বগুড়ার দূর্গম চরে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার সেবা কেন্দ্র

গ্রাম থিয়েটার ডেস্ক:
প্রমত্তা ও খরস্রোতা যমুনার চরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে পালাগানের মোহনীয় নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার গত ২৮ আগস্ট ২০২১ (শনিবার) সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে অদম্য আহ্বান নিয়ে সাড়া জাগাল, বগুড়ার যমুনা পাড়ের সারিয়াকান্দিতে। শহর নয়, যমুনার মাঝে দুর্গম চরে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের পুণ্ডু অঞ্চলের নাট্যকর্মীরা দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলবন্ধন গড়তে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার সেবা কেন্দ্র’ নিয়ে হাজির হন দুর্গম চর মানিকদাইরে। শুধু পালাগানের নাটক নয়, দুর্গম চরের এই উদ্যোগে শামিল হয়েছিলেন একদল প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। সেবা কেন্দ্রে সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে আধুনিক জীবন থেকে অনেক দূরে পিছিয়ে পড়া মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়া হয় চিকিৎসাসেবা। যমুনার স্রোতের ডাকে তাল মিলিয়ে করোনা সচেতনতায় জাগরণী সুর তোলেন নাট্যকর্মীরা।

বগুড়া শহর থকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক এবং প্রায় ২০ কিলোমিটার নদী পথ পেরিয়ে যমুনার চর বেষ্টিত ইউনিয়নের চালুয়াবাড়ির ছোট্টগ্রাম মানিকদাইড় চর। প্রায় ৪ হাজার মানুষের আবাস এই চরের প্রধান সমস্যা নদীভাঙ্গন। প্রতিবছর ভাঙ্গনে এখন চরের গ্রামটির চার ভাগের ৩ ভাগই হারিয়ে গেছে যমুনার ঘূর্ণি স্রোতে। দুর্গম এই চরে ‘সেবা কেন্দ্র’ নিয়ে হাজির হয়েছিল বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বগুড়া ও জয়পুরহাটের বিভিন্ন ইউনিট নিয়ে গঠিত পুণ্ডু অঞ্চল। চর মানিকদাইড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার সেবা কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন সারিয়াকান্দি-সোনাতলা এলাকার সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান। এতে প্রধান আলোচক ছিলেন, চিকিৎসক টিমের সন্বয়কারী ডাঃ সামির হোসেন মিশু। প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল মিয়া, সারিয়াকান্দির পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান মতি, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক দুল, গ্রাম থিয়েটারের আন্তর্জাতিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান, পুণ্ডু অঞ্চলের সমন্বয়কারী শাহাজাদ আলী বাদশা ও সাখোয়াত হোসেন সজলসহ অন্য আওয়ামী লীগ নেতা ও জনপ্রতিনিধি এবং নাট্যকর্মী বক্তব্য রাখেন।

গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক জানান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়িয়ে দিতে দুগর্ম চরাঞ্চলে এই সেবা কেন্দ্র। সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দিতে পারলে কুসংস্কার বাল্যবিয়ে রোধসহ করোনা অতিমারীর এই সময়ে সাধারণ মানুষের মনো চেতনার আলো ভরিয়ে দেয়া সম্ভব। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মেলবন্ধন গড়তে সেবা কেন্দ্রের উদ্যোগ। শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নয়, চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে তুলতে চিকিৎসকরা এগিয়ে এসেছেন।

নব্বই বছরের বৃদ্ধ আব্দুর রহমান জানালেন, তাদের গ্রামে ৭ বছরের মধ্যে কোন চিকিৎসক আসেনি। চোখ ও হাতের ব্যথায় দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে আছেন। এজন্য সেবা কেন্দ্রে এসেছেন। গ্রামের লোকজন জানালেন ২০১৪ সালে তাদের ইউনিয়নের স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর তারা চিকিৎসাসেবা থেকে পিছিয়ে আছেন। আয়োজকরা তালিকাভুক্তি করেছিলেন ৩শ’ জনের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও ওষুধসহ মাস্কও সাবানের। সেখানে হাজির হন ৫ শতাধিক মানুষ। এত লোকের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমস্যা হলেও তারা সাধারণ মানুষের সহায়তায় হাসিমুখে দিনভর কার্যক্রম চালান।

চরাঞ্চলের বাসিন্দা আব্দুর রহিম, তিনি চোখের রোগে ভুগছেন। তিনি সর্বশেষ তিন বছর আগে বগুড়া শহরের চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। এরপর আর চিকিৎসকের কাছে যাননি। কারণ জেলা শহরের যাতায়াত করার মত টাকা তার কাছে নেই। তিনি গ্রাম থিয়েটারের সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা নিতে এসেছেন।

১২ চিকৎসক দলের সঙ্গে ছিলেন প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী। গ্রাম থিয়েটারের এই উদ্যোগ পীড়িত মানুষের মাঝে আনন্দের রেশ ছড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসা টিমের কার্যক্রমের মাঝে বগুড়া থিয়েটারে উদ্যোগে মঞ্চায়িত হয় নাটক ‘নিদানকাল’। করোনা অতিমারী, বাল্যবিয়ে রোধ, ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জাগরণী আহ্বান নিয়ে নাট্যকর্মীরা মঞ্চায়িত করেন এই পথ নাটক। মানুষকে জাগিয়ে তুলতে গম্ভীরা, লছিমনসহ বিভিন্ন পালাগানের বিভিন্ন আঙ্গিকে সচেতনতামূলক এই নাটকে টিকা গ্রহণ, মাস্ক পরার আহ্বান জানিয়ে পালাগানের সুরে বলা হয় ‘করোনা কারনো কারো আপন পর নয়,’ আসুন সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানি।

  • তথ্যসূত্র: দৈনিক জনকন্ঠ, জয়যুগান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *