কিছুটা উত্তেজিত হই। নিজেকে সংযত করে শেখ কামালকে বিষয়টি জানাবার সিদ্ধান্ত নেই। সেই মোতাবেক ডিআইটি ভবনে ছুটে গিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের টেলিফোন ব্যবহার করে শেখ কামালকে ফোন করি। শেখ কামাল বিষয়টি শুনে আমাকে দু’টার সময় ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসায় যেতে বলেন। আমি দু’টার সময় বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে হাজির হই এবং জাতির পিতাকে সাদামাটা ডাইনিং টেবিলে সাদামাটা আহার গ্রহণ করতে দেখতে পাই। আমাকে দেখে তিনি খাবার খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। যেহেতু আমি টেলিভিশনের ক্যান্টিনে খেয়ে গিয়েছি তাই আমি বিনয়ের সাথে অপরাগতা জানাই। তিনি একটু রাগ করে ধমক দিয়ে আমাকে টেবিলে বসালেন। শেখ কামাল মুচকি মুচকি হাসছিলেন। বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই কি নাটক করছিস? আমি উত্তরে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললাম, ‘দেশের খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষের কথা নাটকের মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেছি।’ তিনি বললেন, ‘আর কি করেছিস?’ আমি বললাম, ‘দোকানে কোন চাল, ডাল, তেল কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। ফাঁসির দড়ি পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের নাটকে সেই রকম দৃশ্য রয়েছে।’ তিনি উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠে বললেন, ‘চাল-ডাল পাওয়া যাচ্ছে না কিন্তু ফাঁসির দড়ি পাওয়া যাচ্ছে এ কেমন কথা। কেন যে এগুলো করিস!’ তারপর শেখ কামালের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঢাকা জেলা প্রশাসক রেজাউল হায়াতকে কি আসতে বলেছিস?’ কামাল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। একটু পরে জেলা প্রশাসক রেজাউল হায়াত ও আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু প্রবেশ করেন। বঙ্গবন্ধু রেজাউল হায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাটক কেন বন্ধ করেছো?’ রেজাউল সাহেব বললেন, নাটকটি জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। কেননা নাটকের দুর্ভিক্ষের কথা, হাইজ্যাকের কথা পুনঃ পুনঃ উচ্চারিত হয়। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘দেশে যে দুর্ভিক্ষ অবস্থা চলছে এটা কি অস্বীকার করা যাবে। না রাস্তাঘাটে হাইজ্যাক চলছে তা অস্বীকার করা যাবে? দেশ ও সমাজের যে বাস্তবতা নাটকে, সাহিত্যে, গানে প্রতিফলিত হয়। শিল্পীর ও শিল্পের স্বাধীনতাটুকু থাকতে হবে। তা না হলে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন হলাম কেন?’ আমি হতবাক এবং স্তব্ধ। তাকিয়ে আছি বঙ্গবন্ধুর দিকে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-‘যা নাটক কর গা’। আর পল্টু ভাই ও রেজাউল হায়াতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোরা বয়, তোদের সাথে লঙ্গরখানা পরিচালনা বিষয়ে আমার কিছু কথা আছে।’ আমি লাফ দিয়ে উঠে তাঁকে সালাম দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসলাম। শেখ কামাল পিছনে পিছনে নেমে এসেছে। কামাল তাঁর গাড়িতে উঠে, আমাকে তাঁর পাশে গাড়িতে বসতে বললেন। তারপর গাড়ি ছোটালেন পল্টন ময়দানের দিকে। ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতির সামনে নামিয়ে দিলেন এবং বললেন-‘যা সন্ধ্যায় সময়মতো নাটক শুরু করিস আমি একবার আসবো। আজ সকালের শো-টা কেমন হয়েছে?’ আমি বললাম ভালো। সে বলল, ‘আমাদের দল ঢাকা থিয়েটার তো দাঁড়িয়ে গেল।’ এই বলে আমার দুই হাত ধরে ঝাকুনি দিলেন, বললেন, ‘জয় বাংলা।’ আমি অভিভূত। শেখ কামালের মতো সিংহ হৃদয়ের তরুণ নেতা সামনে আমার নিজেকে ক্রমশই ক্ষুদ্র মনে হতে থাকল।

আজ শেখ কামাল নাই। কিন্তু ঢাকা থিয়েটার বিশ্ব নাট্যমঞ্চে সদর্পে বিচরণ করছে। ঢাকা থিয়েটার একমাত্র বাংলা ভাষা-ভাষীদের দল, যারা বাংলা ভাষায় উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘লন্ডন গ্লোব থিয়েটার’-এ নাটক মঞ্চায়ন করেছে। শেক্সপিয়ারের সাড়ে চারশতম জন্মজয়ন্তীতে বিশ্ব শেক্সপিয়ার নাট্য উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে শেক্সপিয়ারের ‘টেম্পেস্ট’ মঞ্চায়ন করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। সেদিন শহীদ শেখ কামালসহ অনেক প্রয়াত বন্ধুদের অনুপস্থিতি আমাকে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা তাঁর কন্যাদ্বয়কে নিয়ে সেদিন লন্ডন গ্লোব থিয়েটারে উপস্থিত ছিলেন। নাটক শেষে তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘ভাবা যায় বাংলাদেশের মতো একটি দেশের নাটক আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যমঞ্চ গ্লোব থিয়েটারে নাটক করছে!’ আমি কিছু সময় চুপ করে থেকে ছোট আপা অর্থাৎ শেখ রেহানাকে বললাম, ‘কামাল বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতো। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসাবে আমরা শেখ কামালকে সবসময় স্মরণে রাখি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সবসময় বুকে ধারণ করি। এবং সিংহ হৃদয় রাজনৈতিক কর্মী শেখ কামালের সামনে নতজানু হই। শেখ কামালের মৃত্যু নেই। জয় বাংলা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *