সত্তার গভীরে পারুলভাবি

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

তৌফিক হাসান ময়না
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অন্যতম সুহৃদ, এ দেশের শিল্প সৃজনের আসম সাহসী সহযাত্রী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা যাকে আমরা সকলে পারুলভাবি বলে ডাকতাম। গ্রাম থিয়েটারের সকল কর্মীরাই তাঁকে ঐ নামে চিনতো। তিনি ছিলেন গ্রাম থিয়েটারের স্বপ্নদ্রষ্টা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এর সহধর্মিনী। গ্রাম থিয়েটারের অভিভাবকের অভিভাবক। যার ভালোবাসায় তিলে তিলে গড়ে ওঠেছেন সেলিম আল দীন। তাঁর শিল্পীত মনে সর্বদা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন মঙ্গল প্রদীপ। যে প্রদীপের আলোয় উজ্জীবিত হয়েছেন সেলিম আল দীন। এ জনপদের পথে প্রান্তরে অবিরাম ছুটে চলা সেলিমভাই আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বঙ্গোপসাগরের কূলে কূলে বসবাসকারী মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য কৃষ্টি। সৃষ্টি করেছেন ঐতিহ্যবাহী বাংলা শিল্পরীতি ও আঙ্গিকের বৈজ্ঞানিক ব্যবহারে জাতীয় নাট্য ও শিল্প আঙ্গিক। তাঁর সকল সৃজনে ছিলো সহধর্মিনী মেহেরুন্নেসা পারুলভাবির অটুট বন্ধন। সেলিম আল দীন নিজের গড়া অলংকারে সাজিয়েছেন পারুলভাবির ভালোবাসার উত্তাপ আর উষ্ণতায়।

পারুলভাবির সাথে আমার পরিচয় ১৯৮০ সালের বগুড়া থিয়েটারের পথনাটক ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল নাটকের ২৫তম অভিনয় উৎসবের মাধ্যমে। সেলিম আল দীন প্রথম বগুড়ায় ১৯৮০ সালের ১৬ অক্টোবরে এসেছিলেন। তাঁর আসার কারণে যোগাযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসায় আমার সাথে প্রথম দেখা। রাতের গাড়িতে বগুড়া থেকে রওনা দিয়ে ভোরে ঢাকায় পৌঁছাই। ঢাকায় পল্টনে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুভাইয়ের সাথে দেখা করে। সোজা চলে আসি সাভার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে।

ছায়া ঘেড়া, সবুজ বৃক্ষ পরিবেষ্টিত প্রকৃতির অপরূপ মনোরম পরিবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ছোট বাসা, দোতলা, ছিমছাম। ড্রইংরুমে বসে সেলিমভাই এর সাথে আলাপ করছি। তিনি বলছেন, আমি মন্ত্রমুগ্ধর মত শুনছি। নাটক নিয়ে নতুন কথা, আবেগমথিত কথামালা, নতুন দিনের নাট্যআঙ্গিকের ভাবনা, দর্শন। তিনি আরো বললেন, দেশজ মৃত্তিকাসংলগ্ন শৃঙ্খলমুক্তির অবিনাশী গান। বাঙালির নিজস্ব শিল্পরীতি নাট্যরীতি। স্বপ্নের কথা, ঔপনিবেশিক ভবনামুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষের সংস্কৃতির বাংলাদেশ। শিল্পশিক্ষক এক এক করে বলে চলেছেন আর আমি শুনছি। এমন সময় ‘অনেক হয়েছে, ওকে এখন ছাড়ো, একটু খেয়ে নিক।’ চমকে তাকিয়ে দেখি, ¯েœহভরা মুখ নিয়ে হেসে বললেন, নাও খাও তো, বহুদূর থেকে এসেছো।’ ট্রে থেকে তার হাতে বানানো পরোটা, মাংসের তরকারি নামিয়ে টেবিলে সযত্নে রাখলেন। সেলিমভাই গোসল করার জন্য উঠে গেলেন। পারুলভাবি আমার পাশে চেয়ারে বসলেন। চোখের চশমাটা চোখ থেকে খুলে শাড়ির আঁচলে মুছে আবার পরলেন। বললেন- ‘আমার খুব ইচ্ছা হয় তোমাদের বগুড়ায় যেতে। মহাস্থান আছে না?’ বললাম- সামনের অনুষ্ঠানে সেলিমভাই এর সাথে চলে আসুন। তিনি জানালেন- ‘না এবার হবে না।’ প্রথম দেখাতে একেবারে নিজের করে নেওয়া। তারপর আরো অনেক কথা, নাটক, দল, পরিবার, ঘরসংসার। এরপর ১৯৮১ সালে ২২ জানুয়ারিতে বগুড়া থিয়েটারের আমন্ত্রণে শকুন্তলা নাটক মঞ্চায়ন করার জন্য ঢাকা থিয়েটার এলো বগুড়ায়। সাথে সেই সময়কার একঝাঁক শক্তিমান মঞ্চ তারকা। রাইসুল ইসলাম আসাদ, হুমায়ুন ফরিদী, সুবর্ণা মুস্তাফা, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিমূল ইউসুফ, ফারাহ খানসহ নাটকের নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুসহ প্রায় ৪৫জন নাট্যশিল্পী। এই বিশাল টিমের সঙ্গে এসেছিলেন পারুলভাবি। বগুড়ায় পৌঁছেই তিনি বলেছিলেন- ‘এই ময়না, কাল সকালে তো শো নেই, সকালে মহাস্থান যাবো।’ পরদিন সকালে প্রাচীন পুণ্যস্থান পুণ্যভূমি করতোয়া বিধৌত আজকের মহাস্থানে আসে পুরো ঢাকা থিয়েটার নাট্যকর্মীরা। পারুলভাবি আমাকে ডেকে মহাস্থানের বিশাল জনপদের পুণ্যস্থানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলেন। জিয়ৎকুÐ নামে একটা বিশাল ইদারা আছে, কথিত আছে রাজা পরশুরামের সাথে ইসলাম প্রচারক আউলিয়া শাহসুলতান বলখি মাহি সাওয়ার সাথে যুদ্ধের সময় রাজা পরশুরামের নিহত সৈন্যগণ এই ইদারার পানি খেয়ে আবার জীবিত হচ্ছিল। এই কল্পকথা শুনে পারুলভাবি বলেছিলেনÑ ‘আহা, সেই যুগ যদি আবার ফিরে আসতো, তবে মরে গিয়ে এই কূপের পানি খেয়ে পুনর্জন্ম হতো।’ প্রাচীন পুÐ্রবর্ধনের ক্ষীণ করতোয়া হঠাৎ কোন প্রাকৃতিক প্রসন্নতায় পুনর্বায় স্ফীতকায় হয়ে উঠেছে। পৌরাণিক দেবতার আশীর্বাদে আবার জাগ্রহ হলো সেই জনপদ। কী যে আনন্দ হতো! পৃথিবীটা খুব সুন্দর, চিরবিদায় নিতে মন চায় না। সত্য যে তাঁকে চিরবিদায় নিতে হলো, কিন্তু পুনর্জন্ম আর হলো না।

এরপর বহুবার পারুলভাবির সাথে বিভিন্ন কারণে দেখা হয়েছে। কখনো বগুড়ায় আমাদের অনুষ্ঠানে আবার কখনো সেলিমভাই এর সাথে নাটক নিয়ে, গ্রাম থিয়েটার নিয়ে তাঁর বাসায় আলোচনা করার সময়। কত বিরক্ত করেছি, রাত নেই দিন নেই হঠাৎ হানা দিতাম তার সংসারে। কোনদিন রুষ্ট হতে দেখিনি তাঁকে। প্রতিবারই স্নেহে কাছের মানুষের মতো ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে নিতেন সকলকে। মনে আছে, একবার রাত একটার দিকে হিমুভাইয়ের গাড়িতে আমি, মিল্লাত, প্রদীপ আর হিমুভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট দিয়ে সোজা সেলিমভাই এর বাসায় গিয়েছিলাম। সেলিমভাইতো আমাদের দেখে মহাখুশি। কী খাব, সে নিয়ে তাড়াহুড়া শুরু করেন। পারুলভাবির কথা উঠতেই সেলিমভাই বললেন- ‘প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ঘুমিয়ে আছে।’ আমরা ভাবলাম এতো রাতে এভাবে আসাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। হঠাৎ দেবদূতের মতো তিনি উপস্থিত ঘুম ঘুম চোখে। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন- ‘নিশ্চয় রাতের খাওয়া হয়নি?’ আমরা বাধা দিলাম কিন্তু কোন কথা না শুনে তখনই রান্না করে আমাদের সকলকে খাওয়ালেন। আমরাই তার সংসার, সংসার তার থিয়েটার। তাঁর ভালোবাসায় আমরা সিক্ত হতাম বার বার। আমার স্ত্রী মিমির সাথে পারুলভাবির ছিল দারুণ সখ্য। বগুড়া থিয়েটারের নাট্য উৎসবে তিনি এসেছিলেন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। একরাত ছিলেন আমার বাসায়, সেই সুবাদে মিমির সাথে পরিচয় এবং স্নেহের বন্ধনে জড়িয়ে নেওয়া। নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন মিমিকে। কতো উপদেশ, সংসার বিষয়ে কথা। আমার বিষয়ে নানান দায়িত্ব, কর্তব্য, সচেতন ও সতর্ক থাকার কথা অভিভাবকের মতো বলতেন। ঢাকায় থাকা অবস্থায় প্রায়ই মোবাইলে দুজনের মধ্যে আলাপ হতো। মিমি বলতো- পারুলভাবি আমার শিক্ষক আমার আত্মার আত্মীয়। মিমির সাথে শেষ দেখা গত ২০১৬ এর ঢাকা বিভাগীয় কর্মশালায়। শিল্পকলা একাডেমির ৬তলায় মহড়া কক্ষের এক কোনে বসে বিকাল পর্যন্ত কথা হয়েছিল মিমির সাথে। পারুলভাবি এমনি ভাবে শুধু মিমি নয় অনেকেরই পরম হিতৈষী ছিলেন। ঢাকা থিয়েটার, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার সকল নাট্যকর্মীদের তিনি নিজের পরিবারের সদস্য মনে করতেন, ভালোবাসতেন। কাউকে স্নেহ দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, কাউকে কাজের সুযোগ করে দিয়ে, কাউকে আর্থিক কিংবা বৈষয়িক সাহায্য দিয়ে, কাউকে আন্তরিক সমালোচনায় সংশোধন করিয়ে; কত ভাবে কত উপায়ে তিনি সকলের কাজে লেগেছেন, সহযোগিতা করেছেন এবং তিনি সব কাজ নীরবে- নিভৃতে নেপথ্যে থেকেই করে গিয়েছেন। তিনি কোনদিন নাটক করেননি। অথচ থিয়েটারের একজন নিবেদিতকর্মী ছিলেন। তাঁর কোন আড়ম্বর ছিল না। সেলিমভাই এর মত একজন প্রথিতযশা নাট্যকারের পত্নী হিসেবে নিজেকে জাহির করতেন না কখনো। প্রশংসা বা স্বীকৃতি কোন কিছুই তাঁর প্রয়োজন পড়ত না। সেলিমভাই এর সকল কর্মযজ্ঞকে তিনি আগলে রেখেছেন সর্ব্ব সময়। তাঁর লেখা, ছবি, নাটকের পাণ্ডুলিপি চিঠি সংরক্ষণে পারুলভাবি আমৃত্যু অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। সেলিমভাইকে চিনতে, জানতে, গবেষণায় পারুলভাবির সংরক্ষিত মূল্যবান কাগজপত্র, নিদর্শন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তাঁর সংগৃহীত বিভিন্ন দলিল, স্মৃতি ও কর্মযজ্ঞ নিয়ে সেলিম আল দীন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরি।

একেবারে আটপৌরে জীবন যাপন করতেন তিনি। সেলিমভাই যখন লেখালিখি নিয়ে ব্যস্ত অথবা টিভি সিনেমা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নিয়ে তিক্ত বিরক্ত, তখন তিনি ধীরস্থিরভাবে স্বামীকে সান্তনা দিতেন। ভরসা ও সহযোগিতা দিয়েছেন। পাদপ্রদীপের হঠাৎ নিভে যাওয়া আলোটির মতো পারুলভাবি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। এক শূন্যতা রক্তক্ষরণ হয় হৃদয়ে, আমাদের অনেক তৃষ্ণায় তিনিই দু’হাতে বিলিয়েছেন পিপাসার জল। অফুরান প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর মানুষটিকে হারালাম। অনেক কষ্ট লুকিয়ে ছিল তাঁর অন্তরে। কোনদিন তা বলেননি কাউকে। সেই বুকভরা হাহাকার নিয়েই বিদায় নিলেন তিনি।

পারুলভাবি, আমি বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায়, আপনি যে খুশি হয়েছিলেন, আমাকে যেভাবে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন তা আমাকে উজ্জীবিত করেছে। আপনার পরামর্শ, উপদেশ আমাকে সাহসী করেছে। যেখানে থাকুন ভালো থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *