[আমার বন্ধু সুসময় চাকমা, খাগড়াছড়ি ক্ষুদৃ নৃগোষ্ঠীর কালচারাল ইন্সস্টিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক। সুসময়ের গ্রামের বাড়ি রাঙ্গামাটি জেলার মারিশ্যায়, কাচালং নদীর পাশে। সে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, সেই ১৯৭৮-৭৯ সনে তখন বাংলাদেশের পাহাড়ী এলাকা ছিল অশান্ত, লড়াই ছিল সর্বত্র। নিজের বাড়িতে ফিরে যেতেও ছিল হাজারো প্রতিবন্ধকতা। চাকমা সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে সকল বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে সেই সময়ে কাজ করেছিলেন সুহৃদ চাকমা, সুসময় চাকমা, কবি মৃত্তিকা চাকমা, সুগত চাকমা, শিশির চাকমা আরও অনেকে।সুসময় সেই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর থেকে বের করতো সাহিত্য পত্রিকা। সেই অশান্ত সময়ে নানা কারণে বিঝুতে সব সময়ে তার বাড়িতে যাওয়া হোত না। সুসময়কে টানতো তার গ্রাম, নদী, পাহাড় আর গ্রামের মানুষগুলো। আমি আর সুসময় কয়েক বছর আগে কাচালং গিয়ে এক রাত কাটিয়েছিলাম। আমাদের আতিথেয়তা দিয়েছিলেন কবি ও কাচালং কলেজের অধ্যাপক স্নেহভাজন লালন চাকমা, কবি ভদ্রসেন এবং কাচালং কলেজের প্রিন্সিপাল মহোদয়। সেদিন রাত থেকেই ঝুম বৃষ্টি ছিল। কাচালং নদীর পাড়ে মিতভাষী সুসময় চাকমা তার বাল্য ও কৈশোরের নদী, গ্রাম আর তার মায়ের গল্প শুনিয়েছিলো। পরদিন সকালে কাচালং থেকে বেশ খানিকটা দূরে শ্রদ্ধেয় ভান্তে তিলকানন্দ মহাথেরোর আশ্রমে যাওয়ার পথে বারিবিন্দু ঘাটে বসে ‘সুসময়ের বিঝু’কবিতাটি লিখেছিলাম।

সুসময়ের বিঝু
আফসার আহমদ
(কবি ও নাট্যকার মৃত্তিকা চাকমাকে)

উত্তীর্ণ সন্ধ্যায়,
খাগড়াছড়ির পানখাইয়া পাড়ায় টিলাটার ধারে
বাড়ির কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় সুসময়।
ধূসর চাঁদ, জোসনা ম্লান ও বিষন্ন
তার মনে পড়ে কাচালং নদী এই বৈশাখে মাছশূন্য—
এই প্রশ্নটি কেন জাগলো মনে হঠাৎ বৈশাখে,
জানে না সুসময় কেন তার মনে হলো ফুল বিঝুর সন্ধ্যায়
ফেলে আসা দুরন্ত কৈশোর
প্রিয় গ্রাম মারিশ্যা
মায়ের মুখ আঁকা দিগন্ত—
মা কি এখনও অপেক্ষা করে
বিঝু পাখির ডাক শুনে, ভোরে সুসময় আসবে।
মা এখন ফুল বিঝুতে বসে থাকে না পাহাড়ি পথ চেয়ে।
শহরে বসে সুসময় বাড়ির ছাদে আকাশপ্রদীপ জ্বালায়,
আলোক শিখাটি চিনে চিনে মা আসবে ফুল বিঝুর প্রণাম নিতে,
মা আসে না।
লুটেরার কুঠারের আঘাতে বৃক্ষহীন পাহাড়ের চূড়ায়
বিষন্ন সন্ধ্যা গাঢ়তর, জোসনা পাহাড়ের আড়ালে লুকায়—
কৈশোরের রাত নামে না চোখে,
শহরের নিয়নের আলো সরিয়ে সুসময় আর হারাতে পারবে না
কৈশোরের অবাক জোসনায়।
কাচালং নদীটি কেন বারবার বুকের গভীরে স্রোতস্বিনী
ভেসে যায়, ভেসে যেতে থাকে—
সুসময় এখনও বসে থাকে নদীটির পাড়ে,
তার বুকের ভেতরে নিত্য বহমান কাচালং, মারিশ্যার সবুজ পাহাড়,
পৌরানিক গল্পের নায়ক রাধামনের অপেক্ষায় গাবুরী ধনপুদি।
কাচালং সুসময়ের পুরাণের রূপবতী ধনপুদি নারী
আর সে রাধামন
একদিন সে ঠিক ফিরে যাবে কাত্তন থেকে তার প্রিয় নদী এবং নারীটির কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *