সেমিনার। মৌলিক নাটকের সংকট ও উত্তরণের পথ : হামীম কামরুল হক

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

নাসির উদ্দীন ইউসুফ
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের তিনদশকপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ধারাবাহিক যে সেমিনার চলছে, সে অনুসারে আমাদের আজকের ৬ষ্ঠ সেমিনার। আমরা প্রায় একটি মাস হেফাজতের তাণ্ডবের জন্য সেমিনার করতে পারিনি। তাছাড়া প্রায় প্রতি মাসে হয়েছে। কখনো আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে, নাট্য সতীর্থদের কাছ থেকে আবার কখনো কম সংখ্যক সাড়া পেয়েছি। কিন্তু এসব কিছুকে অতিক্রম করে আমাদের যাত্রা চলছে এবং চলবে। আজকে আমাদের সেমিনারের বিষয় ‘মৌলিক নাটকের সংকট ও উত্তরণের পথ’। এ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন হামীম কামরুল হক। আর সভাপতি হিসেবে থাকছেন আমাদের প্রিয় নাট্যকার ও অভিনেতা-নির্দেশক মামুনুর রশীদ। আমাদের মাঝে আরো উপস্থিত আছেন, অত্যন্ত গৌরবের সাথে বলতে পারি সেটি হচ্ছে যে, আমাদের সবার প্রিয় এবং এই মুহূর্তে এখানে যারা উপস্থিত আছেন তাদের সকলের বয়োজ্যেষ্ঠ আমাদের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। এছাড়াও আরো অনেকে এখানে উপস্থিত আছেন আমি সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমি হামীম কামরুল হক সম্পর্কে একটু বলতে চাই কারণ তাঁর সম্পর্কে হয়তো অনেকেই জানেন না। তিনি নাটকের লোক সেইভাবে নন যেভাবে আমরা বিবেচনা করি অর্থাৎ মঞ্চে তিনি কাজ করেন না। তিনি দর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এটিও খুব জরুরি আমাদের জন্য যে একজন দর্শক একজন শিল্পকর্মীও বটে। তিনি মূলত কথাসাহিত্যিক। তাঁর দুটো উপন্যাস রয়েছে ‘রাত্রি এখন যৌবনে’ আর ‘গোপনীয়তার মালিকানা’। হামীম কামরুল হক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি তুলনামূলক নাট্যতত্ত্বের ওপর পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। বাংলা একাডেমিতে কর্তব্যরত [বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগ’-এ শিক্ষকতা করছেন। -স.] ইতোপূর্বে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি দৈনিক ডেসটিনি পত্রিকার যে সাতিহ্যপাতা ছিল সেটি সম্পাদনা করতেন এবং এটা খুবই উঁচুমানের একটি সাহিত্য পাতা ছিল এটা আমরা সবাই স্বীকার করবো। তাঁর নানা সময়ে নানা গল্প এবং সমালোচনা প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও কামরুলের আরো অনেক পরিচয় আছে। তিনি সেলিম আল দীনের ছাত্র এবং নিয়মিত নাটক দেখেন সমালোচনামুখর হন। আমরা ভেবেছি যে আজকে আমাদের ৬ষ্ঠ যে সেমিনারটি চলছে সেটির উপস্থাপনাপত্রটি একজন দর্শকের কাছ থেকে দেখি। যিনি দর্শক একইসাথে একজন ঔপন্যাসিকও বটে। যা হোক আমি কথা বাড়াব না। বিষয়টি আজকের সভাপতি নাট্যকার মামুনুর রশীদ এবং সৈয়দ শামসুল হকের। মৌলিক নাটকের সংকটের উত্তরণের পথ- দুজন আমাদের প্রধান নাট্যকার এখানে উপস্থিত আছেন। আমি মামুনুর রশীদকে সভাপতি হিসেবে এই সেমিনার সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব দুটো কাজ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। ধন্যবাদ।


মামুনুর রশীদ
ধন্যবাদ নাসির উদ্দীন ইউসুফ। আমি এ ধরনের একটি উদ্যোগকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানাই যে, গ্রাম থিয়েটারের ৩০ বছরপূর্তি উপলক্ষে ধারাবাহিক সেমিনার হচ্ছে এবং একটা কথা খুব বলা দরকার আমাদের হকভাই [সৈয়দ শামসুল হক] সব সময়ই বলেন যে, আমাদের আসলে ইন্টারেকশন হয় না। আমরা একজন কথা বলি এবং সবাই সে কথা শুনে যাই, এরফলে হয় কী সাহিত্যের কোনো বিকাশ হয় না। বা নাটকেরও কোনো বিকাশ হয় না। এবং আমরা এটাও চাই এবং ঢাকাতে এটা সেটা শুরু করেছি এবং আমরাও এটা শুরু করেছি। সেটা হচ্ছে যে, নাটকের বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করা দরকার। আজকের বিষয়টি তাত্ত্বিক আলোচনা করা দরকার। আজকের একজন অভিনেতা কী অভিনয় করলেন বা সেখানে মিউজিকটা কী গেল এটা নিয়ে নাট্যকর্মীদের মধ্যে একটা আলোচনা হওয়া দরকার। যারা অভিনয় করতে চান, যারা নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে চান তাদের মধ্যে একটা আলোচনা দরকার। এমন কী একটি প্রবন্ধ পাঠ করা হল সেটা নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না সে রকম। এটাও ঠিক নয় এবং এই যে নাট্যসংস্কৃতি কিন্তু শুধু অভিনয় নয়। এর প্রস্তুতিপর্ব, এর অভিনয় এবং এগুলি নিয়ে কিন্তু একটা ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার যেটা পশ্চিমবঙ্গে ঘটেছে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ঘটেছে। আমি দেখেছি যে, একটি নাটক অভিনীত হওয়ার পর রাতভর সেটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। বাংলাদেশে আনফরচুনেটলি এই বিষয়টা আমরা একসময় গড়ে তুলেছিলাম সত্তরের দশকে, আশির দশকে। একটি নাটক দেখার পর তুমুল তর্ক-বিতর্ক আলোচনা হত। কিন্তু কালক্রমে সেটা ভীষণভাবে কমে গেছে। এবং সেখানে আমি মনে করি এটি একটি ভাল উদ্যোগ এবং আমরা চাই এই প্রবন্ধটা যিনি পাঠ করবেন, পাঠ করার পর আমরা সেটা কিছুক্ষণ আলোচনা করলাম। এরপর সেটা শেষ হয়ে গেল তা না। এটি নিয়ে আরো ব্যাপক আলোচনা হোক নাট্যকর্মীদের মধ্যে এটা আমাদের আকাঙ্ক্ষা। যাই হোক এবার আমি অনুরোধ করছি মূল প্রবন্ধকারকে তাঁর প্রবন্ধ পাঠ করার জন্য।

হামীম কামরুল হক
উপস্থিত মাননীয় এবং শ্রদ্ধেয় সভাপতি মামুনুর রশীদ, শ্রদ্ধেয় নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক, নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি আমার প্রবন্ধ পাঠ শুরু করছি। আজকের প্রবন্ধের নাম আপনারা সবাই জানেন ‘মৌলিক নাটকের সংকট ও উত্তরণের পথ’। শিরোনাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আজকের বিষয়ের দুটো ভাগ। একটি হলো- মৌলিক নাটকের সংকট, আরেকটি হলো- এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ সন্ধান। এতে আরো একটা যৌথপ্রয়াস বোধ করি দেখা দেবে। কেন না বর্তমান বক্তা সংকটের দিকটাই চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু উত্তরণের দিকনির্দেশনাগুলো আলোচকদের কাছ থেকেই ক্রমশ উত্থাপিত হবে বলে আশা করি। কারণ কোনোভাবেই বর্তমান লেখকের সেই স্পর্ধা নেই- যাতে তিনি মৌলিক-নাটকের সংকট উত্তরণের একটা নিশ্চিত ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন। যদিও বা লিখন ক্রিয়ার অপটুতার কারণে সেই স্পর্ধা দেখা দেয়- সেজন্য আগেই সবার কাছ থেকে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে রাখছি।

শুরুতে আরো একটা কথা বলে নিতে চাই। আমি নাট্যসাহিত্যের একজন নগণ্য পাঠক। থিয়েটারের একজন সামান্য দর্শক। নাট্যরচনার সঙ্গে আমার তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-সমালোচনা ও গবেষণা আমার কাজের ক্ষেত্র। সোজা কথায়, আমি নাটক ও থিয়েটারের জগতের ভেতরকার কেউ নই। পরোক্ষ কিছু যোগ আছে, কিন্তু যারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাদের তুলনায় আমাকে রীতিমতো অনভিজ্ঞই বলা চলে।
ফলে তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে এ রকম একটি বিষয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ আমার জন্য যুগপৎ শঙ্কার এবং সৌভাগ্যের। শঙ্কা এ কারণে যে, এই প্রথম নাটক নিয়ে এমন একটি সুধী সমাবেশে আমাকে কথা বলতে হচ্ছে, তাতে আদৌ আমি কিছু বলতে পারব কি না- যার কোনোরকম সারবত্তা বা নতুনত্ব থাকতে পারে! আর সৌভাগ্যের ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। আমাদের বেশিরভাগ সেমিনারের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের প্রবন্ধ পাঠ করতে দেওয়া হয় যাঁরা বয়সে অপেক্ষাকৃত প্রবীণ এবং অত্যন্ত অভিজ্ঞ। কিন্তু বহুবার তিনি এই বিষয়ে কথা বলেছেন বিধায় তাঁর আর নতুন কিছু নতুন করে বলবার আকাক্সক্ষা থাকে না। আর তাঁর প্রবন্ধ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য থাকেন- তাঁর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ব্যক্তিরা, যাঁরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর ছাত্রও হয়ে থাকেন। ফলে গুরুতুল্য ব্যক্তির পঠিত প্রবন্ধ সম্পর্কে কিছু বলা বা তাঁর সমালোচনা করার কাজটি তাঁরা করেন না। এছাড়াও ওই বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির কাজে লাগতে পারে এমন কোনোকিছু আলোচকদের দিক থেকে প্রায় ক্ষেত্রেই উত্থাপিত হয় না। আর তাঁর ভুলভ্রান্তি নির্দেশ করার কথা তো বলাইবাহুল্য। এই চল থেকে কেউ-ই খুব একটা বের হতে চান না। তাঁরা তরুণদের ওপর ভরসা করেন না যে, অনভিজ্ঞ তরুণ এমন গুরুত্ববহ সেমিনারের মান রাখতে পারেন কি না। অথচ তরুণদের এক্ষেত্রে সুযোগ দেয়াটা নানান কারণে দরকারি। এভাবেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণদের তৈরি হওয়ার সুযোগ হয়। অথচ এ কাজটি আমাদের বর্তমান বিদ্যা ও মননচর্চার জগতে খুব একটা করা হয় না। সেদিক থেকে আজ এখানে একটা উল্টো ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে, যেখানে একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ নাটক সম্পর্কে প্রবন্ধ পাঠ করবেন এবং তার আলোচনা করবেন গুরুতুল্য ব্যক্তিবর্গ; তাঁরা এই তরুণের সীমাবদ্ধতা ও ভুলভ্রান্তিগুলো বিশেষভাবে ধরিয়ে দেবেন। এতে করে পরবর্তীকালে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রবন্ধকার আরো বেশি সর্তক হবেন এবং ভুলভ্রান্তি কমিয়ে আনার দিকে নজর রাখবেন। মোট কথা তাঁরা বর্তমান লেখককে ভুল থেকে ঠিকের দিকে নিয়ে যেতে সহায়তা করবেন। তাই বিষয়টি আমার জন্য এক বিরল সৌভাগ্য। আর এজন্য বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখছি।


বর্তমানে মৌলিক নাটকের যে বেশ একটা সংকটকাল চলছে, তা বোধ করি নাটক ও থিয়েটার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই বোধ করে থাকবেন। বলাবাহুল্য মৌলিক নাটক বলতে আমরা বোঝাতে চাই- যা কোনো একজন নাট্যরচয়িতার নিজস্ব সৃষ্টি, যা কোনো পৌরাণিক ঘটনা বা কাহিনি অবলম্বনে রচিত নয়; নয় কোনো উপন্যাস বা গল্পের নাট্যরূপ বা কোনো পৌরাণিক কাহিনি, উপন্যাস বা গল্পের বিনির্মাণ, অথবা সেগুলোকে ভেঙে নতুন ব্যাখ্যায় তৈরি কোনো নাটক। কোনো নাট্যকার বা নাট্যরচয়িতা নিজের অন্তরের তাগিদে এবং সাহিত্য রচনার প্রেরণা থেকেই যখন নাটক রচনা করেন, সেই ধরনের নাটককে আমরা মৌলিক নাটক বলতে চাই। পরে এর মঞ্চায়ন হলেও হতে পারে, নাও হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য হিসেবে সেটি শিল্পোত্তীর্ণ নাটকের স্তরে উন্নীত হয়- সেই রকম মৌলিক নাটকের সাম্প্রতিক সংকটের কয়েকটি দিক শনাক্ত করার জন্য আজকের এই আলোচনার সূত্রপাত।

নাটক সাহিত্যই, যাকে সোজা কথায় নাট্যসাহিত্য বলছি। নাটক সাহিত্য হলেও এটি থিয়েটার অভিমুখী শিল্প। ফলে এর এই বিশিষ্টতা একে সাহিত্যের বাইরে নিয়ে আসে। অনেকেই নাটক ও থিয়েটারকে এক করে দেখেন: যা-ই নাটক, তা-ই থিয়েটার; যা-থিয়েটার তা-ই নাটক- এই রকম একটি ভ্রান্তি অনেকদিন ধরেই আমাদের ভেতরে বিদ্যমান।
এবার সাহিত্যেরও একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। সাহিত্য একজাতীয় দাবা খেলা। নাটকও তাই।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দাবাড়– ড. ইমানুয়েল ল্যাস্কার তাঁর দাবা বিষয়ক বই ‘কমন সেন্স ইন চেস’-এ লিখেছিলেন,‘দাবাকে খেলা হিসেবে উপস্থাপিত ক’রে, বা বলা চলে ভুলভাবে উপস্থাপনের কারণে, অনেকেই মনে করেন, এটি কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য সাধন করে না, বরং অলস সময় কাটতেই এর জন্ম। কিন্তু এ যদি শুধুমাত্র খেলাই হতো, তাহলে দাবা এতদিন যে পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এসেছে, এটি টিকে থাকত কিনা সন্দেহ। কিছু অত্যুৎসাহী উদ্যমী মানুষের জন্যই দাবা শিল্প বা বিজ্ঞানের পর্যায়ে উঠতে পরেছে- যদিও এর কোনোটাই দাবা নয়, বরং এর প্রধান চরিত্র লক্ষ্য করেই বলা চলে- এতে মানুষ আনন্দ পেয়ে থাকে- এ হলো এক ধরনের লড়াই। অবশ্য আসল লড়াই নয়, যে লড়াইয়ে যুযুধান পক্ষের মধ্যে রক্তপাত ঘ’টে তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ফুটে ওঠে। এ এমন এক লড়াই যাতে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক আর নিছক বুদ্ধিবৃত্তি প্রধান হয়ে ওঠে। এ ধারণা থেকেই দাবা হয়ে উঠেছে ব্যঞ্জনাময় কিছু…।’ এখানে তাঁর বলা ‘দাবা’ শব্দটির জায়গায় ‘সাহিত্য’ কথাটি বসিয়ে দিয়ে দেখুন সাহিত্য ও দাবা একে অন্যের সঙ্গে কতটা মিলে যায়।

খেয়াল করুন দাবাতে থাকে দুটো পক্ষ। সাহিত্যেরও দুটো পক্ষ- লেখক ও পাঠক। [থিয়েটারেও থাকতে হয় ন্যূনতম দুটো পক্ষ- অভিনেতা ও দর্শক] এবং বর্তমানে সাহিত্য যেখানে এসে পৌঁছেছে- তাতে এটি দিয়ে আর কোনো উদ্দেশ্য সরাসরি সাধন করা যায় না। আগের মতো একটি বই লিখে সমাজের মূলকেন্দ্র ধরে নাড়া দেওয়া যায় না। ফলে কারো কারো মতে বর্তমানে এটা অলস লোকের বিলাসমাত্র। কিন্তু আমরা দেখি কিছু উদ্যমী ও উৎসাহী মানুষ এটা কোনো কাজে আসুক না আসুক এ নিয়েই মেতে থাকেন। নিজে আনন্দ পান। অন্যকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর সাহিত্যও একটি লড়াই, কিন্তু এ লড়াইয়ে শারীরিকভাবে রক্তপাত ঘটে না, কিন্তু এ এমন এক লড়াই যাতে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিই প্রধান হয়ে ওঠে।

এছাড়াও দাবা একমাত্র খেলা যা লিখে রাখা যায়, এবং বার বার সেই খেলাটা খেলা যায়। যদিও আসল খেলাটা একবারই হয় এবং কখনোই একটি খেলা হুবহু আরেকটি খেলার মতো হয় না। সাহিত্যও তা-ই। নাটকও তাই। লেখার সময় সেটি একবারই হয়, পরে সেটি বার বার পড়া যায়। দাবা খেলায় নাটকীয়তা, চাল, পাল্টা চাল তো সাহিত্যের ভেতরেও ঘটে। মুখ্য ও গৌণ ভূমিকার কতবার না অদলবদল হয়। কখনো ঘোড়া মহাশক্তি নিয়ে হাজির হয়, এখনো একটি হাতি বা নৌকা, কখনো বা একটি সৈন্য অবস্থানগত কারণে এতটাই শক্তি অর্জন করে যে তার ভূমিকার কারণে প্রতিপক্ষের পতন ত্বরান্বিত হয়।

সাহিত্যিকের সামনে না-চাইতেও অন্তত একজন পাঠক এসে দাঁড়িয়ে যান- যার জন্য তিনি লেখেন। যিনি নাটক লেখেন, কেবল নিজস্ব তাড়না থেকে, তার সামনেও ন্যূনতম হলেও একজন পাঠক থাকেন। থাকেন এমন একজন ভাবুক পাঠক- যার কথা আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে পেয়ে যাই, যেখানে নাটক আর থিয়েটারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে না। কোনো একটি সীমাবদ্ধ মঞ্চে বা স্থানের ভেতরে এর অভিনয় অত্যাবশ্যক- এই বাধ্যবাধকতা থেকে নাটক যে মুক্ত তিনি সেটি দেখিয়ে দিতে চান। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ভাবুকের চিত্তের মধ্যে যে রঙ্গমঞ্চ আছে, সে রঙ্গমঞ্চে স্থানাভাব নাই।’ ঠিক এ জায়গা থেকেই তিনি বলেছেন, ‘নাটকের ভাবখানা এইরূপ হওয়া উচিত যে, আমার যদি অভিনয় হয় তো হউক, না হয় তো অভিনয়ের পোড়াকপাল- আমার ক্ষতি নাই।’ লক্ষণীয় যে তিনি প্রবন্ধের নাম রেখেছেন ‘রঙ্গমঞ্চ’ যা মূলত থিয়েটারকেই বোঝায়, সেখানে তিনি শিরোপা দিচ্ছেন নাটককে। ঠিক এ জায়গা থেকে নাটকের শক্তিকে আমাদের নতুন করে ও বার বার খেয়াল করার দরকার।

দীর্ঘদিন নাটক লিখে, থিয়েটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকেও আমাদের অনেকেই জানেন না যে নাটক ও থিয়েটার এক বিষয় নয়। কেউ কোনো একটি বিষয়ে জীবনাতিপাত করেও পরে জানে না যে, সে যে জন্য জীবনোৎসর্গ করেছে, তাতে তার কোনো অধিকারই নেই। আমি এর নাম দিয়েছি ‘গোরা সিন্ড্রম’। আপনারা জানেন, রবীন্দ্রনাথের গোরা সারাজীবন হিন্দুত্বের মহত্ব জাহির করেছে, সবার উপরে তুলে রেখেছে হিন্দুয়ানিকে, কিন্তু দেখা গেল সেই গোরা নিজেই হিন্দু নয়, সে আইরিশ। এই যে আত্মজ্ঞানের অভাবে নিজেকে ভুল জায়গায় খরচ করার কাজটিকে বলছি ‘গোরা সিন্ড্রম’।

আমাদের শিল্পসাহিত্যের এমন অনেক ব্যক্তি আছেন- যারা সারাজীবন এর পেছনে ব্যয় করে দেন, কিন্তু জানেন না যে তারা আসলে শিল্পসাহিত্যের লোকই নন। এবং আরো মর্মান্তিক এই যে, তাদের কেউ কখনো বলে না, ‘আপনি কেন উপন্যাস লেখেন, আপনার তো ঔপন্যাসিক চেতনাই নেই’, ‘আপনি কেন গল্প লেখেন আপনি তো গল্প লেখার লোকই নন’, বা ‘কাউকে বলা হয় না, আপনি কেন নাটক লেখেন বা থিয়েটার করেন, আপনি তো থিয়েটারের লোকই নন।’ সবচেয়ে বড় কথা তারা নিজেরা তা কোনোদিন ধরতে পারে না। বোধ করি এখান থেকেও মৌলিক নাটকের সংকটকে বুঝে নেওয়ার আছে।
প্রথমত যিনি নাটক লিখতে চান বা লিখতে শুরু করেছেন, তাকে স্পষ্টত জেনে নিতে হবে তিনি আসলে নাটক লেখার লোক কিনা। এ ব্যাপারে প্রথমেই সচেতন না হলে সারাজীবন নাটক লিখে গেলেও সত্যিকার নাট্যকারের স্তরে তিনি যেমন উঠতে পারবেন না, তেমনি তার হাতে সত্যিকারের নাটকও তৈরি হবে না। তবে হ্যাঁ, আজকাল মিডিয়া তার ভালোরকমের (?) সাহায্যকারী হতে পারে। ‘মিথ্যাকার নাটক’গুলো দিয়ে তাকে নাট্যকার বানিয়ে দিতে পারে।
এটা যে এক ভয়াবহ আত্মঘাতী বিষয় তাও কেউ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না। ভাবুন তো একটি দুনম্বরি বা নকল ওষুধ বাজারজাত করার কথা। ভেবে দেখুন, এটা কী রকমের ভয়াবহ একটি ব্যাপার হতে পারে। এবং কতটা ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না, ঠিক তেমনিভাবে- যা শিল্প নয়, কবিতা নয়, ছোটগল্প নয়, উপন্যাস নয়, তাকে ওই নামে চালানো এবং অলেখককে লেখক হিসেবে চালানো; তার লেখা লক্ষ লক্ষ কপিতে ছাপানো কি ততোধিক ভয়াবহ নয়? নকল ওষুধ শরীরে ক্ষতি করে, আর নকল লেখাকে আসল বলে চালানোয় ক্ষতি হয় চিন্তার, মেধার, সর্বোপরি মস্তিষ্কের, কোনো ক্ষতিই এরচেয়ে ভয়ংকর হতে পারে না।

মজার ব্যাপার হল লেখার এইখানে ফাঁকিটা দেওয়া যায়, দিনের পর দিন চালিয়েও নেওয়া যায়। কারণ তা জীবন্ত নয়, কিন্তু ‘নকল নাটক’কে ‘আসল নাটক’ বলে বেশি দিন চালানো যায় না। ফলে মৌলিক নাটক লেখার নামে অ-নাটক লিখতে এসে কেউ বেশি দিন এটা চালাতে পারেন না। কারণ নাটক যেমাত্র থিয়েটারে হাজির হবে বা নাটকের অভিনয় হবে, তৎক্ষণাৎ বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে যাবে। এখানে এক কুমিরের ছানা বার বার দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এজন্য শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমকে বর্তমানে ফাঁকির ওপর চালিয়ে দেওয়া গেলেও নাটকের ক্ষেত্রে তা চলে না। নাটকের ক্ষেত্রে তাই একটা ঝুঁকি থাকে। নিজস্ব সৃষ্টি মানে মৌলিক কিন্তু তা নাটক নামে পাতে দেওয়ার মতো নয়, এমন নিম্নমানের নাটক করার চেয়ে অনূদিত বা কোনো উৎকৃষ্ট গল্প-উপন্যাসকে নাট্যরূপ দেওয়াটাকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এটি হল আমাদের মতে বর্তমানে মৌলিক নাটক রচনার প্রথম সংকট। যিনি নাটক লিখবেন তাকে আত্মা-সত্তায়-অস্থি-মজ্জায় নাট্যকার হতে হবে। কঠিন ও নির্মম আত্মসমালোচনার মাধ্যমে তাকে বুঝে নিতে হবে- তিনি কি আদৌ নাট্যকার, নাটকের জন্য তিনি তার জীবনের সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন, সর্বস্ব বাজি ধরতে পারেন? সত্যিকার নাটক কী বস্তু তিনি কি তা আয়ত্ত করার জন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে পারবেন? তিনি নিঃস্ব হতদরিদ্র দশায় থেকে থেকে নিঃশেষ হয়ে যাবেন, কিন্তু তিনি নাটককেই বেঁচে থাকার মূল উপাদান হিসেবে আঁকড়ে ধরে রইবেন। এই কঠিন কঠোর প্রশ্নের মীমাংসা না করে নাটক লেখায় খুব বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবে কেউ যদি টিকে থাকতে চান তো এবং এর বদলে কিছু নামকাওয়াস্তে নাটক লিখে, নাটকের লোক হিসেবে একটা তকমা জোগাড় করে ‘স্রেফ করে খাওয়া’র জন্য অন্যান্য কাজে ভিড়ে যাবেন, তাতে শিল্পটা পণ্য হবে মাত্র, শিল্প হবে না।

২.
আমরা মৌলিক নাটকের সংকটের কথা বলছি, আসলে তা তো মৌলিক নাট্যকারের সংকট। বলাবাহুল্য, সংকটটা এই সময়ের। মূলত বিগত একদশক ধরে নতুন নাট্যকার এবং তাদের লেখা নাটকের ক্ষেত্রে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। অনেকদিন ধরেই আমরা সেই রকম নাট্যকার পাচ্ছি না যিনি একটির পর একটি সত্যিকারের নাটক লিখে যাচ্ছেন, তার সেই নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে এবং সফলতা পাচ্ছে। তার বদলে আমরা অনেক ক্ষেত্রে গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ পাচ্ছি, পাচ্ছি অনূদিত নাটকের মঞ্চায়ন। পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে নাটক লেখা। বাংলা নাটক কেন, সুপ্রাচীন গ্রিক নাটক বা সংস্কৃত নাটকের ক্ষেত্রে বার বার ঘটেছে। মহাকাব্য ও মহাকায় উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়ার ঘটনাও বিশ্বজোড়া। পিটার ব্রুককৃত ‘মহাভারতে’র নাট্যরূপ বা তারও অনেক আগে দস্তয়েভস্কির ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’ উপন্যাসের মঞ্চায়নের ঘটনা তো সবারই জানা।

কিন্তু আমরা মৌলিক নাটক চাই। সে নাটকের কাহিনি-ঘটনা-চরিত্র কোনোকিছু থেকে নেওয়া বা অ্যাডাপ্টেড নয়। কোনো অনূদিত নাটক নয়। চাই এমন নাটক, যে নাটক কোনো লেখক নিজের সৃষ্টিশীল তাড়না-প্রেরণা থেকে লিখবেন, যা হয়ে উঠবে সাহিত্যগুণমণ্ডিত। সেই রকম সাহিত্যগুণমণ্ডিত নাটকেরই সংকট চলছে এখন। নাট্যসাহিত্য বলতে যা বুঝি, কোনো মঞ্চায়ন ব্যতিরেকে যে নাটকের রস একজন ব্যক্তি [হাজার বছর পরেও] একেবারে একান্তে পাঠ করেও আস্বাদন করতে পারেন- তেমন নাটকের বই এখন কি প্রকাশিত হচ্ছে? সেরকমের নাটকের সংকট চলছে এখন।

আমরা তো চাইলেই গ্রিক নাটকগুলো, কালিদাস, ভাস, শূদ্রক বা সং¯ৃ‹ত নাটকগুলো, শেক্সপিয়রের নাট্যাবলি, মার্লো, গ্যেটে, ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ, চেখভ, মেটারলিঙ্ক, দীনবন্ধু, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, পিরানদেল্লো, ব্রেখট, বেকেট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, সাঈদ আহমদ, মমতাজউদ্দীন আহ্মদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন প্রমুখের নাটক পাঠ করেই সেসব নাটকের রস গ্রহণ করতে পারি। এখনো তাদেরই নাটক কমবেশি বই হিসেবে পাওয়া যায়। সেখানে একদশকে নাটক লেখার ক্ষেত্রে অদ্ভুত একটি পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে প্রকাশনা শিল্পে নাটকের বইয়ের চাহিদাকে প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থাটিও মৌলিক নাটকের সংকট থেকে উদ্ভূত। কারণ মৌলিক নাটকের ক্ষেত্রে প্রকাশনা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারতো। নাটক প্রকাশের ক্ষেত্রে আগে মুক্তধারার মতো প্রকাশনী বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছিল। বর্তমানে তা অবসিত প্রায়। বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠান নাট্যসাহিত্য প্রকাশের বেলায় আগের মতো সক্রিয় নয়। কিছুদিন আগেও ‘কিসসা কাহিনী’ নামের একটি প্রকাশনী সংস্থার উদ্ভব হয়েছিল- যারা তরুণদের নাটক প্রকাশ করতে বিশেষভাবে এগিয়ে এসেছিল, সেটিও এখন বিলুপ্ত। ফলে নাট্যসাহিত্যের প্রকাশনার অভাবও মৌলিক নাটক রচনায় একটা বাধা হয়ে আছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে যেভাব নাট্যপ্রতিযোগিতা হতো- তাও আর আগের মতো হয় না। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে অকার্যকর করে দিয়ে কেবল নেতৃত্বেরই সংকট তৈরি হয়নি, শিল্পসংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রটিকে ঊষর করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কোনো নাট্যদলে শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথের নাটক বা প্রবীণ কারো নাটকের জন্য যে ব্যয় করা হয়, সেটি যদি একজন তরুণ নাট্যকারের নাটকের ক্ষেত্রে করা হতো, তাতেও কিছু উৎসাহ বাড়তো।

আপনারা ইংরেজিতে যাকে বলে ‘প্লে-রাইট’ আর ‘ড্রামাটিস্ট’- এই দুয়ের পার্থ্যকটা নিশ্চিয় জানেন। প্লে-রাইটরা নাটক লেখেন কোনো একটি নাট্যদলের জন্য। আর ড্রামাটিস্টরা নাটক লেখেন নাটক লেখার জন্য। তিনি তাঁর নাটকের অভিনয়ের পরোয়া করেন না। তাঁর শিল্পতাড়না তাঁকে এই বোধ করায় যে এর প্রকাশের জন্য নাটক নামের শিল্পাঙ্গিকটিই সবচেয়ে জরুরি।
যারা থিয়েটারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে নাটক লেখেন, তারা যুগপৎ প্লে-রাইট ও ড্রামাটিস্ট। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী থিয়েটারের জগতে এমন কিছু ব্যক্তিকে আমরা পেয়েছি যাঁরা এই দুটো ভূমিকাই পালন করেছেন। কিন্তু হালে নতুন প্রজন্ম থেকে সেই ভূমিকা নিয়ে কাউকে তেমন করে অগ্রসর হতে দেখা যাচ্ছে না। দুয়েকটি নাটক রচনায় কয়েকজনের সফলতা নিশ্চয় স্বীকার করতে হয়, কিন্তু এর ধারাবাহিকতা ততটা রক্ষিত হচ্ছে কি? ধারাবাহিকতার এই অভাব থেকে মৌলিক নাটকের অভাব দেখা দেয়নি কি?

আরো একটি নিদারুণ বিষয় আছে। সেটি হলো: থিয়েটারে থিয়েটার বিষয়কচর্চা যতটা হয়- নাট্যসাহিত্যের চর্চা বোধ করি ততটা হয় না। দলীয়ভাবে যে নাটক আগামীতে হবে, সেই নাটক ছাড়া নাটকের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকারদের নাটকগুলো কি সেইভাবে নিয়মিত চর্চা করা হয়? ব্যক্তিগভাবে কেউ কেউ হয়তো স্কাইলাস, সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, অ্যারিস্টোফানেস বা শেক্সপিয়র থেকে শুরু করে বেকেট পর্যন্ত নাটকগুলো পড়েন, বা দীনবন্ধু-মধুসূদন থেকে মাসুম রেজার নাটক পড়েন, কিন্তু থিয়েটারের গ্রুপগুলোতে কি নিয়মিত নাটকের এইসব রথীমহারথীকে নিয়ে কোনো পাঠচক্র হয়? [আমি ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, হয় না।] অথচ প্রত্যেকটি নাট্যদলের তো নিজস্ব গ্রন্থাগার থাকার প্রয়োজন ছিল [সেখানে কোনো নাট্যদলেরই নিজস্ব লাইব্রেরি নেই] -যার মাধ্যমে বিশ্বনাটক ও বিশ্ব শিল্প-সাহিত্যের অন্যান্য দিকগুলি নাট্যকর্মীদের নিয়মিত চর্চার বিষয় হয়ে উঠবে।

কারো কারো দৃষ্টিভঙ্গি এমনও ছিলো বা হয়ে আছে যে, অভিনেতা মূঢ় বা স্টুপিড না হলে তাকে নিয়ে কাজ করানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বোধজ্ঞানসম্পন্ন অভিনেতা নির্দেশকের কাজের জন্য বাধা হয়ে ওঠে। সে নানান যুক্তিতর্কে লিপ্ত হয়। আধুনিক সময়ে পড়ালেখাহীন অভিনেতার চেয়ে বাজে জিনিস আর কী হতে পারে? কেবল নাটকের বইপত্র নয়। শিল্পসাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে আগ্রহী না হলে নাটকের জগতে কাজ করা মানুষের প্রকৃত বিকাশ কি সম্ভব?

এবার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথার শরণ নেওয়া যাক, তাঁর মতে, শিল্পের একটা মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘নালমতিবিস্তরেণ’। অর্থাৎ অতি বিস্তারে যে অপর্যাপ্ত রস থাকে, তা নয়। অমৃত হয় এক ফোঁটা, তৃপ্তি দেয় অফুরন্ত। আর সেই শিল্পের আরেক দিক হল ‘অনন্যপরতন্ত্রা’। তিনি লেখেন ,‘আমার শিল্প এক, আর তোমার শিল্প আর-এক, আমার দেশের শিল্প এক, তোমার দেশের শিল্প অন্য- এ না হলে মানুষের শিল্পে বিচিত্রতা থাকত না; জগতে এক শিল্পী একটা-কিছু গড়ত, একটা-কিছু বলত বা গাইত আর সবাই তার নকল নিয়ে চলত।’ তিনি এর ভেতরে যে বিপদটির কথা আমাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সেটি হল- আগের শিল্পী যে ছাঁচে সফল হয়েছেন- সেটিই পরের শিল্পীর জন্য পথ- এই মানসিকতাই হল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, ‘অতি পুরাতন চোরাবালি।’ এর হাত থেকে বাঁচার জন্য চাই ‘অনন্যপরতন্ত্রা’। ‘কি দিয়ে ঘর সাজালে, কি ভাবেই বা নিজে সাজলেম?’ সেই বিচার থেকে শিল্পে অধিকার আসে। সেই অধিকার না পেলে আর কিছুই পাওয়া হবে না। এবং সেই অধিকার পেলে সারা বিশ্বের শিল্পসম্পদের অধিকার তৈরি হয়, তা সম্ভোগ করার ক্ষমতা জন্মায়। ফলে ‘অনন্যপরতন্ত্রা’র সাধনা যে করে কি দেশের কি বিদেশের প্রাচীন নতুন সব শিল্পের ভোগ তার কপালে জোটে। অর্থাৎ, কেবল নিজের লেখা-সৃষ্টি-শিল্প নিয়েই ব্যস্ত থাকলে প্রকৃত শিল্পীর চলে না, সারা পৃথিবীর থেকে শিল্পসম্পদগুলি নিজের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসা চাই।

আমরা মৌলিক নাটকের বিকাশের জন্য শিক্ষিত অভিনতা ও নির্দেশকের কথা জোর দিয়ে বলতে চাই। কারণ শিক্ষিত অভিনেতারাই পারেন মৌলিক নাটক ও নাট্যকারের অবির্ভাবকে সম্ভব করতে তুলতে। ভালো লেখকের জন্য ভালো পাঠক চাই। মৌলিক নাটকের সংকট কাটানোর জন্যও চাই সমঝদার নাট্যসাহিত্যের পাঠক, নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা।

এর জন্য সবার আগে বোঝার দরকার নাটক কাকে বলে? থিয়েটার ও নাটকের পার্থক্য কী? নাটক একটি সংলাপ ও দৃশ্যনির্ভর সাহিত্যকর্ম। এছাড়া ঠিক কোন কারণে নাটক অন্য সমস্ত শিল্পমাধ্যম থেকে আলাদা সেটিও বুঝে নেওয়ার দরকার আছে। তবে সেটি আলোচনার ক্ষেত্র এটা নয়। আমরা কেবল এর কিছু বিষয় স্পর্শ করে যেতে পারি। সবাই জানেন, থিয়েটার একটি প্রায়োগিক শিল্পকর্ম। অন্য সমস্ত শিল্প মাধ্যমের সঙ্গে থিয়েটারের বিশিষ্টতাকে ভসেভলদ মায়ারহোল্ড আলাদা করছিলেন এই বলে যে, থিয়েটার একমাত্র শিল্প- যেখানে মানুষের শরীরটা একেবারে সরাসরি চোখের সামনে উপস্থিত থাকে। এছাড়াও থিয়েটার একটি যৌথ শিল্পকর্ম। এখানে কাব্য, আখ্যান, উপাখ্যান, সংগীত, গীত, অভিনেতা, দর্শক, আলোকনিয়ন্ত্রণ, রূপসজ্জা, পোশাক পরিকল্পনা থেকে চিত্রপটসহ এমন কিছু নেই যা থিয়েটারের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু থিয়েটারে ন্যূনতম প্রয়োজন হল: একজন অভিনেতা ও একজন দর্শক। এটা ইয়ের্জি গ্রোতোভস্কির কথা থেকে ধার নিয়ে বলছি। অন্যদিকে, নাটক হল থিয়েটারের সাহিত্য অংশটুকু। লিখিত অংশটুকু। নাটকের স্ক্রিপ্ট ছাড়াও থিয়েটার হতে পারে, কস্টিউম ও সেট ডিজাইন বাদ দিয়েও থিয়েটার হতে পারে। কিন্তু অভিনেতা ছাড়া কি থিয়েটার হতে পারে? পারে না। আর চাই কমপক্ষে একজন দর্শক। এই যে থিয়েটার [লিখিত] নাটকের মুখাপেক্ষী নয়, এখান থেকেও মৌলিক নাটকের সংকট তৈরি হয়েছে। থিয়েটার বর্তমানে পুরোপুরিই নির্দেশকের শিল্প হয়ে গেছে। আগে যাঁরা মনে করতেন থিয়েটার ও নাটক- একটি শরীর হলে আরেকটি আত্মা- এখন অনেকেই আর সেটি মনে করেন না। কোনো কোনো নাট্যদলের নির্দেশক ও অভিনেতা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে থিয়েটার করছেন। থিয়েটার হয়ে উঠেছে ইম্প্রোভাইজেশন বা প্রত্যুৎপন্ন একটি বিষয়। যেখানে নির্দেশক ও অভিনেতার উদ্ভাবনাই প্রধান। নাটকের আর কোনো প্রয়োজন নেই। হলেও সেটি যে খুব সাহিত্যগুণ সম্পন্ন নাটক হতে হবে- তাও নয়। মোটামুটি একটা গল্প বা কাহিনিমতো তৈরি করে তারপর প্রয়োজন মতো সংলাপ বসিয়েই নাটকের কাজটি চালানো যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো একজন সদ্য প্রয়াত ব্যক্তির জীবন নিয়ে, তিনি যদি একজন সংগীতের দিকপাল হন তো তাঁর সেই সংগীতের ওপর ভর ক’রে, মাঝে মাঝে তাঁর জীবনের কাহিনি বর্ণনা করেই একটি থিয়েটার তৈরি হয়ে যাচ্ছে। যাতে কাহিনি, চরিত্র নাট্যকলায় যে যে মাত্রায় উন্নীত হতে পারার কথা- তার কোনো বালাই নেই। এভাবেও বাংলাদেশে, বিশেষ করে লোককাহিনি, যাতে প্রচুর গান থাকে, তা নিয়ে নাটক তৈরি করে অভিনয় করা হয়েছে। এই নাটকগুলোর কোনো কোনোটা বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। [বাংলা একাডেমির ফোকলোর সংগ্রহমালা থেকে নেওয়া ‘মাধব-মালঞ্চী কইন্যা’র কথা স্মরণ করতে পারি।] কিন্তু মৌলিক নাটকের অভাব তো এই ধরনের থিয়েটারচর্চা দূর করতে পারে না। মহাকাব্য-ছোটগল্প-উপন্যাস থেকে, লোককাহিনি থেকে পরিগ্রহণ বা অ্যাডাপ্ট করে লেখা নাটকও তা পারে না, তা যতই অভিনব কাজ হোক না কেন। অনেকেই জানেন পোস্টমর্ডান বিষয়ের অন্যতম দিক হচ্ছে ‘মৌলিকত্বহীনতা’ এবং ব্যাপক মিশ্রণের মাধ্যমে ‘এমন এক নকল জিনিস তৈরি করা যার কোনো আসল নেই’। নাটককেও সেই মাত্রায় কেউ কেউ নিয়ে যেতে চান। এখান থেকেই মৌলিক নাটকের আদৌ আর কোনো প্রয়োজন আছে কিনা- সেটিও ভেবে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কাছাকাছি মিল আছে এমন কয়েকটি চরিত্র রামায়ণ-মহাভারত-ইলিয়াড-ওডেসি থেকে নিয়ে একটি নাটক লেখা হল। সেখানে একিলিস, অর্জুন, রাম ও ওডিসিউসের মতো চরিত্রদের হাজির করে বা হেলেন, সীতা, পেনিলোপী ও দ্রৌপদীকে হাজির করে একটা মিশ্র নাটকের কথা ভাবা হলো। কোনো নাট্যকার এসব জড়ো করে এমন একটি অভিনব নাটক রচনা করলেন যা মঞ্চেও সফল হয়ে গেলো। কিন্তু তারপরও কি সেই খেদ মিটবে, হোমার, বাল্মীকি আর বেদব্যাস থেকে চরিত্র এনে একটি অভিনব নাটক তৈরি হলেও সেটি মৌলিক নাটকের স্তরে উঠতে পারে না, যে মৌলিক নাটকের সংকটের কথা আমরা বলছি। হোমার, বাল্মীকি ও বেদব্যাসের কাহিনি থেকে নেওয়া বা ‘অবলম্বন’ তকমাটা এর গায়ে লেগেই থাকে। তবে এও বলে রাখা ভালো শেক্সপিয়র-গেট্যের মতো লেখকরাও তাদের সৃষ্টির বড় একটি অংশ অন্যের কাছ থেকে ধার করে নিয়েই গড়েছেন। তাঁদের মহাশক্তিময় প্রতিভায় মৌলিক-যৌগিকের ভেদ ঘুঁচে গেছে, সেসব হয়ে উঠেছে মৌলিকতম সৃষ্টি। এমন দৃষ্টান্ত পরের নাট্যকারদের মধ্যেও কম নেই।

৩.
মৌলিক নাটক সমকালকে চিরকালে, চিরকালকে সমকালে হাজির করে। আর তা নাট্যকারের নিজস্ব কল্পনা-অভিজ্ঞতা ও মননজাত সৃষ্টি হয়ে ওঠে, নিজস্ব প্রেরণাজাত সৃষ্টি হয়ে ওঠে। সেই মৌলিক নাটক লেখার জন্য নাটক লিখতে চাওয়া মানুষকে যৌগিক ভূমিকা পালন করতে হয়। কারণ, জোর করে মৌলিকত্ব অর্জন করতে চাওয়াটা শিল্পের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাপার। আইজাক বাশেভিস সিঙার বলেছিলেন, তিনটি জিনিস লেখককে ধ্বংস করে দেয়, ১. যে লেখককে সমাজতাত্তি¡ক এবং রাজনীতিবিদের ভূমিকা নিতেই হবে; তাকে অবশ্যই সামাজিক দ্বান্দ্বিকতার সঙ্গে তাল মিলাতে হবে- এই প্রবণতা লালন করা; ২. অর্থলোভ এবং দ্র
দ্রুত স্বীকৃতির বাসনা; ৩. জোর করে মৌলিক হওয়ার চেষ্টা- নিজের গদ্য, রচনাশৈলী ও বর্ণনা0শই লেখকের প্রকৃত লেখকত্ব। কিন্তু সেটি বজায় রাখার জন্য বিশেষ একটি যৌগিকত্ব চাই। অর্থাৎ মৌলিক নাটক লিখতে হলে নাট্যকারকেও যৌগিক হতে0 হবে। এটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

এই যৌগিকতার দুটো দিক আছে- একটি হল নাটক ছাড়াও শিল্পসাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের প্রতি গভীর আগ্রহ ও চর্চা- যেমন কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, চিত্রকলা, চারু ও কারুকলার নানান বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ হওয়া চাই বিশ্ববিস্তৃত। বিশেষ করে আধুনিক ও সাম্প্রতিক কবিতা-উপন্যাস-ছোটগল্পের স্রোতটি নিজের ভেতর নিত্য প্রবাহিত হতে দেওয়ার দরকার আছে। এতে অন্য মাধ্যম থেকে মৌলিক নাটক লেখার প্রেরণা জাগানিয়া বহু কিছু পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে চলবে। বলাবাহুল্য এর বড় অংশটাই পাঠ নির্ভর। ফলে মৌলিক নাটক রচনারও সূত্র ওই একটাই- যে সূত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক নবিশ গল্পকারকে দিয়েছিলেন। সেই নবীন গল্পকারের জিজ্ঞাসা ছিলো, যে গল্প-উপন্যাস লিখতে হলে কী করতে হবে? তারাশঙ্কর উত্তর দিয়েছিলেন- পড়ো পড়ো এবং পড়ো। একই প্রশ্ন শাকুর মজিদ হুমায়ূন আহমেদকে করলে তিনিও প্রায় একই উত্তর দিয়েছিলেন- ‘নতুন লেখকদের জন্য আমার একটাই কথা- পড়তে হবে, প্রচুর পড়তে হবে- সব লেখকের লেখা পড়তে হবে। তাতে ভাষার ওপর দখল আসবে- কোন লেখক কিভাবে চরিত্রগুলো নিয়ে ‘ট্রিট’ করছেন, সেটাও পরিষ্কার হবে।’ এতে তলস্তয়ের সেই বাণীটিও স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁর কথায়- ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন- বই বই এবং বই।’ বা গোর্কির কথায়, তিনি [মানে গোর্কি নিজে] তাঁর জীবনের ভালোমন্দ যা কিছু অর্জন করেছেন সব কিছুর জন্য তিনি বইয়ের কাছে ঋণী। সুধী এই কথাগুলো আগে আমরা সর্বত্রই দেখতে পেতাম। মুক্তধারার মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রন্থতালিকার পুস্তিকায় এখনো এই কথাগুলো ছাপিয়ে যাচ্ছেন। আফসোস আমাদের বাংলাদেশের লেখকরা লেখালেখিতে থাকার এই প্রধান দিকটি থেকে যেন ক্রমে সরে যাচ্ছেন। দৃষ্টি ও বোধকে বিচিত্র দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নিজের সৃষ্টিকে ঋদ্ধ করার দিকে তাই আমাদের যাওয়া হচ্ছে না। কেউ এই সত্যটি উপলব্ধি করেন না যে, পঠনক্রিয়ায় যে যত বহুগামী তার তত নম্বর। যিনি নাটক লেখেন তিনি কেবল নাটক নিয়েই থাকেন; সমকালীন ছোটগল্প কবিতা, দেশিবিদেশি ধ্রুপদী ও আধুনিক উপন্যাস নিয়ে তার পাঠ প্রায় শূন্যের কোঠায়; আর যারা উপন্যাস-ছোটগল্প লেখেন নাটক যে পড়ার মতো একটি বিষয়- সে কথা তাদের মনেও পড়ে না। উল্টো ঘটলে মৌলিক সৃষ্টির জন্য প্রার্থিত যৌগিকত্বটা আমাদের পাওয়ার কথা ছিলো। আরেকটি যৌগিকত্ব থিয়েটারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়। বিশ্বের প্রধান নাট্যকারদের কথা নাই বা বলি; বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যকে যে কজন সমৃদ্ধ করেছেন- তাঁরা প্রায় সবাই নাটক রচনা, নির্দেশনা, অভিনয়ের মতো কাজগুলো একইসঙ্গে করেছেন। সেই সঙ্গে পালন করছেন সংগঠকেরও ভূমিকা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে থেকে শুরু করে বর্তমান অব্দি সেই প্রজন্মের কজন এখনো একই ভূমিকায় ক্রিয়াশীল আছেন বলেই আমাদের নাট্যজগৎ এখনো সজীবতা পাচ্ছে। নাটক রচনা ও থিয়েটারই যাদের ধ্যানজ্ঞান। সারাটি জীবন এর জন্য ব্যয় করে দিয়েছেন। জীবন ও জীবিকা- দুটি অতিবাহিত করেছেন নাটক ও থিয়েটারের জন্য- সেই রকম দায়, অভিনিবেশ নিয়ে অনেকদিন ধরেই নতুন প্রজন্মের কাউকে এ ভুবনে আসতে দেখা যাচ্ছে না। এদের কারো কারো যদিও নাটক ও থিয়েটারের প্রতি দরদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু ওইরকম যৌগিক ভূমিকা তাদের পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। আধুনিক সংগীতে যেমন গীতিকার গান লেখেন, সুরকার সুর করেন এবং সংগীতশিল্পী গানটি পরিবেশন করেন; থিয়েটারের ক্ষেত্রেও নাট্যকার-নির্দেশক ও অভিনেতা-সংগঠকের ভূমিকা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। এই খণ্ডনের প্রক্রিয়াটিও মৌলিক নাটকের জন্য বাধা হয়ে আছে। এই খণ্ডন তো আছেই, তারপর থিয়েটারের জগৎ বিচিত্র মানুষের জগত। এতগুলো মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে এতে নিবিড় সম্পর্ক যেমন তৈরি হয়, এর ভেতরে জটিলতাও দেখা দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে এমন ঘটনাও ঘটে যে, থিয়েটার করতে চাওয়া বা নাটক লিখতে চাওয়া কোনো কোনো ব্যক্তিকে চিরকালে জন্য এই নাটক ও থিয়েটারের জগৎ ত্যাগ করতে হয়। কারো কারো মতে এখানে শিল্পের চাইতে ‘রাজনীতি’ বড় হয়ে উঠেছে। আছে পরশ্রীকাতরতা, ভয়ংকর বিদ্বেষকামী ঈর্ষা।

সত্যিকারের অভিনয়শিল্পী ও লেখক একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সৎ মানুষ। হৃদয়বৃত্তির এমন একটি স্তরে তিনি অবস্থান করেন যেখানে মানবিকতা দিয়েই তিনি সব কিছুর বিচার করেন। বিবেকের শক্তিই তার শিল্পী হিসেবে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। যিনি নাটক লিখতে চান, কোনো না কোনো নাট্যদলের সঙ্গে তার কাজ করা শ্রেয়। কারণ একে তো নাটকের বই প্রকাশ করা দুরূহ, তারপরও তিনি যদি একাকী নাটক লিখে যান, এতে খুব বেশিদিন তার নাট্যকার সত্তা টিকে থাকতে পারে না। সেই তিনি যদি কোনো নাট্যদলে এসে তার ভেতর ও বাহিরের নানা রকমের হীনতা-নীচতার শিকার হন, তাহলেও ওই জগতে বেশি দিন টিকে থাকার কথা নয়। এছাড়াও থিয়েটার জগতের কিছু হীন বিষয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় তিনি এখানে টিকতে পারেন না। আমাদের স্বীকার করে নিতে হয় যে, সমাজের রক্ষণশীল অংশে নাটক ও থিয়েটার করা লোকজনের প্রতি তীর্যক দৃষ্টির এখনো তেমন পরিবর্তন হয়নি। থিয়েটারের জগতকে অনেকেই মনে করেন- এ যেন বামাচারের জায়গা, নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার ক্ষেত্র। আদতে এটা তো একটি মুক্ত পরিবেশ, যে পরিবেশ সভ্য মানুষমাত্রেরই কাক্সিক্ষত, কিন্তু যারা এই মুক্ত পরিবেশের অপব্যবহার করেন- তা দিয়ে গোটা থিয়েটার জগতকে বিচার করা মূঢ়তা ছাড়া আর কী? ক্ষেত্র বিশেষে তিলকে তাল করে দেখানো হয়। এ ধরনের সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলে নানান ভাঙন ও খণ্ডন। বস্তুত শিল্পসাহিত্য হৃদয়বৃত্তির জায়গা। কিন্তু শিল্পচর্চা বা সাধনাকে সবার ঊর্ধ্বে রাখলে এসব অপবাদ ঘুচেও যায়। সৃষ্টিসাধনের লক্ষ্য যদি অটুট থাকে, শিল্পে বিশ্বাস যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে কোনোকিছুই সৃজনশীল মানুষের পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে না। বাস্তবতা হল- যিনি লিখতে চান বা লেখার জগতে আসেন, তাকে একটি বিবেচনা করতেই হয়: কে তাকে ঘৃণা করলো, আর কে তাকে ভালোবাসলো- এই নিয়ে ব্যস্ত থাকলে- তার দ্বারা বড় কাজ করা সম্ভব হয় না।
তবে ভরসার জায়গাটিও ধরে রাখতে হয়। আস্থা ছাড়া থিয়েটারের মতো যৌথশিল্পক্রিয়াকে অর্জনের চূড়ান্তে নিয়ে যাওয়া যায় না। নাটকলেখক, নাট্যনির্দেশক, অভিনয়শিল্পীদের ভেতর আত্মিক যোগ যতটা শক্তিশালী হয় ভরসার জায়গাটি তত বাড়ে। আর সেখান থেকেই একজন নাট্যকার স্থিতধী অর্জন করেন। এর ফলে মৌলিক নাটক লেখার কাজটিও সম্পন্নতা পায়।

ভরসার কথা এজন্য বলতে হয় যে, দেখা গেছে নাট্যকার নির্দেশকের ওপর ভরসা করতে পারছেন না, যে তিনি যেভাবে তার নাটকের মঞ্চায়ন হবে বলে মনে করেছিলেন- তা ঘটল না, অভিনেতা-অভিনেত্রী যে মানে উঠলে পরে তার নাটকের চরিত্রগুলি জীবন্ত হয়ে উঠতে পারতো তাতে ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। এর উল্টোটা ঘটলেই নাট্যকারের লেখা জোর পায়। বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট নাট্যকার বর্তমান লেখককে বলেছিলেন, তিনি যখন কোনো চরিত্র নির্মাণ করেন, লিখতে লিখতে তার দলের নির্দিষ্ট ব্যক্তি তার মাথায় থাকে- যাকে দিয়ে এই চরিত্রটি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা যাবে। সেই সঙ্গে যখন নাটক লেখা সম্পন্ন হয়, তিনি চিন্তা করতে থাকেন নির্দেশক- তিনি যা লিখেছেন, সেটাকে আরো কয়েক ধাপ উচ্চে নিয়ে- একে শিল্পসফল ও মঞ্চসফল করে তুলতে পারবেন। কারণ তার প্রায়ই মনে হত- তিনি নাটককে নাটকের প্রচলিত জায়গা থেকে ক্রমে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন- যাতে শিল্পের সবকিছু মিলেমিশে যাচ্ছে। এমন সব পরিস্থিতি ও মুহূর্তের বর্ণনা আছে যা মঞ্চে আনা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু তারপরও তিনি সেখান থেকে সরে যেতেন না। কেননা তাঁর মনের রঙ্গমঞ্চে কোনো কিছুর জন্যই জায়গার অভাব ছিলো না। তাঁর বিশ্বাস নির্দেশক ও অভিনেতারা তাঁর নাটকের সীমাভাঙা ব্যাপারগুলো মঞ্চের সীমায় হাজির করতে পারবেন। এই যে অভিনেতার ওপর আস্থা, নির্দেশকের ওপর নির্ভরতা- এটি তাঁর নাটকগুলোকে কোথায় নিয়ে গেছে তা বাংলা নাটক ও থিয়েটারের জগতে এখন ইতিহাস। নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনয়শিল্পীর ভেতরে এই বন্ধন যত শক্ত হবে, মৌলিক নাটকের মুক্তিটা ততই সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে।

৪.
মৌলিক নাটক রচনায় সংকটটের আরেকটি দিক হচ্ছে, নাটকের নান্দনিক দিক বা নন্দনতত্ত্ব বা সৌন্দর্যদর্শন সংক্রান্ত চর্চার অভাব। স্বীকার করে নেওয়া দরকার যে, তত্ত্ব দিয়ে নাটক হয় না। কিন্তু শিল্পাসাহিত্যের নান্দনিক ইতিহাসের পরম্পরাগুলোর সম্পর্কে গভীর ও সম্যক ধারণা না থাকলে মৌলিক নাটক রচনার কাজটি যে সম্ভব হয় না- এটি আবারো জোর দিয়ে বলতে চাই।
ক্ল্যাসিক, রোমান্টিক, রিয়ালিজম-ন্যাচারালিজম, পরে সিম্বলিজম থেকে শুরু করে অ্যাবসার্ড ইত্যাদির অভিধা দেওয়া নাটকগুলোকে- কেন মর্ডান বলা হচ্ছে- সেসব সম্পর্কে জানাটা যদি কেবল কানে শোনার পর্যায়ে রয়ে যায়, সেই তত্ত্ব -মতবাদের সঙ্গে গভীর পরিচয় যদি না থাকে, তাহলে পিটার বিকসেলের সেই বিখ্যাত ‘আবিষ্কারক’ গল্পের মতো ঘটনাই বারবার সৃষ্টি হয়। সেই গল্পে এক লোক জগতের কী হচ্ছে না হচ্ছে তার কোনো খোঁজ না রেখে, একদিন এমন এক জিনিস আবিষ্কার করে এবং তা দেখাতে গেলে সবাই তাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। কারণ তার ধারণা তিনি ‘নতুন’ একটি জিনিস তৈরি করেছেন, আর সবাই বলে, ‘ও তুমি টেলিভিশন বানিয়েছো!’ লোকজন কেন তার আবিষ্কার নিয়ে এত হাসাহাসি করছে সে বুঝতেই পারছিল না। তখন তাকে বলা হয়, লোকজন এই কারণেই হাসছে যে তারা অনেকদিন ধরেই টেলিভিশন দেখছে- তা আর নতুন করে আবিষ্কার করার কোনোই কারণ বা দরকার নেই।। শিল্পের ক্ষেত্রে মৌলিক সৃষ্টির জন্য তাই কী ধরনের কাজ আগে হয়েছে সেটি জানার গুরুত্ব সেই কারণেও জরুরি। এছাড়াও নাটক সম্পর্কিত বিভ্রান্তিগুলোও শনাক্ত করার দরকার। নাটক নাটকই। নাটক লক্ষ লক্ষ শব্দে বা হাজার হাজার পৃষ্ঠায় রচিত হওয়ার আঙ্গিক নয়। নাটক কখনো উপন্যাস বা গল্পের কাজ করে না। ফলে নাটককে যখন উপন্যাসের মতো ‘সমগ্রতাস্পর্শী’ করে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়, তাতে নাটক আর নাটক থাকে না। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও মারিও ভার্গেস ইয়োসার এক বিখ্যাত আলাপচারিতা থেকে জানা যায়, তাঁরা দুজনে ‘টোটাল নভেল’ই লিখতে চান। [ভার্গেস ইয়োস নিজে আবার নাট্যকারও।] সবাই জানেন যে, নভেল বা উপন্যাস বিষয়টিই তো সমগ্রতাস্পর্শী- তা না হলে সেটি উপন্যাসই হয় না। লোকজনকে সেই ‘টোটাল নভেলে’র কথা বলতে চেয়েছেন তারা। জীবনের সমগ্রকে স্পর্শ করেন বলেই ঔপন্যাসিকের গুরুত্ব একজন কবি, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ বা আর সবার তুলনায় বিশিষ্ট করেন দেখিয়েছেন ডি এইচ লরেন্স। অন্যরা একজন ঔপন্যাসিকের তুলনায় কোনো অংশেই ছোট নন, কিন্তু ঔপন্যাসিককে যেভাবে জীবনের সমগ্রতায় যেতে হয়, তার লেখায় বা কাজে, যা না হলে তার কাজটাই পালন করা হয় না, অন্যরা সেই সমগ্রতায় না গিয়েও নিজের কাজটিতে চূড়ান্তভাবে সফল হতে পারেন। নাট্যকারের এখানে ঔপন্যাসিকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার কথা নয়। নাট্যকারের কাজ একজন কবির কাজ। শব্দ, প্রতীক, উপমা, চিত্রকল্প, সংকেত ইত্যাদির মাধ্যমেই কবি নিজেকে হাজির করেন। জীবনের এমন কিছু খাতে আমাদের চালিত করেন যা আর কোনো কিছু দিয়ে সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত জর্জ সেফেরিসের একটি ছোট্ট কবিতার কথা স্মরণ করি। মাত্র তিনটি কথায় সাহিত্যের ও সাহিত্যিকের কর্মদর্শনের মূল অনুজ্ঞাটি তিনি বলে দিয়েছেন-
‘তুমি লেখ:
কালি কমে
সমুদ্র বাড়ে।’

-এই কালি অপ-জীবনযাপনের কালি, লোভ, পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা, হিংসা, জুগুপ্সা কত কিছুরই না কালি। এই কালি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজিক রীতিনীতির বিচিত্র দমন-পীড়নের কালি। আর সমুদ্র? সেতো সৌন্দর্যের, বোধের, চেতনার সমুদ্র এবং নতুন উদ্দীপনার, নতুন দৃষ্টির ও কর্মের সমুদ্র। ফলে যিনি লেখেন তাকে এর ভেতরকার গভীর ও সৃষ্টিশীলতার প্রশ্নে একথাটির অর্থ নতুন করে বুঝিয়ে দেওয়ার নেই। শিল্পতত্তে¡র নানান দিক বুঝে নিলেও কোনো তত্ত্বে বা ছকে কোনো প্রকৃত শিল্পী বাঁধা পড়েন না। কোনো মতবাদ বা আদর্শবাদকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেন না। কিন্তু বাংলা শিল্পসাহিত্যের একটা বড় ক্ষতি যে বামপন্থাকে ভুল বুঝে লালন করার ভেতরে রয়ে গেছে- সেটি জোর দিয়ে কেউ কখনো উল্লেখ করেন না। বরং মনে করেন, বামপন্থা আর আধুনিকতা সমার্থক। কিন্তু মার্কস নিজেও তো কোনোকিছুকে একরৈখিক বলে তাতে এঁটে থাকার কথা বলেননি। কিন্তু আমরা দেখেছি অনেক মার্কসবাদী মাকর্সের চেয়েও বেশি মার্কসবাদী। এই ধরনের মার্কসবাদীদের কেউ কেউ যখন শিল্পসাহিত্য করতে আসেন, তারা মার্কসবাদকে শিল্প করার চেয়ে শিল্পকে মার্কসবাদী করে তুলতে চান। এর মানে হল, তার শিল্পের লক্ষ্যই হয়ে যায় মার্কসবাদ। একজন নাট্যকার মার্কসবাদ থেকে জীবন রাজনীতি সমাজ মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছেন- তা শিল্পনির্মাণে কাজে লাগাতেই পারেন। অর্থাৎ মার্কসবাদকে শিল্পমুখী করবেন, শিল্পকে মার্কসবাদমুখী করবেন না। জীবন কোনো মতবাদমুখী বিষয় নয়, তাই শিল্পও কোনো মতবাদের দাসত্ব করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র মতো নাটক যেকেনো মার্কসবাদী সাহিত্যের চেয়েও বেশি বামপন্থী নয় কি? প্রমথ চৌধুরী বহু আগে বলেছিলেন- পাশ্চাত্যে যা মরে যায়, প্রাচ্যে তা ভূত হয়ে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে। পাশ্চাত্যে সাহিত্যর মাধ্যমে নীতিপ্রচারটিকে একসময় বড়ো করে দেখা হয়েছিল। জন গলসওয়ার্দির মতো লেখক ও নাট্যকার নীতি-প্রচারকে নাটকের প্রধান কাজ বলে মনে করতেন। আমাদের শিল্পসাহিত্যে এমন এক ‘আদর্শবাদে’র প্রতি মোহ আছে, যার কারণে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের মতো মহালেখকের উপন্যাস আদর্শবাদ প্রচারের কাজ করে এবং যা তাঁদের উপন্যাসকে প্রকৃত উপন্যাস হয়ে উঠতে বাধা দিয়েছে। আমরা শুরুতেই ‘গোরা সিন্ড্রমে’র কথা বলেছি, কিন্তু উপন্যাসের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সবখানে এই আগল ভাঙতে পেরেছেন কি? রবীন্দ্র-পরবর্তী আমাদের শিল্পসাহিত্যজুড়ে আবার দেখা গেছে- কেবলই হতদরিদ্র জীর্ণ ক্ষমতাহীন মানুষের মুখ, কিন্তু যাদের শোষণ, নিপীড়নের জন্য ওইমানুষগুলোর এই দশা হয়েছে সেই শয়তানদের মুখচ্ছবি ততটা উজ্জ্বলভাবে কোথাও আসেনি। চোখ মেললেই দেখি, আমাদের আসে-পাশের তথাকথিত সফল ও ক্ষমতাবান মানুষ মাত্রই এক একজন শয়তানের প্রতিভূ। কিন্তু সেই প্রতিভূদের আমরা লেখায় কতটা আনতে পারি? কতটা নাটকে, থিয়েটারে হাজির করতে পারি? আধুনিক শিল্প মানেই যে শয়তানের মুখটা চিরে চিরে দেখা- সেই কাজটা আমরা কতটা করতে পারছি? বরং সর্বত্র আমরা আদর্শবাদ ও নীতি নৈতিকতার ঝাণ্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে একটা অলীক শিল্পকেই হাজির করছি। মাঝে মাঝে এও মনে হয়, যদি শিল্পে ভালো করে ‘খারাপ’দের তুলে আনা হতো তাহলে বাস্তবে শয়তানিটা ক্রমে কমেও যেতে পারতো। এক শেক্সপিয়রই তো তাঁর নাটকে কোনো নীতিনৈতিকতার বালাই রাখেননি। গ্যেটে তাঁর ‘ফাউস্টে’ দেখিয়েছেন ক্ষমতা ও শয়তানি কত দূর প্রসারিত হতে পারে। আমার শিল্পসাহিত্যে আর মঞ্চে আদর্শবাদের ধুঁয়া তুলে আদতে আড়াল করে দেই আদর্শহীন ও মানবিকতার ধার একটুকু না ধরা শয়তানদের। ফলে শিল্পসাহিত্য তথা নাটক থিয়েটারের ভেতর দিয়ে কোনো আদর্শবাদের তোষণ-পোষণ জীবনবোধের প্রকৃত উদ্ভাসের জন্য বাধা হয়ে আছে- তা আমরা খেয়াল করছি না। মানবিকতার সার্বিক বোধ ছাড়া শিল্পসাহিত্যের মৌলিকত্ব অর্জন হতে পারে না। প্রতি পদে পদে সংস্কার, প্রথাগত বিধি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে আমরা যখন গণতন্ত্র, ধর্মনিপেক্ষতার কথা বলি, তখন সেটি কথার কথায়ই পরিণত হয়ে থাকে। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দেশ, সংস্কৃতি ইত্যাদির নামে যে-নেতিবাচক বিভেদচেতনা তার কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরে- আমরা না সত্যের কাছে যেতে পারি, না মুক্তির কাছে যেতে পারি। অন্যদিকে প্রখর রাজনৈতিক বোধ ছাড়া যিনি নাটক লিখতে আসবেন- তিনি তার সেই সৃষ্টিকে সার্থক করে তুলতে পারেন না। আমরা মূলত রাজনৈতিক সচেতনাবোধের কথাই বলছি। কোনো রাজনৈতিক দলের বা মতবাদের একাট্টা সমর্থন যদি তার শিল্পে ছাপ ফেলে তো সেটি শিল্পের জন্যই এক আত্মঘাতী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়- এই মন আজো সত্যিকারের সৃষ্টিশীল মানুষের মন। এই মন থাকে বলেই শিল্পসাহিত্য হয়ে উঠতে পারে যা কিছু মানবিক তার প্রকৃত ভাষ্য। প্রগতিশীল মানুষের সংকট তো আছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের সংকটগুলোও বুঝে নিতে হয়। গ্রামের সাধারণ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কেমন করে ধর্মান্ধ রাজনীতিতে পড়ে দিশেহারা হয়ে যায়, তার সেই অসহায় মুখটির দিকে কি আমরা তাকাবো না? নাকি তাকে বলব, তুমি ধর্মান্ধ, তুই ধ্বংস হ। তুমি পঁচে মর! তাহলে আর শিল্প করা কেন? তারচেয়ে কোনো কিছুর ভেঁড়ুয়া হলে তো করে কেটে খাওয়ার সুবিধা বাড়ে। আমাদের সর্বত্র এখন এইসব ভেঁড়ুয়াদের দিন। তাদের আমরা যারপরনাই ক্ষমতাবানও মনে করি। তাদের প্রকৃত চেহারা তুলে আনে যে নাটক তা আমরা মঞ্চায়ন করি না। হায়! ভয়ভীতি দিয়ে রাজনীতি চলতে পারে। কিন্তু শিল্প তো চলে না। শিল্পের অভেদাত্মক যে তিনটি সম্পদ- ভাষাগত দক্ষতা, সততা এবং সাহস। এর একটিও যদি না থাকে তো সেই শিল্প আর দাঁড়াতে পারে না। ভাষাগত দক্ষতা তো একজন নাটক রচনাকারীর প্রাথমিক গুণ। তার মানে এই নয় যে বাকিদুটো দ্বিতীয়-তৃতীয়। তিনটিই এক সারিতে প্রথম; গায়ে গায়ে লেগে প্রথম, মানে অভেদ। এখান থেকেই মৌলিক সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রখরতা লাভ করে। সেখান থেকে একজন নাটক লিখলে তার সেই সৃষ্টিতে কালি কমতে থাকে আর সমুদ্র বাড়তে থাকে। আসুন যারা নাটকের জন্য, থিয়েটারের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে চান, তারা আত্মসমালোচনার মাধ্যমে, এর প্রতি প্রগাঢ় প্রেমে ও পরিশ্রমে নিজের সেই স্বভাবকে, প্রকৃতিকে উন্মুক্ত করুন। যদি পারেন তো তাদেরই নাটক লেখা মানায়। অনেক কালি জমেছে- সে কালি নাটকে খরচ করে আসুন সমুদ্রটাকে বাড়াই।

মামুনুর রশীদ
আজকের যে প্রবন্ধকার হামীম কামরুল হক তিনি অনেকগুলি মৌলিক বিষয় এখানে উপস্থাপন করেছেন আজকের সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করবো এবং আশা করবো যে এখানে যারা উপস্থিত আছেন সবাই আলোচনা করে এই প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করবেন। আমাদের অত্যন্ত প্রিয় নাট্যকার আমাদের অগ্রজ সব্যসাচী লেখক, উনার ব্যক্তিগত কাজ থাকার কারণে চলে যেতে হবে তাই তিনি প্রথমে আলোচনা করবেন এবং তাতে একটা সুবিধা হবে আমরা সেই সূত্র ধরে অনেক দূর যেতে পারবো।

সৈয়দ শামসুল হক
ধন্যবাদ সম্মানিত বন্ধু সভাপতি মামুনুর রশীদ। সব্যসাচী বলেছেন আমাকে, এই সপ্তাহ কয়েক আগে রংপুরে গিয়ে একটি ভ্যারিয়েশন পেয়েছি যেটা এখানে উপস্থিত করলে খারাপ হবে না। ঐখানে দাঁড়িয়ে ঘোষক বললেন যে, এখন আমাদের সামনে বক্তব্য রাখবেন সব্যচাষী। তো আমার খুব ভাল লেগেছে যে, আমি ভীষণ নিবেদিত, ভীষণভাবে নিবেদিত একজন কৃষক। তো সেটাও মন্দ নয়। আর সেটা মনে হল এই জন্য যে, শেষে বলেছে না থিয়েটারের জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করতে চান। যারা নাটকের জন্য- আমি নাটকে আছি, থিয়েটারে আছি। আমি জীবনের জন্যে জীবন উৎসর্গ করতে পারি। তার অতিরিক্ত বোধ হয় পারবো না। এই প্রবন্ধটা হামীম কামরুল হক, আমাদের তরুণ লেখকদের মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন লেখক। ওর লেখার আমি গুণগ্রাহী। এই প্রবন্ধ যে শিরোনামে এসেছে আমার একটু বুঝতে অসুবিধা হয়েছে। সেটা হচ্ছে ‘মৌলিক নাটকের সংকট ও উত্তরণের পথ’। এটা মৌলিক নাটকের সংকট নয়, এটা- মৌলিক নাটকের অভাবজনিত সংকট। এটা তাহলে বোঝাতে হবে। অমৌলিক নাটকের কোনো সংকট নেই হয়তো সেরকম নয়। এই প্রবন্ধে আমি চলে যেতে হবে বলে যে দ্রুত বলছি তা নয়। আমি শুধু কয়েকটা দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথম কথা হচ্ছে খুব খেটে লিখেছে, অনেক বিষয় এসেছে এবং সবটাই আমার মনে হয়নি যে সংকট এবং উত্তরণের পথ। উত্তরণের পথ তো পরিহারই করেছে, ও বলেছে স্পর্ধা নেই। আমার অধিকার নেই বললে ভাল হতো। স্বীকার করেছেন কাজেই সংকট উনি বলতে গিয়েছেন, কেননা আমার মনে হয়েছে গোটা তিনেক প্রবন্ধের বিষয়কে তিনি একত্রে করে ফেলেছেন। যেমন ওই যে আদর্শবাদ, মার্কসবাদ, শিল্প এটা একটা আলাদা বিষয়। এটা মৌলিক নাটকের অভাবজনিত সংকটের বিষয়ে আমার মনে হয় যে এইটে আসবার খুব একটা কারণ আমি দেখতে পাইনি। আমার মনে হয়েছে যে এটাকে নিয়ে আলাদাই একটা প্রবন্ধ হতে পারতো। যেমন প্রমথ চৌধুরীর বলেছেন যে- পাশ্চাত্যে যা মরে যায় প্রাচ্যে আমাদের তা ভূত হয়ে ঘাড়ে বসে। এবং এই কথার জের ধরে একটা আলাদা প্রবন্ধ হতে পারতো এবং সেটা এখানে আমার মূল যে বিষয় তা থেকে একটু সরিয়ে দিয়েছে। এই ধরনের আরো কয়েকটা প্রসঙ্গ আছে। এখানে আপনাদের সবার সামনেই আছে এটা দেখতে পাবেন যে, গোটা তিন-এক প্রবন্ধের মসলা এর মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছি। হামীম কিছু মনে কোরো না, আমি দু’একটা বিষয়ে সবার এবং বিশেষ করে তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যেমন তুমি দু’টো জায়গায় নাম করতে গিয়ে নামের তালিকা করতে গিয়ে- যেমন ধরো, শেক্সপিয়র, মার্লো, গ্যেটে, ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ, মেটারলিঙ্ক, দীনবন্ধু, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, পিরানদেল্লো থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মামুনুর রশীদ ইত্যাদি। why not প্রথমে রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, দীনবন্ধু, ওয়ালীউল্লাহ, সাঈদ আহমদ। তারপরে সেখান থেকে শুরু করে তুমি অন্য দিকে যাও। আরো একবার তুমি এই কাজ করেছ। যেখানে এটা করেছো এটা তোমার দোষ নয় এটা আমাদের অভ্যাসের দোষ। এখানে তরুণেরা রয়েছেন। আমার দীর্ঘজীবন থেকে এটা দেখতে পাচ্ছি। আরো এক জায়গায় যখন তুমি উল্লেখ করেছ, মামুন কী বলে- হামীম এই বাইরের লেখকদের আগে উল্লেখ করে তারপরে আমাদের জায়গায় এসেছে। এটা কিন্তু দাস্য মনোভাব। এটা আমরা ধরেই নেই যে, আমাদের এখানে যা কাজ হয়েছে এটা পরের বিবেচ্য, ওইখানেই সব আছে। এটা হামীমের একার দোষ না, এটা আমি অনবরত দেখে থাকি। সাধারণ মানের প্রবন্ধে আমি অনবরত দেখে থাকি যে প্রথমেই শেক্সসপিয়র-মার্লো থেকে শুরু করে কালিদাস, দীনবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ এখানে চলে আসে। এইটা আমার কাছে কোনো সমালোচনা নয় প্রবন্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে, কারণ এর আগে তো মামুন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে নাকি, ও ঘোষণা করল সবার বয়োজ্যেষ্ঠ আমি সেজন্য অধিকারও খানিকটা আছে। অনেক দেখলাম তো বায়ান্ন সাল থেকে এ পর্যন্ত। একষট্টি বছর হয়ে গেল। এখন আরো কয়েকটি কথা বলি। নাটক আর থিয়েটার নিয়ে আমাদের হামীম যেটা করেছেন বোঝাবার চেষ্টা করেছেন, বোঝাতে পারেননি সরে গেছেন, আবার এসেছেন। কিন্তু দুটো দিক আছে। নাটক যেটি পড়বার দিকে ও সাহিত্যের মূল্যের দিকে জোর দিয়েছে। পড়বার মত এরকম নাটক লেখা হয়েছে। পড়বার মত কিন্তু আমি যতদূর বুঝি এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত এবং এখানে হয়তো কেউ স্বীকার করবেন আবার সবাই হয়তো স্বীকার করবেন যে, নাটক অভিনীত না হওয়া পর্যন্ত নাটক নয়। এবং সেটা এমন কী টেকনিক্যাল পারফরমেন্সও নাটক নয়। দর্শক থাকতে হবে। দর্শক, নাট্যকার, নাটকটি যারা করছেন এবং যারা দেখছেন। এবং সে দেখার ব্যাপারে দাক্ষিণাত্যের নৃত্যশিল্পের গুরুরা বলে থাকেন খুব সুন্দর একটি কথা- যদি কেউ না থাকে মন্দিরের প্রদীপটি হচ্ছে তোমার দর্শক। তার সামনে তুমি নাচবে। হ্যাঁ এরকম কথা আছে। অর্থাৎ এখানে এটিই বোঝানো হচ্ছে যে তিনটি থাকবে হবে। সাহিত্য হতে পারে। নাটককে আমরা সাহিত্য বলে পাঠ করি জানি। সব নাটকই সাহিত্য হয়ে ওঠে না। সব কবিতাই কি সাহিত্য হয়ে ওঠে? সব গল্পই কি সাহিত্য হয়ে ওঠে? আমাদের এই যে ‘৪৪৪২টি’ বই বেরিয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবগুলোই কি সাহিত্য হয়? কাজেই নাটকেও এরকম ব্যাপার আছে এটা কোনো আলাদা নয়। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, হামীম বলেছেন যে নির্দেশকের শিল্প হয়ে উঠেছে, এটা আমি স্বীকার করি না। একটা জিনিস খুব পরিষ্কার। আমি তুলনামূলক একটা উপমা দিয়ে বলি যদি There is difference between theater and circus. সার্কাসে প্রশিক্ষণ আছে। ধরুন প্রশিক্ষণ আছে নাটকের মতোই। আলো আছে, বাজনা আছে, চমক আছে একেবারে ডিসিশন রয়েছে পারফেকশন রয়েছে সব কিছু রয়েছে। কিন্তু যেটা নেই সেটা নাটকে রয়েছে। এইসব আছে এবং নাটকে যেটা আছে সেটা হচ্ছে বক্তব্য একটা আছে। আমাদের নির্দেশকরা, এখানে তো একজন খুব সামনের একেবারে বড় নির্দেশক রয়েছেন, আমি উনাকে খুবই বড় জানি। তো এটা কিন্তু আমার মনে হয় যে, এটা ঠিক নয় যে, নির্দেশকের শিল্প হয়ে উঠেছে তা নয়। আমার একেবারেই প্রথম নাটকে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় -এ ছোট্ট একটি ভূমিকাতে আমি বলেছিলাম যে নির্দেশকের স্বাধীনতা আছে। নির্দেশকের স্বাধীনতা আছে, তার নিজের কল্পনা নিশ্চয় এরকম নয় যে একেবারে বাঁধনছেঁড়া-বাঁধনহারা কল্পনা। তার ভিত্তি কিন্তু ওইখানেই রয়েছে। এবং এইখানেই হচ্ছে একটি নাটক as a text একটি লিটারারি প্রোডাক্ট। মনে হতে পারে, যদি মনে হয় সেইটের যে মঞ্চায়ন সেইটি That Theatre. একটা নাটককে আমি সাহিত্য হিসেবে দেখছি আবার একটি নাটককে আমি মঞ্চে দেখছি এটা আলাদা কিছু নয়। আমি মনে করি নাটক একটাই। তার পাণ্ডুলিপির সেই গুণ থাকলে সেটা সাহিত্য হিসেবে আমরা গ্রহণ করবো কিন্তু তাই বলে এটা শুধুই সাহিত্য নয় এবং সাহিত্য এটা হচ্ছে একটি বাড়তি পাওয়া বলে মনে করি। এটার জায়গাটা হচ্ছে মঞ্চে এবং মঞ্চে এমনি যে কবিতা ও নাটক হচ্ছে সবচেয়ে দূরগামী শিল্প। আমি বলি আমাদের ভাষার মাধ্যমে। আজকে সফোক্লিসের নাটক যখন হয় সফোক্লিস টুডে রাইট, শেক্সপিয়র যখন হয় শেক্সপিয়র টু ডে রাইট। আমাদের সেলিম আজকে চলে গেছেন সেলিম যখন মঞ্চে আসেন সেলিম চলে যাওয়ার পর আমি যখন তার নাটক দেখেছি আমার মনে হয় সেলিম আছেন। That the material. He is very much here. এটা বলে আমি যেটা বলতে চাই- আমি ওইটা বুঝিনি প্লে-রাইট এবং ড্রামাটিস্ট এই দুটোর তফাৎটা কিন্তু আমি বুঝিনি। হামীম বলেছেন যারা মঞ্চের জন্য লিখেন তারা প্লে-রাইট এবং ড্রামাটিস্ট হচ্ছেন যারা নাটক সাহিত্য এই ভেবে লেখেন। এগুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার। এখানে আমরা সবাই কিন্তু নাট্যজন নাটকের মানুষ। এর আরো একটা ইংরেজি আছে dramaturge. শুধু প্লে-রাইট আর ড্রামাটিস্ট নয় dramaturge ও আছে। তার উল্লেখ দরকার কিন্তু। এ সবগুলোর মূলে একটা জায়গায় সেটা হচ্ছে জীবন্ত মানুষের জন্যে, পারফর্ম করবার জন্যে, তার ভাষা সম্পদ। এইটা হচ্ছে নাটক। এভাবে আমি বুঝেছি। আরেকটা কথা আমি যেটা বলেছি যে, একটু আগে আমাদের উল্লেখ করতে গেলেই সবসময় বিদেশের বা অন্যদেশের নামগুলো করে তারপর আমাদের দীনবন্ধুতে আসা এটা যেমন ঠিক নয় তেমনি প্রবন্ধে হামীম, আমি তিরস্কার করবো না। কিন্তু এই প্রবণতা আমাদের প্রাবন্ধিকদের প্রায় সবারই আছে। সেটা হচ্ছে অনবরত পাশ্চাত্যের দোহাই, হাওলা, তাদের সাক্ষী মানা, তাদের উল্লেখ করা যেটা অবিরাম তুমি করেছো। এমন কী তাদের কথা উল্লেখ করেছো যাদের নাম সচরাচর নাটকের সাথে উল্লেখ করলে হবে না। কিন্তু তাদের কথা লিখেছ অথচ এইদেশে এইভাষায় মাইকেল মধুসূদন থেকে একেবারে এদের পর্যন্ত অনবরত কিন্তু নাটকের কথা বলা হয়েছে। লিখিতভাবেই, সেমিনারে এবং তাদের উদ্ধৃতি বা তাদের সাক্ষ্য তাদের বরাত আমি এ প্রবন্ধে দেখিনি। বাংলাদেশের ওয়েতে যদি আমি দেখি রবীন্দ্রনাথ কী বলেছেন একটা কথাই শুধু এসেছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা, প্রমথ চৌধুরীর উল্লেখ এসেছে ভাল। কিন্তু একেবারে নাটকে গোবিন্দ হালদার কীভাবে এসেছেন? তিনি তো গান লিখতেন কবিতা লিখতেন। বেশকিছু কথা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তো রয়েছেনই। এটা তো আমার মনে হয় যে, এদিকটা আমাদের ভাবা উচিৎ। আমি এই প্রবন্ধের লেখকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা রেখেই বলছি, তাকে কোনো আঘাত করবার জন্য নয়। এটি আমাদের একটি সার্বিক দোষ যে, আমরা সবসময় আমার দেশের বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই, সব সময় কবিতার আলোচনা করতে গেলেই- টিএস এলিয়ট এই বলেছিলেন, অনেকেই এরকম করেন। দয়া করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত কখনো কখনো জীবনানন্দের দু’একটি বাক্য- ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’ এরকম পরিচিত দু’একটা বাক্য। কিন্তু কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ কী বলেছেন আজ পর্যন্ত আমি কোনো কবির প্রবন্ধে, সমালোচকের প্রবন্ধে দেখিনি। খুব বড় করে দেখেছি বাইরের। এগুলো বলেই আমি আপাতত আর তিরস্কারের দিকে যাবো না। সেটা আমি বলবো যে, অনেকদিন ধরেই আমরা সেইরকম নাট্যকার পাচ্ছি না, যিনি একটির পর একটি সত্যিকারে নাটক লিখে যাচ্ছেন তার সেই নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে। একসঙ্গে এরকম পাওয়া দুষ্কর। সত্যিকারের নাটক এক, তারপর নিয়মিত লিখে যাওয়া একের পর এক, তারপর নিয়মিত মঞ্চস্থ হওয়া, তারপর সফলতা পাওয়া! একের পর এক তো মধুসূদন লিখেননি। গিরিশ ঘোষ লিখেছেন। মঞ্চের প্রয়োজনে তাকে লিখতে হয়েছে। একদিনে যে ঘটনা ঘটেছে এগারোদিনের মাথায় তিনি সেটা নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু একের পর এক তাকে লিখতে হয়েছে। কিন্তু একের পর এক সত্যিকারের নাটক এটা বোধ হয় সত্যি বেশি চাওয়া হচ্ছে। আমরা অনেকদিন থেকে গল্প উপন্যাসের নাট্যরূপ পাচ্ছি, পাচ্ছি অনূদিত নাটকের মঞ্চায়ন। এটা নাটকের ব্যাপারটাই এরকম যে সবকিছুর ভেতর থেকে এর উপাদান পাওয়া যাবে। এবং তুমি নিজেও সেটা বলেছো। যে পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে কিংবদন্তী থেকে, বিভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া হয়েছে। এরকম নাট্যকার ও নাটকের উল্লেখ তোমারই প্রবন্ধে দেওয়া আছে। কিন্তু এটা অনুবাদ করলেই সেটা নাটক হবে না, সাহিত্য হবে না এটা আমি স্বীকার করি না। একটা খুব ভাল কথা বলেছো যে বাইরের ব্যাপারে যে সবখান থেকেই আমাদের নিতে হবে। এই যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তারসঙ্গে কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ সেইভাবে বোধে আমাকে উত্তরাধিকার ব্যবহার করতে হবে। এবং সবটাই আমার ভেতর থাকবে। এটা আমি বলি, এখানে অনেকেই আমরা সবসময়ই বলি যে শেকড়। যেতে হবে, শেকড়ে যেতে হবে। এই করতে করতেই কিন্তু আমরা সংকীর্ণ হয়ে আসি। ভুল ধারণা আমি দেখতে পাই, অনেক ক্ষেত্রেই দেখতে পাই। আমি দেখি আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। সেখানে তো কৃপণতা দেখি না। সেখানে তো সংকীর্ণতা দেখি না। এইখানে বলি একেবারে শেষদিকে আমাদের বাংলাদেশের লেখকদের অনেককেই আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি তারা অনেক পড়েন। পড়াশোনা করেন না এরকম লোক তো, আমরা যাদের চিনি তাদেও তা আমি বলতে পারছি না, এই তুমি অমুক পড়। এবং পড়াটা কী পড়েছি সেটা গোপন করে আমার কাজে সেটা প্রতিফলিত হবে। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে কজনের সাক্ষ্য-প্রমাণ পাবে? অনেকেই এটা বলেছেন এবং আমি মনে করি এইরকম একটাও পাবেন না। অথচ রবীন্দ্রসদনে তাঁর পড়া বইয়ে শুধু মার্জিনের লেখাগুলো, কিছুলেখা আমার দেখবার সুযোগ হয়েছে। দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। যেমন তেমন বই পড়েছেন তার কুত্রাপি লেখায় উল্লেখ করেননি। কিন্তু ওইটা দেখে এনরিচড করেছেন। এবং এই কথাটিতে কিন্তু আমার ক্ষুব্ধ হবার কিছু নেই। কারণ আর কিছু না হোক আমার বাড়িতে আটদশ হাজার বই আছে, গেলেই দেখা যাবে। আর বলছ যে পড়লে মৌলিক সৃষ্টির জন্য প্রার্থিত যোগিকত্বটা আমাদের পাওয়ার কথা ছিল। আর তুমি একদিকে বলছ এই যৌগিকত্ব না থাকলে থিয়েটার হয় না। কারণ এই যে বলছ এরপরে, যৌগিকত্ব থিয়েটারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার মাধ্যমে অর্জিত হয়। কিন্তু তুমি সাহিত্যের নাটক চাইছো মঞ্চবর্জিত এইটা একটু বড় স্ববিরোধী হয়ে গেল না। নাকি বোঝাতে পারনি, নাকি আমার বোঝার ভুল। আমার মনে হয় এই পরস্পর বিরোধিতাটা আছে যে, তুমি মৌলিক নাটক বলতে সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ নাটকের কথা ভাবছো, নাকি নাটক শুধু সাহিত্য হিসেবেই ভাবছো, তার মঞ্চগুণ আছে কী নেই সেটা তোমার কাছে বড় নয়। তুমি বলছো আধুনিক সংগীতে যেমন গীতিকার গান লেখেন, সুরকার সুর করেন এবং সংগীতশিল্পী গানটি পরিবেশন করেন, থিয়েটারের ক্ষেত্রেও, গানের ক্ষেত্রে যেমন আলাদা হয়ে গেছে। একজন গান লেখেন, একজন সুর করেন এবং আরেকজন গাইছেন, থিয়েটারের ক্ষেত্রেও প্রবন্ধকার বলছেন, নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা। সংগঠকের ভূমিকা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। ভাল কথা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। তারপরেও এটা পরস্পরবিরোধী হলো কি না তোমার থেসিসের দিক থেকে যে, এই খণ্ডনের প্রক্রিয়াও মৌলিক নাটকের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে। তাহলে তো তাকে যেতেই হচ্ছে মৌলিক নাটকের জন্য, যে অর্থে এখানে মৌলিক নাটক আছে। কাজেই এই বিরোধী যারা, তাদের চিন্তার একটু ফাঁক আছে অথবা স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে এই খণ্ডনের প্রক্রিয়াটিও মৌলিক নাটকের জন্য বাঁধা হয়ে আছে, You are identifying one of the major problem. অথচ আমি মনে করি যে, এই নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতার ভূমিকা খণ্ডিত নয়। এটা এইরকমই ছিল। নাট্যকার-নির্দেশক হইতোবা এক হতে পারেন। অনেক সময় নাট্যকার অভিনয়ও করেছেন। এতে খণ্ডিত হবার জন্য যে নাটক, শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয় বা ভারতবর্ষে নয়, সমস্ত বিশ্ব যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নয়। এরকম আমি অজস্র নাম করতে পারি। ঠিক আছে। আমি তো নির্দেশনায়ও যাই না অভিনয়ও করি না, এমন কী আমার দলও নেই। আমি একমাত্র বাংলাদেশে যার কোনো দল নেই। তো আমার নাটক কি হয়নি? আমি তত্ত্বাবধায়কও না এবং মহড়াতেও যাই না কারণ আমি নাটকটি একবার পাঠ করি যে কোনো দলেরই। যারা আমার নাটক করেছেন তারা জানেন। আমি পাঠ করি যেভাবে ঠিক আমার ভেতরটা শুনতে পাই। তারপরে একবারও নয়। টেকনিক্যাল পারফরমেন্সের শোতে যাই না। আমি একেবারে প্রথম রজনি যাকে বলে, প্রথম রজনিতে সবার সঙ্গে বসে দেখি। আর একটু বলে রাখি, এখানে আমার স্বজনগণ রয়েছেন, আমি আমার নাটকে প্রথম রজনিতে যখন যাই লবিতে দাঁড়াই এবং লোকগুলোকে দেখি যারা ঢুকছেন তাদের মুখভাব লক্ষ করি এবং নাটক শেষে বেরিয়ে আসছেন তারা কি একই রকমে হাসতে হাসতে ঘাড়ে হাত দিয়ে বেরুচ্ছেন নাকি একটু বদল ঘটেছে। তাতে আমি টের পাই আমার নাটকটি হয়েছে। সারাজীবন বহন করতে হবে তা আমি দাবি করি না কিন্তু পাঁচমিনিট একটা নাটক দেখে থমকে গেলাম দমে গেলাম, উত্তেজিত হচ্ছি কি না এটুকু দেখার জন্য নাটক শেষ হওয়ার ঠিক আগে আমি বাইরে আসি। এই যে নাট্যকার- নির্দেশক খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে আমি তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ যে, এই খণ্ডনের ভিতরে থেকেও আমি আশা করি চাহিদামত মৌলিক নাটক, কোনো পৌরাণিক ভিত্তি নয়। ওইদিক থেকে তো এগুলোকে মৌলিক নাটকই বলবে। সাহিত্য হিসেবে নূরলদীন রয়েছে। সবকিছু মনে পড়ছে না। নারীগণ আমি পলাশী যুদ্ধের পটভূমিতে লিখেছি সেটাও হচ্ছে শুধু পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা। কাজেই এ কথাগুলো আমি নিতেই পারছিলাম না। তারপরেও আমি বলব এই প্রবন্ধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আর ভিতর থেকে একটি হচ্ছে এই যে, এই যে মৌলিক নাটকের অভাবজনিত যে সংকট সেটা টাইটেল হওয়া উচিত ছিল। এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি দিকে ধাবিত হয়েছেন প্রবন্ধকার এবং প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে মার্কসবাদ। শুধু মার্কসবাদ কেন বিংশ শতাব্দীতে শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি শাখার উপর দুটি বাদ খুব চেপে বসেছিল। একটি হল মার্কসবাদ অপরটি ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এই দুটো ডিটারমাইন করেছে। এরা প্রভাবিত করেছে শিল্পসাহিত্য। যাদের বেশি করেছেন তাদের শিল্প টিকেনি শেষপর্যন্ত। নইলে সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ট্রাক্টরকে মনে হয়েছে এ ট্রাক্টর নয় এ প্রণয়িনী। প্রেমে পড়েছে কৃষক। সে নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে কিন্তু তা থেকে গেছে আগের। আইভান বুনিন যিনি দেশ ছেড়ে গেছেন। প্যারিসে বসে তিনি লিখেছেন। আমরা এখনো সেগুলো ভুলতে পারি না। মানিক বন্দোপাধ্যায় মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়ে যে উপন্যাসগুলো রচনা করেছেন তার চেয়ে তার দীক্ষিত হওয়ার আগের উপন্যাসগুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা বা দিবারাত্রির কাব্য। যখনই ফ্রয়েডীয় দর্শনে গিয়েছেন, চতুষ্কোণ লিখেছেন, যখনই তিনি মার্কসবাদের আলোকে শহরতলী লিখেছেন সেগুলো আমরা উল্লেখমাত্র আর করি না। এই বিপদের দিকে যে সংকেত দেওয়া হয়েছে আমি মনে করি তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মতবাদের দিক থেকে নয়। আদর্শবাদের দিক থেকে নয়, গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি দিক থেকে সেটি হলো ওই উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে। ‘সমস্ত বিশ্ব আমার উত্তরাধিকার।’ সমস্ত বিশ্ব আমার ভিতরে থাকবে। সবকিছুই যে আমাকে ব্যবহার করতে হবে তার তো কোনো মানে নেই। সে আমার ভিতরে আগুন জ্বালাবে। সেটা প্রণোদনা নিয়ে আসবে কাজে। যে কোনো একটা জায়গা থেকে মানুষ অনুপ্রাণিত হয়। খুব বড় জিনিসেরও দরকার হয় না। খুব ছোট ঘটনা। অ্যালবেয়ার কামুকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আপনি উপন্যাসের ধারণাগুলো পান কোথা থেকে। তিনি বলেছিলেন যে, মনেই হতে পারে যে, খুব বড় কথা বলেছি, সেটা বোধহয় খুব বড় কারণে আমি পেয়েছি তা নয়। এটি খুব সামান্য কারণে পেয়েছি। এবং তার একটি উপন্যাসে দেখা যাবে যে, তার একজন খুবই ঘনিষ্ট আইনজীবী গাড়ি চালাচ্ছেন প্যারিসের রাস্তায়। তিনি বাড়ি ফিরছেন। লালবাতিতে থেকে গেলেন। সামনেই তার গাড়িটা। বাতিটা যখন সবুজ হয়েছে তার গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। পাশ থেকে একজন টেক্সিওয়ালা বললেন, এই হারামজাদা তোর গাড়ি চলে না কেন? তখনই গাড়ি স্টার্ট নিল এবং তিনি চলে গেলেন। এটি তাকে ভাবায় যে, আমার এত নাম এত খ্যাতি আর সাধারণ একজন আমাকে হারামজাদা বলে গেল। তাহলে খ্যাতির অর্থ কী? জীবনে কী করলাম? এই খ্যাতির অর্থ কী? সে নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। খুব ছোট ঘটনায়। দেশের ঘটনায়। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব খুব মজা করে বুঝাতেন। একদিন একজন প্রশ্ন করলেন দেবদা বলেন তো কী করলে শব্দ ত্যাগ করা যায়। বললেন, আমি তো অমুক করছি তমুক করছি এখনো পৌঁছুতে পারছি না। তিনি বললেন, শোনো একটি গল্প বলি। এক ভদ্রলোক গায়ক মানুষ বউকে নিয়ে স্নান করতে যাচ্ছে গায়ে তেল মাখতে মাখতে। বউ বলছে এই জানো, অমুকের না বৈরাগ্য ভাব হয়েছে। গায়ক বলল কেন কী হয়েছে। বউ বলল, তার তো অনেক বউ। সেদিন সে একটি বউ ছেড়ে দিয়েছে আবার নাকি অন্য বউও ছেড়ে দিবে। গায়ক বলল আরে ধুর অমন করে কি বউ বৈরাগী হওয়া যায়। এই দেখ ক্যামনে হতে হয়। এই বলে সে ঘটি-বাটি ফেলে চলে গেলেন। সাধারণ একটা ব্যাপার থেকে কী হলো। মনে ছিলো অনেক কথা সবটা বলা গেলো না। তিরস্কারের ভাগটাই বেশি হয়ে গেল। এরজন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। তোমার জন্য নয়। আমিই বা আর কয়দিন আছি। এদের সামনে দুটো কথা বলে গেলে ভাববে যে, হ্যাঁ তিনি বলেছিলেন এরকম কথা। তার মধ্যে একটু বলি, এটি প্রবন্ধের কথা নয়। নাম করতে গেলে দেশের নাম আগে করতে হবে। আমার ভাষার সংস্কৃতির নাম আগে করতে হবে। তারপর সোভিয়েত, শেক্সপিয়ার, মার্লো। আমি জোর করে আমাকে ওদের উপরে রাখতে চাইছি না। দ্বিতীয়ত যে বিষয়ে কথা বলব, আমার লোকেরা কী বলেছেন সেইটায় বিচার বিবেচনা আগে করতে হবে। আমেরিকায় ইউরোপে কে কী বলে তা অনেক পরে। এবং দেখা যাবে যে, আমরা যে সাক্ষ্য প্রমাণ দেই আমাদের নিজেদের পড়াশোনাকে প্রমাণ করার জন্য। যেমন পড় পড় পড়। এইটার জন্য আর ওদের দরকার হবে না। এটা রবীন্দ্রনাথও বলেছেন। আমিও বলেছি খুব ছোট করে। এই হাওলাদের দরকার পড়ে না। আর একটা কথা হল অনুজদের জন্য There is difference between theater and circus. এটা কিন্তু মাথায় রাখতে হবে। সার্কাসে সবই আছে। আলো আছে, বাজনা আছে, প্রশিক্ষণ আছে এমন কী মৃত্যু। পড়ে গেল তো মৃত্যুই। সবই আছে। তারপরেও কী নেই? কনটেন্ট নেই। এইটা কিন্তু আমরা ভুলে না যাই।When we talk about theatre. এবং আমরা যারা নিজে। শেষ কথা হল, মৌলিক নাটকের অভাবজনিত যে সঙ্কট এটা বোধ হয় আমাদের একটা ঝোঁক আছে যে, এই লেখাটা বড় কষ্টের। অভিনয়ে যাবো, মহড়াতে যাবো, উপর তলায় চপ খাবো, নিচতলায় বাদামের খোসা ভাঙবো এটা অনেক বেশি ভাল। আমার তো দল টল কিছু নেই। আমি একদিন দেখাবো আমার পাণ্ডুলিপি যেমন নূরলদীনের সারা জীবন। Just have a look at it. আমার হাতে লেখা বাঁধিয়ে রেখেছি আমি। এত খেটেছি এত কেটেছি। এই কাজ তো সহজে কেউ করতে চাই না। তরুণদের আমি বলব যারা নাট্যজন, নবীন এসেছে Journey begins from there এবং ঐ জায়গাটা যেন ভুলে না যায়। সকলের সব আছে আমার তো কেউ নেই। আমার হচ্ছে এই গল্পগুলোন। আর একটা ব্যাপার হলো Available resources আমাকে ভাবতে হবে। রিসোর্সের কথা তো মনে রাখতেই হবে। কিন্তু আজ থেকে ৫০ বছর পর তো রিসোর্স অনেক বেশি হবে সেটারও যেন শব্দগুণ বেশি থাকে বা আয়োজন থাকে। যেন আজকের মধ্যেই সেটা সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়। তাহলে কিন্তু নাটকটা সেই প্রাণ পাবে না যে প্রাণ শতাব্দী পার হতে সাহায্য করবে। এটাও ভাবতে হবে Available resources at the same time for the resource. মহিলা সমিতির ওই মঞ্চে যা করা গেছে ২০ বছরে তার ভিতরে কমপক্ষে ৮/১০টি কে চিরকালের ধ্রুপদি বলা যায়। আর এখন আয়োজন। এত ভাল এত আরামপ্রদ আসন, আর হাওয়া এসি, কিন্তু কোথায়, মুনতাসির ফ্যান্টাসি, কিত্তনখোলা কই? দেখি না তো। কোপের্নিকের ক্যাপ্টেন কই? বিষাদ-সিন্ধু কই? কাজেই Available resources আছে বলে একেবারে আমি জগৎমাত করে দিতে পারবো তাও নয়। অনেকটা বলেছি, প্রবন্ধের উপর অতটা বলিনি। তবে ভালই লাগল। আমি এসেছি বাচ্চুর কথায় এজন্যে যে, আর কিছু না হোক অন্তত প্রাণের কথা প্রাণের মানুষের সামনে বলা যাবে। অনেক ধন্যবাদ।

মামুনুর রশীদ
আমার মনে হয় যে, হকভাইকে একটি একক বক্তৃতায় ডাকা উচিত চিল আজকে। সেটা না ডেকে প্রবন্ধের আলোচনায় তাকে ডেকেছি আমরা এবং তিনি আলোচনাটা করতে করতে প্রায় ৪৫ মিনিট হয়ে গেল। আমরা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুনছিলাম উনার কাছ থেকে। কিন্তু উনাকে একক বক্তৃতা দিতে দিলে ভাল হতো। আমরা তার ওপর আলোচনা করতাম। এখন চায়ের বিরতি হবে।

রাহমান চৌধুরী
আসলে প্রবন্ধটা আমি দুবার পড়েছি। কালকে পেয়েছি, কালকে রাতে একবার আবার আজকে সকালে একবার। নিঃসন্দেহে চিন্তাভাবনাগুলো অসম্ভব ভালো আমি যদি ভাবটা বুঝে থাকি এই প্রবন্ধটার। এটা নিয়ে অনেক সমালোচনায় জায়গা আছে সেটা হল শব্দ প্রয়োগ নিয়ে। অনেক বিষয় নিয়ে স্ববিরোধিতাও আছে। ভাবটা যদি বুঝে থাকি এটা অনেক চমৎকার। উনি যেটা বলতে চাইছেন আমার মনে হয়, এখন আর বড় মাপের নাটক লেখা হয় না। শেক্সপিয়ার যে সব নাটক লিখতেন সেটা লেখা হচ্ছে না। এই ধরনের বড় নাটক লেখা হচ্ছে না এবং বড় মাপের নাটক লেখার জন্য যেটা দরকার তা হল অনেক জানা, প্রচুর পড়াশোনা করা এমন কিছু বলতে চেয়েছেন। বড় মাপের নাটক সম্পর্কে বলতে হলে কিছু নাম আগেই চলে আসবে, শেক্সপিয়ারের নাম আগেই আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। হকভাইয়ের আলোচনায় অনেক সমালোচনা ছিল। সমস্যা হল হকভাইয়ের মতো লোকদের বা মামুনভাই। ওনারা আলোচনা করে চলে যান পরেরটা হইতো শোনেন না। হকসাহেব বার বার বলছিলেন যে উনি বয়োজ্যেষ্ঠ। এগুলো সামন্ত সংস্কৃতি। পাশ্চাত্যসংস্কৃতি এগুলো বলে না। শেক্সপিয়ার তো অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ তাঁর নাম তো আগেই আসবে। তো আমার কাছে এইগুলো কোনো সমস্যা বলে মনে হয়নি। উনি যেটা বলতে চেয়েছেন, আমার যেটা প্রশ্ন আছে সেটা হল মার্কসবাদ নিয়ে উনি একটা প্রশ্ন তুলেছেন, মার্কসবাদ নিয়ে আমরা কতটুকু জানি এবং বুঝি সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। মাকর্সবাদী বলা ও হওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। মার্কসের একটা চমৎকার কথা আছে, সেটা হলো পৃথিবীতে আর কোনো দর্শন থাকবে না। দর্শন হারিয়ে যাবে শিল্পটাই থাকবে। মার্কস সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি না। উনি যখন লিখতে বসতেন উনি বার বার শেক্সপিয়ারকে অসম্ভব উদ্ধৃত করতেন উনার লেখার মধ্যে। উনি গ্রিক নাটক পড়ার জন্য ওই ভাষাটাও শিখেছেন। আর আজকের যে সমস্যা আমাদের সেটা নাটক হোক বা যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন আজকের প্রবন্ধকার হামীম। আসলে এটাকে মার্কসবাদ ছাড়া বিশ্লেষণ করা যাবে কি না সেটা ভাববার বিষয় রয়ে যাচ্ছে। আমাদের আজকের দূরদর্শনের দিকে তাকালে মনে হয় যে রান্না-বান্না জানে না বোধ হয়। আমার বাবা-মা উনাদের রান্না-বান্না শিখতে হবে। এরকম কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে দূরদর্শনের অনুষ্ঠান ভরে যাচ্ছে। কিন্তু কীসে সমস্যা সেটা আসছে না। একটা উদাহরণ দিই, আমাদের একজন ব্যক্তি উনি নেপালে গিয়েছেন পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছেন কিন্তু নামার সময় উনি মৃত্যুবরণ করেছেন। খুবই দুঃখজনক। কিন্তু উনাকে আমরা ঘুরতে পাঠাইনি উনার আনন্দে উনি গিয়েছেন। যখন নেপালের সরকার বলল, এই মুহূর্তে উনার মৃতদেহ বের করা যাবে না। কারণ এই জায়গাগুলো খুবই দুর্গম মৃতদেহ আনা যাবে না খুব দুর্গম। মৃতদেহ আনা যাবে না খুব বৃষ্টি। আমাদের সরকার চাপ সৃষ্টি করল এবং ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয় করল লাশটা আনার জন্য। কিন্তু ওই সময় অনেক মানুষের ঘরবাড়ি উড়ে গেল ঝড়ে। ৪০ লাখ টাকায় কিন্তু অনেকগুলো ঘরবাড়ি হতো। আমরা যখন চিন্তাভাবনা করি সে ক্ষেত্রে মার্কসবাদ বড় একটা অস্ত্র। এই রুমটা যদি আমরা মাপতে চাই তাহলে একটা স্কেল লাগবে সেটা মিটার হোক বা ইঞ্চি। আজকে মার্কসবাদ হবে মাপার একটা যন্ত্র আমাদের সবকিছুকে। এছাড়া কিন্তু উনি যে কথাগুলো বলছেন সেগুলোর প্রতি লড়াই করা একটু কঠিন এবং এটা একটা রাজনৈতিক দিক। এটা আমি এইজন্য বলছি যে, উনি উনার প্রবন্ধে বলেছেন, আমরা যদি ওইরকম নাটক করি মানবতাবাদী বা ভাল নাটক বা আমরা যদি মুখোশগুলো তুলে ধরতে পারতাম খারাপ লোকদের তাহলে বোধহয় সমাজটা ভাল হয়ে যেত। মুখোশ তোলার কাজটা মনে হয় ব্রেখটের থেকে কেউ বেশি করিনি। কিন্তু সেটাতে কিন্তু সমাজ পাল্টায়নি। মার্কস বলেছেন স্পষ্টভাবে শ্রেণিসংগ্রামের কোনো উপায় নেই। নাটক মানুষকে শ্রেণিসংগ্রাম করার পথ চিনতে সাহায্য করে। শুধু নাটক নয় শিল্প-সাহিত্যও এটা করে। আর একটা জিনিস বলতে চাই। পৃথিবীর বড় সাহিত্য হল মহাভারত। এর থেকে বড় সাহিত্য আমি দেখি না। তারপর ওডিসি, গিলগামেস এর প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু যদি নাটক নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন তাহলে পাশ্চাত্য ছাড়া ভাবতে পারি না। এটা সত্যি। এই পাশ্চাত্যের নাটকের যে উন্নয়ন একটা বিস্তৃতি এটা কিন্তু এইজন্য হয়নি যে ওরা আমাদের চেয়ে সভ্য সেজন্য না কিন্তু। আসলে পাশ্চাত্যের যে শাসন, অন্ধকারযুগে আটকে রাখা রেনেসাঁর যুগ আবার রেনেসাঁর মুক্তি। সারা ইউরোপ যে উন্নত হল। কেন হল? কারণ ল্যাটিনকে বাদ দিয়ে তারা মাতৃভাষা চর্চা করল। আর আমার দেশে রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী চিৎকার করতে করতে মরে গেল কিন্তু শিক্ষাটা বাংলায় চালু হল না। এশিয়ায় প্রত্যেকটা দেশে কিন্তু ইংরেজি ভাষা শেখানো হচ্ছে। জাপান এগিয়ে গেছে কারণ জাপান কিন্তু ইংরেজি ভাষা গ্রহণ করেনি তারা মাতৃভাষা চর্চা করছে। যে কথা বলছেন হকভাই, সারা বিশ্বকে আমি আগে গ্রহণ করব কেন? ইউরোপ কিন্তু মহাভারত নামটা সবার আগে নেয় কারণ ভারতে সবথেকে বেশি আবিষ্কার করেছে কিন্তু ইউরোপ। এটা বুঝতে হবে আমাদের। আমাদের ব্যাকরণ তৈরি জন্য এই যে প্রেস, ভাষা এগুলো ইউরোপ দিয়েছে এগুলো তো অস্বীকার করতে পারি না। তার মানে এই না যে, ইউরোপের চাপে তাদের অর্থনীতি গ্রহণ করতে হবে। তারমানে এই না যে, বিশ্ব ব্যাংকের নিয়ম দ্বারা আমাদের চলতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে বিশ্ব ব্যাংক আর শেক্সপিয়ার আলাদা জিনিস। শিল্প সাহিত্যের জগৎ আর অর্থনীতির জগৎ আলাদা। বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আমি যে লড়াইটা করব, পাশ্চাত্যের শিল্প সাহিত্য বা শেক্সপিয়ারের সাথে কিন্তু তা নাই। ওদেরও কিন্তু আমাদের সাথে নাই। নাই বলেই তো ওরা ভারত থেকে সব কিছু গ্রহণ করছে। আমার মনে হয় এই বিষয়গুলি এই আলোচনার ক্ষেত্রে ওনার নাম আসার ক্ষেত্রে আসা উচিত। আমি আজকে বলির পাঠা বানাতে চাই আজকে এই সমস্যার জন্য। একজন হচ্ছেন মামুনভাই আরেক জন বাচ্চুভাই। দুজন যেহেতু সামনে আছেন সামনে বলাই ভাল। পিছনে যারা আছেন তাদের নাম নাই বললাম। বাচ্চুভাইকে দেখলে আমি বুঝতে পারি মার্কসবাদী লেখা উনি প্রচুর পড়েন। তারপর আবার তিনি বুর্জোয়াতন্ত্রের কাছে আটকে পড়েন। বিবিসিতে চাকরি করাটা হকভাইয়ের খারাপ লাগে না। ওখান থেকে উনি বড় বেতন নেন কিন্তু শেক্সপিয়ারের নাম আগে আসাটা উনার খারাপ লাগে। আমার প্রশ্নটা হল আমরা আসলে কী চাই। ভাল কিছু করতে চাই এতে তো বিরোধ নাই। ভাল নাটক করতে চাই। ভাল নাটক নাই সেটা আমাদের আফসোস। আমি একটা কথা বলতে চাই যে, মৌলিক শব্দটা ব্যবহার না করে, নাটক চাই আমরা ভাল নাটক। মৌলিক হল পদার্থ বিজ্ঞানের একটি শব্দ এটি অনেক সমস্যা তৈরি করেছে। মৌল শব্দটা পরবর্তীতে আসছে বাইবেল থেকে। তারা পুনর্জন্ম বা চারটা কারণে তাদের বলা হয় Fundamental. এটার মানে জঙ্গি না কিন্তু। তারা আদি বাইবেলে পড়ে থাকতে চায়। তো এই শব্দটা নিয়ে কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছে। নাটকের বিষয়ে এটা গুরুত্বপূর্ণ। এই যে মাদ্রাসাশিক্ষা এটা একটা ভাববার জায়গা। ২০/২৫ লাখ মানুষ মেরে ফেলার তো কোনো সুযোগ নেই। এটা তো মানবাধিকার হতে পারে না। তাহলে সে আশার থেকে চলে গেল কেন দূরে? ৪০ বছর আমরা কী করেছি আসলে তাহলে। আমরা কি কখনো মাদ্রাসায় গিয়েছি? তাদের সাথে কথা বলেছি? তাদের সাথে কখনো ভাল ব্যবহার করেছি? এভাবে আমরা মসজিদ মাদ্রাসা অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। সে দায় কিন্তু আমাদের নিতে হবে। আমি একটা ঘটনা বলি আপনারা জানেন যে, সিপিবির অফিসটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঠিক তার একমাস আগে একদল লোক আমাকে বলছে যে, কে যেন সিপিবির উপর থেকে ঢিল ছুঁড়েছে। তখন লোকজন নিচে নেমে এসেছে। একজন চিৎকার করে বলছে যে, আপনারা ঢিল ছুঁড়েছেন এইসব। মাদ্রাসার কিছু ছেলে ছুটে এসেছে সেখানে। তারা বলছে কই আমরা তো এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। কেউ তো ঢিল ছুঁড়েনি। না না আপনারা এগুলো করবেন না। জানেন না এগুলো করতে না করা হয়েছে। তার মানে ওখানে সবাই কিন্তু একরকম বিশ্বাস নিয়ে আসেনি। আমাদের খুব সচেতন হওয়া উচিৎ আমাদের লড়াইয়ে জেতার জন্য। আমরা কি ৫০ লাখ লোককে অন্য দিকে ঠেলে দিব? আপনি যেমন বললেন মুখোশ নেতিবাচক চরিত্রের ক্ষেত্রে। নাকি আমরা সত্যি আবিষ্কার করে যারা ধুরন্দর তাদের আমাদের কাজে নিয়ে আসব। আমাদের পক্ষের লোককে আমরা অন্যপক্ষে পাঠিয়ে দিচ্ছি অনেকদিন ধরে এবং সেটা এই কারণে যে, আমরা বুর্জোয়া সুবিধাগুলো নিচ্ছি। এখানে মামুনভাইয়ের ভিতর কিন্তু কোনো পার্থক্য নেই। আমরা কিন্তু বুর্জোয়া সুবিধাগুলো নিচ্ছি। ফিরেও তাকাচ্ছি না নাটকের দিকে। আমার মনে হয় আমাদের এই ভাবনাগুলো আসা দরকার। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমি মনে করি যা শ্রেষ্ঠ তাই আমাদের সকলের মনে চলা দরকার। আপনার এই বিষয়গুলো সম্মান করি। আমি মনে করি এগুলো নিয়ে আরো লেখালেখি দরকার। আর একটা বিষয় আপনারা বললেন বাংলা একাডেমি নিয়ে যে, নাটক কেন ছাপা হয় না। বাংলা একাডেমিতে কিন্তু একটা নিয়ম হয়েছিল যে ওখানে কবিতা, উপন্যাস ছাপা হবে না কিন্তু নাটক ছাপা হবে। কারণ নাটকে বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছিল। আমার একটা নাটক। ওরা একমত যে ছাপবে। তখন কয়েক মাসের জন্য রফিকুল ইসলাম সাহেব এসেছিলেন ডিজি হয়ে। তখন বিএনপি বলল এটা সরিয়ে দেন। উনি কিছু না জেনেই বললেন এখান থেকে কবিতা উপন্যাস ছাপা হয় না কেন? শুধু নাটক ছাপা হবে কেন? না, নাটক ছাপা হবে না নাটক বাদ এই বলে তিনি এটা বাতিল করে দিলেন। এই বাতিল বলল ওদের কাউন্সিল যদি ধমৎবব না করে তাহলে এটা আর হবে না। কাউন্সিল ঠিক করবে নাটক চলবে কিনা। বাচ্চুভাইরা কিন্তু এর উদ্যোগ নিতে পারেন। সবাইকে ধন্যবাদ।

মামুনুর রশীদ
ধন্যবাদ আপনাকেও। আমাদের একটা সমস্যা হচ্ছে যে নাটক হল সর্বব্যাপী। নাটক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সমাজ চলে আসে, রাজনীতি চলে আসে, পৃথিবীর বিভিন্ন দর্শন চলে আসে। এজন্য দীর্ঘ পরিসরে আলোচনাও হওয়া দরকার। কিন্তু আজকে যে বিষয়বস্তু, আমি অনুরোধ করব যদি বিষয়বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যায় তাহলে আমরা একটু বেশিই উপকৃত হবো। তো এরপর কে আলোচনা করবেন। ফ্লোর ওপেন। হ্যাঁ আপনার নামটা বলুন।

জাহারাবী রিপন
সভাপতিকে শ্রদ্ধা। আমি আজকের সেমিনারের প্রবন্ধকারকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। উনি শেষ উক্তিতে বলেছেন, অনেক কালি জমেছে সে কালি নাটকে খরচ করে আসুন, সমুদ্রটাকে বাড়ান। খুব চমৎকার কথা। প্রবীণ এবং প্রখ্যাত নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক নানাবিধ সম্পর্কে বলছেন। আমিও প্রবন্ধকারকে অনুরোধ করব যদি প্রবন্ধ সম্পর্কে দুই একটি বিদ্রুপ চলে আসে তাহলে আপনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আজকের বিষয় মৌলিক নাটকের সংকট ও উত্তরণের পথ। আমরা যারা লিখছি বা লিখব এ জায়গাটাই আমাদের মৌলিকত্বের বিষয়। যদি মধুসূদনকে আমরা দেখি, মেঘনাদবধ রচনার জন্য মধুসূদন অন্যান্য সাহিত্যের মহাকাব্য আত্মস্থ করেছিলেন। তারপর কাহিনিটাকে এখানে এনেছেন। মধুসূদন সেখান থেকে রামায়ণ থেকে রাবণকে নায়ক হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করলেন। মেঘনাদবধ কাব্য বাংলাসাহিত্যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। অবশ্য আধুনিক বলতে হবে। এরআগে বলতে গেলে জয়দেব, আলাওল এদের কথা তো অবশ্যই বলতে হবে। কাজেই এই জায়গাটাই মৌলিকত্ব। রামের জন্মস্থান অযোধ্যায় নয় কবির মনভূমিতে। মানুষ মনের ভিতরের তাড়না থেকে লেখে কিন্তু তার জন্যে তো দেখারও একটা বিষয় আছে। আসলে দেখাতেই শিল্পের প্রণোদনা শিল্পের সৃষ্টি- এ কথা আমি ১৯৯৬ সালে দৈনিক বাংলাতে ‘নাটক রচনা নাট্যমঞ্চের ভূমিকা’ প্রবন্ধে লিখেছিলাম। দুই-তিনটা পর্ব লিখে আমি শেক্সপিয়ার পর্যন্ত চলে এসেছিলাম। পরে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে দেখানোর চেষ্টা করেছি শেক্সপিয়ার অসম্ভবরকমভাবে নাট্যমঞ্চের সাথে যুক্ত ছিলেন। এজন্য এই নাটকগুলো শিল্পস্বভাব হওয়ার একটা বড় কারণ। সে রকম যদি ইবসেনকে দেখি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যদি দেখি, জোড়াসাঁকো, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এবং রঙ্গমঞ্চ সেখানে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। রঙ্গমঞ্চ যদি দেখি রবীন্দ্রনাথ বলেই গিয়েছেন নাটক এবং থিয়েটারের বিষয়টা। প্রবন্ধকার একটি জায়গায় নাটককে থিয়েটার থেকে আলাদা করে দিয়েছেন। আমি মনে করি এখানে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য ধারণা আছে। প্রাচ্যের ধারণা নাটক এবং থিয়েটারের এক উৎসই। পাশ্চাত্যে থিয়েটার বলা হচ্ছে। আপনি যদি লক্ষ করেন যে কিছু পত্রিকা ড্রামা রিভিউ হিসেবে ব্যবহার করে। কানাডায় সেটা ব্যবহার করছে। কিন্তু ইউরোপের অন্যরা থিয়েটার বলছে। আমাদের গ্রাম থিয়েটার আধুনিক শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে নামকরণের ক্ষেত্রে একটা জিনিস খুব সুতীক্ষ্ণভাবে বিবেচনা করেছে। নিয়মটা এমন যে, কোনো নদী, কোনো মুক্তিযোদ্ধার নামটা প্রথমে থাকবে পরে আমরা থিয়েটার কথাটা যুক্ত করব এবং এটা গ্রহণ করবার মানসিকতা প্রবলভাবে আছে। সেক্ষেত্রে আমি বলি থিয়েটার এবং নাটককে খুব যে আলাদা করে দেখতে হবে জিনিসটা এমন না। মৌলিক নাটকের ক্ষেত্রে প্রতিভার বিষয়টাকে বড় করে দেখতে হবে। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে একটা কথা আছে, কয়েকটা ভাগ আছে। দুই ধরনের প্রতিভার কথা বলা হয়েছে। একটি প্রতিভা যেটা জন্মগতভাবে পায়। আবার হল মানুষ যেটা আহরণ করে অভিজ্ঞতাদ্বারা লব্দ করে। যেমন শেক্সপিয়ারের প্রথমদিকের রচনা আর পরের রচনা লক্ষ করলে বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের প্রভাতসংগীত এবং সান্ধ্যসংগীত এর ব্যবধান তো অবশ্যই আছে। সেলিম আল দীনের ক্ষেত্রেও আলাদা নয়। এদেশের অনেকেই নাটকের শিকড় সন্ধান করেছেন বটে কিন্তু মহৎ কবিতুল্য নাট্যপ্রতিভায় হয়তো দু’একজন অতিক্রম করে গেছেন। সেক্ষেত্রে মৌলিক নাটক বা মহৎ নাটকের জন্য মহৎ কবি প্রতিভার প্রয়োজন। কারণ অনেকেই নাট্যকার, অনেকেই আবার কবি নাট্যকার। যারা মহৎ কবি তারাই মহৎ নাট্যকার এটা আমাদের বিবেচনায় আসতে হবে। মৌলিক নাটক রচনায় ক্ষেত্রে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন, মৌলিক সৃষ্টিসত্তা প্রয়োজন। এজন্য অনুধ্যান এবং পূর্ববর্তীদের লেখা উল্টরাধিকার হিসেবে ঐতিহ্যকে অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। কাজেই শিল্পের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারকে বহন করে সামনের দিকে যেতে হবে। বর্তমানকে মূল্য দিয়ে তবেই উত্তরণ সম্ভব। মৌলিক নাটকের জন্যে মৌলিক প্রতিভা, মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন। সকলকে ধন্যবাদ।

মামুনুর রশীদ
আরো সময় নিয়ে আলোচনা করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আমাদের সময়ের একটা সীমাবদ্ধতা আছে এ জন্য আমরা সবাইকে অনুরোধ করছি আলোচনা একটু সংক্ষিপ্ত করার এবং তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে শেষ করার। জাহারাবী রিপনকে ধন্যবাদ। এবার জাহিদ রিপন আরেক রিপনকে বলি।

জাহিদ রিপন
অনেক গুরুগম্ভীর আলোচনা করলেন জাহারাবীভাই। একটু যোগ করি আর কী। জাহারাবীভাই কোনো সময় আমাদের নাটকের সমালোচনাও করেছেন। হামীম কামরুল হক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার ৩ বছরের অনুজ। আজকে এই ‘মৌলিক নাটকের সংকট এবং উত্তরণের পথ’ প্রবন্ধটা লেখার জন্য আমি অগ্রজ হিসেবে গর্বিত কারণ এই লেখাটায় ভাষা এবং নানামুখি দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ভালো হয়েছে। এই মিলনায়তনে সারা বছর যত সেমিনার হয় তার একটি দুটি আমার বাদ যায়। তাছাড়া সকল সেমিনারে আমি থাকি, আমরা দল ধরেই থাকি। একমত যে থিয়েটারটা এখন নির্দেশকের থিয়েটার। কিন্তু আবার ওখানকার সাথে একমত না যখন বলছেন যে, স্টুপিড অভিনেতাই হচ্ছে নির্দেশকের পছন্দ যে কোনোকিছু ভাববে না, যে তার কথায় চলবে। এইটা হয়ত একসময়ের থিয়েটারে সম্ভব ছিল, কিন্তু আধুনিক থিয়েটারে এটা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় তার প্রমাণ হচ্ছে, যদি এখানকার উপস্থিতি তালিকা দেখেন যে, যারা উপস্থিত হয়েছে, অর্থাৎ স্বপ্নদলের ছেলেমেয়ে বেশি উপস্থিত হয়েছে, যাদের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল আজকে এইখানে আসা। এইটা নিয়ে আমরা পরে গিয়ে হয়তো তিনঘণ্টা আলোচনা করব। সবকিছু মিলিয়ে নির্দেশক হিসেবে আমরা চাওয়া হচ্ছে আমার অভিনেতা আমার চাইতেও বেশি পড়া লেখা করবে, আমি তাকে একটা ডিজাইন দিব কিন্তু জীবন্ত করতে হবে শিল্পটাকে তাকে। মঞ্চে আমি কিন্তু নেপথ্যে যাকব। সেই জায়গাটাতে আমি দেখতে চাই। আমি হামীমকে অনুরোধ করি যে আপনি থিয়েটারের বাইরে থাকেন, থিয়েটারের সাথে সম্পৃক্ত হলে এখানে যে আলোচনা, যে বিরূপ আলোচনাগুলো হয়েছে সেটি আর থাকবে না। আসলে আমাদের লেখকের খুব অভাব, সমালোচকের খুব অভাব। সেই জায়গা থেকে আমি আমন্ত্রণ জানাই যে আপনি নিয়মিত দেখবেন, আলোচনা করবেন, সমালোচনা করবেন। কারণ আমাদের দেশে কিন্তু ভাল সমালোচক তৈরি হয় নাই। এখন মৌলিক নাটক বিষয়ে আমার কিছু দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেটা আমি একটু বলি। সেটা হচ্ছে নাটক কি মৌলিক হওয়াটা খুব জরুরি? অথবা যে ক্ল্যাসিক যেগুলো আমরা জানি, সফোক্লিস কি কোনো মৌলিক নাটক লিখেছেন? অথবা ইউরিপিডিস বা অ্যারিস্টোফেনিস? লিখেছিন কি? লেখেন নাই। যা লেখা হয়েছে তা হোমারের ওডিসি থেকে। কিন্তু সে কাঠামোর মধ্যেও তারা এক সম্ভাবনার পথনির্দেশ করেছেন। অর্থাৎ যদি ছোট করে একটা উদাহরণ দেই যে ইদিপাসের সমস্ত জিনিস হোমার বলে গিয়েছেন। বলে গিয়েছেন যে মাকে বিয়ে করবে, বাবাকে হত্যা করবে ইত্যাদি। কিন্তু বলেন নাই যে শাস্তিটা ইদিপাস নিজে নিবেন নিজের শাস্তি। সে দেবতার ওপর নির্ভর করবে না, সে নিজের চোখ নিজেই অন্ধ করবে-এটা ইলিয়াড ওডিসিতে কোথাও নেই। তাহলে এই যে ওই কাঠামোর মধ্য থেকেও মানুষের এক সম্ভাবনা এবং বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে, দৈবের বিরুদ্ধে, আধ্যাত্মিকতার বিরুদ্ধে, সকলকিছুর বিরুদ্ধে, স্রষ্টার বিরুদ্ধে, পূর্ব নির্ধারণের বিরুদ্ধে মানুষ যখন তার অমিত সম্ভাবনার কথা বলছে সফোক্লিস কৌশলে বলে দিচ্ছে এবং পরে আমরা দেখছি ইদিপাস এট কলোনাস নাটকে সে যখন বলছে যে, না আমি কেন দায়ী, দেবতা দায়ী, হ্যাঁ এইসব যখন বলছে তখন আমরা বুঝতে পারি যে মানুষের অমিত সম্ভাবনার কথা বলছে। আমরা যদি শেক্সপিয়ারে আসি, তিনি কি মৌলিক কিছু লিখেছেন? একেবারেই না। তার সকল নাটক একটি বাদে, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড বিষয়ক বই থেকে কাহিনি ধার করা। সেক্ষেত্রে শেক্সপিয়ারও কিন্তু মৌলিক কিছু লেখেন নাই। কিন্তু এই বলিষ্ঠ কাহিনির মধ্যদিয়ে এমনভাবে বিস্তার করেছেন কাহিনিটাকে এমন সম্ভাবনায় নিয়ে গেছেন যে সেটি একটি ক্ল্যাসিক সাহিত্য হয়ে ওঠেছে, একটি মৌলিক নাটক হয়ে ওঠেছে। আমি দেখতে চাই এই জায়গা থেকে। এখন আমাদের এখানে নাটকের সংকটটা দেখেন? মানে আমাদের সকল সাহিত্য নিয়ে কি আমাদের কাজ করা শেষ হয়ে গেছে? আমাদের যদি একটা লোকপালা দেখি, এই পালার রচয়িতা কে? নির্দেশক কে? অভিনেতা কে? সুরকার কে? অধিকারী কে? দেখা যাবে একজনমাত্র ব্যক্তি এই সকল দায়িত্বগুলো পালন করছেন। তার মানে একজন ব্যক্তির অনেকগুলো সত্তা আছে। নির্দেশক, অভিনেতা, সংগঠক ইত্যাদি। এই সত্তার জায়গা থেকে যদি দেখি তাহলে তো আমাদের সকল সাহিত্যই আসলে নাটক। যেটাকে পরবর্তীতে সেলিম আল দীন চিহ্নিত করেছেন। এখন আমার তো মনে হয় যে বিদ্রোহী কবিতার কোন লাইন পরিবর্তন না করে থিয়েটার হতে পারে। যদি তাই হয় সেই জায়গাটাই তো আমরা শেষ পর্যন্ত বলতে চেয়েছিলাম যে হাজারবছরের ঐতিহ্যের সাথে এই দ্বৈতাদ্বৈতের জায়গায় দাঁড়িয়ে এই নাটক, প্রবন্ধ এটা আর আলাদা জায়গায় নেই। মঞ্চে এটা কতটুকু সফল হল, যোগাযোগ কতটা হল, সেই জায়গাগুলোই আমাদের মূল দেখার জায়গা। হামীম কামরুল হক একটু এই জায়গাগুলো স্পর্শ করে গেছেন। কিন্তু আবার আমার মনে হয়েছে পশ্চাত্যের দ্বারা তাড়িত। আমি মনে করি যে আপনি একটা জায়গায় বলেছেন, নাটক তো উপন্যাসের গভীরতাকে ধারণ করবে না, নাটক তো কবিতার মত। তাহলে কবিতার মত হতে হবে নাটককে সেটাই বা আপনি ধরছেন কেন? আর আমরা তো বলছি কবির মত হচ্ছে সবাই। আমরা তো হচ্ছি কবি এবং শিল্পের ভাষা কবিতা, মঞ্চে যা কিছু উচ্চারিত হয় কবিতা। বাস্তব জীবনে আমরা যে কথাগুলো বলি সেটা গদ্য। তাই যদি হয় তাহলে কবিতা হয়েই মঞ্চে যেতে হবে আমার বাস্তবজীবনের সকল কিছুকে। এখানে ওই ভেদটা থাকছে না। হামীম কামরুল হক আপনাকে আরেকটু সাহসী হতে হবে, আপনি আমাদের সাহসী হতে বলেছেন কিন্তু আপনাকেও সাহসী হতে হবে। আপনি যে উদাহরণ দিয়েছেন যে আমরা মনে করছি, আপনি ‘সেলিম আল দীন’র কথা বলছেন কিন্তু আপনি নাম বলছেন না। আরেকটা জায়গা আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনি ‘মহাজনের নাও’ নাটক প্রসঙ্গে কথা বলছেন কিন্তু নাম বলছেন না। কেন আপনি নাম বলবেন না? যদি আপনি এরকম বলেন যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে কোনো একজন সদ্যপ্রয়াত ব্যক্তির জীবন নিয়ে তিনি যদি একজন সংগীতের দিকপাল হোন তাহলে সংগীতের ওপরভর করে মাঝে মাঝে জীবনের কাহিনি বর্ণনা করে একটি থিয়েটার তৈরি হয়েছে যাতে কাহিনি, চরিত্র, নাট্যকলায় উন্নীত হতে পারার কথা, কিন্তু তার কোনো বালাই নেই। তাহলে নামগুলা কেন বলবেন না? আপনি আবার আমাদেরকে বলছেন যে শিল্প যখন আমাকে পছন্দ করল, কে অপছন্দ করল এটা আমাদের মাথায় রাখলে শিল্পটা হবে না এবং শিল্পের বাংলাদেশি থিয়েটার যেসব সমস্যা চিহ্নিত করেছেন তার মধ্যে আপনি রাজনীতি থেকে শুরু করে দলীয় ভাঙ্গন ইত্যাদি বলেছেন এবং আমাদের এই আপষকামিতা এইগুলো চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। হকভাই থাকলে ভাল হতো, যেমন বলছেন যে মার্কসবাদ আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি বা ফ্রয়েডীয় দর্শন ইত্যাদি ক্ষতি করেছে। অর্থাৎ আমি সামান্য জ্ঞান থেকে বলছি যে মার্কসবাদ ও ফ্রয়েডীয় দর্শন চূড়ান্ত। তাহলে দৃষ্টিভঙ্গিটা ভিন্ন হতে পারে। এখানে নির্দেশক গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে নির্দেশকভেদে ব্যাখ্যাগুলো ভিন্ন হতে পারে সেক্ষেত্রে একটি নাটকের হাজার রকমের সম্ভাবনা দাঁড়াতে পারে। এখানেই হচ্ছে নির্দেশক গুরুত্বপূর্ণ। তো আমি কথা বাড়াবো না, আমি শুধু বলি যে আমরা শেকড় বলতে আসলে বাঙালি সংস্কৃতিই শুধু বুঝি না, সেটা শুধু আমার জায়গা থেকেই বলছি না। বিশ্বের সবকিছুই তো আমার শেকড়। তাহলে বিশ্বের ভাল কিছু যদি নেই, এই শেকড় নিয়েও কথা বলা এখন একটা ফ্যাশন, শেকড়কে টিটকারি মারা এটাও আমি বিস্মত হয়ে লক্ষ করেছি যে ইদানিং এইটা আবার দাঁড়িয়েছে যে জিনিসটাকে পঁচা বলা, অমুক বলা, শেকড় বলতে যেন আমরা একটা বস্তুগত জিনিসকে বুঝি। বিশ্ব সংস্কৃতি যদি আমার উত্তরাধিকার হয় তাহলে গ্রিসের একটা জিনিস তো আমারই। আমি তো সেখান থেকে দেখতে চাই। যাই হোক আমি আর কথা বাড়াবো না। আমার মনে হয় এই রকম প্রবন্ধ যতই হবে ততই হচ্ছে আমাদের নবীনদের চিন্তার জায়গাগুলো আরো প্রসারিত হবে এবং আমাদের কাজে লাগবে। ধন্যবাদ সবাইকে।

মামুনুর রশীদ
এখানে একটা সমস্যা আমাদের নাটকের ক্ষেত্রে। নাটকে আমরা চাই আমাদের অভিনেতা, অভিনেত্রী, নির্দেশক সবাই বই পুস্তক পড়েন এবং পড়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এর বাইরেও নাটক খুব কল্পনাশ্রয়ী, ইমাজেনিটিভ আর্ট। এই ইমাজেনিটিভ আর্ট এর চর্চাটা কীভাবে হবে? শেক্সপিয়ার কিন্তু ডক্টরেট ছিলেন না। পণ্ডিতও ছিলেন না। কিন্তু তিনি কীভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়গুলো মানুষের ভিতরের যন্ত্রণার ইতিহাস, কীভাবে যন্ত্রণা, ঈর্ষা, হিংসা এগুলোকে আবিষ্কার করলেন এটা কিন্তু একটা বিরাট ভাববার বিষয়। এবং মৌলিক নাটক রচনার ক্ষেত্রে এই ইমাজেনিটিভ বিষয়গুলো আমার মনে হয় একটু গুরুত্ব দেয়া দরকার। আমি অনুরোধ করব যে অনন্ত হীরা কিছু বলবেন কিনা।

অনন্ত হীরা
ধন্যবাদ আমাকে বলার সুযোগ দেয়ার জন্য। আমার কাছে যে বিষয়টি মৌলিক নাটকের সংকট এটি আমি আরেকটু সহজভাবে দেখেছি। সেটি হচ্ছে আমার কাছে মনে হচ্ছে নাটকের সংকট এবং আমার কাছে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই সময়কালের জন্য এবং এই বিষয়টি আমাকে টেনেছে, আকর্ষণ করেছে যে কারণে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও আমি সোয়া ঘণ্টা জার্নি করে এসেছি। আমার আসলে একজন নাট্যকর্মী হিসেবে আমার ভেতরের একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করব আপনাদের সামনে। এবং আমার অবজারভেশন হল যে প্রতিনিয়ত আমরা লক্ষ করি যে নাটকের দল বাড়ছে, নাটকের কর্মী বাড়ছে, নাট্য নির্দেশক বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমরা লক্ষ করি যে আমাদের দেশের চার পাঁচজন বিখ্যাত নাট্যকার যারা দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে আমাদের মঞ্চের ক্ষুধা মিটিয়েছেন। মামুনভাই, আবদুল্লাহ আল মামুন, সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হক আরো দু-একজন আছেন। এরপরে গিয়ে আসলে অনেক কষ্টে হয়তো মান্নান হীরার নামটি উচ্চারণ হতে পারে। হওয়া উচিৎ। কিন্তু তারপরে আর নাট্যকার খুঁজে আমরা পাই না। তো এইটা আমার ভেতরে একটা দীর্ঘদিনের প্রশ্ন এবং কাউন্টার একটি প্রশ্ন আছে যেটা আমি সবার সাথে শেয়ার করতে চাই। এরপরে প্রতি বছরই আসলে আমরা লক্ষ করি যে নতুন নতুন নির্দেশক পাচ্ছি, দল পাচ্ছি কিন্তু নাট্যকার হচ্ছে না কেন? এখন আমি আমার দলের প্রয়োজনে হয়ত দুইটা নাটক লিখেছি কিন্তু আমি যাদের নাম বললাম তাদের লেখার ক্ষেত্রে নাটক রচনার ক্ষেত্রে যে ধারাবাহিকতা সেরকম কাউকে পাচ্ছি না কেন। এটি একটি প্রশ্ন। আবার একইভাবে এই প্রশ্নটিও আমার ভেতরে আছে সেটাও আমি সবার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। সেটি হচ্ছে যে একজন নাট্যকার কি আসলেই প্রতিদিন প্রতিবছর প্রতি যুগে আসে কি না এটিও একটি প্রশ্ন আমার কাছে। আজকে যেসব রেফারেন্স আসছে যে আজকে শেক্সপিয়ারের দেশেই আমরা পেয়েছি কি না এইটা কিন্তু আমার কাছে একটি প্রশ্ন। বরঞ্চ আমার কেন যেন উল্টো মনে হয় যে আমরা গত চল্লিশ বছরে সৈয়দ শামসুল হক একজন, সেলিম আল দীন, মামুনুর রশিদ এবং আবদুল্লাহ আল মামুনকে তো পেয়েছি। এই ৪০/৪২ বছরে এতগুলো নাট্যকারের আগমন, এদের প্রত্যেকেরই ৫/৭/১০টি করে উল্লেখ করার মত নাটক আছে। যেগুলো বারবার মঞ্চে অভিনীত হতে পারে। উপস্থাপিত হতে পারে। আজকে ‘চাকা’র মতো একটি নাটক সেটি কি আমরা লক্ষ করছি, আজকে সেলিমভাই আমাদের মাঝে ২-৩ বছর নেই। সেটি কি আমরা লক্ষ করছি যে, সেলিমভাইয়ের রচনাগুলো আমরা ঢাকায় বা সারাদেশে খুব সু-অভিনীত হতে দেখছি মানে সেরকমটি ঘটছে কি না সেটিও আমার ভেতরে একটি প্রশ্ন। আসলে অন্য অনেককিছু সংকটের মতো হয়ত নাটকের সংকট মানে নাট্যকারের সংকট সেটা একটা আছে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় ৪০/৪২ বছরে আমরা যতগুলো নাটক বা নাট্যকারকে পেয়েছি সেটা আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় এবং নাট্যকার আসলে প্রতি যুগে, প্রতি দশকে হবে না বলেই আমার বিশ্বাস আর কি। আমার বরঞ্চ মনে হয় যে এই সংকটটাই বড় যে আসলে যেই নাটকগুলো আমাদের বাংলাভাষায় এবং বাংলাদেশের নাট্যকারদের সুলিখিত নাটকগুলো আছে সেগুলোই আসলে যথাযথভাবে আমরা মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারছি না। সবাইকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন
আমি একটু দায়িত্ব নিয়েই বলতে চাই যে নাট্যকার ও নির্দেশকের সম্পর্কের বিষয়টা যেখানে চলে আসছে। আমি নির্দেশকের দিক থেকেই বলছি। আমার যেটা মনে হয়েছে গত দশ-পনের বছর বা ২০ বছরও হতে পারে। দশ-পনের বছরের মধ্যে থাকলেই ভাল হবে। এমন একটা চেতনা কিন্তু চলে এসেছে যে আমি ভাল একটা নির্দেশনা দেয়ার জন্য আমার খুব ভাল একটা স্ক্রিপ্ট দরকার, যেমন মনোজ মিত্ররা যেরকম লিখেছেন অথবা তারও আগে রবীন্দ্রনাথ যেরকম লিখেছেন অথবা মোহিত চট্টোপাধ্যায় যেরকম লিখেছেন ওইরকমই একটি স্ক্রিপ্ট আমার দরকার হবে এরকম ভাবনার কিন্তু পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি নির্দেশকের দিক থেকে বলছি, আমার যদি সঠিক চেতনা থাকে যে কীভাবে আমি উপস্থাপন করব। দৃষ্টিভঙ্গিটা যদি আমার পরিষ্কার থাকে এবং কীভাবে দর্শকের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে তুলব, তাহলে কিন্তু আমার ওইরকম যেটা ফর্মাল স্ক্রিপ্ট তার খুব একটা প্রয়োজন হয় না। এটা যে শুধুমাত্র আমার জেনারেশনে এসে থিয়েটারে হয়েছে তা না। এটা অন্যজায়গাগুলোতেও দেখছি। যেমন ধরেন, আপনি যদি দেখেন ফ্যাশনের জায়গাটা, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের জায়গাটা সেখানে কিন্তু এখন কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করতে হবে, শুধুমাত্র ফর্মাল কাপড় দিয়ে। কালারের ক্ষেত্রে পুরুষের ক্ষেত্রে একটু সাদা কালার, মেয়েদের ক্ষেত্রে একটু রঙিন কালার সেই বিষয়টা কিন্তু এখন আর নাই। এখন ডিজাইন বা কাটিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু যে কালার থাকতে হবে, মেয়েদের ক্ষেত্রে গোল গলা হইতে হবে এরকম বিষয়গুলোও কিন্তু এখন আর নাই। সবক্ষেত্রেই কিন্তু পরিবর্তনের একটা ঝড় বইছে। যে ঝড়টা এসে থিয়েটারেও লেগেছে। এখানে আমরা নির্দেশকরা যখন মামুনভাইরা কাজ করেছিলেন সেই সময় হয়ত এমন একটা চেতনা ছিল যে আমার ফর্মাল স্ক্রিপ্ট লাগবে এরপর আমি রিহার্সেল শুরু করবো। এখন কিন্তু আমরা সেটা ভাবছি না। আমি যেমন ইদানিং ভাবছি যে হুতুম পেঁচার নকশা নিয়েও তো একটা ভাল স্ক্রিপ্ট হতে পারে। একটা ভাল প্রযোজনা হতে পারে। এখন হুতুম পেঁচার নকশা কিন্তু নাটক না। এটা একটা গদ্য এবং বিষয়গুলো যেভাবে এসেছে তৎকালীন সমাজের কিছু অনুষঙ্গ এসেছে। সেটা নিয়েও কিন্তু ভাবছি যে এটাকে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়। এই যে চেতনাগুলো এসেছে এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে বলব যে একাডেমিক্যালি এই বিষয়গুলো পেয়েছি আমি যখন থিয়েটারে পড়ি তখনই। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আমার শিক্ষকরা যখন কাজ করতেন তখন তারা দেখাতেন যে, ডিরেক্টরের দিক থেকে যদি তোমার চেতনার জায়গাটি পরিষ্কার থাকে ফর্মাল স্ক্রিপ্টের দরকার নেই। এই যে জায়গাটা এটা কিন্তু এখন আমি যদি নাট্যকার হিসেবে দেখি এই ধরনের বিষয় কিন্তু আমাকে একঅর্থে উৎসাহিত করে যে অনেক পরিশ্রম করে একটি নাটক লিখব দু-বছর তিনবছর ভেবে তারপর তো সেটার ভাগ্যে কী ঘটবে? কেউ এটা ধরবে না। এটি একটি বিষয় আছে। আরেকটি বিষয় আছে আমি আমার জায়গা থেকে বলছি আমার মধ্যেও একটা রাজনীতি কাজ করে কিন্তু। আমি যখন নির্দেশক হিসেবে দাঁড়াই, স্ক্রিপ্ট সিলেক্ট করতে যাই তখন আমার মধ্যে একটা রাজনীতি কাজ করে যে, আমার বন্ধু এক্স ওয়াই জেড ও একটি নাটক লিখবে, অমুক একটি নাটক লিখবে সেটা না করে যদি আমি মেঘনাদবধ কাব্য করি তাহলে তো আমার আরেক ধরনের ইমেজ তৈরি হয় যে, জসিম মেঘনাদবধ কাব্য ধরেছে। ওর তো সাহস আছে। কিন্তু থিয়েটারের বা নাট্যকারের একটি বড় ভূমিকা হচ্ছে এটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে অনেক কিছু। এ ব্যাপারে একটি বড় জায়গা হয়েছে- সে কিন্তু মঞ্চকে সামনে নিয়েই লেখে। যতরকমই যত কিছু ধরে আমি কিন্তু যখন নাটক লিখতে যাই তখন মঞ্চকে সামনে নিয়েই লিখি। শেষপর্যন্ত নিয়তিটা হয় যে তার নাটক মঞ্চে উঠতে হবে। এখন আমি যখন নাটকটা লিখছি তিনবছর পরিশ্রম করে লিখলাম এরপর কেউ এটা মঞ্চস্থ করছে না তখন কিন্তু দু’একটা লেখার পর আমি আর উৎসাহিত হবো না। তো এইরকম কতগুলো বিষয় আছে। আমার মনে হয় যে এই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখেও কিন্তু কেন ভাল নাটক আসছে না, স্ক্রিপ্ট কেন হচ্ছে না এটা একটা বড় বিষয় হতে পারে। আরেকটা বিষয় এখন কাগজে-কলমে ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ডকুমেন্টেশন করার বিষয়টা কিন্তু এখন আর এভাবে ভাবা হচ্ছে না। ডকুমেন্টেশনে এখন অনেক ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যেটা আমি একটু বলি, আমি এইবার ফিলিপাইন গিয়েছিলাম। ন্যাশনাল মিউজিয়ামে গিয়ে দেখেছিলাম যে পাঁচ মিনিটের একটা ভিডিও ফুটেজ। একশ’জন মানুষের একটা কম্পোজিশন, পাঁচ মিনিটের একটা ভিডিও ফুটেজ যেটা দেখাচ্ছে অসাধারণ শিল্প সৌন্দর্য্য, ফর্মাল একটা স্ক্রিপ্ট আমাকে ওইরকম আনন্দ দিতে পারেনি। তো এইরকম অনেকগুলো বিষয় আছে। এখন স্ক্রিপ্ট বলতে ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফর্মাল স্ক্রিপ্ট সে জায়গায় যদি না যাই এর মধ্যে আমরা কী কী কাজগুলো করেছি সেগুলো যদি একটু বিবেচনায় আনা হয় তাহলে হয়তো কতটুকু আমরা পেয়েছি। কতটুকু পাওয়া উচিত বা কীভাবে পেতে পারি সেই দিক নির্দেশনাগুলো আমাদের সামনে আসতে পারে। ধন্যবাদ।

শিমূল ইউসুফ
সবাইকে অনেক অনেক অভিনন্দন। মামুনভাই তো আমার বন্ধু। আমি মামুনভাইয়ের ছোট বন্ধু। সবচেয়ে বড় বন্ধু হল আমার মেয়ের। ‘মামুন’ ডাকে। ডাক, এই সম্পর্কগুলো নিয়েই বলি। এটা তো আমরা প্রফেশনাল হিসেবে করি না বাংলাদেশে কেউ। একটি সম্পর্কের ভিত্তিতেই কিন্তু আমরা থিয়েটার করি। আমি আজকে থিয়েটার করছি কেন? আমার তো গান গাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোথাও তো একটা ভাল লাগা আছে এখানটায়। এই ভালোবাসা, ভাল লাগা এই এখানে লেগে থাকার একটা বিষয় এবং যেহেতু স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্ম আমার মনে হয়েছিল যে এই জায়গাটাকে যদি সমৃদ্ধ করা যায়, একজন কণ্ঠশিল্পী না হয়ে আমি না হয় একজন মঞ্চশিল্পীই হলাম তাতে অসুবিধাটা কি? কণ্ঠশিল্পীর তো অভাব নেই তাই না? আমি না হয় মঞ্চশিল্পী হলাম, অভিনয় করলাম। অন্তত জায়গাটা ধরে রাখলাম। জায়গাটা বাড়বে, ভরবে- এটাই কিন্তু আশা করেছিলাম। এবং শেকড়ের সন্ধানে যে কথাটা বারবার এখানে বলা হচ্ছিল এটা আসলে কি গাছের শেকড় না আমাদের শেকড় রয়েছে। এটা আমার মনে হয় যে শিল্পের শেকড়। সেই শেকড়ের সন্ধান তো আমাদের প্রত্যেককেই করতে হবে। এটা আমাদের করতে হবে এই কারণেই যে আমরা আজকে যেখানে দাঁড়িয়ে শিল্পকর্ম করছি সেটা আসলে যতই আমরা পাশ্চাত্যকে এড়িয়ে চলি না কেন যতই বলি, আমাদের প্রাচ্য অনেক সমৃদ্ধ, হ্যাঁ অবশ্যই আমরা সমৃদ্ধ হাজার বছরের ঐতিহ্য আমাদের আছে। কিন্তু তারপরেও কোথাও গিয়ে একটা জায়গায় কিন্তু আমাদেরকে ফেস করতে হয়, আমরা টেকনিক্যালি কতটা সাউন্ড। আমরা যারা অভিনেতা-অভিনেত্রী আমরা যারা বাইরে গিয়েছি, প্রোডাকশন দেখেছি, বাইরের করেছি, আমরা কিন্তু তখন বুঝতে পারি যে হয়তো অভিনয় বা নির্দেশক বা নাটক এসব ক্ষেত্রে আমরা অনেক এগিয়ে আছি কিন্তু টেকনিক্যালি আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমার মনে হয় সেই টেকনিক্যাল জায়গাটা আমার না বলাই ভাল। কারণ আমি বুঝি না আমি একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমি বলতে চাই এখানে আমি একটা জায়গায় এসেছি। নাটক, নাট্যকার, নির্দেশক এবং অভিনেত্রী-অভিনেত্রী তার মাধ্যমেই নাটকটা আসলে বিবেচিত হবে নাটকটা আসলে কতখানি সমৃদ্ধ হবে। আমার মনে হয় নাট্যকার, একজন এক জায়গায় লিখেছেন- অমুককে মাথায় ধারণ করে নাটকটা লিখা হয়েছে। বাংলাদেশে যদি সেলিম আল দীন বা অন্যকেউ বা মামুনভাই কারো কথা মনে করে কোনো চরিত্র লিখেন তাহলে আমার মনে হয় সেই অভিনেত্রীর সেটা অনেক বড় পাওনা যে এখানে আমরা একটা চরিত্র নিয়ে দাঁড়াতে পারি। কাজেই আমাদের অ্যাচিভমেন্ট এখানটায় অভিনেত্রী হিসেবে। আমরা কোথাও না কোথাও গিয়ে লেখকের মাথায়ও ঢুকে যাই যে অমুককে দিয়ে এইটা হবে মানে আমরা স্টুপিড না। ধন্যবাদ সবাইকে।

আফসার আহমদ
উপস্থিত সুধীবৃন্দ আমি প্রথমেই হামীমকে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই এ কারণে যে, ও বলেছে ও নাটকের লোক নয় কিন্তু সে নাটক পড়ে। নাটক সে পড়ে সেটা তো আমি জানি। নাটক দেখেও সে, দেখেছে। আমি তো হকভাইয়ের আলোচনা শুনি নাই, এখন শুনলাম, যাদেরটা শুনলাম, সবার আলোচনাই সমৃদ্ধ আলোচনা। আর এখন শেষেও আসছি, সময়ও কম। আমি যেটা বলতে চাই যে, আসলে হামীমের লেখাটা এবং চিন্তাটা খুবই মৌলিক এবং মৌলিক বলেই সে কোনো রেফারেন্স ব্যবহার করে নাই। এখানে কারো রেফারেন্স, কারো উদ্ধৃতি ওইরকম করে নাই। আর লেখাটা মৌলিক বলেই, এখানে আছে হয়ত সে নাটকের সাথে নাই বলে, এটা অনেক বেশি আদর্শবাদী লেখা, খুব আইডিয়াল একটা লেখা এবং তার অনেক ভাবনা আছে, অনেক সুন্দর সুন্দর ভাবনা আছে, সে ভাবনা বিস্তারের জন্য তার প্রস্তাবও আছে যেটা সুন্দর। আর আরেকটা বিষয় হল যে, এখানে এই আমি এটা পড়তে পড়তে, আমি তো শুনি নাই এটা, নয়ত বুঝতে পারতাম ভাল, যখন লেখক পড়ে তখন সেটা অনেক বোঝা যায়। তার পড়ার মধ্যেই থাকে যে আসলে কী বলতে চায়, তার আবেগটা কোথায়। আমি শুধু পড়লাম। এই যে আমি পড়ে সবটা বুঝতে পারলাম না এটাও হামীম এই বিষয়টা বুঝতে যে, শুধু নাটক পড়লেই নাটকের সবটা বোঝা যায় না। নাটকটা যখন মঞ্চে আসে তখন সেটা শরীরী হয়ে ওঠে, জীবন্ত হয়ে ওঠে। যার জন্য নাটকের সাথে শুধু যে পাঠকের সম্পর্ক এটা ঠিক না। নাটকের সাথে পাঠক এবং দর্শক উভয়ের সম্পর্ক, বিশেষ করে দর্শকের সম্পর্ক। এজন্যই নাটক শুধু পাঠযোগ্যই নয়। পৃথিবীর বহু নাটক আছে সেটা কিন্তু মঞ্চস্থ হয় নাই। শুধু পড়েছে, সবাই যে পড়েছে তা নয়। বার্নার্ডশ’র নাটক আছে যেটা কোনোদিনও মঞ্চস্থ হয় নাই। অনেক বড় নাটক। সবাই যে কম-বেশি পড়েছে তাও না। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা তাদের পরীক্ষা পাসের জন্য পড়ে। কিন্তু এমনিতে কেউ পড়ে না। অথচ আন্না কারেনিনা- তলস্তয়ের সেই যে ওয়ার অ্যান্ড পিস সেগুলো বহু লোকে পড়েছে। তো পড়েছে কখন? আমরা বলি যে মৌলিকতা কী আসলে? আসলে সত্যিকার অর্থে আমার বিবেচনায় লেখার ক্ষেত্রে মৌলিকতা খুব কম। মৌলিকতা এই কারণেই কম, রিপন বলেছে তো আমি ওইদিকে আর যাবো না। কালিদাসও মৌলিক নাট্যকার নন। কালিদাস মহাভারতের একটা গল্প নিয়ে শকুন্তলা লিখেছেন। কালিদাস ওই সময়ের একটি প্রচলিত লোকগল্প থেকে উর্বশী কাহিনি যেটা লিখেছেন। তাহলে মৌলিকত্বটা কোথায়? মৌলিকত্বটা ওই জায়গায় যে একজন লেখক গল্পটা তার মতো দেখে একটা শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরেন। ওইটিই তার মৌলিকত্ব। যার জন্যে পড়লেই কিন্তু ভাল লেখক হওয়া যায় না। একজন লেখকের একটা আলাদা শক্তি থাকে যে শক্তিটা তার লেখাপড়াটাকে বাড়িয়ে দেয়। তাকে চিন্তা করতে শেখায়। কিন্তু একজন লেখকের মৌলিকত্ব তার ভেতরেই থাকে। লেখাপড়াটা তাকে শুধু অগ্রসর করে। লেখাটা পড়তে পড়তেই চিন্তাগুলো এসেছে। সেলিমস্যারের একটা উদ্ধৃতি আছে- ‘যে লেখে সে দেখে’। ওখানে আরেকটা কথা আছে যে- ‘যে লেখে সে দেখে আর যে দেখে সে লেখে না।’ এখানে কথা হল একজন যখন দেখতে দেখতে লেখে তখন সে ফটোগ্রাফার। আমার চোখের সামনে বোতল আছে লিখলাম, আমার সামনে টেলিফোন সেট আছে লিখলাম, কলম আছে লিখলাম, তো আমি লেখক কীসের। আমি তো দেখে দেখে লিখলাম আর যে লেখে সে দেখে না। অর্থাৎ লেখকের অন্তর্দৃষ্টির ভিতর দিয়ে প্রচুর গল্প, প্রচুর কাহিনি তৈরি হতে থাকে যেটার একটা বাস্তবরীতি থাকে। আর ঐ বাস্তবতাটাই নাটক। সফোক্লিসকে যদি আমরা বলি মৌলিক নাট্যকার নন, কারণ আমরা বলতেই পারি তিনি ইলিয়াড ওডিসি থেকে নাটকের কাহিনি নিয়েছেন। মৌলিকত্ব কোথায়। মৌলিক হল যে আড়াইহাজার বছর আগে যেমন অপরিসীম সম্ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলেন নাটকের মধ্যে, যে মানুষ সকল কিছু দিয়ে সামনের দিকে যেতে চায়, মানুষ স্রষ্টাকে বা মানুষ নিয়তিকে চায়। কিন্তু ইলিয়াড ওডিসিতে তা ছিল না, ফলে এই যে একজন নাট্যকার লেখার মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে, নতুন যুগকে, তার যুগকে সম্পূর্ণ একটা শাশ^ত সত্যের মধ্যে তুলে ধরেন তখনই তিনি মৌলিক হন। মামুনভাই কী লিখবেন? মামুনভাই যখন কোনো নাটক লিখেন, তার গল্পের ক্যানভাসটাই বাংলাদেশ। তখন তার গল্প মৌলিক হয়ে ওঠে। সেলিম আল দীন যখন নাটক লেখেন তখন সেখানে তিনি কী করেন, তিনি গল্পটা কোথা থেকে পান? আসমান থেকে পান? না। গল্পটা কোথাও না কোথাও ঘোরাফেরা করে। এই গল্পটাকে তার মতন করে তিনি তৈরি করেন। আমরা দেখব যে কালিদাসের শকুন্তলার কথা যদি আমরা বলি, শকুন্তলা মহাভারতের একটা গল্প। মাত্র দশ লাইন। মহাভারতে মাত্র দশ লাইন আছে। কিন্তু তিনি যখন লিখলেন সেখানে দেখা গেল নাটকটা বেশ বড় এবং সেখানে একটা আংটির কাহিনি আনলেন। আংটিটা মহাভারতে নাই। এই একটা আংটি পুরো নাটকটার মোড় ঘুড়িয়ে দিল। এই যে নতুন করে সংযোজন-বিয়োজন, এইটা নিয়েই কিন্তু একজন নাট্যকার সামনের দিকে যান। এবং যার জন্যে নাটক শুধু যে আমরা পড়বো তা নয়, আমরা দেখবও বটে। এই কথাটা কিন্তু বলেছেন, অভিনেতা প্রসঙ্গ আছে, আনন্দকুমার স্বামী তাঁর একটা লেখায় বলেছিলেন যে- একজন অভিনেতা যখন মঞ্চে অভিনয় করে তখন তিনি যদি অভিনয় করতে করতে দর্শকের সাথে সম্পর্ক তৈরি না করতে পারেন তাহলে তিনি একজন পাথুরে অভিনেতা, প্রাণহীন অভিনেতা। আর যদি একজন দর্শক নাটক দেখতে দেখতে অভিনেতার সাথে সংযোগ তৈরি না করতে পারেন তাহলে তার সাথে দেয়ালের কোন পার্থক্য নাই। আনন্দকুমার স্বামী তার লেখার মধ্যে বলেছিলেন এই যে নাটকের সাথে অভিনেতা দর্শকের সেই সম্পর্ক তখনই সেটা আমরা বলি থিয়েটার হয়। থিয়েটারে যে অন্তর্গত, হামীম সেটা ঠিকই বলেছে, থিয়েটারের ভেতরে যে আত্মাটা সেটাকে আমরা নাটক বলতে পারি। থিয়েটার যদি কম্পোজিট আর্ট হয় তাহলে তার ভেতরের আত্মাটা হচ্ছে নাটক এবং সেটাকে আমরা সাহিত্যও বলতে পারি। যেই সাহিত্যটা পাঠ করতে করতে এক রকম, আর দেখতে দেখতে আরেক রকম হয়, পড়তে পড়তে আমি যে চরিত্রটা, আমি যখন পড়ি তখন আমি হয়ত বাবাকে একরকম দেখি, কিন্তু আমি যখন নাটকটা দেখি তখন মামুনভাই যা লিখেছেন তার অনেক বেশি আমি দেখি। একজন নাট্যকার তখনই মৌলিক হয়ে ওঠেন যখন তার দর্শককে এইভাবে দেখাতে পারেন। এইখানে একজন নাট্যকারের মৌলিকত্ব। শেষে যে কথাটা বলব- একটা কথা এখানে আছে যে ‘গোরা সিনড্রম’। ‘গোরা সিনড্রম’ অনেক ভাল, চমৎকার আমার কাছে লেখেছে। আত্মজ্ঞানের অভাব থাকলেই ‘গোরা সিনড্রম’ ঘটে। আমি বলছি যে আত্মজ্ঞানের সাথে আরেকটা দেশও জ্ঞান, দেশাত্মবোধ কিংবা বোধ। নাট্যকারের ভিতরের কিংবা লেখকদের ভেতরে যদি বোধ না থাকে তাহলে এই গোরা সিনড্রমটা হয় এবং বোধ যখন থাকে না। দেশাত্মবোধ থাকে না, দেশজ্ঞান থাকে না তখনই তারা পরাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। সেই পরাশ্রয়ীকে আমরা বলি পাশ্চাত্য আশ্রয়ী হয়ে ওঠে, বিদেশি আশ্রয়ী হয়ে ওঠে। এবং এই বিদেশি আশ্রয়ী যখন হয়ে ওঠে তখন আমরা দেখব যে প্রমথ চৌধুরী যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে ‘পাশ্চাত্যে যা মরে যায়, প্রাচ্যে সেটা ভূত হয়ে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে’ এবং আমাদের কাঁধে চেপে বসে এই মানসিকতাকে যদি আমরা বলি যে অধীনতার মানসিকতা। অন্যভাবে যদি বলি তাহলে বলা যায় কলোনিয়াল মানসিকতা। এই কলোনাইজড মানসিকতা যখন একজন লেখককে ভর করে, নাটকের ক্ষেত্রে, তার সময়ে এসে আমরা যদি কলোনাইজডকে ঘুরিয়ে বলি যে মৌলিক চিন্তা করবার ক্ষমতাটা তার না থাকে, তখনই কিন্তু সে নাট্যকার নতুন করে চিন্তা করেতে পারেন না। তখন তিনি অন্যকারো চিন্তার দাসত্বের অধীন হয়ে যান। এবং এইখানেই একজন নাট্যকার আমরা বলি তার কাঁধে হয়ত পাশ্চাত্যের ভূতটা চেপে বসে। আমরা দেখেছি নাটকের নির্দেশনার ক্ষেত্রে যেটা হামীম বলেছে, সত্য কথাটা। এবং এতে কোনো দোষের কিছু নাই। আমরা জানি যে, পাশ্চাত্যে সত্তুরদশকে যে আন্দোলনটা হয়েছিল এবং থিয়েটারের সেটে ডিজাইনে, বক্স সেটের যে ধারণা সত্তুর দশকে ছিল, সেটা আমাদের দেশে আশির দশকে নব্বই দশকে এসে মর্ডান হয়ে গেল। কিন্তু আমরাই যখন আবার একটা শূন্যমঞ্চের মাঝে নাটক করা শুরু করলাম তখন কিন্তু আমরা দেখলাম যে, শূন্যমঞ্চের ক্ষমতা অনেক বেশি, যে কোনো কিছু ছাড়া। তো সব শেষে মামুনভাইকে ধন্যবাদ। আমি সব শেষে বলব, কবিতা পাঠ, যেটা রিপন ইঙ্গিত করেছে যে, উপন্যাস ছাড়া শুধু নাট্যকার কবিতা পড়বে কেন। একটা জিনিস আমরা জানি যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার যারা তারা কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হতে হলে কবিতার গুণ থাকতে হয়। কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবির শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের গুণ না থাকলেও চলে। কালিদাস শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ, শ্রেষ্ঠ কবি সফোক্লিস, শ্রেষ্ঠ কবি শেক্সপিয়ার, সবাই কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবি। কিন্তু এই নাট্যকারদের রচনায় কবিতার বোধগুলো থাকে কিংবা উপন্যাসের বোধ থাকে। এই বোধটা একটা বিস্তারিত জীবনবোধ। দু’একজন নাট্যকারের মধ্যে যখনই থাকে তখন আমরা তাকে মৌলিক বলবো। এটা অন্যের গল্প ধার করলেও হতে পারে, নতুন কোনো মিথলজি নিয়ে হতে পারে- সেটাও হতে পারে। মূল কথা হল, একজন নাট্যকার নতুন করে তার চিন্তাগুলোকে আমাদের সামনে তুলে দিবেন। আর আমি ধন্যবাদ জানাই হামীমকে। সবশেষে বাইরে আলোচনা করছিলাম, সেটা শেকড় নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমি জানি না হকভাই বলছেন কিনা? কোনোরকম ভুল হলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। শেকড় নিয়ে বিখ্যাত একটা কবিতা আছে। ‘শেকড়ের হোক ডানা। কবিতাটা শেকড়ের ডানা। শেকড় থেকে জানা মেলে কীভাবে। আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামিদুজ্জামানের একটা ভাস্কর্য আছে। মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য। এক পা, হাতে বন্দুক, পাটা মেটালের ওপরে দাঁড়ানো- এটা দেখতে দেখতে মনে হয় যে, কেউ যেন এটা গেঁথে রেখেছে, ছুটে যাবে এটা সামনের দিকে। একটা ভাস্কর্যের বড় গুণ হচ্ছে তার স্পিড, তার কম্পোজিশন, তার আলোছায়া, যত শ্যাওলা পড়ে তত সুন্দর হয়ে ওঠে। তো ওইটাকে আমরা যদি শেকড় বলি, ডানাটা হচ্ছে তার ছুটে যাওয়াটা, তার গতিটা। আমরা যদি আমাদের এই শেকড়ের দিকে ফিরে তাকাই। শেকড়কে গ্রহণ করি তাহলে তার ডানার প্রয়োজন। সেটার জন্য অবশ্যই শুধু ভারতবর্ষের এই যে চলমানতার মধ্যে, যে এই খুব শম্ভুকগতির চলমানতা প্রাচ্যে, সেই গতিশীলতা আমাদের নাটকের মাঝে আনতে হবে। ওয়েস্টকে একেবারেই অবহেলা করলে চলবে না। ওয়েস্টের গতি আছে। সেটা যদি আমাদের শেকড়ের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি শেকড়ের হবে ডানা এবং সেই শেকড়ের ডানা নিয়ে নাট্যকার, নির্দেশক কিংবা অভিনেতারা ক্রমাগত একটা মৌলিক, সৃজনশীলতার দিকে অগ্রসর হতে পারে। ধন্যবাদ।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ
ধন্যবাদ মাননীয় সভাপতি, মামুনুর রশীদ। আমি প্রথমেই ধন্যবাদ জানাবো হামীম কামরুল হককে তার রচনার জন্যে। আজকের উপস্থাপনাপত্রটি তিনি রচনা করেছেন। তিনি তার বিশ্বাস এবং ভাবনা এবং খুব স্বাভাবিক, যেহেতু গদ্যে তার দখল ভাল, ঔপন্যাসিক-কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন। এবং দ্বিমত প্রকাশ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আমি প্রথমেই বলি সেটি হচ্ছে মৌলিক নাটক বলতে আসলে যেটি আমি বিবেচনায় আনি সেটি হচ্ছে বিষয় নয়, রচনা। বিষয় তো একই প্রায়। যেটি মহাভারতেও আছে। যেটি ইলিয়াডে আছে সেটি নানাভাবে নানাজনের হাত দিয়ে নানা রকমে প্রকাশিত। এখন রচনা বলতে কী? নাটক একটি শিল্প মাধ্যম। কিন্তু এর একটি কারিগরি দিক আছে। এটি সংকর। যেমন কবিতা এবং গল্প-উপন্যাসের একটি সুবিধা আছে। সেটি একটু আগে যেটি আফসার আহমদ বলছিলেন যে, মনোজগতে একটি বিশ্ব আছে মানুষের। যার বিশ্ব যত গভীরতা অর্জন করে তার বিশ্ব তত বড়। রবীন্দ্রনাথ বিশ^কেই ধারণ করেছিলেন প্রাচ্যের জন্যে এবং শেকড়টা একেবারেই লালন বা গগন হরকরার হাত দিয়ে। কিন্তু কোনো ক্ষতি হয়নি তাতে। বিশ্বেরও ক্ষতি হয়নি লাভ হয়েছে। কেন? তিনি বিশ্বকে গ্রহণ করতে পেরেছেন। পাশাপাশি তাঁর ভাষাজ্ঞান এতো ভাল ছিল এবং প্রকাশ করার আঙ্গিকটা এত সুন্দর যে কালোত্তীর্ণ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু নাটক সেখান থেকে হয় না। সেজন্য রবীন্দ্রনাথেই আবার প্রমাণ আছে। নাটকের জন্যে ভাষাটাও আলাদা, নাটকের জন্যে রীতিটাও আলাদা, আঙ্গিকটাও আলাদা। সুতরাং যেকোনো একই গল্প পাঁচজনের হাত দিয়ে পাঁচরকম নাটক হতে বাধ্য এবং এই জায়গায় এসে আমার মনে হয় মৌলিকত্বের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে এটি বলতে পারি আমরা। অর্থাৎ এই জায়গাগুলো অতিক্রম করতে পারছি না বলেই যে লেখ্যরীতিটা কী হতে পারে নাটকের। একজন নাট্যকার যখন লিখেন মামুনুর রশীদের আঙ্গিক এবং ভাষা সেলিম আল দীনের আঙ্গিক এবং ভাষা এক নয়। একই অর্থে সৈয়দ শামসুলের হকেরও নয়। এমন কী চরিত্রগুলোও এক নয়। কিন্তু দেখা মানুষগুলো হয়ত এক হতে পারে। বাস্তবের দেখা মানুষগুলো এক হতে পারে কিন্তু ওই মানুষগুলো যখন নাট্যকারের হাত দিয়ে এক শিল্পরূপে প্রকাশিত হয় তখন কিন্তু বদলে যাচ্ছে। একটি মানুষকে দেখেছেন কিন্তু তিনজন তিনভাবে লিখেছেন। এই যে লেখার কারিগরি দিক বা কৌশল, এই কৌশলটি সম্ভবত যত কষ্ট করে মামুনুর রশীদ, সৈয়দ হক বা সেলিম আল দীন অর্জন করেছিল, তত কষ্ট করে অন্যেরা চাচ্ছেন না, এখনকার দিনে। আমি অভিযোগটা একটু বলছি অন্যদেরকে। কারণ এই কষ্টটুকু সম্ভবত করতে চাচ্ছেন না। এবং আমি একজনের নাম উল্লেখ করছি মাসুম রেজার নাম উল্লেখ করছি। সঠিকভাবে উল্লেখ করেছি কারণ ঝিলিক দেয়া নাম কিন্তু। কিন্তু মাসুম রেজা পরে আর কষ্টটি করলেন না। তার কৌশল জানা ছিল, তার ভাষা জানা ছিল, তার আঙ্গিক জানা ছিল, কিন্তু তিনি করলেন না। আমি চাই মাসুম রেজার কানে কথাগুলো রাতেই পৌঁছে যাক। নয়তো এটা ছাপা হওয়ার পর পৌঁছে যাক। আমার মনে হচ্ছে হকভাই একটি কথা সঠিক বলেছেন যেটাও সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করতেই পারি। আমরা গ্রাম থিয়েটার থেকে আহ্বান জানিয়েছি হামীম কামরুলকে। হামীম লিখেছেন, আমরাই বলেছি মৌলিক নাটকে সংকট উত্তরণের পথ। সুতরাং এই জায়গায় যদি কোনো এক ধরনের ধোঁয়াশা ব্যাপার হয়ে থাকে সেজন্য আমাদের দায় নিতে হবে। যিনি উপস্থাপন করেছেন বা রচনা করেছেন তার নয়। আমার মনে হয়েছে এখানে হতে পারে নাটকের অভাবজনিত সংকট উত্তরণের পথ। অথবা আরেকটি আলোচনা মনে হয় অনন্ত হীরা করল। সেটা হচ্ছে যে সম্ভবত নাটকের সংকট। নাটকের সংকট সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেশি, এটাও কিন্তু হতে পারত। আমি দুটোই সম্ভাবনার জায়গা দেখছি এখানে। আর একটি কথা তো আমি বলেই ফেললাম যে মৌলিক বলতে আমি কী মনে করি বা কী এখনো ভাবছি। কিন্তু প্রবন্ধের যে জায়গাটা সমালোচনার এবং বড় হয়ে দেখা দেয় সেটি হচ্ছে এটি বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ মনে হয়নি আমার কাছে। এটি অনেক বেশি আদর্শের জায়গা থেকে বলা হয়েছে। এটা আদর্শের জায়গা যেটা আফসার বলেছে একজন দর্শক হিসেবে, একজন শিল্পকর্মী হিসেবে, একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে, একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে, সে নাটকটাকে কীভাবে দেখতে চায় এবং কী সততা প্রয়োজন ব্যক্তিজীবনে এবং শিল্প রচনার ক্ষেত্রে সেই জায়গাটাকে বড় করে দেখছেন এবং অনেকে সেটা বড় করে দেখেননি। হামীম আমার এটি মনে হয়েছে যে, বিশ্লেষণমূলক আদর্শগুলো সেগুলো অনেকাংশে উপদেশমূলকও বটে। অর্থাৎ আমরা নাটক যারা করি তাদের কী কী করা উচিত, কী কী করা উচিত না এ ব্যাপারে উপস্থিত বলবে নাটকে। আমার আরেকটা মনে হয় যে নাটক অবশ্যই সাহিত্য। এবং নাটক নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের জায়গায় পুরো পৃথিবী, আড়াই হাজার বছর যদি নাটকের ইতিহাস ধরি, আছে। নাটক কি সাহিত্য? আর সাহিত্য কি নাটক হতে পারে? একটা দোদুল্যমানতা, দ্বিধা আমাদের মাঝে আছে। আমার নিজের মনে হয়েছে যে অবশ্যই নাটক সাহিত্যআশ্রয়ী। এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি পিটারব্রুক পড়ার পর সত্যি কথা বলি, আমার মনে হয় যে সাহিত্য যদি নাও থাকে নাটকে তাহলে সেটা থিয়েটার হবে না কেন? এটা পিটার ব্রুক আমাদের শিখিয়েছে এবং আমরা সত্তুর দশকের শেষভাগে এসে আশির দশকে পিটার ব্রুকের সাক্ষাৎ পেয়ে যাচ্ছি। এবং পরবর্তী পর্যায়ে তো তার অ্যাম্পটি স্পেস এর পাশাপাশি আমরা শিফটিং পয়েন্ট এরকম লেখা পেয়েছি তার কাছ থেকে এবং সেখানে আরো বিশদভাবে উনি কেন সরে আসলেন এই হলি থিয়েটার থেকে এটা উনি বলেছেন। সুতরাং সেই জায়গায় আমার মনে হয় যে সম্পর্কটা কি সাহিত্য এবং নাটকের। এটা নিজের মনে হয়েছে যে, অবশ্যই আমি যদিও তাৎক্ষণিক থিয়েটারে বিশ্বাস করি। আমি সেলিম আল দীনকে বলতাম- তোমার নাটক লেখার দরকার নাই, তুমি আমাকে টেক্সট দাও সেটা আমি নাটক করব। নাটক করার দায়িত্ব আমার এবং করেছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ওই টেক্সটা পাবো কোথায়, যদি একজন সেলিম আল দীন না থাকে, ওই টেক্সট পাবো কোথায় যদি মামুনুর রশীদ বা সৈয়দ হক না থাকে। এটা আমার মনে হয়েছে। আমার নিজের মনে হয়েছে যে আমি তো মৌলিক জায়গার কথা বলতে যাবো। যেমন আমি ধার করতেই পারি সেটা যেমন আছে তেমনি শুধুমাত্র অভিনীত হওয়ার জন্যও একটি টেক্সট দরকার। এটি খুবই জরুরি কিন্তু। সেটা যেভাবে হোক যে ফর্মেই হোক। ওরাল ফর্মও হতে পারে। কিন্তু একটা টেক্সট কোথাও দরকার হচ্ছে। আমি মনে করি যে থিয়েটারের সাথে যেখানে নাটক এবং থিয়েটারের মাঝে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করার প্রবণতা আছে। এই প্রবন্ধে এবং সেটি আমাদের মাঝেও বিদ্যমান, জীবনে যারা থিয়েটার করি, নাটক করি। আমার মনে হয় যে সকল নদী সমুদ্রমুখী বা সমুদ্রগামী। সকল নাটকও মঞ্চগামী বা মঞ্চমুখী। ওর মুক্তি হচ্ছে মঞ্চে। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর মঞ্চেই কিন্তু মুক্তি ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ অসফল একজন নাট্যকার, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে রবীন্দ্রনাথ নাট্যকার হয়ে উঠেছেন কার হাত ধরে? মঞ্চমুখী হয়ে। প্রশংসিত মানে কী? দর্শক দ্বারা নন্দিত নয়, মূল মঞ্চে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। যেটা হয়েছে তার গল্পগুলো নাটক হয়ে আমাদের প্রফেশনাল থিয়েটারে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ একজন সফল নাট্যকার বাংলাদেশে। কিন্তু জীবদ্দশায় তাঁর নাটক তিনি করেছেন তাঁর বাড়ির ভেতরে, আঙ্গিনায় মধ্যে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে গিরিশ ঘোষের মত লোক যিনি পাত্তাই দিচ্ছেন না রবীন্দ্রনাথকে। ওই সময়ের থিয়েটারে মূল লোকটাই পাত্তা দিচ্ছে না কিন্তু। আমি সেই কথাটাই বলছিলাম। কিন্তু মেঘনাদবধ কাব্যকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, গিরিশ ঘোষের মঞ্চে মেঘনাদবধ কাব্য হচ্ছে। ছত্রিশটা নাটক দেখা যায় তার জীবদ্দশায়। তারমধ্যে তিরিশটা হচ্ছে গল্প থিয়েটার। তিরিশটার কাছাকাছি কোনো একটা সংখ্যা হবে। এটা কিন্তু কষ্টকর রবীন্দ্রনাথের জীবনে। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু রিকগনাইজ করতেন না। মেইনস্ট্রিমের কর্মীদের রিকগনাইজ আপনি দেখবেন না তার লেখায়। খুব একটা যে করতেন তা না। তার মাঝে আভিজাত্যবোধ তো থাকতেই পারে এতবড় মানুষ হিসেবে, লেখক হিসেবে। আর আরেকটা জিনিস হচ্ছে যে, আমি মনে করেছি যে থিয়েটারটার দিকেই, মঞ্চায়িত করাই হল একটি রচনার সফলতা। আমি নাট্যকার মামুনুর রশীদের সামনেই বলছি, নাটক লিখিত হয়ে থাকলো মঞ্চায়ন হলো না, এ আমি সফল মনেই করছি না। আমি নাই পারি, আমার অধিকার রয়েছে নাট্যকর্মী হিসেবে। আর আমি মনে করি সেটি নেই এখানে। আরেকটি বিষয় হামীম, সেটি হচ্ছে নতুন নাট্যকাররা কী কী বিবেচনা করছেন না। তাদের সীমাবদ্ধতাটা কী আসলে? লেখা হচ্ছে না কেন? কবিতা তো লেখা হচ্ছে, গল্প-উপন্যাস তো লেখা হচ্ছে। নাটক খুব কম লেখা হচ্ছে। চোখে পড়ার মত না। হ্যাঁ, লিখছে অনেকে কিন্তু নোটিশ করার মত না। কিছু নাটক তো হয়েছে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে যে, সত্তুর দশকে যে বিশাল জোয়ার তৈরি হয়েছিল পাঁচজন-ছয়জন নাট্যকারের হাত ধরে, এমন কী সারা বাংলাদেশ ধরে পঞ্চাশজন নাট্যকারের হাত ধরে। সেই অবস্থাটা কি এই মুহূর্তে আছে কি না? তার কারণগুলো কী সেগুলো একটু মনে হয় আলোচনায় আসলে ভাল হতো। তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম সামাজিক একটা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় দুটি ধারা আছে। দুটি খুব বড় অনুসঙ্গ আছে। একটি হচ্ছে ইনফরমেশন টেকনোলজি। এই যে এক ধরনের ভার্চুয়ালিটি তৈরি হয়েছে, একটা বিরাট ঘটনা ঘটেছে। আরেকটি হচ্ছে ইসলামাইজেশন সোসাইটি, পলিটিক্যাল সোসাইটি। ধর্মীয় একটি প্রভাব তৈরি হয়েছে। দুটোর মধ্যে কি দ্বিধায় আছে একজন যুবক? সে ভাবতেই পারছে না। সেই যুবকটাকে এটা ভাবতে হবে। এটা আমার এই সেমিনার থেকে বলার ইচ্ছে যে আপনাকে ভাবতে হবে। এই দ্বান্দ্বিক জায়গায় যেতে হবে আপনাকে। একদিকে উত্তুঙ্গে যাচ্ছেন আপনি, বিজ্ঞানের উন্নয়নের এবং প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গগুলোকে নিয়ে, ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে। ধর্মের মতো একটি জায়গায় আপনি আবদ্ধ হয়ে যাওয়ারও একটি সম্ভাবনা দাঁড়িয়েছে। অনেক ভাল নাটক এখন বের হওয়ার কথা। সত্তুর বা আশির দশকের চেয়ে বড় সংকট এখন। জাতিসত্তার পরিচয় তো এখন হয়ে গেছে বাঙালির অথবা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর। লড়াই চলছে কিন্তু। সেই লড়াইটা তো হচ্ছে। মারমা বা চাকমাদের সাথে লড়াইটা সেটা জাতি সত্তার। সে লড়াইয়ের পক্ষে বিপক্ষে কথা আছে। আমরা পক্ষেই আছি। কিন্তু আমাদের জাতিসত্তা নিয়ে তো সংকট নাই। ৯৯% মানুষের। তাহলে আমরা পারছি না কেন। সে জায়গাগুলো আমার মনে হয় বিবেচনায় আনছে না। একজন নাট্যকার কিন্তু সমাজতাত্ত্বিকও বটে আবার মনঃস্তাত্তি¡ক বটে। এই জায়গাটায় ক্ষতিটা হয়। কবি তো নিশ্চিত, কবি না হলে নাট্যকার হওয়া যায় না। এই জায়গায় আমি একটু কথা বলতে চাই, সেটি হচ্ছে এই প্রসঙ্গে মাদ্রাসার ব্যাপারটা আমাদের রাহমান চৌধুরী এনেছেন। সেটা হচ্ছে যে এতবড় একটি অংশকে অবজ্ঞা করে, না তাকিয়ে, তাহলে ওকে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমার, শাসন করার দায়িত্ব যেমন আমাদের রয়েছে। আমরা ভাবছি রাষ্ট্র পরিচালনাকারী মানুষ হিসেবে মধ্যবিত্ত হিসেবে। এটা ভাববার অবকাশ আছে, এই লোকগুলো অবহেলিত, অপাঙক্তেয়, দৃষ্টির গোচরহীন নয় মধ্যবিত্ত। এবং শিক্ষিত সমাজের এই মানুষগুলোর এতগুলো মানুষ আছে, এত শক্তি তাদের ঢাকা শহর তারা দখল করে নিচ্ছে? আমরা শঙ্কিত হচ্ছি রাষ্ট্র তার যন্ত্রে আবির্ভূত হচ্ছে? সুতরাং সঙ্কটটা কিন্তু খুব বড়। সঙ্কটটা ভীষণ বড়। তারচেয়ে বড় সঙ্কট হচ্ছে এই জায়গাটা। এই জায়গাটার অ্যাড্রেস আমাদেরকে করতে হবে। শুধু শক্তি দিয়ে না, ডায়ালগ দিয়েও। আমার মনে হয়েছে এবং এই জায়গাগুলোতে নাটক একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন আমরা আদিবাসীদেরকে নিয়ে কথাগুলো বলতে পেরেছি, মামুনভাইয়ের নাটক, সেলিম আল দীনের নাটকের মধ্যদিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি নানা সময়ে। পঁচাশি সাল থেকে আমরা বলেছি যেই হত্যাকাণ্ড, যেই নির্যাতন শুরু হয়েছে, সেই নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড বিরুদ্ধে আমরা সেই নাট্যকর্মীরা, নাট্যকার কলম হাতে নিয়েছেন, আমরা অভিনেতা-কুশীলবরা অভিনয় করেছি মঞ্চায়ন করেছি এবং মামুনুর রশীদ করেছেন, সেলিম আল দীন করেছেন। সুতরাং আমার মনে হয় আমাদের এই জায়গাগুলো, নিজেদের মধ্যে যে সূ² ভাগগুলো রয়ে গেছে, অনালোকিত যে জায়গাগুলো রয়ে গেছে এবং যেই মানুষগুলোকে অপাংক্তেয় মনে করছি, আসলে রাষ্ট্রের জন্য তারাও জরুরি আমাদের মতো। সুতরাং চরিত্র এবং বিষয়ের জায়গা কিন্তু বাংলাদেশে আমি মনে করি না কোনো রকম অভাব রয়েছে, আমাদের উদ্যোগের অভাব আছে। আমি তরুণদেরকে বলব লিখতে। মামুনুর রশীদ দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে, সেলিম আল দীন বা হকভাই দ্বারা, সৈয়দ শামসুক হক দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে। আরেকটি আমি মনেই করি, যে কথাটি সবচেয়ে সত্যি কথা- আত্মা এবং শরীর। আমি মনে করি একটি টেক্সট হচ্ছে একটি প্রযোজনার আত্মা। আর থিয়েটারটা হচ্ছে আসলে শরীর। আমার মনে হয়েছে যে এটা শরীর। এটাকে আমি দেখতে পাই। কিন্তু আমি যেটা দেখতে পাই না, যেটা নিয়ে আমি বাড়ি ফিরে যাই সেটা হচ্ছে ওই ঘটে যাওয়া থিয়েটারটা, একটা আত্মা। তো ধন্যবাদ সবাইকে আপনাদের, মামুনুর রশীদকে বিশেষ করে ধন্যবাদ, সময় দিয়েছেন প্রচণ্ড ব্যস্ত একটা নাট্যকার হওয়ার পরও এবং হামীম কামরুল তোমাকেও ধন্যবাদ।

রাহমান চৌধুরী
আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়েছে যে, এটা আমি সাহিত্য বলছি নাটক নিয়ে। আসলে আমাদের যখন নাটক শুরু হয় তখন কিন্তু নাট্যকারদের কবি বলা হতো এবং সেজন্য সাহিত্য আকারে তৈরি হয়েছে। তখন কিন্তু আমাদের এই বই বের করার সুযোগ ছিল না যে বই পড়বে। নাট্যকারকে বা সাহিত্যকে যেতে হয়েছে মঞ্চের মধ্যদিয়ে আমরা দেখতে পাই। সেটি কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এসেছে নাটক প্রথম সাহিত্য হিসেবে। তো সাহিত্যের জায়গাটা আমাদের বাদ দেয়া যাবে না। আর ডিক্টেটর তো খুব ভয় পেত নাটককে। বলছে যে নাচটাচে আমার কোনো আপত্তি নেই। এ তো নাটক ওটাকে বন্ধ করতে হবে। ওটা বলেছেন স্পষ্ট করে। কিন্তু অ্যারিস্টটল বলেছেন যে না, নাটক বন্ধ করা যাবে না। তখন তিনি একটা রুলস তৈরি করেন। অ্যারিস্টটল কাব্যতত্ত্ব তৈরি করে নাটকের ফর্মে নিয়ে আসলেন। এটা কিন্তু বুঝতে হবে। কনটেন্টকে কিন্তু ভয় পায় সবাই। নাটকে একটা কনটেন্ট আছে বলেই সবাই ভয় পায়।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ
লেখারূপ ছাড়া তো কনটেন্ট সম্ভব নয়।

রাহমান চৌধুরী
এখন সম্ভব। কারণ এযুগে তো সেটাই হচ্ছে।

হামীম কামরুল হক
আসলে আমি এত উপকৃত কারণ আমি শুরুতেই যে কথাটি, যে উদ্দেশ্যটা নিয়ে এই প্রবন্ধটা লেখা যে, আমাকে আজকে সবাই অনেক সহায়তা করবেন, ভুল-ক্রটি বা আমার যেগুলি আমি এড়িয়ে গেছি বা ধরতে পারিনি বা বিশ্লেষণের অভাব ছিল, এই উপদেশমূলক অনেককিছু আমি আজকে পেলাম। এটা আমার, বলতে গেলে আমি এখন একটু জোড় দিয়ে বলি, যতদিন লেখালেখি করেছি এর মাঝে আজকের সেই অর্জনটা, এর কোনো তুলনা নেই। আজকে আমি অসম্ভব রকম কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারকে এবং আজকে যারা কথা বললেন তাদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ সবাইকে।

মামুনুর রশীদ
প্রথমেই ধন্যবাদ দিব বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারকে। আমার মনেই হচ্ছে যে আজকের এই আয়োজনটা একটা আশংকা থেকে। কারণ গ্রাম থিয়েটারের অনেকগুলি শাখা। এবং সেই শাখাগুলোকে সচল রাখার জন্য গ্রাম থিয়েটারের কর্তারা সারাদেশ ঘুরে বেড়ান। তাঁরা সেখানে লক্ষ করেছেন যে নাটক নেই। নাটক যদি না থাকে তাহলে গ্রাম থিয়েটার কী করে থাকবে? এবং মৌলিক নাটক লেখার ঝোঁক নেই। আমার কাছে ঝোঁকটাই বড় প্রশ্ন এবং এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য ড. আফসার আহমদও স্বীকার করবেন, যিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত আছেন এবং আমি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত আছি এবং ছেলেমেয়েরা এতো লেখাবিমুখ। মৌলিক চিন্তা তো দূরের কথা, লেখাবিমুখ যে, লিখতে হবে নাটক, সেটা ভয়াবহ ব্যাপার। আমি জানি না, সব ইউনিভার্সিটির সিলেবাসেও একটা সঙ্কট আছে। সঙ্কট ঠিক নয়। এই ডিপার্টমেন্টগুলো কি নাট্যকার সৃষ্টিতে সাহায্য করবে নাকি করবে না এইক্ষেত্রে একটা কনফিউশন আছে এবং এই কনফিউশন থেকে যেটা হচ্ছে সেটা এই নাটক লিখায় কেউ অনুপ্রাণিত হচ্ছে না। কিন্তু আবার এই প্রশ্নও জাগে নাটক লেখায় অনুপ্রাণিত হচ্ছে না তাহলে কি খুব ভাল নির্দেশক হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত হচ্ছে? খুব ভাল অভিনেতা-অভিনেত্রী হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত হচ্ছে? এইসব জায়গায় কিন্তু একটা কনফিউশন আছে। আমরা আজকে কয়টা আউটস্ট্যান্ডিং ডিরেক্টর পেয়েছি, কয়টা আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাক্টর-অ্যাক্ট্রেস আমরা মঞ্চে পেয়েছি? যদি এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমরা হই তাহলে কিন্তু আমরা হতাশ হবো, আমরা আশঙ্কিত হবো, এটা একটা বড় ক্রাইসিস। আরেকটা যেটা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বললেন যে, আমাদের সোসাইটিতে এখন কত বড় বড় প্রবলেম এসেছে। তাহলে তো আরো অনেক বেশি নাট্যকার আসার কথা ছিল এই প্রবলেমগুলোকে অ্যাড্রেস করার জন্যে এবং আমাদের একটা সত্যিকার অর্থে কতগুলো ক্রাইসিসের জন্ম নিয়েছে। একটা হচ্ছে- আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। আমরা কিন্তু একটা অত্যন্ত সাংঘাতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এবং আমরা তখন বলতাম যে আমরা বাঙালি। কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে বাঙালি না মুসলমান এই সঙ্কটটা কিন্তু তিরিশের দশকের অর্থাৎ গত শতাব্দীতে কিন্তু তৈরি হয়ে গেছে যে আমরা বাঙালি না মুসলমান। এবং ২২৬ বছর ধরে মাদ্রাসাশিক্ষা প্রচলিত আছে ভারতবর্ষে। ওইদিকে আমরা কেউ তাকাইনি এবং ভেবেছি যে এটা পাকিস্তান বিদ্বেষ থেকে। পাকিস্তান যে রকমভাবে ইসলামকে চাপিয়ে দিতে, উর্দুভাষাকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, এ সমস্ত কারণে কিন্তু আমরা এতবেশি ইসলামবিদ্বেষী হয়েছি এবং সেক্যুলার এডুকেশনে আমাদের এত বেশি আস্তা ছিল যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতাকে বজায় রাখতে। কিন্তু কালক্রমে পলিটিসাইজড হয়ে গেল বিষয়টা। পলিটিসাইজড হয়ে গেল যে ১৯৭২ সালে যারা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছে তারা কিন্তু সংগঠিতভাবে ৪২ বছর ধরে গ্রাম-গঞ্জে আমরা আমাদের যে এলাকাগুলো রিচ করতে পেরেছি, যে জেলা শহরগুলো এবং ঢাকা শহরের টিএসসি, শাহবাগ এই এলাকাগুলো। ওরা কিন্তু এই এলাকায় আসেইনি। ওরা রয়ে গেছে গ্রামে-গঞ্জে কওমি মাদ্রাসা করেছে, নানান কিছু করেছে। এই যে বাঙালি জাতি-সত্তার বিরুদ্ধে পয়লা বৈশাখে একটা বিরাট ঢেউ নামে ঢাকা শহরে, মফস্বলেও নামে, গ্রামাঞ্চলেও নামে ওরা এর মধ্যদিয়েও নিজেদেরকে সংগঠিত করেছে এবং সংগঠিত করে এখন যে রূপটা আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা ভয়ংকর রূপ রয়েছে এবং আপনারা দেখেন গতকালের যে পত্রিকাটা আছে, বিএনপি বলছে যে, সমস্ত হেফাজতে ইসলাম আমাদের পক্ষে আছে, আওয়ামী লীগ সঙ্গে সঙ্গে বলছে একাংশ আমাদের পক্ষে আছে। তার মানে আওয়ামী লীগ রং is also suffering from identity crisis. সে কি বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে এগুবে নাকি তার সাথে ইসলামকেও সাথে নিয়ে নিবে। তো এই ধরনের ক্রাইসিসের মধ্যদিয়ে আমরা এগুচ্ছি এবং নাট্যকর্মও কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সারাদেশে সংস্কৃতিকর্মীরাও কিন্তু আজকে আতঙ্কিত এবং এই আলোচনাগুলি আমি মনে করি প্রতিটি দলে হওয়া উচিত ক্লিয়ার করার জন্য যে, আল্টিমেটলি আমরা সেক্যুলার থাকব Under all circumstances আমরা সেক্যুলার থাকব কিন্তু আমাদের এই ঘটনাগুলোকে আমলে নিতে হবে এইটা হচ্ছে প্রশ্ন। আমরা যদি সেক্যুলার থাকতে চাই, আমরা যদি হেফাজতে ইসলামের বিরোধিতা করতে চাই তাহলে এটাকে উপেক্ষা করা যাবে না। এটাকে আমলে নিয়ে এটার বিরুদ্ধে struggle করতে হবে। আর মৌলিক নাটক নিয়ে সঙ্কট নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে এবং আফসার যেটা বলেছেন আমি তার সাথে সম্পূর্ণ একমত। যে পেপারটি পড়া হয়েছে এটাও মৌলিক। মৌলিকত্বেও ব্যাপারে সঙ্কট আছে। মৌলিকত্ব হচ্ছে- কথাটা আশা করি হামীম অন্যভাবে নেবেন না, যেমন হামীম কতগুলো থিয়েটার দেখেছেন বাংলাদেশে? এটাও কিন্তু একটা প্রশ্ন? সব থিয়েটার তো আপনার পক্ষে দেখা সম্ভব না এবং অনেক সময় অনেক থিয়েটার ঝলসে ওঠে, অনেক সময় অনেক থিয়েটার ব্যর্থ হয়, অনেক সময় চমৎকার পাণ্ডুলিপি কিন্তু দেখা যায়। বলে যে স্ক্রিপ্টটা দারুণ ছিল। তার মানে আমি ওর কথায় বুঝে নিয়েছি স্ক্রিপ্টটা দারুণ ছিল মানে প্রোডাকশনটা ভাল হয় নাই। তো এখন হয় কী, আপনার কাছে যত বেশি ডাটা থাকবে, যতবেশি নাটক দেখা থাকবে ততবেশি কিন্তু আপনি সমস্যাটাকে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আমি আশা করব ঢাকা থিয়েটার চমৎকার একটি আয়োজন করেছে। এটা নিয়ে আমার অনেককিছু বলার ছিল। কিন্তু অলরেডি সাতটা তিরিশ মিনিট বেজে যাচ্ছে এবং আমার নিজের মহড়া আছে, তো সেইজন্য আমি দীর্ঘায়িত করবো না। সেজন্য আমি যদি কখনো সুযোগ পাই অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং আমার একটা আকাক্সক্ষা থেকে গেল, আফসার যে আলোচনার সূচনা করেছেন, রিপন যে আলোচনার সূচনা করেছে, মৌলিক নাটক নিয়ে যে আলোচনার সূচনা করেছে, রাহমান চৌধুরী যা বলেছে, শিমূল যেটা বলেছেন এগুলি নিয়েই আমার একটা পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শোনার আকাক্সক্ষা থাকলো। আশা করি ঢাকা থিয়েটার ভবিষ্যতে আমার এই ইচ্ছা পূর্ণ করবে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। হামীমকে ধন্যবাদ, ঢাকা থিয়েটারকে ধন্যবাদ।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ
২৯ জুলাই যদিও রমজানের মধ্যে পড়ছে ঢাকা থিয়েটারের ৪০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। তো ১৯৭৩ এবং ২০১৩ আমরা ২৬ অথবা ২৭ তারিখ শুক্রবার-শনিবার আমরা একটি সেমিনার করতে যাচ্ছি। সেটি বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের ৩ দশক আর ঢাকা থিয়েটারের ৪ দশক নিয়ে। গ্রাম থিয়েটারের যদিও ৩১ বছর হয়ে গেছে। আমাদের অধ্যাপক আসফার আহমদ তিনি সেদিন আমাদের সামনে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। আমি চাইবো যে, যতবেশি মানুষ আসে তত ভাল হবে। মামুনভাই তোমাকেসহ এখানে যাঁরা আছেন, ২৯ তারিখে থাকবেন আশা করি। দিনটার একটা আলাদা ভ্যালু আছে, একটা আলাদা ইমোশন যুক্ত আছে। ২৯ তারিখের পরিবর্তে আমরা ২৭ তারিখও করে ফেলতে পারি। সেমিনারটা আমরা করি হলিডের দিন। ধন্যবাদ সবাইকে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *