স্মৃতির মন্দিরে

গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা – ৩৭ বর্ষ

আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৬
OCTOBER 2019​

আমিনুর রহমান মানিক
সময় চলে যায় কিন্তু মানুষের জীবনের ঘটে যাওয়া স্মৃতিগুলো যুগ যুগ ইথারে অমর হয়ে থাকে। কর্ম, ধর্ম ও আচার আচরণ মনের ক্যামেরায় আটকে থাকে ভাস্বর হয়ে। নবজাতকের মিষ্টি হাসি যেমন সহজে ভোলা যায় না তেমনি আজও ভুলতে পারিনি সেই মহিয়সী নারী মেহেরুন্নেসা পারুলআপাকে। চির অম্লান হয়ে থাকবেন নন্দিত নাট্যকার সেলিম আল দীনের যোগ্য সহধর্মিনী মেহেরুন্নেসা পারুল।

আমার বাড়ি হতে পারুলআপাদের বাড়ির দূরত্ব তিনশত গজের মধ্যে। জন্ম অবধি পারুলআপার পরিবারবর্গ করোটিয়াতে বসবাস করে আসছিলেন। বছরে দু’একবার আসলেও অপরিচিত জনের মতোই মনে হতো। কখনো তেমন ভাবে আলাপচারিতা বা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। ১৯৮০ সালে সেলিম আল দীনের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আর সে পরিচয়ের কারণেই পারুলআপার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠেছিল। সে যাত্রায় সেলিম ভাই পুরো দশদিন তালুকনগরে অবস্থান করেছিলেন। দশদিনের ফসল আজকের বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। সেলিমভাইয়ের নির্দেশে আমি ৫৯ জন সদস্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলাম আজহার আলী স্মৃতি পরিষদ। এ স্মৃতি পরিষদের সভ্যগণ ঢাকা থিয়েটারের অনুমতি ক্রমে ১৯৮১ সনে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সংগঠন তালুকনগর থিয়েটার।

সেলিমভাইয়ের মধ্য দিয়ে পারুলআপাদের পরিবারের সাথে যে সম্পর্ক তা আজও অম্লান হয়ে আছে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আড্ডা জমে ওঠে পারুলআপাদের বাসায়। মাঝে মাঝে পারুলআপা চা নাস্তা নিয়ে আমাদের আড্ডায় শরিক হতেন। আড্ডাটা শুধু পারুলআপাদের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ রইলনা, পালাক্রমে আমার বাড়িতেও জমে উঠল। ঘনিষ্ঠতার চরম মুহূর্তে জাহাঙ্গীরনগর ফিরে যাবার পালা। গাড়ি-ঘোড়া নেই। তাই প্রায় বারো কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ঘিওর পর্যন্ত সফরসঙ্গী হলাম। রাস্তায় চারবার বিশ্রাম নিলাম। বাসা থেকে আনা খাবার মুখে দিয়ে যাত্রা পথে পা বাড়ালাম। ঘড়িতে তখন দুপুর একটা। সেলিমভাই ঘিওর এসেই চায়ের দোকানে জমিয়ে বসলেন। মানিক আমার পাশে বস, একঘণ্টা আড্ডা দেব তাতে ক্লান্তি অনেকটা দূর হবে। দুবার চা পান করলাম। পারুলআপা বার বার তাগাদা দিলেও সেলিমভাই নড়ে চড়ে বসে বলে উঠব, আর একটু বসি পারুল, মানিককে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ঘণ্টা দেড়েক পর পারুলআপার অনুরোধে ঘোড়ারগাড়ি ঠিক করে নিয়ে এলাম। গাড়িতে ওঠার সময় পারুলআপা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, যখন মন চায় তখনি আমার বাসায় যাবি, তোর জন্য আমার ঘরের দরজা খোলা থাকবে। সেলিমভাই পকেট থেকে দশ টাকা বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। কিছু কিনে নিয়ে যাবি, ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিবি। ঘোড়ারগাড়িটা বরঙ্গাইল অভিমুখে রওয়ানা হলো। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে পলকহীন নেত্রে তাকিয়ে রইলাম। সেলিমভাই ও পারুলআপা হাত নেড়ে বিদায় জানাল। দূর থেকে সেলিমভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো, মানিক আমি লোক পাঠালে তার সাথে অবশ্যই জাহাঙ্গীরনগর চলে আসবি। আমি ভারাক্রান্ত মনে সম্মতি জানালাম। যতদূর মনে পড়ে, সপ্তাহ খানেক পর সেলিমভাইয়ের হাতে লেখা পত্র নিয়ে সালাম সাকলাইন আমার বাড়িতে এলেন। পরেরদিন পত্রবাহকের সাথে সেলিমভাইয়ের বাসায় চলে এলাম। পারুলআপা আমাকে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এলেন। ফ্যানের সুইচ টিপে বসে পড়লেন আমার পাশে। জানতে চাইলেন বাবা-মার খবরাখবর। পরেরদিন অঘোষিত বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হবে। সে সভায় আমার করণীর সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিলেন সেলিমভাই ও পারুলআপা।

সকাল দশটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে উঠে পড়লাম আমি আর সেলিমভাই। একটু বিলম্ব হলেও সহি- সালামতে পুরানা পল্টনে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে পৌঁছালাম। যতদূর মনে পরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, শিমূল ইউসুফ, সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ুন কবীর হিমু, কামাল বায়েজীদ প্রমূখ।

নাসির উদ্দীন ইউসুফের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সভার কার্যক্রম শুরু হল। সকলের মতামত নিয়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুভাই আমার হাতে ২৫০ টাকা ধরিয়ে দিলেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তালুকনগর থিয়েটার গঠন এবং এ বছরের আজাহার আলী বয়াতির মাঘী মেলা ১৯৮০ সনে আমাকেই করতে হবে।

১৯৮১ সনে আনুষ্ঠানিক ভাবে তালুকনগর থিয়েটার স্বীকৃতি প্রদান সেই সঙ্গে ঢাকা থিয়েটার প্রথমবারের মতো তালুকনগরে নাটক নিয়ে গ্রাম থিয়েটারের ভিত্তি স্থাপন করবে। রাত দশটায় সেলিমভাইসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এলাম। তখন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে অধিকাংশ কার্যক্রম সেলিমভাইয়ের বাসায় হতো। ১৯৮০ হতে ২০০৭ সন পর্যন্ত বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের কাজে সেলিমভাইয়ের বাসায় শতাধিক বারের বেশি আসতে হয়েছে। প্রতিবারেই করতে হয়েছে রাত যাপন। কিন্তু পারুলআপা বাড়তি ঝামেলা মনে করে কখনো বিরক্ত হননি।

একদিন পারুলআপা মিনতির সুরে বললেন, মানিক তোর দুলাভাই তাঁর দাফন বিষয়ে যে কথা বলেছিল তা পরবর্তী লেখায় অবশ্যই লিখবি। আমি তাই পারুলআপার কথা রাখতে কলম ধরলাম। সেলিমভাইয়ের সাথে শত শত স্মৃতি মনের মন্দিরে লুকোচুরি খেলে। আবেগজড়িত কণ্ঠে আমাকে বললেন, মানিক আমার মৃত্যুর পর দাফন যেন আজাহার আলী বয়াতীর কবরের পাশে দেয়া হয়। এটা তোর প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ।

১৪ জানুয়ারি ২০০৮ সালে সেলিমভাই সকল ভক্তদের অকুল সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর শবদেহ যখন শহীদ মিনার চত্বরে, দাফন বিষয়ে জল্পনা কল্পনার ভিড়ে সেলিমভাইয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করার সাহস পেলাম না। শুধু ঋণ পরিশোধের জন্যে পারুলআপা ও পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলাম।

আমি দেখেছি সেলিমভাইয়ের বাসায় হাজারও নাট্যকর্মীর ভিড়। তাদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পারুলআপাকেই বহন করতে হতো। গ্রাম থিয়েটার প্রতি নিবেদিত প্রাণ না থাকলে তা কোনদিনই সম্ভব হতো না। এক কথায় বলছি, সকল গ্রাম থিয়েটার নাট্যকর্মীদের জন্য তাঁর ঘরের দরজা সর্বক্ষণ খোলা থাকতো। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার সক্রিয়তার পিছনে পারুলআপার অবদান খাটো করে দেখবার অবকাশ নেই। সেলিমভাইয়ের চলে যাবার পর পারুলআপা বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের হারিয়ে যাওয়া তথ্য অন্বেষণে কয়েকবার গ্রামে এসেছেন। দু-তিন দফায় আমার নিকট থেকে ছবি ও তথ্যাদি সংগ্রহ করেছেন নিজ উদ্যোগে।

সর্বোপরি বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অগ্রযাত্রায় পারুলআপার অবদান অবিস্মরণীয়। পারুলআপা আজ আমাদের মাঝে নেই। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *