কিভাবে বলি ভালো থাকবেন স্যার

স্মরণ


হাবিব জাকারিয়া উল্লাস
অধ্যাপক আফসার আহমদ গতকাল আমাদের ছেড়ে গেলেন। আকস্মিক বলতেই হয়, তেষট্টি খুব বেশি বয়স নয়। মৃত্যুকে মানতে তো কষ্ট হয়, সে হবেই। এই যে, লিখতে গিয়েও মনে হচ্ছে, সত্যি তো? এমন হয়। বিশেষ করে নাট্যকলা বিভাগগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সম্পর্কের যে প্রবণতার ভেতর দিয়ে যায়, শিল্পমাধ্যম হিসেবে থিয়েটারের প্রভাবটা সেখানে থাকে। থাকাটাই জরুরি। শিল্পের সাথে নানাভাবে জড়িত মানুষদের সেটা বুঝতে কষ্ট হবে না।

যা লিখলাম সেটুকুও ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নয়। একজন নাট্যকলার শিক্ষার্থী যেভাবে একজন শিক্ষককে পায় ক্লাসে-মহড়ায়, সেখানে যে আবেগগুলো জন্ম নেয়, সেখানে যেভাবে পরষ্পর পরষ্পরকে জানা যায়, জানতে হয়, সে আবেগ হয়তো এ লেখার পাঠককে ছোঁবে না। আমাদের মহড়ার সময়কাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিনে আঁটবে না। তারপর সারারাত স্ক্রিপ্টের কাজ করে সকালে মহড়ায় যাওয়া। সারারাত ক্যাম্পাসের দেয়ালে পোস্টার মারা, টিকেট বিক্রি, একের পর এক শো করা, দেশে-দেশের বাহিরে শো করতে যাওয়া। নানান যজ্ঞের ভেতর দিয়ে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যাই। তাই যে কান্নাটা ভেতর থেকে ছুটে আসছে কাল থেকে, তার ঠিকানা কেবল আমার সতীর্থরাই বুঝবেন।
আপাতত এটুকু বলি, আজকে যখন ভাবি সেই ১৯৮৫-৮৬ সালে বাংলাদেশে নাট্যকলাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের একটি বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটা কতটা সহজ ছিল? তার পেছনের পরিকল্পনা, কর্মযজ্ঞ, সংযোগগুলো কেমন ছিল? ভাবতে পারাটাও বেশ কঠিন হয়। কিন্তু ঘটনাটি ঘটে গেছে। এখন পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ রয়েছে। শুরুটা করেছিলেন সেলিম আল দীন এবং আফসার আহমদ।

সমসময়ে দুজনই সারা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন এই জনপদের নাট্যমূলক পরিবেশনাগুলো দেখতে, বুঝতে। সেই অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছেন ‘থিয়েটার স্টাডিজ’ নামক গবেষণা পত্রিকায় এবং অবশ্যই নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পাঠে-প্রযোজনায়। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে তাঁরা এমন একটি সিলেবাস তৈরী করেছিলেন যেখানে বিশ্বনাট্যের ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলাদেশ জনপদের নিজস্ব নাট্যভাবনার ক্ষেত্রটি সবথেকে গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশে এই সময়োচিত উদ্যোগটি জরুরি ছিল।

পরবর্তীতে অধ্যাপক আফসার আহমদ মনোযোগ দেন বাংলাদেশে বসবাসরত নানা নৃগোষ্ঠীর দিকে। গবেষক হিসেবে তাঁর কর্মযজ্ঞের মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে সেটি। প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব নাট্যমূলক পরিবেশনা রয়েছে। সেই পরিবেশনাগুলোকে সংগ্রহে আনা, অনুবাদ এবং বিশ্লেষণে তাঁর গবেষক জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে। কেবল তাই নয়, উক্ত পরিবেশনাগুলোর নাট্যরূপ সৃজন ও মঞ্চায়নের কাজ তিনি বরাবর করে গেছেন। বাংলাদেশে নাট্যসমালোচনা ও গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার বিষয়েও বরাবর তাঁর আগ্রহ ছিল।

আফসার আহমদ গ্রিক ভাষা শিখেছিলেন গ্রিক নাটক পড়াবার জন্য। খুব সহজ করে ক্লাস নিতেন। তাঁর সাথে আমার প্রথম খাগড়াছড়ি যাওয়া, দীঘিনালায় চাকমা গেংখুলি গীদ ‘রাধামন ধনপুদি’ আর ‘স্রান্দবীর বারোমাইস্যা’ দেখতে। ফিরে ‘মনসার পালা’ প্রযোজনা। মনসামঙ্গলকে বিষয়বস্তু করে তাঁর লেখা। ‘মনসার পালা’ নাটকটি নিয়ে আমরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলগঞ্জ আর উদয়পুরে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ছে, ‘মনসার পালা’ লেখার সময় একরাতে তাৎক্ষণিক একটা গান বানিয়ে ফেললেন- ‘তুমি আমার বৃষ্টিভেজা প্রথম কদম ফুল, ভালবাসার সাতনড়ি হার, সন্ধ্যাতারার দুল’। একজন মানুষ যখন হঠাৎ সুরসহ নতুন কোন গান গেয়ে ওঠেন তখন তাঁকে খুব সুন্দর লাগে, ভীষণ সুন্দর। কোন বিষয়ের জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরাতো প্রায় শূন্য অবস্থায় যাই শিক্ষকের কাছে। বহুকাল পরে ফিরে তাকালে দেখি আজ ততটা শূন্যতা নেই, কেন নেই? সেখানে আরও অনেক কিছু, অনেকের মাঝে আফসার আহমদও আছেন। আমার শূন্যতায় আমি তাঁর কাছে নিয়েছি, আমার যা প্রয়োজন। আমরা কেউ দেবতা নই। মানুষ। দোষে-গুণে মানুষ। তাই হবার কথা।

কিভাবে বলি ‘ভালো থাকবেন স্যার’। আমার এখনকার দুনিয়াটা তো আপনি চেনেন। গতকাল থেকে আপনার কোন সংবাদ জানিনা।
সহযোগী অধ্যাপক, নাট্যকলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *